প্রতিবেদন

সমুদ্রসম্পদ রক্ষা ও আহরণে বাংলাদেশ নৌবাহিনী

এম নিজাম উদ্দিন
দেশের সমুদ্রসম্পদ রক্ষা ও আহরণে বাংলাদেশ নৌবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সত্ত্বে¡ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রচেষ্টায় ভারত থেকে সংগৃহীত ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’ নামে দুটি পেট্রোল ক্র্যাফট নিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কার্যক্রম শুরু হয়। সেদিনের সেই বাংলাদেশ নৌবাহিনী এখন একটি ত্রি-মাত্রিক আধুনিক বাহিনীতে পরিণত হয়েছে।
‘শান্তিতে সংগ্রামে সমুদ্রে দুর্জয়’ এই মহিমান্বিত বাণীর ধারক ও বাহক বাংলাদেশ নৌবাহিনী। ইতোমধ্যে নৌবহরে যুক্ত হয়েছে আরও ৩টি যুদ্ধজাহাজ। প্রথমবারের মতো এসেছে দুটি অত্যাধুনিক সাবমেরিন। হাতে নেয়া হয়েছে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ কার্যক্রম। নৌবাহিনীকে আরও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে চীনে নতুন দুটি করভেট নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থানগত ও কৌশলগত কারণে বাংলাদেশের জলসীমা ও তার সম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয় নৌবাহিনীকে। উপকূলীয় এলাকার নিরাপত্তা বিধানও নৌবাহিনীর একটি অন্যতম কাজ। কারণ, বাংলাদেশের রয়েছে ৭১০ কিলোমিটার উপকূল এলাকা, যেখানে প্রায় ৩ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহের জন্য সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল। বহির্বিশে^র সাথে দেশের বাণিজ্যের ৯০ ভাগেরও বেশি সমুদ্রপথেই পরিচালিত হয়ে থাকে।
মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ মীমাংসার পর বঙ্গোপসাগরে সুবিশাল অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে সমুদ্রনিরাপত্তার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ওই এলাকায় অবাধে মাছ শিকার ও অন্যান্য সম্পদ আহরণ করা যাচ্ছে। ওশানোগ্রাফি ও ব্লু ইকোনমির ওপর কাজ শুরু হয়েছে। আর এ কাজে প্রধান ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী।
সাগরে এখন বাংলাদেশের ৬০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য। বছরে ২ হাজার ৬০০ বিদেশি জাহাজ আসে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে। এজন্য কোস্টাল শিপিং চালু হয়েছে। সমুদ্রকে ঘিরে কর্মসংস্থানের বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সমুদ্রের সম্পদ লুণ্ঠনে অন্যরা শ্যেনদৃষ্টি ফেলছে, জলদস্যুরা টার্গেট নিয়ে আছে। ওদের ঠেকাতে প্রয়োজন একটি বহুবিধ ক্ষমতাসম্পন্ন ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনীর। একদিকে তার থাকবে ভাসমান যুদ্ধজাহাজের বড় নৌবহর, অন্যদিকে থাকবে গভীর সমুদ্রের তলদেশে সাবমেরিনের ক্লাস্টার। আরও থাকবে নৌ অভিযানকে অন্তরঙ্গভাবে সহযোগিতা দিতে দূরপর্যবেক্ষণ শক্তিসম্পন্ন বহুমাত্রিক দক্ষতার বিমানের সারি। প্রয়োজনে বিমানবাহী জাহাজ সংযোজিত হবে। এমন একটি যুগোপযোগী শক্তিশালী আধুনিক সর্বমাত্রার নৌবাহিনীর প্রয়োজন ভূকৌশলগত অবস্থানের কারণে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
অবশ্য সমুদ্রবাণিজ্য রক্ষার পূর্ণ দায়িত্ব এখন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ওপর। যদিও বাংলাদেশ নৌবাহিনী উপকূলীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন দূর সমুদ্রের চ্যালেঞ্জ তাদের সামনে। আর এ জন্যই সকল মহল থেকে এর আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে এবং বর্তমান সরকারের গৃহীত ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর আলোকে নৌবাহিনীর আধুনিকায়নও অনেক দূর এগিয়েছে।
বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় নৌবাহিনীর দায়িত্ব অনেক। দেশের বিশাল জলসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি সমুদ্রে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান রোধ, গভীর সমুদ্রে উদ্ধার তৎপরতা বৃদ্ধি, মৎস্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ব্লকসমূহে অধিকতর নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি সার্বিকভাবে দেশের ব্লু ইকোনমির উন্নয়নে এ বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছে।
