রাজনীতি

সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে ২৫ মাস পর মুক্তি পেলেন খালেদা জিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক
দুই বছর এক মাস ১৬ দিন কারাভোগের পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২৫ মার্চ মুক্তি পেয়েছেন। এই খবর চাউর হওয়ার পর বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা যেন জোরে নিঃশ্বাস নিয়েছেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, মুক্তি যেভাবেই হোক, যত দিনের জন্যই হোক এটি নিশ্চিতভাবেই নেতাকর্মীদের জন্য আনন্দের খবর। উদ্বেগে দিন কাটানো খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরাও এতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
এর আগে ২৪ মার্চ আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এক সংবাদ সম্মেলনে সরকার শর্ত সাপেক্ষে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ৬ মাসের জন্য খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে খালেদা জিয়ার কারাভোগ শুরু হয়। প্রথম ১১ মাস তিনি ছিলেন পুরনো ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে একমাত্র বন্দী হিসেবে। খালেদা জিয়া এই কারাগারে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে উচ্চ আদালতের নির্দেশে গত বছরের ১ এপ্রিল চিকিৎসার জন্য তাকে নিয়ে আসা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের কেবিন ব্লকে।
এই দীর্ঘ সময়ে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে আইনি ও রাজনৈতিক কর্মসূচি দিয়েও কোনো সুবিধা করতে পারেনি বিএনপি। দলীয় চেয়ারপারসনের দুই বছরেও মুক্তি না হওয়ায় কর্মী-সমর্থকরাও ছিলেন ক্ষুব্ধ ও শঙ্কিত। নেতারাও কোনো হিসাব মেলাতে পারছিলেন না খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রশ্নে।
দুই মাস আগে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে সর্বশেষ জামিন আবেদন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ফুল বেঞ্চ শুনানি করে খারিজ করে দিলে আইনি পথে তার মুক্তির পথ বন্ধ হয়ে যায়। এরপরই গত ২৪ জানুয়ারি বিএসএমএমইউতে খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করে তার সেজ বোন সেলিমা ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তার বোনের মুক্তির বিষয়ে নতুন করে আবেদন করা হবে। পরে অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে সেই আবেদন করা হয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, হাত-পায়ে রিউমেটিক আর্থারাইটিস, ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত খালেদা জিয়া। এখন কারো সহযোগিতা ছাড়া তিনি হাটতে পারেন না, খেতেও পারেন না। এরকম অবস্থায় তার মুক্তির খবর নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক।
খালেদা জিয়ার বোন সেলিমা ইসলাম এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আর দলের নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের সামনে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এ আহ্বান জানান তিনি।
ফখরুল বলেন, এখন করোনা ভাইরাস আক্রমণের এই সময়ে দলের নেতাকর্মীরা শান্ত থাকবেন। কেউ যেন আক্রান্ত না হন খেয়াল রাখবেন। এই মুহূর্তে সবাই স্বাস্থ্যের প্রতি যতœবান হবেন। খালেদা জিয়াকে ৬ মাসের শর্তসাপেক্ষে মুক্তির সরকারি সিদ্ধান্তের বিষয়ে ফখরুল বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে সারাদেশের মানুষ উদ্বিগ্ন ছিল। তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন, অন্তত ৬ মাসের জন্য হলেও তিনি মুক্ত থাকবেন। তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি চিন্তিত এই জন্য যে, দেশের বাইরে যেতে না পারলে তার চিকিৎসার কী হবে। সে সুযোগ নেই দেখলাম।’ তবে বিএনপির মহাসচিব জানান, তারা নেতা এবং আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
২৪ মার্চ খালেদা জিয়াকে শর্তসাপেক্ষে আইন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশক্রমে নির্বাহী আদেশে ৬ মাসের জন্য মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। আইনি প্রক্রিয়াগুলো শেষ হলে ২৫ মার্চ মুক্তি পান খালেদা জিয়া। এর আগে খালেদা জিয়ার মুক্তির সুপারিশের ফাইলটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায়।
খালেদা জিয়া তার ৩৮ বছরের রাজনৈতিক জীবনে মামলার সাজা নিয়ে এবারের টানা কারাবাস প্রথম হলেও আরো একবার প্রায় এক বছর তিনি কারাবন্দী ছিলেন। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সংসদ ভবন এলাকায় বিশেষ কারাগারে বন্দী ছিলেন তিনি। এ ছাড়া আশির দশকে স্বৈরাচারী এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৭ সালে খালেদা জিয়াকে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল সড়কের বাসায় গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে পূর্বাণী হোটেলে দলীয় নেতাদের সাথে বৈঠক থেকে প্রথম খালেদা জিয়াকে পুলিশ ঘেরাও করে আটক করে।
এ দিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান, খালেদা জিয়া ঢাকায় নিজ বাসায় থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করবেন।
আনিসুল হক বলেন, তার সাজা ৬ মাসের জন্য স্থগিত রেখে তাকে ঢাকার নিজ বাসায় থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করার শর্তে এবং ওই সময়ে তিনি দেশের বাইরে যেতে পারবেন না এই শর্তে মুক্তি দেয়ার জন্য আমি মতামত দিয়েছি। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ হচ্ছে আইনি প্রক্রিয়ায় এই দুই শর্তে তার দ-াদেশ স্থগিত রেখে তাকে মুক্তি দেয়া হোক।
তার মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হবে কি না এ বিষয়ে তিনি বলেন, আগে ৬ মাস যাক, তারপর দেখা যাবে। তিনি বলেন, এখানে কিন্তু বলা হচ্ছে না তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারবেন না। সেটা তার অবস্থার ওপর নির্ভর করবে। তবে শর্ত হচ্ছে, তিনি দেশের বাইরে যেতে পারবেন না। সরকার মানবিক কারণে সদয় হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা (উপধারা-১) অনুযায়ী এটা আইনি প্রক্রিয়ায় করা হয়েছে।
