প্রতিবেদন

যেভাবে শিশুমৃত্যুর হার ৬৩ শতাংশ কমিয়েছে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
শিশুমৃত্যুহার হ্রাসে বাংলাদেশ প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশে বিগত ২০ বছরে শিশুমৃত্যুর হার ৬৩ শতাংশ কমিয়েছে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশই ২০০০ সাল থেকে শিশুমৃত্যু হ্রাসে যথেষ্ট উন্নতি করেছে, যাতে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ।
শূন্য থেকে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুহার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্যকে ইতোমধ্যে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) স্বীকৃতি দিয়েছে।
ইউনিসেফ-এর এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্য পরিসেবার উন্নয়নের ফলেই বাংলাদেশে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। এমনকি শিশুমৃত্যুহার হ্রাসে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। মা ও শিশুমৃত্যুহার হ্রাসে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের টার্গেট নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন-এর বার্ষিক গ্লোবাল চাইল্ডহুড রিপোর্ট-২০১৯ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালে গত দুই দশকে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা অনেক হ্রাস পেয়েছে। ৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি অর্জন করেছে, যেখানে ভুটানের শিশুমৃত্যুর হার কমেছে ৬০ শতাংশ, নেপালে ৫৯ শতাংশ এবং ভারতের ৫৭ শতাংশ। আর বাংলাদেশ শিশুমৃত্যুর হার কমিয়েছে ৬৩ শতাংশ।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, সরকার মাতৃ ও শিশুমৃত্যু রোধে সকল সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করেছে। আর এই কারণেই দেশে মাতৃ ও শিশুমৃত্যু দু’টিই কমেছে। ২০১৭ সালে গর্ভকালীন মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ১৭৬ জন থাকলেও বর্তমানে তা ১৭২ জন। এছাড়া ২০১৫ সালে প্রতি হাজার নবজাতকের মৃত্যুহার ২০ জন থাকলেও বর্তমানে তা হ্রাস পেয়ে ১৮ দশমিক ৪ ভাগে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরো বলেন, এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আমাদের ২০৩০ সালের মধ্যে প্রিম্যাচিউরড শিশুমৃত্যুহারের লক্ষ্যমাত্রা ১২ দেয়া আছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতের সবাই সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে এই অপরিণত শিশুমৃত্যুহারের লক্ষ্যমাত্রা আগামী ২ বছরেই অর্জন করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে দেশের সব সরকারি হাসপাতালেই গর্ভবতী মায়েদের জন্য ২৪ ঘণ্টা ডেলিভারি সুবিধাও রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ও নিপোর্টের রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত ২৪ বছরে দেশে শিশুমৃত্যুহার ৭৩ শতাংশ কমেছে। এসডিজি অনুযায়ী, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে শূন্য থেকে ১ মাস বয়সী শিশুমৃত্যুহার প্রতি হাজারে ১২ জনে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বর্তমানে এই সংখ্যা ২৮ জন। তবে শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুমৃত্যুহার প্রতি হাজারে ৩৮ জন।
সর্বশেষ জরিপেও দেখা গেছে, প্রতি হাজারে শূন্য থেকে ১ মাস বয়সী ২৮ শিশু মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুমৃত্যুহার প্রতি হাজারে মাত্র ১০ জন। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য শূন্য থেকে ১ মাস বয়সী শিশুমৃত্যুহার হাজারে ১২ জন এবং ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুমৃত্যুহার হাজারে ২৫ জনে নামিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুমৃত্যুহারে বাংলাদেশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এখনই এগিয়ে রয়েছে। তবে, শূন্য থেকে ১ মাস বয়সী শিশুমৃত্যুহার হাজারে ১৪ জন কমানোর বিষয়টি সংশ্লিষ্টরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের একজন পরিচালক এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, শূন্য থেকে ১ মাস বয়সী শিশুর মৃত্যুঝুঁকি বেশি। যদিও ৫ বছরের নিচে পর্যন্ত ঝুঁকি থেকে যায়। কারণ, জন্ম-পরবর্তী শ্বাসকষ্ট, কম ওজনের কারণে জন্মগত জটিলতা, সেপটিসেমিয়া, নিউমোনিয়া ও এনকেফেলাইটিস ৫ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ। এ ছাড়া অপুষ্টির কারণেও মৃত্যু হয়। এই মৃত্যু প্রতিরোধে সার্বিক ব্যবস্থাপনার মান বাড়ানো হয়েছে। টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন, ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণ, ভিটামিন এ সম্পূরক ওষুধের সফল ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব কারণে শিশুমৃত্যু হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা থাকলে আগামী ২০৩০ সালের আগেই শিশুমৃত্যুহার কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুমৃত্যুহার কমে আসার ক্ষেত্রে সরকার পরিচালিত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে সন্তান প্রসবের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং প্রসূতি মায়ের স্বাস্থ্য পরিচর্যার সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের বাইরে কিছু এনজিও শিশুমৃত্যুহার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে নিরাপদ সন্তান প্রসবে হাজার হাজার ধাত্রীকে প্রশিক্ষিত করেছে ব্র্যাক। এসব ধাত্রী সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছেন।