প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

করোনা ঝড়ে কাঁপছে বিশ্ব : সঙ্কটের মুখে মানুষের জীবন-জীবিকা

বিশেষ প্রতিবেদক : করোনা ঝড়ে কাঁপছে বিশ্ব। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গভীর সঙ্কটের মুখে পড়েছে মানুষের জীবন-জীবিকা। ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে যে করোনা ভাইরাসের আগ্রাসন শুরু হয়েছিল সেই ভাইরাস আজ বিশ্বের প্রধান শত্রু হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ২৮ মার্চ এই প্রতিবেদন ছাপাখানায় যাওয়া পর্যন্ত বিশ্বে নোভেল করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৬ লক্ষ ছাড়াল। মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৮ হাজার ৬৬৩ জন হয়েছে। ইতালি, স্পেনের পর এবার আমেরিকায় হু হু করে ছড়াচ্ছে ভাইরাস।
২২ জানুয়ারি পর্যন্ত চীনে ৫৮০ জন করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয় এবং ১৭ জন মারা যায়। ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ২৫৯ জন মারা যায় এবং ১১ হাজার ৯৫০ জন করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়।
পরবর্তী ১৫ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৬৯ হাজার ১৯৭ এবং মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১ হাজার ৬৬৯ জন।
ফেব্রুয়ারি মাসের ঠিক শেষ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৬ হাজার ৬০৪ জন। একই দিনে মৃত্যু সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৩০০ বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৯৭৭ জন হয়।
আক্রান্তের সংখ্যা লক্ষের ঘরে পৌঁছায় ৬ মার্চ। আক্রান্তের সংখ্যা লক্ষের ঘরে পৌঁছাতে সময় নেয় প্রায় ৬৭ দিন। পরবর্তী ১১ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়, মানে ২ লক্ষের ঘরে পৌঁছে যায়। ঠিক সেই সময় মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৮ হাজার জনে।
১৯ মার্চ পর্যন্ত বিশ্বে মৃত্যু হয় প্রায় ১০ হাজার মানুষের। আক্রান্তের সংখ্যা ২ লক্ষে পৌঁছানোর ঠিক ৪ দিনের দিনে, অর্থাৎ ২১ মার্চ আক্রান্তের সংখ্যা ৩ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়।
২১ মার্চের পরবর্তী ৩ দিনে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লক্ষ ২২ হাজার ৫৭৪ জনে। ২৪ মার্চে এই ৪ লক্ষ ২২ হাজার ৫৭৪ জনের বিপরীতে মারা যায় ১৮ হাজার ৮৯৪ জন।
২ দিনের ব্যবধানে ২৬ মার্চ পর্যন্ত পুরো বিশ্বে করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে ৫ লক্ষ ৩১ হাজার ৮৬৫ জন। আর এই ২ দিনের ব্যবধানে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার ৭৩ জন।
২৬ মার্চে আক্রান্তের সংখ্যা যেখানে ছিল ৫ লক্ষের ঘরে সেটা ২৮ মার্চ সন্ধ্যায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দাঁড়ায় ৬ লক্ষ ২১ হাজার ৮০ জনে। আর মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয় ২৮ হাজার ৬৬৩ জন।
পুরো বিশ্বে এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাস রিকভার করতে পেরেছে ১ লক্ষ ৩৭ হাজার ৩৬৩ জন। ২৮ মার্চ পর্যন্ত চিকিৎসা চলমান করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত ব্যক্তি রয়েছেন ৪ লক্ষ ৫৫ হাজার ৫৪ জন।
করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা লক্ষের ঘরে পৌঁছায় ৬৭ দিনে, ২ লক্ষ হয় পরর্বতী ১১ দিনে, ৩ লক্ষ হয় পরবর্তী ৪ দিনে। এরপর করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৩ লক্ষ থেকে ৪ লক্ষে যেতে সময় নেয় ৩ দিন। করোনা ভাইরাসে সংক্রমিতের সংখ্যা ৫ লক্ষ হয় ২ দিনে। আর সর্বশেষ আক্রান্তের সংখ্যা ৬ লক্ষ ছাড়িয়ে যায় প্রায় দেড় দিনে।
চীনের উহানে যাত্রা শুরু হওয়া করোনা ভাইরাস ২৮ মার্চ পর্যন্ত বিশ্বের ১৮২টি দেশ ও অঞ্চলে সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে।
করোনা ভাইরাসে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুবরণ করেছে ইতালিতে, যেটি প্রায় ১০ হাজার। মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে স্পেন। স্পেনে মৃত্যু সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ২৮ মার্চ পর্যন্ত করোন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে ৪৮ জন। আর তাদের মাঝে মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের।
দুই.