ক্রমাগত আহরণের ফলে বিশে^র স্থলভাগের সম্পদ আজ সীমিত। তাই সারা বিশ^ এখন নতুন সম্পদের খোঁজে রয়েছে। সরকার ব্লু ইকোনমির মাধ্যমে সমুদ্রসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির ৯৫ শতাংশ সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবদান ৯২ শতাংশ। দেশের সমুদ্রবন্দর কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নির্মিত হচ্ছে পায়রা সমদ্র্রবন্দর। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নে রাবনাবাদ চ্যানেলের তীরে এটির নির্মাণকাজ চলছে। প্রতি বছর দেশের বন্দরের ব্যবহার ১২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জরুরি হয়ে উঠেছে নতুন একটি বন্দরের। তাছাড়া বর্তমান দুটি বন্দরে যে আকারের জাহাজ আসতে পারে, তারচেয়ে বৃহত্তর দৈর্ঘ্য ও বেশি গভীরতার জাহাজ সরাসরি পায়রা বন্দরের জেটিতে আসতে পারলে সামগ্রিকভাবে লাভবান হতে পারবে দেশের শিল্প, বাণিজ্য ও অর্থনীতি।
২০১৩ সালে কাজ শুরু হওয়া পায়রা বন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে ট্রানজিট ও অর্থনৈতিক করিডোর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প-কারখানা, নৌবাহিনীর ঘাঁটিসহ অবকাঠামোগত আরও অনেক সুযোগ-সুবিধা। পর্যটন ও কর্মসংস্থানেরও বিরাট ক্ষেত্র তৈরি হবে। উপরন্তু মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা- যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি দায়িত্ব বাড়বে নৌবাহিনীর।
সমুদ্র বাণিজ্যের গতিপথ নিশ্চিত করার জন্য দরকার চোরাচালান রোধ, রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য বিদেশিদের অনুপ্রবেশ বন্ধকরণ, জলদস্যুতা ও অন্যান্য অপরাধ দমন করা। তেমনি বন্দরকে দরকার রক্ষা করা। আর এসব কাজ নৌবাহিনীকে করতে হচ্ছে। নৌবাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরের আমদানি-রপ্তানির প্রক্রিয়া গতিশীল হয়েছে। নৌবাহিনীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো মোংলা বন্দরে নিরাপদে ভিড়তে পারছে এবং দুর্বৃত্তদের কবলমুক্ত হয়ে স্বাভাবিক মাল খালাস প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হয়েছে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ নৌবাহিনী সাফল্য দেখিয়েছে। নৌবাহিনী এবং বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় মিয়ানমার ও ভারতের সাথে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। বাংলাদেশের জলসীমার পরিধি বিস্তৃতি লাভ করায় নৌসদস্যদের দায়িত্ব আরও বেড়েছে।
নৌবাহিনতে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন জাহাজ, অত্যাধুনিক এয়ারক্র্যাফট। এছাড়া নতুন ঘাঁটি ও সংস্থা তৈরি, নতুন নতুন স্থাপনা প্রস্তুতকরণ, নৌসদস্যদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত ও বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাসহ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কলেবর আরও বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলছে। সরকারের ‘ফোর্সেস গোলের’ আওতায় নৌবাহিনীর প্রভূত উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনী বিশ্বের অন্যতম দক্ষ ও শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর প্রথম ধাপ ২০১২-১৫ সময়ে ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এ ধাপে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুটি ফ্রিগেট, চীন থেকে দুটি করভেট জাহাজ এবং দেশের খুলনা শিপইয়ার্ডে তৈরি যুদ্ধজাহাজসহ ২০টি যুদ্ধজাহাজ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে অত্যাধুনিক নৌবহর, সাবমেরিন, ডেস্ট্রয়ার, অত্যাধুনিক ফ্রিগেটশিপ, করভেটশিপ, মাইন সুইপার, পেট্রল ক্র্যাফট, অয়েল ট্যাংকার, নেভাল অ্যাভিয়েশন, গবেষণা ও জরিপ জাহাজ এবং এক দল দক্ষ ও অকুতোভয় নৌ সদস্যদের নিয়ে একটি শক্তিশালী বাহিনীরূপে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী।

দুই.
