প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

এবার পালিত হলো শতাব্দীর অন্যরকম ঈদ

বিশেষ প্রতিবেদক
‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।
তোর সোনা-দানা, বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ
দে যাকাত, মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিঁদ
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।
আজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে,
যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ।’
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এ এক অনবদ্য সৃষ্টি। শাওয়াল মাসের চাঁদ অর্থাৎ ঈদুল ফিতরের চাঁদ ওঠার সংবাদে রেডিও-টিভিতে খুশীর উচ্ছ্বাস নিয়ে বেজে ওঠে ঈদ আনন্দের আগমন বার্তা। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পর চাঁদ দেখার আনন্দ আর এ গানের সুর বিভিন্ন দেশের বাংলা ভাষাভাষী ছেলে-বুড়ো সবার মনে আনন্দের ঝংকার তোলে। কিন্তু এবার বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাস ভাগ বসিয়েছে ঈদের আনন্দে। প্রতিবছর ঈদের নামাজের পর হাসিমুখে কোলাকুলির চিরায়ত দৃশ্য দেখা গেলেও এবার আর তা চোখে পড়েনি কোথাও। করোনার হাত থেকে রক্ষার জন্য মানুষকে বজায় রাখতে হয়েছে সামাজিক-শারীরিক দূরত্ব। তাই এক মাস রোজা রাখার পর খুশির ঈদ এলেও মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে মানুষের মনে নেই সেই আনন্দ। ঈদের খুশির বদলে আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তা নিয়ে ঈদগাহে নয়, মসজিদে মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন মুসল্লিরা। বিরূপ পরিস্থিতির কারণে অধিকাংশ মানুষই নতুন জামা-জুতা কিনতে পারেননি পরিবারের সদস্যদের জন্য। এমনকি ঈদের নামাজ শেষে আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি যাওয়াও হয়নি। ঈদের আনন্দ কাটাতে হয়েছে শুধুই ঘরে বসে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। তাই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়Ñ এবার পালিত হলো শতাব্দীর অন্যরকম ঈদ।
ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানেই আনন্দ। ঈদ বস্তুত বহুমাত্রিক। খুশির আকর ছড়ানো থাকে চারপাশে; এবারের ঈদ এসেছে এক ভিন্ন মাত্রা নিয়ে। প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদ এসেছে কিন্তু আসেনি আনন্দ। করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ থাবায় টালমাটাল পুরো দুনিয়া। এ ভাইরাসের সংক্রমণে বিপর্যস্ত জনজীবন। প্রতিদিনই দেশজুড়ে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত মানুষের সংখ্যা। লকডাউনের কারণে সব মানুষই প্রায় ঘরবন্দি। কারোই জানা নেই এর শেষ কোথায়। অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই ঈদুল ফিতর উদযাপন করলো পৃথিবীর ১৮০ কোটি মুসলমান। করোনা ক্রান্তিকালের এবারের ঈদ আনন্দ, সৌহার্দ্য ও যোগাযোগের জন্য ইতিবাচক ছিল। করোনা সব বদলে দিয়েছে। চিরায়ত সমাজব্যবস্থা, ধ্যান-ধারণা, দর্শনÑ সবকিছু। করোনায় অনেকে হারিয়েছে প্রিয়জন, অনেকে এখনো লড়ছে। মানুষের প্রাণ বাঁচাতে কারফিউ, লকডাউন দেয়া হয়েছে ঈদের দিনেও।
প্রতিবছর আমরা ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করি হাত মিলিয়ে, কোলাকুলি করে। প্রতিবার ঈদের নামাজ ও মোনাজাত শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঈদের মূল আনন্দ উৎসব শুরু হয় কোলাকুলি দিয়ে। কিন্তু এবার মহামারি করোনাকালে ঈদ উদযাপিত হলো সম্পূর্ণ অচেনা এক পরিবেশে। আহারে এমন ঈদও এলো পৃথিবীতে! নেই হাত মেলানো, নেই কোলাকুলি! নেই নতুন পোশাক! নেই গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে ছবি তোলাতুলি। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ছবি তুলতে না পারলেও আমরা শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ছবি তুলে করোনাকালের ঈদের স্মৃতি ধরে রেখেছি মাত্র। আমরা কখনো প্রস্তুত ছিলাম না এমন ঈদ উদযাপনের জন্য।
