আন্তর্জাতিক

ইউরোপ-আমেরিকার পাশাপাশি করোনাক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে দক্ষিণ এশিয়ায়ও

স্বদেশ খবর ডেস্ক
করোনা ভাইরাসের উৎসস্থল চীনের পর ইউরোপ ও আমেরিকায় সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার ভয়াবহ রূপ ধারণ করলেও এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার সার্কভুক্ত দেশগুলোতে সংক্রমণের গতি ছিল অনেকটাই মন্থর। তবে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে এসে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। বিপরীতে এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, স্পেন, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিতে কিছুটা মন্থর হয়েছে মহামারীর প্রকোপ।
গত ১৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রে ২৪ ঘণ্টায় ৩২ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হলেও পরদিন তা ২৯ হাজার এবং এর পরের দিন তা ২৫ হাজারের ঘরে নেমে আসে। মৃত্যুর সংখ্যা উল্লিখিত তিন দিনে নি¤œমুখী। ১৭ এপ্রিল আড়াই হাজারের বেশি মানুষ মারা গেলেও দুদিন পর সেই সংখ্যা দেড় হাজারের নিচে নেমেছে।
ইতালিতেও দুদিনের ব্যবধানে রোগী শনাক্তের সংখ্যা প্রায় ৫০০ এবং মৃত্যুও ১৫০ জন কমেছে। স্পেনে এ সময়ে শনাক্তের সংখ্যা কমেছে প্রায় দেড় হাজার। তবে মৃত্যুর সংখ্যা ওঠানামা করছে লকডাউন শিথিল করা দেশটিতে। ১৬ এপ্রিল ফ্রান্সে ১২ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হলেও ১৯ এপ্রিল সেই সংখ্যা এক হাজারে নেমেছে। তিন দিনের ব্যবধানে মৃত্যুর সংখ্যাও নেমেছে অর্ধেকে। ১৭ এপ্রিল জার্মানিতে সাড়ে তিন হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হলেও দুদিন পর সেই সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার কমেছে। মৃত্যুর সংখ্যাও হয়েছে এক-তৃতীয়াংশ।
উল্লিখিত সময়ে যুক্তরাজ্যে রোগী শনাক্তের হার না কমলেও মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে। আক্রান্ত আর মৃত্যুর গতি কমেছে বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ডে। তবে তুরস্ক আর রাশিয়ায় রোগীর সংখ্যা বাড়ছে হু হু করে।
তবে জনসংখ্যা, জনঘনত্ব দুই-ই বেশি, তারপরও দক্ষিণ এশিয়ায় এ পর্যন্ত করোনা ভাইরাস সংক্রমণের হার তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম বলে দাবি করা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের সাউথ এশিয়া ইকোনমিক ফোকাস শীর্ষক সমীক্ষা প্রতিবেদনে। সম্প্রতি প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপের করোনা সংক্রমণসংক্রান্ত বিশদ পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। যদিও দক্ষিণ এশিয়ায় সংক্রমণের গতি মন্থর মনে হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে কম করোনা পরীক্ষাকে বলছে বিশ্বব্যাংক।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, পৃথিবীর মাত্র ৩ শতাংশ ভূখ-জুড়ে থাকা এই আট দেশে বিশ্বের ২১ শতাংশ মানুষ। তথাপিও বিশ্বের মোট করোনা-মৃত্যুর ১ শতাংশেরও কম ঘটেছে এই ভূখ-ে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার সরকারগুলো শুরু থেকেই তৎপরতা দেখিয়েছে। তাদের ঝুঁকি আছে। এসব দেশের সরকার সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টিতে জোর দিয়েছে। খাদ্য সহায়তা দিতে ত্রাণ তৎপরতা চালিয়েছে এবং করারোপও অনেক ক্ষেত্রে শিথিল করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এমনকি চীনেও এ সংক্রমণ ছড়িয়েছে। কিন্তু শুধু ভারত নয়, সার্কভুক্ত গোটা অঞ্চলে এখনো এ ভাইরাস ততটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদি এ প্রবণতা শেষ পর্যন্ত বহাল থাকে বা আরও স্পষ্ট হয়, তাহলে পুরো বিষয়টি আরও গভীর গবেষণার দাবি রাখে।
