প্রতিবেদন

টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে রোল মডেল

নিজস্ব প্রতিবেদক
শিশুর জন্মের পর মারাত্মক ১০টি রোগ থেকে রক্ষার জন্য সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে অবিস্মরণীয় সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাপক সফলতার জন্য ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ সম্মাননা পুরস্কার দিয়েছে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন এবং ইমিউনাইজেশন (জিএভিআই)।
২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশকে পোলিওমুক্ত রাখায় পুরস্কারটি পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জিএভিআই’র বোর্ড চেয়ারম্যান ড. গোজি ওকোনজো-ইউয়িয়ালার কাছ থেকে মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কারটি গ্রহণ করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনার হাতে পুরস্কার তুলে দেয়ার আগে প্রশংসাপত্রে ওকোনজো-ইউয়িয়ালার বলেন, এই পুরস্কার তাদের জন্য, যারা শিশুদের জীবন রক্ষার জন্য জরুরি টিকাদানে উদ্যোগী হয়েছেন এবং কোনো শিশু যাতে বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে কাজ করেছেন। শুধু টিকাদান কর্মসূচি নয়, শিশু অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়নেও শেখ হাসিনা একজন সত্যিকারের চ্যাম্পিয়ন।
জানা গেছে, ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) শুরু হয়। এরপর ১৯৮৫ সালের জরিপে দেখা যায়, ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের পূর্ণ টিকা প্রাপ্তির হার মাত্র ২ শতাংশ। সেই সময় শুধু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং বড় বড় হাসপাতালে টিকা দেয়া হতো। পরবর্তী ৫ বছরে কর্মসূচির ব্যাপক সম্প্রসারণ ও নিবিড় টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়।
১৯৯০ সালের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগ শিশু টিকা পায়। এরপর সময়মতো সব টিকা গ্রহণ না করার কারণগুলো দূর করার লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, সিডিসি, সিভিপি/পাথ এবং ইউএসএআইডি সম্মিলিতভাবে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করে, যা রেড স্ট্র্যাটেজি নামে পরিচিত। ২০০৩ সালে সরকার হেপাটাইটিস বি’র টিকা কর্মসূচিতে যুক্ত করে এবং এডি সিরিঞ্জ প্রবর্তন করে। ২০০৯ সালে সারাদেশে হিব পেন্টাভ্যালেন্ট এবং ২০১২ সাল থেকে ৯ মাস বয়সে দেয়া হামের টিকার পরিবর্তে হাম রুবেলা (এমআর) টিকা এবং ১৫ মাস বয়সে এমআর দ্বিতীয় ডোজ টিকা সংযোজন করা হয়।
২০১৫ সালে পিসিভি ও আইপিভি টিকা সংযোজন করা হয়। এছাড়াও ২০১৭ সাল থেকে সারাদেশে ফ্রাকশনাল আইপিভি টিকা সংযোজন করা হয়।
২০১৬ সালের জরিপ অনুযায়ী, ১ বছরের মধ্যে পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত শিশুর হার ছিল ৮২.৩ শতাংশ। যদিও বিসিজি টিকাদানের হার ছিল শতকরা ৯৯.৩।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ধনুষ্টংকার, ডিফথেরিয়া, হুপিংকাশি, যক্ষ্মা, পোলিও, হাম, রুবেলা, হিমোফাইলাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি, হেপাটাইটিস-বি ও নিউমোনিয়াসহ শিশুদের ১০টি মারাত্মক রোগের টিকা দেয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের এই টিকাগুলোর মধ্যে জন্মের পরপরই দিতে হয় যক্ষ্মার বিসিজি টিকা। এরপর ৬ সপ্তাহ, ১০ সপ্তাহ ও ১৮ সপ্তাহে দিতে হয় বাকি ডোজ। ৯ মাস পূর্ণ হলে হাম ও রুবেলার প্রথম ডোজ এবং দ্বিতীয় ডোজ দিতে হয় ১৫ মাস পূর্ণ হওয়ার পর। জন্ম থেকে ১৫ মাস পর্যন্ত সময়ে শিশুকে কমপক্ষে মোট ৫ বার টিকা কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হয়। এ জন্য শিশুদের একটি টিকা কার্ড করে দেয়া হয়। এই কার্ডটি সারাজীবন সংরক্ষণ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়।
জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব বান কি মুন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিচালক ইপিআই কর্মসূচি দেখে মন্তব্য করেন, বাংলাদেশ যেভাবে ইপিআই কর্মসূচি পরিচালনা করছে, সেটা বিশ্বের অন্য দেশের জন্য রোল মডেল। এমনকি এখনও পৃথিবীর যেকোনো দেশে এ প্রসঙ্গে যখন আলোচনা হয় তখন বাংলাদেশের প্রসঙ্গটি আসে। কারণ, শুধু টিকা প্রদানে সাফল্য অর্জন নয়, এটিকে ধরে রাখার ক্ষেত্রেও সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। এ কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশে যখন বিশেষ কর্মসূচি নেয়া হয় তখন বাংলাদেশ থেকে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের নিয়ে যাওয়া হয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যসেবায় সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) একটি গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এই কর্মসূচির সাফল্যের পাল্লাটা বেশ ভারী, যার জন্য মিলছে নানান স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ কর্মসূচি বাংলাদেশকে ইতিবাচকভাবে সফল রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এ কর্মসূচির ফলে দেশে মা ও শিশুমৃত্যুর হার কমানোর পাশাপাশি পঙ্গুত্ব রোধ করা সম্ভব হচ্ছে।
রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি তৃণমূলের স্বাস্থ্যকর্মী ও মাঠকর্মীদের আন্তরিকতা আর কমিউনিটির জনগণ, বিশেষ করে মায়েদের সক্রিয় অংশগ্রহণেই সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে সাফল্য আনা সম্ভব হয়েছে।
২০১০ সালে প্রকাশিত ‘গুড হেলথ অ্যাট লো কস্ট: টোয়েন্টি ফাইভ ইয়ারস অন’ শীর্ষক বইয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে অগ্রগতির যে কারণগুলো উল্লেখ করা হয়, তার মধ্যে ছিল বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি। বিশ্ববিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘ল্যানসেট’ ২০১৩ সালে শুধু বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন দিক নিয়ে একটি সিরিজ প্রকাশ করে। সেখানে টিকাদান কর্মসূচিতে কমিউনিটি, অর্থাৎ তৃণমূলের অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রমকে সাফল্যের প্রধান নিয়ামক হিসেবে তুলে ধরা হয়।
মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশ্বের অন্যতম সেরা ধনী বিল গেটস বলেছিলেন, ‘আমজাদ পৃথিবী থেকে পোলিও নির্মূলের অন্যতম এক নায়ক।’ এই আমজাদ হচ্ছেন বাংলাদেশের ছেলে এ এস এম আমজাদ হোসেন। ২০১২ সালে তিনি বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন থেকে গেটস ভ্যাকসিন ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড পান। শিশুদের পোলিও টিকা দেয়া নিশ্চিত করার কাজে নিজস্ব মেধা ও কৌশল অবলম্বনের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার দেয়া হয় তাকে। টিকাদান কর্মসূচির জেলা পর্যায়ের একজন স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন আমজাদ।