অর্থনীতিতে এর আগের বিশ্বমন্দা ছিল ২০০৮ সালের। সেই মন্দায় খুব বেশি আক্রান্ত হয়নি বাংলাদেশ। ফলে ২০০৯ সালে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসে আওয়ামী লীগ সরকারকে তেমন সমস্যায় পড়তে হয়নি। তারপরেও সেবার পোশাক খাতে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দিতে হয়েছিল। আর এবার পোশাকসহ রপ্তানিমুখী খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
কিন্তু আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের ঘটনা সম্পূর্ণ অন্য রকম। করোনা ভাইরাস পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকেই উল্টেপাল্টে দিচ্ছে, যে ধাক্কা থেকে মুক্ত থাকার কোনো সুযোগ নেই বাংলাদেশেরও। বাংলাদেশের রপ্তানি কমছিল, করোনার কারণে তা আরও কমবে। কারণ, বিদেশি ক্রেতারা প্রায় প্রতি দিনই রপ্তানি আদেশ স্থগিত করছেন। আমদানিও কমছে। রাজস্ব সংগ্রহের হার যা এমনিতেই কম ছিল, করোনা ভাইরাসের কারণে তা আরও কমার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারও এখন স্থবির। কারণ, নিত্যপণ্যের বাজার ছাড়া সবকিছু বন্ধ। পরিস্থিতি সামাল দিতে অর্থমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের কাছে ১০০ কোটি ডলার চেয়েছেন। আর এ থেকেই অনুমেয় করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ মানুষের জীবনের ওপরই আঘাত হানছে না, সঙ্কটে ফেলছে বাংলাদেশের মানুষের জীবীকাকেও।
করোনা ভাইরাসের কারণে ২০২০ সালের বিশ্ব অর্থনীতি এক যুগ আগের অর্থাৎ ২০০৮ সালের মন্দার চেয়েও বড় ও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) অর্থনীতিবিদেরা। ডব্লিউটিওর মহাপরিচালক (ডিজি) রবার্তো অ্যাজেভেদো ২৫ মার্চ রাতে নিজের ঘরে বসে এক ভিডিও বার্তায় এ কথা বলেছেন।
রবার্তো অ্যাজেভেদো বলেন, করোনা ভাইরাস মহামারি হিসেবে এসেছে। এতে লাখ লাখ মানুষের জীবনই শুধু ঝুঁকির মুখে পড়ছে না, মানুষের জীবীকাতেও পড়তে যাচ্ছে বড় আকারের নেতিবাচক প্রভাব। এতে ব্যবসাবাণিজ্যের ক্ষতির পাশাপাশি বেকার হবে অসংখ্য মানুষ। করোনা ভাইরাস যেহেতু এক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ, তাই একে বৈশ্বিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হলে ইতিহাস আমাদের ভুলবে না, ক্ষমাও করবে না।
অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় সব দেশকে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান রবার্তো অ্যাজেভেদো। বলেন, অর্থনৈতিক ক্ষতির পূর্বাভাস এখনই পাওয়া যাবে না, তবে ক্ষতির আকার যে অনেক বড়, আমাদের নিজস্ব অর্থনীতিবিদেরা সেই ধারণা করছেন। ক্ষতি কমিয়ে আনতে ডব্লিউটিওর সদস্যদেশগুলোকে একত্রে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হবে। সমন্বিত প্রচেষ্টা মন্দা মোকাবিলার জন্য সহায়ক হয়Ñ এমন মন্তব্য করে ডিজি বলেন, বিভিন্ন দেশের সরকার এরই মধ্যে যে আর্থিক ও রাজস্ব খাতে পরিবর্তন এনে প্রণোদনামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে, তা খুবই ইতিবাচক। তবে এই মহামারি চলাকালে দেশগুলোকে আরও স্বচ্ছভাবে তথ্য বিনিময় করতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনা ভাইরাস নিঃসন্দেহে অর্থনীতির জন্য স্মরণকালের বড় আঘাত। এ আঘাতের প্রভাব কত দিন চলবে, এখনই বলা মুশকিল। তবে আশার কথা যে আঘাত প্রশমনে পোশাক খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু এ তহবিল আরও বড় হওয়া দরকার।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বন্ধ হয়ে গেছে সব খাত। বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কার্যক্রম পুরোপুরিই বন্ধ। নিম্ন আয়ের মানুষ কষ্টে আছে। এসব ক্ষতি পোষানোর চিন্তাও করতে হবে। এ জন্য তহবিলের আকার ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা দরকার।
করোনা ভাইরাসের কারণে বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণটা কত হতে পারেÑ এ বিষয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) একটি বিশ্লেষণ করেছে। এতে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হার ১ দশমিক ১ শতাংশ কমবে বলে প্রাক্কলন করা হয়। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা আর প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ।
এফবিসিসিআইয়ের মতে, ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণাসহ করোনা ভাইরাসের কারণে সম্ভাব্য ক্ষতি কমিয়ে আনতে সরকার এখন পর্যন্ত (২৭ মার্চ) যথাযথ পদক্ষেপই নিয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ যেহেতু এখনো নিরূপিত হয়নি, তাই সুনির্দিষ্ট করে কিছু দাবি করা যাচ্ছে না। তবে ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র থেকে বড়Ñ সব খাতের জন্যই দীর্ঘ মেয়াদে শূন্য সুদে ঋণসুবিধা চাইতে হতে পারে।
এফবিসিসিআই আরো মনে করে, নীতি সহায়তার মাধ্যমে প্রভাব কতটা কমিয়ে রাখা যায়, সেটাই হচ্ছে এখন বড় বিষয়। অযৌক্তিক কোনো দাবি এফবিসিসিআই তুলবে না। এফবিসিসিআইয়ের আস্থা রয়েছে যে, দেশের সব ক্ষতিগ্রস্ত খাত থেকেই করোনার নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপই সরকার নেবে।

তিন.
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বজুড়ে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবে ভয় না পেয়ে জনগণকে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার আহবান জানিয়েছেন। এই দুর্যোগকালে দিনমজুর এবং শ্রমজীবী মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছে দেয়া জরুরি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, যারা খেটে খাওয়া মানুষ, দিন আনে দিন খায়, দিন মজুর শ্রেণি, তাদের কাছে আমাদের খাদ্য পৌঁছে দেয়া একান্ত জরুরি। তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থাও করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি সকলবে বলবো ঘাবড়ালে চলবে না। এই অবস্থার মোকাবিলা করতে সকলকে প্রস্তুত থাকতে হবে এবং সেভাবেই সবাইকে চলতে হবে, যাতে আমরা দেশের জনগণকে সুরক্ষিত করতে পারি।
শেখ হাসিনা তাঁর তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে (পিএমও) প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত অনুদানের চেক গ্রহণকালে একথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে গণভবন প্রান্ত থেকে এই অনুষ্ঠানে যুক্ত হন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে পিএমওতে অনুদানের চেক গ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার ডাকে সাড়া দিয়ে আমরা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছি। আমরা বিজয়ী জাতি। যেকোনো ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলার মত শক্তি ও সাহস আমাদের রয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি।
শেখ হাসিনা বলেন, অনেকেই এখন গ্রামে চলে গেছেন। তারা এখন বসে না থেকে যার যেখানে যতটুকুই জমি আছে সেই জমি যাতে অনাবাদি না থাকে। তাতে ফসল ফলান।
তিনি আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন, এই করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তাতে ব্যাপকভাবে খাদ্যাভাব দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের একট সন্তুষ্টির বিষয় হচ্ছে আমাদের মাটি অত্যন্ত উর্বর, মানুষগুলো কর্মঠ, আমাদের খাদ্যের কোনো সমস্যা হবে না।
শেখ হাসিনা বলেন, মাটি ও মানুষ মিলে যদি আমরা কাজ করি তাহলে নিজেদের খাদ্য নিজেরাই জোগাড় করতে এবং অন্যকেও আমরা সহযোগিতা করতে পারবো। আমাদের বন্ধুপ্রতীম দেশ যারা সহযোগিতা চেয়েছেন তাদেরকেও সহযোগিতা করতে পারবো। সেই সক্ষমতা আমাদের রয়েছে এবং মানবিক কারণেই আমরা তা করবো। শুধু নিজেদের দেশ নয়, অন্য দেশেরও যদি কিছু প্রয়োজন হয় তাহলে সেদিকে আমরা বিশেষভাবে দৃষ্টি দেব।
শেখ হাসিনা বলেন, বাঙালিরা কখনো হারেনি, আমরা হারবো না, এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে সবাইকে চলতে হবে। সেজন্য নিজেকে যেমন সুরক্ষিত রাখতে হবে তেমনি অপরকেও সুরক্ষিত রাখতে হবে। অন্যের প্রতিও আমাদের দায়িত্ববোধ রয়েছে। সেই দায়িত্ববোধ নিয়ে চললে ইনশাআল্লাহ
আমরা এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারবো।
প্রধানমন্ত্রী করোনা ভাইরাস সম্পর্কে বলেন, বিশ্বজুড়েই এটি ঘাতকের মত আবির্ভূত হয়েছে। অবশ্য সুস্থ হয়ে যাচ্ছে মানুষ, তবে অতীতে কখনো এ রকম হয়নি। আর এ ধরণের পরিস্থিতি শত বছরে একবার করে আসে। যা অতীতেও দেখা গেছে। ১৭২০ সালে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া প্লেগ, ১৮২০ সাল এবং ১৯২০ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ছড়িয়ে পরা মহামারির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, যে কারণে সারাবিশ্বই যেন আজ স্তব্ধ হয়ে গেছে, থেমে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী সরকারি ছুটি ঘোষণার প্রসঙ্গে বলেন, সকলে ঘরে থাকবেন এবং কোনো কাজ থাকলে ঘরে বসে করবেন। কিন্তু মানুষের সঙ্গে একটু দুরত্ব বজায় রাখবেন, যাতে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হতে না পারে। কিছু প্রবাসী হঠাৎ দেশে চলে আসায় যেসব জায়গায় এই রোগের লক্ষণ দেখা গেছে তার বিস্তার রোধে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটার বিস্তার