নৌবাহিনীকে বাংলাদেশের জলসীমার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে নিজেদের তথা বাংলাদেশকে সম্ভাব্য দুর্যোগ থেকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধের নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশ জলসীমা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাওয়ায় সমুদ্রবাণিজ্য নির্বিঘœ এবং দুষ্কৃতকারীদের হীন চেষ্টা প্রতিরোধ করতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সকল জাহাজ, ঘাঁটি ও স্থাপনায় বিশেষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হচ্ছে।
নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার ক্ষেত্রে প্রত্যেক নৌ সদস্যের তাদের নিজ নিজ স্থান থেকে আরও সচেতন থাকা জরুরি। এজন্য বিশ^ায়নের যুগে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, ধর্মীয় উগ্রপন্থিদের উত্থান এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের রণসামর্থ্যরে বিষয়সমূহ বিবেচনা করে দেশের নৌবাহিনীকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। হলি আর্টিজানের অভিযানে নেভি শিল্ড অংশগ্রহণ করে জঙ্গি নির্মূলে ভূমিকা রেখেছে।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগের দিক থেকেও নৌবাহিনী এগিয়ে আছে। বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনী প্রধানদের সফর, স্বার্থসংশ্লিষ্ট দেশসমূহের সমুদ্রবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন, বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর সাথে বিশেষ বিশেষ সামুদ্রিক মহড়ায় অংশগ্রহণ, বন্ধুপ্রতিম দেশে নৌবাহিনী জাহাজসমূহের শুভেচ্ছা সফরসহ আন্তঃযোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সামুদ্রিক মহড়া, শুভেচ্ছা সফর এবং আন্তঃযোগাযোগে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর দক্ষতা ও রণকৌশল সমৃদ্ধ হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতার মাধ্যমে স্পেশাল ওয়ারফেয়ার ডাইভিং অ্যান্ড স্যালভেজ (সোয়াডস) প্রতিষ্ঠা এর অনন্য নিদর্শন।

তিন.
বর্তমানে বাংলাদেশের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার ৬৩২ বর্গকিলোমিটার। এই সমুদ্রসীমা অগাধ প্রাকৃতিক সম্পদের ভা-ার। এই সীমার আওতায় প্রচুর পরিমাণে মাছ, সমুদ্রজাত উদ্ভিদ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, যা আমাদের দেশের বিপুল জনসংখ্যার সম্পূর্ণ চাহিদা মেটাতে সক্ষম। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন এই সম্পদের সুষ্ঠু সংরক্ষণ ও ব্যবহার। বাংলাদেশ নৌবাহিনী এজন্যই কাজ করছে।
এছাড়াও সাঙ্গু উপকূলীয় গ্যাসফিল্ডের ওপর ভিত্তি করে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে বিভিন্ন গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে, সামুদ্রিক অঞ্চলে আমাদের গ্যাস আহরণের কিংবা খনিজ তেল প্রাপ্তির সম্ভাবনা খুবই বেশি, যা আমাদের জলসীমার গুরুত্ব কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত দেশীয় জেলেদের সহযোগিতা এবং সন্ত্রাসীদের হাত থেকে বিদেশি জাহাজগুলোকে নিরাপদে বন্দরে পৌঁছানো এবং সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রের স্থাপনা ও পাইপ লাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নৌ সদস্যরা দেশের দুর্জয় কা-ারির ভূমিকা পালন করছে।
মৎস্য আহরণ ও বাজারজাতকরণসহ সমুদ্রসম্পদ বিশেষ করে আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ লাখ লোকের জীবিকা নির্ভরশীল। ২০০১ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রথমবারের মতো জাটকাবিরোধী কর্মসূচি ‘অপারেশন জাটকা’ অভিযান শুরু করে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর টহল জাহাজ প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ অবৈধ কারেন্ট জাল আটক ও ধ্বংস করে মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বিশাল সমুদ্রে অবৈধ অস্ত্র ও মালামাল বহনকারী জাহাজ ও নৌকা এবং সন্ত্রাসীদের আটক করার জন্য কুতুবদিয়া চ্যানেল ও মহেশখালীতে নৌবাহিনীর জাহাজ ও নৌসদস্যরা নির্ঘুম প্রহরীর ভূমিকা পালন করছে। বিশাল সমুদ্রসীমানা রক্ষা, নৌপথে মানব পাচার রোধ ও অবৈধ মৎস্য আহরণ রোধ করতে নৌবাহিনীর ৫ থেকে ৭টি জাহাজ প্রতিনিয়ত টহলে রয়েছে।
বিদেশ থেকে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের বাংলাদেশে প্রবেশ রোধ করে বাংলাদেশ নৌবাহিনী এদেশের যুবশক্তিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করছে। দেশের সমুদ্রে অন্যদেশের মাছ ধরার ট্রলার আটক করে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অকুতোভয় নাবিকরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে বাংলাদেশের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। উপকূলীয় এলাকা সন্দ্বীপ ও সেন্টমার্টিনের প্রবাল দ্বীপসমূহ, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, কক্সবাজারে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়মিত অপারেশনের ফলে হাজার হাজার মানুষকে নিরাপত্তা প্রদান করে যাচ্ছে।

চার.