২০ এপ্রিল পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে ভারতে, ১৭ হাজার ৬১৫ জন। দেশটিতে মারা গেছে ৫৫৯ জন। এরপর আছে পাকিস্তান, দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার ৪১৮ জন। আর মারা গেছে ১৭৬ জন। বাংলাদেশে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৯৪৮ জন। মারা গেছে ১০১ জন। আর ভুটানে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা মাত্র ৫ জন। আফগানিস্তানে আক্রান্ত ১ হাজার ২৬ জন। মারা গেছে ৩৩ জন। শ্রীলঙ্কায় শনাক্ত হয়েছে ৩০৪ জন। মারা গেছে ৭ জন। নেপালে শনাক্ত হয়েছে ৩১ জন। দেশটিতে এখনো কেউ মারা যায়নি।
দক্ষিণ এশিয়ায় যাদের পরীক্ষা করা হয়েছে তাদের মধ্যে পাকিস্তানে আক্রান্ত হয়েছে ৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ, বাংলাদেশে ১০ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ ও শ্রীলঙ্কায় ৫ দশমিক ১২ শতাংশ। এ পরিসংখ্যান ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক কম। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরীক্ষার সংখ্যা বাড়লে আক্রান্ত শনাক্ত হওয়ার হারও বাড়বে, যেমন এখন বাংলাদেশে বাড়ছে। আবার অনেক বিশ্লেষক বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় পরীক্ষার হার বাড়লেও শনাক্ত হওয়ার হার ইউরোপ ও আমেরিকার মতো নয়।
গেল বছরের শেষদিকে চীনে ভাইরাসটির প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর এখন ছড়িয়েছে বিশ্বের ২১০টি দেশ ও অঞ্চলে। এখনো কোনো প্রতিষেধক এবং ওষুধ আবিষ্কার না হওয়ায় কখন এর সংক্রমণে লাগাম টানা যাবে তার কোনো দিশা পাচ্ছেন না চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীরা।
আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য বলছে, ২০ এপ্রিল রাত ১০টা পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে এ রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছে ২৪ লাখ ৩৭ হাজার ১৯১ জন। মারা গেছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩১৬ জন। আরোগ্য লাভ করেছে ৬ লাখ ৩৮ হাজার ৭৮ জন। আর চিকিৎসাধীন ১৬ লাখ ৪১ হাজার ৭৫৭ জন। তাদের মধ্যে ৫৬ হাজার ৩১৭ জনের অবস্থা গুরুতর।
২১ এপ্রিলের তথ্যানুযায়ী, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যায় সবার ওপরে থাকা যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ৭ লাখ ৬৭ হাজার ৪০২ জনে। আর মারা গেছে ৪১ হাজার ২২৯ জন। আক্রান্তের সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা স্পেনে এখন করোনা রোগীর সংখ্যা ২ লাখ ২১০ জন। মারা গেছে ২০ হাজার ৮৫২। তবে মৃত্যুর সংখ্যায় শীর্ষে থাকা ইতালিতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯৭২ জনে। মারা গেছে ২৩ হাজার ৬৬০ জন। ফ্রান্সে আক্রান্ত ১ লাখ ৫২ হাজার ৮৫৪ জন। মারা গেছে ১৯ হাজার ৭১৮ জন। ইউরোপের আরেক দেশ জার্মানিতে শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৪৬ হাজার ২০০ জন। মারা গেছে ৪ হাজার ৬৬৯ জন। যুক্তরাজ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ২৪ হাজার ৭৪৩ জন। মারা গেছে ১৬ হাজার ৫০৯ জন। নেদারল্যান্ডসে আক্রান্তের সংখ্যা ৩৩ হাজার ৪০৫ জন। মারা গেছে ৩ হাজার ৭৫১ জন। বেলজিয়ামে রোগীর সংখ্যা ৩৯ হাজার ৯৮৩ জন। মারা গেছে ৫ হাজার ৮২৮ জন।