যাতে না হয় সে জন্য যথাযথ ব্যবস্থা আমরা বাংলাদেশে নিতে সক্ষম হয়েছি এবং প্রথমে সচেতনতা সৃষ্টির পর ধাপে ধাপে পরিকল্পিতভাবে আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ করে দিয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী নিম্নবিত্ত এবং খেটে খাওয়া মানুষদের খাদ্যভাবের আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন, অনেকেই আছেন যারা দিন এনে দিন খেয়ে চলতে পারেন। কিন্তু তাদের আর্থিক অবস্থা এত ভালো নয় যে, তারা জিনিসপত্র জমা করে রাখবে এবং দিনের পর দিন চলতে পারবে। কাজ না করে বসে থাকলে তারা তো চলতে পারবে না। কাজেই দীর্ঘদিন এই অবস্থা চলার ফলে তারা ইতোমধ্যেই খুব কষ্টে আছেন।
এসব দুর্গত মানুষদের সহযোগিতার জন্য সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই খাদ্য সাহায্য পাঠিয়েছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভিজিডি, ভিজিএফ, বৃত্তি এবং উপবৃত্তিসহ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কর্মসূচিগুলো অব্যাহত থাকবে। এসব কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত মুখ্য সচিবসহ সংশ্লিষ্ট মহলকে দিনমজুর ও খেটে খাওয়া শ্রেণির জনগণের একটি তালিকা প্রণয়নেরও নির্দেশ দেন।

চার.
করোনা ভাইরাসের কারণে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আর এ কারণেই রাজধানীসহ দেশজুড়ে নেমে এসেছে নীরবতা।
রাজধানী জুড়ে ছোট বড় সব সড়কই এখন যানবাহন শূন্য। এমনকি পাড়া, মহল্লার রাস্তা, গলি পথেও নেই কোনো রিক্সা বা ছোট যানবাহন। শুধু যানবাহন নয়, সড়কগুলো হয়ে পড়েছে জনশূন্য। বন্ধ রয়েছে দোকান-পাটসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠান।
বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের যে দাপট চলছে, বাংলাদেশেও তার আঘাত লেগেছে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। এই সাধারণ ছুটি চলাকালে জনসাধারণকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সরকারের নির্দেশনা মেনে সর্বস্তরের মানুষ ঘরে অবস্থান করছেন। জনসাধারণের ঘরে থাকা নিশ্চিত করতে সড়কে টহল দিচ্ছে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সদস্যরা।
সারাদেশে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। লঞ্চ, রেল ও বিমান চালচল আগে থেকেই বন্ধ। সীমিত আকারে ফেরি চলাচল করছে। রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব জেলায় রাস্তায় লোক চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ফলে, রাজপথ যেন পরিণত হয়েছে বিরানভূমিতে।
সায়েদাদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, মহাখালি, ফুলবাড়িয়া, মহাখালী ও গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে কোনো বাস ছেড়ে যাচ্ছে না। এসব টার্মিনালের শ্রমিকরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ এরই মধ্যে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। যারা ঢাকায় রয়েছেন হোটেল-রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকায় তারা টার্মিনালগুলোতে রান্না করে খাচ্ছেন।
২৪ মার্চ থেকে পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত দেশের সব রুটে অনির্দিষ্টকালের জন্য যাত্রীবাহী রেল চলাচল বন্ধ রয়েছে। এর ফলে কমলাপুর স্টেশন থেকে কোনো ট্রেন ছাড়া হয়নি।
সরকারের এই ঘোষণা মেনে সব ধরনের যানবাহন বন্ধ রয়েছে। রাজধানীর সড়কগুলোর পাশাপাশি মার্কেট, শপিং মল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। রাজধানী শহরের পাড়া, মহল্লার দোকান-পাট বন্ধ এবং মহল্লার রাস্তায় কোনো যানবাহন চলছে না। কোনো কোনো এলাকায় দুই একটি মুদির দোকান ও ওষুধের দোকান খোলা রয়েছে। দুই একটি রিক্সা দেখা গেলেও যাত্রী নেই।
এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবিকায়। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে মানুষ ঘরে থাকছে ঠিকই, কিন্তু কাজ না থাকায় মানুষ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। কারণ করোনা ভাইরাসের কারণে কতদিন পৃথিবী স্তব্ধ থাকবে, তা কেউই বলতে পারছে না।