২০১২ ও ২০১৪ সাল ছিল বাংলাদেশের সমুদ্র বিজয়ের উৎসবের বছর। বাংলাদেশ ১৪ ডিসেম্বর ২০০৯ সালে মিয়ানমারের বিপক্ষে জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত সমুদ্র আইনবিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল এবং ভারতের বিপক্ষে নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত সালিশি ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার মামলায় আন্তর্জাতিক আদালত বাংলাদেশের যৌক্তিক ন্যায্যতাভিত্তিক দাবির পক্ষে ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে। এর ফলে বঙ্গোপসাগরের মহীসোপানে বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি জলসীমা পেয়েছে। বাংলাদেশ সেন্টমার্টিন দ্বীপের জন্য ১২ নটিক্যাল মাইল রাষ্ট্রাধীন সমুদ্র এলাকা, ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল সীমানা এবং মহীসোপানে অধিকার প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বাংলাদেশের অনুকূলে এ রায় প্রদানে বাংলাদেশ নৌবাহিনী হাইড্রোগ্রাফিক ডিপার্টমেন্টের তত্ত্বাবধানে সাইড স্ক্যান সোনারের মাধ্যমে গভীর সমুদ্র এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান সঠিকভাবে নিরূপণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এরপর ২০১৪ সালের ৮ জুলাই সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারতের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পন্ন হওয়ার রায় দেয়া হয়। রায়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমানার আনুমানিক ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটারের অধিকার পেয়েছে বাংলাদেশ। এই সমুদ্রসীমা উদ্ধারেও বাংলাদেশ নৌবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নৌবাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বঙ্গোপসাগরের মহীসোপানে বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠার জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের যে ন্যায়সঙ্গত অধিকার ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে মামলার নিষ্পত্তির মাধ্যমে যে এলাকায় আমাদের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো সেসব এলাকায় সব ধরনের জৈব, খনিজ, সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ ও আহরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলের ব্যবস্থা করা এবং এই সমুদ্র অঞ্চলের নিরাপত্তাবিধানের প্রধান দায়িত্ব এখন নৌবাহিনীর কাঁধে। ত্রিমাত্রিক এই বাহিনী তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
উল্লেখ্য, বিশ্বের কোনো দেশের সমুদ্রসীমা কখনোই ঝুঁকিমুক্ত নয়, এদিক থেকে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা শত্রুমুক্ত রাখতে এবং সমুদ্র বাণিজ্যকে রক্ষার জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে সদা সচেষ্ট থাকতে হচ্ছে। কারণ তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে দেশের সমুদ্রসীমা রক্ষা এবং অপরিসীম সমুদ্র সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণ করা।

শেষ কথা
উন্নয়নের স্বার্থেই বঙ্গোপসাগরের সম্পদরাজির যথাযথ সংরক্ষণ প্রয়োজন। গোটা বিশ্বের মানুষ সমুদ্রের ওপর অধিকতর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। একটি সমুদ্র উপকূলীয় দেশ হিসেবে আমাদের দেশের জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান হার সমুদ্র্রনির্ভরতাকে আরও ব্যাপক করে তুলেছে। সমুদ্র থেকে প্রাপ্ত সকল খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে লক্ষণীয় ভূমিকা পালন করতে পারে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এটা করতে হলে নৌবাহিনীকে আরো আধুনিক করে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলমান থাকা উচিত।
দেশের বিশাল সমুদ্রাঞ্চলে রয়েছে মৎস্য, গ্যাস ও অন্যান্য খনিজসম্পদসহ অনাবিষ্কৃত মূল্যবান সম্পদ। এসব সম্পদ রক্ষা, আহরণ ও সমুদ্র এলাকার সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী, আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য নৌবাহিনী গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
বিশাল সমুদ্র নৌবাহিনীর কর্মক্ষেত্র। লোকচক্ষুর অন্তরালে উত্তাল সমুদ্রে দিবারাত্রি কঠোর পরিশ্রম ও কর্তব্যনিষ্ঠার যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তারা স্থাপন করেছেন দেশবাসী তা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। উপরন্তু নৌবাহিনীর সদস্যরা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের তৎপরতা সকলের প্রশংসা অর্জন করেছে। সমুদ্রবাণিজ্য রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশ নৌবাহিনী এখন অনেক বেশি কার্যকর, শক্তিশালী ও গতিশীল বাহিনী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বিশেষ করে ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা ও গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর গুরুত্ব ও কার্যকর ভূমিকার বিকল্প নেই।