প্রতিবেদন

মানব পাচার প্রতিরোধে নানামুখী উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে বাংলাদেশের লোকজনের বিদেশে পাড়ি দেয়া থামছে না। ভাগ্য বদলাতে অনেকে দেশি-বিদেশি মানব পাচারকারীদের প্রলোভনের শিকার হচ্ছেন। এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে মানব পাচারের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশিদের নাম বারবার আসছে।
বিপজ্জনক পথে মানব পাচার যে বন্ধ হয়নি, তার সর্বশেষ উদাহরণ ২০১৯ সালে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালি যাওয়া বাংলাদেশের লোকজনের নৌকাডুবির ঘটনা। ওই ঘটনায় ৪ জনের মৃতদেহ এবং নিখোঁজ ৩৯ বাংলাদেশির নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে।
উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিরা মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত নোয়াখালীর ৩ ভাইয়ের নাম উল্লেখ করেছেন। তারা হলেন রোম্মান, রিপন ও রুবেল। তাদের একটি শক্তিশালী চক্র রয়েছে লিবিয়া ও তুরস্কে। উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিরা মাদারীপুরের দু’জন পাচারকারীর নামও উল্লেখ করেছেন। তাদের নাম নুরী ও মিরাজ।
এর আগে ২০১৮ সালের অক্টোবরে মেক্সিকোর দুর্গম পথে প্রায় ২০০ বাংলাদেশি আটক হন। তাদের গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে তখন বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র পৌঁছাতে আগ্রহী অবৈধ অভিবাসীদের দুবাই থেকে ব্রাজিল নেয়া হয়। এরপর বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, পানামা সিটি ও গুয়াতেমালা হয়ে নেয়া হয় মেক্সিকোতে।
একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে আটক করা হয় ১৯২ জন বাংলাদেশিকে। তাদের গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে লিবিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার পথটি হচ্ছে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ওই পথ দিয়ে ইতালি যাওয়ার সময় প্রতি ৫০ জনের ১ জন মারা গেছে। আর ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত অন্তত ১৭ হাজার অবৈধ অভিবাসী ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইউরোপে ঢুকে পড়েছে। এ সময়ে সাগরে হারিয়ে গেছে অন্তত ৪৪৩ জন বাংলাদেশি।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ দপ্তরের (ইউনিডক) ২০১৯ সালের মানব পাচারবিষয়ক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম ও দক্ষিণ ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্তত ৫ শতাংশ নাগরিককে পাওয়া গেছে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে মানব পাচারের শিকার হওয়া এসব লোক মূলত ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নাগরিক। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার লোকজন বিশ্বের ৪০টি দেশে মানব পাচারের শিকার হয়।
মানব পাচারকারীদের খপ্পর থেকে মুক্তি পাওয়া বিদেশগামী বাংলাদেশিরা বলছেন, মূলত উন্নত জীবনের আশায় এসব ঝুঁকিপূর্ণ পথে তারা দেশের বাইরে পা রাখেন। তবে সরকারের তথ্য অনুযায়ী দেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে। ২০০৫ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ, বর্তমানে তা কমে হয়েছে ২১ শতাংশ। মোট দেশজ উৎপাদন গত ৪ বছরে অব্যাহতভাবে ৭ থেকে বেড়ে ৮ শতাংশ হয়েছে। একই সময় মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৬৫ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯০৯ ডলার হয়েছে। তবে এ সময়ে বেকারত্বের হার কমবেশি একই রকম থেকে গেছে। পছন্দমতো কাজ পাচ্ছেন না অন্তত ৬৬ লাখ নারী-পুরুষ।
দেশের উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির এমন আবহে বাংলাদেশিদের মানব পাচারকারীর খপ্পরে পড়ার কারণ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মরিয়া হয়ে যারা বিদেশ যাচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই তরুণ। তাদের অনেকেই হয়তো স্কুল কিংবা কলেজের পাট চুকিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনীতি এখন কোন ধরনের কাজের সুযোগ করে দিচ্ছে, সে বিষয়টিও ভাবতে হবে। অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি হয়তো চায়ের দোকানে কিংবা অ্যাপভিত্তিক পরিবহন যাত্রীসেবায় লোকজনের কাজের সুযোগ করে দিচ্ছে। কিন্তু বিদেশগামী তরুণেরা আসলে কী ধরনের কাজ চায়, সেটা আমাদের নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে। তরুণরা নিজেদের জন্য উন্নত ভবিষ্যৎ চায়। মর্যাদাসম্পন্ন কাজ চায়। আর এ ধরনের কাজের জন্যই ঝুঁকি নিয়ে তারা বিদেশে যেতে বাধ্য হচ্ছে। প্রবৃদ্ধির উচ্চ হার দিয়ে এটা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।
এমন অবস্থায় মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশে একটি প্রকল্পের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) বাংলাদেশ এবং কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (কোইকা)।
৫ বছর মেয়াদী এই প্রকল্পের আওতায় মানব পাচার প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি ও দক্ষতা সৃষ্টিতে কাজ করবে এই দুই সংস্থা। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে আইওএম।
আইওএম-এর ঢাকা কার্যালয়ে গত ১৬ মার্চ এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন আইওএম বাংলাদেশ-এর মিশন প্রধান ও বাংলাদেশ জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক নেটওয়ার্ক-এর সমন্বয়ক গিওরগি গিগাওরি এবং কোইকা বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ইয়ংহা ডো।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০১৯ সালে প্রায় ৭ লাখ অভিবাসী দেশের বাইরে গেছেন। যেসব অভিবাসী অবৈধ পথে দেশের বাইরে যাচ্ছে তারা পাচারকারীদের হাতে শোষণ ও নিপীড়নের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিশ্বে বর্তমানে আধুনিক দাসত্বের শিকার আনুমানিক ৪ কোটির বেশি মানুষ এবং জোরপূর্বক শ্রমের সর্বোচ্চ বিস্তার এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিদ্যমান।
একদিকে যেমন মানব পাচারের শিকার ও ভুক্তভোগীদের সংখ্যার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই, অপরদিকে বাংলাদেশে মানব পাচারের অভিযোগে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ মামলা বিচার প্রক্রিয়া শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে।
‘কোইকা-আইওএম কম্প্রিহেনসিভ প্রোগ্রাম টু কমব্যাট হিউম্যান ট্রাফিকিং ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই প্রকল্পটি ৩টি ক্ষেত্রে কাজ করবে, যেমন- পাচারকারীদের বিচার নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচার বিভাগের দক্ষতা বৃদ্ধি, মানবপাচারে ক্ষতিগ্রস্তদের টেকসই পুনঃএকত্রীকরণে সহায়তা প্রদান এবং ঢাকা, যশোর, সাতক্ষীরা ও কক্সবাজারসহ সারাদেশে ১০ লাখ মানুষের মাঝে পাচারের ঝুঁকি এবং নিরাপদ অভিবাসনের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি।