খেলা

ক্রীড়াঙ্গনে করোনার থাবা: স্থগিত একাধিক ইভেন্ট, মৃত্যু ডজন ক্রীড়াবিদের

স্বদেশ খবর ডেস্ক
বিশ্বজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে করোনা ভাইরাস। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে কালো থাবা বসিয়েছে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস। মৃত্যুর দূত হয়ে হাজির হওয়া করোনা কাউকেই করুণা করছে না। একের পর এক ক্রীড়া ইভেন্ট স্থগিত কিংবা বাতিল হয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক ক্রীড়াবিদ ও কোচ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যু হয় ডজন ক্রীড়াবিদের। সবমিলিয়ে জনজীবনের মতো খেলাধুলার মানুষেরাও এখন চরম বিপন্ন।

লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের
বিশ্বকাপ বাছাই স্থগিত
করোনার কোপে এশিয়ার পর থমকে গেছে লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব। ফলে দেশের জার্সি পরে আপাতত আর মাঠে নামা হচ্ছে না মেসি, নেইমারদের। এ মাসেই ২০২২ কাতার ফুটবল বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব শুরু করার কথা ছিল ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাসহ লাতিন আমেরিকার ১০টি দেশের। কিন্তু করোনার বিস্তার ঠেকাতে লাতিন আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনমেবলের অনুরোধে বাছাইপর্বের প্রথম দুই রাউন্ডের সব ম্যাচ স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে ফিফা। ম্যাচগুলো মাঠে গড়ানোর কথা ছিল ২৩ থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে। প্রথম দুই রাউন্ডের পরিবতির্ত সূচি পরে জাননো হবে। এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ক্লাব টুর্নামেন্ট কোপা লিবার্তাদোরেসের পরবর্তী রাউন্ডের খেলাও স্থগিত করা হয়েছে। জুনে হতে যাওয়া কোপা আমেরিকার ব্যাপারে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।

ইংলিশ ফুটবলে করোনার ছোবল
ইতালি, স্পেন ও ফ্রান্সের পর করোনা ছোবল হেনেছে ইংলিশ ফুটবলেও। করেনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন আর্সেনাল কোচ মিকেল আর্তেতা ও চেলসি উইঙ্গার ক্যালাম হাডসন ওডোই। যার প্রভাবে প্রথমে স্থগিত করা হয় ব্রাইটনের বিপক্ষে আর্সেনালের আজকের ম্যাচ। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সব ম্যাচ স্থগিতের ঘোষণা দেয় লিগ কর্তৃপক্ষ। প্রিমিয়ার লিগ আপাতত স্থগিত না করে উপায় ছিল না। কারণ, কোনো ক্লাবের একজন করোনায় আক্রান্ত হওয়া মানে দলের সবাইকে অন্তত ১৪ দিন গৃহবন্দি থাকতে হবে। করোনার উপসর্গ দেখা দেয়ায় এরই মধ্যে ম্যানসিটির ফরাসি উইঙ্গার বেঞ্জামিন মেন্দি ও লেস্টার সিটির তিন ফুটবলার স্বেচ্ছা-আইসোলেশনে চলে গেছেন। আর্তেতা ও ওডোইয়ের আক্রান্তের খবর নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সংস্পর্শে আসা দলের সবাইকে হোম কোয়ারেন্টিনে আলাদা করে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে লন্ডনের দুই ক্লাব আর্সেনাল ও চেলসি। এ পরিস্থিতিতে লিগ স্থগিতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে সবাই।