এদিকে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়া করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে শঙ্কা প্রকাশ করে গত কয়েক দিন ধরে তার মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছিলেন বিএনপি ও খালেদা জিয়ার শীর্ষ আইনজীবীরা। গত বছর শেষদিকে ও চলতি বছর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিএনপি চেয়ারপারসনের কারামুক্তি প্রশ্নে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন ওঠে। সম্প্রতি জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় উচ্চ আদালতে জামিনের আবেদন খারিজ হওয়ার পর তার আইনজীবীরা ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারা অনুযায়ী সাজা স্থগিত করে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কখনো কখনো বিশেষ ব্যবস্থায় (প্যারোল) তার মুক্তির বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবীরা জানান, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে হত্যা, দুর্নীতি, রাষ্ট্রদ্রোহ, নাশকতা, মানহানি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৩৭টি মামলা রয়েছে। তবে কারামুক্তি পেতে জামিনের প্রয়োজন ছিল শুধু যে দুটি মামলায় (জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট) তিনি দ-প্রাপ্ত হয়েছেন সেই মামলাগুলোতে।
খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, খালেদা জিয়ার কারামুক্তির বিষয়ে আমরা রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হলেও সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে এটি আরও আগে হলে বিএনপি চেয়ারপারসনের স্বাস্থ্যের এতটা অবনতি হতো না। যাই হোক, আমাদের উচ্চ আদালত তাকে জামিন না দিলেও সরকারের নির্বাহী আদেশে তিনি মুক্তি পাচ্ছেন এতে আমরা সন্তোষ প্রকাশ করছি।
দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বলেন, সরকার তার প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে মানবিক কারণে এ উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আইনি বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত থেকে গেল। সাজা স্থগিত হলেও দুটি মামলায় আপিলের শুনানি বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হবে।
অন্যদিকে, দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার (৭৪) হঠাৎ মুক্তির ইস্যুতে মুখ খুলছেন না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা। দলটির সভাপতিম-লীর মাত্র দুজন সদস্য এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। সম্পাদকম-লীর অনেকেই বিরক্তিও প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, তারা এখন করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় ব্যস্ত।
করোনা ভাইরাস নিয়ে দেশজুড়ে আতঙ্কের মাঝে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ২৪ মার্চ সংবাদ সম্মেলন করে জানান, খালেদা জিয়ার বয়স বিবেচনায় মানবিক কারণে সরকার সদয় হয়ে দ-াদেশ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিএনপি নেতারা এতদিন বলে আসছিলেন, সরকারের ইচ্ছায় খালেদা জিয়াকে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। তাই তার মুক্তির দাবি সরকারের কাছেই জানিয়ে আসছিলেন তারা। তবে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বিএনপি নেতাদের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলে আসছিলেন, খালেদার মুক্তি আদালতের বিষয়। এখানে সরকারের কিছু করার নেই। তবে শেষ পর্যন্ত খালেদার মুক্তি হলো নির্বাহী আদেশেই।
এ প্রসঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতা বলেন, তারা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একথা বলেছিলেন। কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রভাবে দেশে অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। তাই সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা বাস্তবতা ও মানবিকভাবে বিবেচনা করে খালেদা জিয়াকে মুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে নাম না প্রকাশের শর্তে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এক
মন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তারদের পরামর্শে অনেকটা হঠাৎ করেই সরকার মুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে আইনমন্ত্রী তার মুক্তির ব্যাপারটি জানিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজি জাফরউল্যাহ বলেন, দেশ এখন করোনা ভাইরাস আক্রান্ত। সবাই হুমকি ও ঝুঁকিতে আছে। এই মুহূর্তে খালেদার মুক্তির সিদ্ধান্ত ভালো হয়েছে। তাছাড়া খালেদার যে বয়স তাতে উনি ঝুঁকিতে আছেন। এসব বিষয় বিবেচনা করে সরকার মুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমার মনে হয়, সরকারের এ সিদ্ধান্ত সঠিক হয়েছে।
আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা বলে আসছিলেন খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে সরকারের কোনো কিছু করার নেই। তাহলে নির্বাহী আদেশেই কেন তাকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে- এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটাও কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ায়ই হয়েছে। খালেদার পরিবারের সদস্যরা তো রাষ্ট্রপতির কাছে আপিল করেছেন। তারপর মুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। এক্ষেত্রে আইন অনুসরণ করেছে।
সভাপতিম-লীর আরেক সদস্য ফারুখ খান বলেন, আমরা আদালতের কথা বলেছি- একটি স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে। এখন করোনা ভাইরাসের প্রভাবে দেশে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া খালেদা জিয়ার বয়সের কথা বিবেচনায় নেয়া হয়েছে এই মুহূর্তে। তার বয়স বিপজ্জনক। এই বয়সে এ ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হলে খালেদার জীবন বাঁচানো কঠিন হবে। তাই তাকে বাসাবাড়িতে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে সরকার। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার সব সিদ্ধান্তই বাস্তবতার নিরিখে। বাস্তবতা ও মানবিকভাবে সরকার ও প্রধানমন্ত্রী এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। আমি মনে করি সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফ বলেন, খালেদার মুক্তির বিষয়ে নো কমেন্টস। সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, খালেদার মুক্তির ব্যাপারে কথা বলার কোনো আগ্রহ নেই। করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় কাজ করছি।