অর্থনীতি

শেয়ারবাজারে ধস ঠেকাতে বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
করোনা ভাইরাসের বিরূপ প্রভাবে বিশ্বের প্রায় সব দেশের শেয়ারবাজারেই পতন শুরু হয়েছে। এর ঢেউ এসে লেগেছে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারেও। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসইর) প্রধান মূল্যসূচক এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে গেছে। এ অবস্থায় শেয়ারবাজারের ধস ঠেকাতে বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার আতঙ্ক জেঁকে বসেছে শেয়ারবাজারে। এ আতঙ্কে ব্যক্তিশ্রেণি থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা পর্যন্ত নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। এতে বাজারে চরম ক্রেতাসংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে আতঙ্কিত বিনিয়োগকারীদের অনেকে লোকসানে শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় বাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেয়া উদ্যোগও কাজে আসছে না। বাজারের পতন রোধে ব্যাংকগুলো যাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসে, সেই ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ জানিয়েছেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) নেতারা। গভর্নর ফজলে কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ অনুরোধ জানান তারা।
শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর আগে করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বের প্রধান প্রধান শেয়ারবাজারে যখন পতন দেখা দেয়, তখনো মোটামুটি ভালো অবস্থায় ছিল দেশের শেয়ারবাজার। কিন্তু দেশে করোনার রোগী শনাক্ত এবং তিন জনের মৃত্যুর খবরে দেশের শেয়ারবাজারে স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি পতন শুরু হয়, যা অব্যাহত আছে। এ অবস্থায় ধস ঠেকাতে বিশেষ তহবিল গঠন কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে সন্দিহান সংশ্লিষ্ট অনেকে।
এদিকে করোনার প্রভাবে দেশের পুঁজিবাজারে যে ধস নেমেছে তা কাটিয়ে উঠতে গত ১৮ মার্চ থেকে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ শুরু করেছে। এতে করে শেয়ারবাজারের ধস ঠেকানো যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
১৬ মার্চ রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে এনইসি সম্মেলনকক্ষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সঙ্গে বৈঠকে বসেন দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা। সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানানো হয়।
বৈঠকে বিভিন্ন ব্যাংকের এমডিরা তাদের ব্যাংক শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করবে বলে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে আশ্বস্ত করেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে সবাই আতঙ্কগ্রস্ত। আমরা বৈঠকে বসেছি যাতে তাদের জন্য কিছু করতে পারি কি না। এক্ষেত্রে আমাদের ব্যাংকগুলো হলো প্রাথমিক উৎস। তারা সবাই আশ্বস্ত করেছেন, কেউ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেজন্য ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজারে নতুন বিনিয়োগ করবে।
বৈঠক শেষে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, দেশের শেয়ারবাজার উঠছিল। হঠাৎ করে করোনা ভাইরাস আসার পর ভয় পেয়ে অনেকে শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। এখনই ওই ২০০ কোটি টাকা যেটা দেয়া হয়েছে, সেটাকে সঠিক পন্থায় বিনিয়োগ করতে হবে। ওই তহবিলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার মতো আছে। ওই টাকার যথাযথ ব্যবহার করা উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংক যে শর্ত দিয়েছে তাতে প্রত্যেকটি ব্যাংক রাজি হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এখানে প্রায় ৫০টির মতো ব্যাংক রয়েছে। সবাই একবারে ২০০ কোটি টাকা করে শেয়ার কিনবে না, ক্রমান্বয়ে কিনবে। এটা মনিটরিং করা হবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। এর মাধ্যমে শেয়ারবাজারে এখন যে স্থবিরতা বিরাজ করছে, আস্তে আস্তে সেখান থেকে বের হয়ে আসা যাবে।
এদিকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করেছে ১১টি ব্যাংক। বাকিদের দ্রুত তহবিল গঠনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে। শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াতে এই তহবিল বিশেষ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ইতোমধ্যেই তহবিল গঠন সম্পন্ন করেছে ৮টি ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হলো সোনালী, জনতা, রূপালী, সিটি ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, এসআইবিএল এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক। বাকি ৩টি ব্যাংক ২৪ মার্চের মধ্যেই তহবিল গঠন সম্পন্ন করবে বলে জানা গেছে। এই ৩টি ব্যাংক হলো ঢাকা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়া।
সূত্র বলছে, সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের প্রভাবে কিছুদিন থেকে খুবই খারাপ সময় পার করছে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, সে অনুযায়ী তহবিল গঠন করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে কয়েকটি ব্যাংক বিশেষ তহবিল গঠন সম্পন্ন করেছে। বাকিরাও যাতে দ্রুত এই তহবিল গঠন করে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। শেয়ারবাজারের উন্নয়ন নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিবাচক। শিগগিরই বাজার ঘুরে দাঁড়াবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এদিকে জানা গেছে, বিশেষ তহবিল গঠনের পাশাপাশি অব্যাহত ধস ঠেকাতে দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনের সময়সীমা ১ ঘণ্টা কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
১৮ মার্চ অনুষ্ঠিত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ডিএসইর সিদ্ধান্তের পর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জও একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
১৯ মার্চ থেকে দুই স্টক এক্সচেঞ্জ সকাল সাড়ে ১০টায় লেনদেন শুরু হয়ে তা চলে বেলা দেড়টা পর্যন্ত। এর ফলে এখন থেকে প্রতিদিন লেনদেন হবে ৩ ঘণ্টা।