করোনায় মৃত্যু ডজন ক্রীড়াবিদের
মহামারি করোনা ভাইরাস এরই মধ্যে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আর এর ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। বাড়ছে মৃত্যু। করোনা এমন এক ভাইরাস যা ছাড় দিচ্ছে না কাউকে। যে বা যিনিই এই ভাইরাসের সংস্পর্শে আসছেন, তিনিই সংক্রমিত হচ্ছেন এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে। ফলে প্রাণহানির ঝুঁকিতে পড়ছেন ব্যক্তিটি। তেমনই এই করোনা ভাইরাসের থাবা পড়েছে বিশ্বক্রীড়াঙ্গনে। এই ভাইরাসের কালো থাবায় এরই মধ্যে প্রাণ গেছে ২১ বছর বয়সী কোচ থেকে শুরু করে ৮০ বয়সী ব্যক্তি পর্যন্ত।
করোনার সবচেয়ে বেশি প্রভাব দেখা যাচ্ছে ইউরোপের দেশ ইতালি, স্পেন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে। স্পেনেই মাত্র ২১ বছর বয়সে মারা গেছেন ফুটবল কোচ ফ্রান্সিসকো গার্সিয়া। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা থেকে কোচিং পেশাকে বেছে নেন তিনি। স্পেনে যখন এই ভাইরাস ছড়িয়ে যায় তখন অনেকের মধ্যে তিনিও করোনায় আক্রান্ত হন। তিনি আগে থেকেই কিছুটা অসুস্থ ছিলেন। ফলে এই ভাইরাস তাকে বেশ কাবু করে ফেলে। এছাড়া স্পেনে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক সভাপতি লরেঞ্জো সানজ। তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর বয়স। বিশ্বে বেশ জানাশোনা যে কজন ক্রীড়াব্যক্তিত্ব ছিলেন তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন সানজ। তার সময়ে তিনি রিয়াল মাদ্রিদে নিয়ে এসেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত খেলোয়াড়দের। আর তার সময়ই রিয়াল মাদ্রিদ ২ বার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা জেতে।
প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ক্রীড়াব্যক্তিত্বদের মধ্যে সর্বশেষ নামযুক্ত হয়েছে সোমালিয়ার সাবেক কিংবদন্তি ফুটবলার আব্দুল কাদির মোহাম্মদ ফারাহ। তিনি লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর।
অন্যদিকে ইরানিয়ান রেডিও ফারতা জানিয়েছে, দেশটিতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ১১ জন ক্রীড়াবিদের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সাবেক খেলোয়াড়দের পাশাপাশি বর্তমান খেলোয়াড়রাও রয়েছেন। ইরানে সবাইকে যে মৃত্যুটি নাড়া দিয়েছে সেটি হলোÑ দেশটির জাতীয় মেয়ে ফুটবল দলের খেলোয়াড় ইলহাম শেখির মৃত্যু। মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। ইলহাম বসবাস করতেন খোম প্রদেশে। ইরানে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এখানেই। তবে প্রথমে তার মৃত্যুর খবর গোপন রাখতে চেয়েছিল দেশটির সরকার। এমনকি ইলহাম নামে একজনকে সাজিয়ে সরকারি রেডিওতে একজনের সাক্ষাৎকারও নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে তার মৃত্যুর খবরটি ছড়িয়ে পড়ে। শেষমেষ সরকার তার মৃত্যুর কথাটি স্বীকার করে। তাছাড়া রেডিওটি জানিয়েছে, বাস্কেটবল, বক্সিং ও ফুটবলাররাও রয়েছেন এই মৃত্যুর তালিকায়।
অন্যদিকে ইতালিতে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বিশিষ্ট আর্কিটেকচার ভিতেরিও গ্রেগত্তি। যদিও তিনি একজন আর্কিটেচার ছিলেন কিন্তু ক্রীড়াবিশে^র সঙ্গে তার নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ তার করা ডিজাইনেই তৈরি হয়েছিল ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপের স্টেডিয়াম। বিশ্বকাপ উপলক্ষে ইতালির জেনোয়া শহরে মারাসসি স্টেডিয়ামের ডিজাইন করেছিলেন তিনি। এরপর ১৯৯২ সালে স্পেনের বার্সেলোনায় হয়েছিল অলিম্পিক। বার্সেলোনা অলিম্পিক স্টেডিয়ামের ডিজাইনও করেছিলেন তিনি। ভিতেরিও গ্রেগত্তির বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।
এই কজন ক্রীড়াবিদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়েছে চারপাশে। কিন্তু করোনা ভাইরাসে মারা যাওয়া মৃত্যুর মিছিলে রয়েছে আরো অনেকেই। যাদের নাম আসেনি বা প্রকাশ পায়নি। এছাড়া এই দেশগুলোতে অখ্যাত অনেক ক্রীড়াব্যক্তিত্ব রয়েছেন যারা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। কিন্তু তাদের নাম কোনো জায়গাতেই আসেনি।