ঈদুল ফিতর, মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এবার ছিল না নামাজের জন্য ঈদগাহে মুসল্লিদের দীর্ঘ লাইন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে হয়েছে মসজিদে মসজিদে নামাজ আদায়। করোনার প্রাদুর্ভাবরোধে ১৩ দফা শর্তে জাতীয় ঈদগাহের পরিবর্তে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় ঈদুল ফিতরের প্রধান জামাত। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে পাঁচটি ঈদের জামাত হলেও তার দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সকাল ৭টায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের জ্যেষ্ঠ পেশ ইমাম হাফেজ মুফতি মাওলানা মিজানুর রহমান। আগে থেকেই পুলিশ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ঈদের নামাজকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী মুসল্লিরা সারিবদ্ধভাবে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে একটি জীবাণুনাশক কক্ষের মধ্য দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে তাদের নামাজ পড়তে দেখা গেছে। একে অপরের থেকে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করেন। একই চিত্র ছিল ঢাকার বাইরেও। ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় ভিড় এড়াতে অনেক মসজিদেই একাধিক জামাতের আয়োজন করা হয়। নামাজ শেষে ঠেলাঠেলি করে বের হয়েছেন অনেকেই। ঈদের নামাজের পর খুশির বদলে মানুষের চোখে মুখে ছিল আতঙ্ক আর দুঃশ্চিন্তার ছাপ। ঢাকা থেকে যারা গ্রামে ফিরেছেন তারাও ছিলেন গ্রামবাসীর জন্য আতঙ্কের কারণ।
প্রতি বছর ঢাকায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে রাষ্ট্রপতিসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা অংশ নেন। এবার রাষ্ট্রপতি ঈদের নামাজ আদায় করেছেন বঙ্গভবনের দরবার হলে। এদিকে ২৭০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঈদের দিনে নির্জনতা দেখাল উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদগাহ কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ময়দান। এমন নির্জনতা কেউ দেখেনি আগে। ঈদের দিন যেখানে লাখো মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত। নানা দুর্যোগ-দুর্বিপাকে বন্ধ হয়নি শোলাকিয়ার ঈদের জামাত। কিন্তু এবার সেই ময়দান ছিল পুরোপুরি নিস্তব্ধতা।
করোনা মহামারির এই অকালে মানুষের মধ্যে ভীতি, আতংক, উদ্বেগ, ভবিষ্যৎ-ভাবনা আর স্বজন হারানোদের বেদনা, আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীনদের ও তাদের আপনজনের উৎকণ্ঠাসহ সব মিলিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয়Ñ বিশ্ববাসীর জন্য এ এক ভিন্ন ঈদ, ছিল এক অচেনা দিন। এমন ঈদুল ফিতর আর কখনো দেখেনি কেউ। সামাজিক দূরত্ব যেন নিয়ে গেছে মানুষগুলোকেও আনন্দ-উৎসব পালন থেকে যোজন যোজন দূরে। মানুষের আর উদযাপনের সুযোগ নেই, এটি ছিল যেন শুধু একটি দিন যাপন। সবাই চাইছেন এমন ভিন্নতার ঈদ যেন আর না আসে। সবারই প্রত্যাশা, অচিরেই যেন দূর হয় করোনার এই নিদারুণ দুঃসময়। সবাই যেন ফিরে পান আবার সেই সুস্থ-স্বাভাবিক দিনগুলো। তারা অচিরেই যেন পেয়ে যান ভিন্ন এক সুসময়।
ঈদে ছোটদের কাছে নতুন জামা আর বড়দের কাছে কোলাকুলি করে শুভেচ্ছা বিনিময় ও পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে মুরব্বিদের কাছ থেকে দোয়া নেয়া, ঘরে ঘরে গিয়ে ঈদের মজাদার খাবার খাওয়া, হাত ধরাধরি করে দলে দলে ছোটদের বেড়ানো বাঙালি মুসলমানের চিরচেনা সংস্কৃতি। এতেই আমরা ঈদ আনন্দ উপভোগ করে আসছি চিরকাল। কিন্তু মহামারি করোনা ভাইরাস এবার আমাদের ফেলেছে এক কঠিন অবস্থায়। ঘরবন্দি পরিস্থিতিতে করোনা দিনের ঈদ সীমাবদ্ধ থেকেছে কেবল অনলাইনে। অনলাইনে শুভেচ্ছা বিনিময়, সালাম-দোয়া, ঈদ মোবারক জানিয়েই অপরের সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক টিকিয়ে রেখেছেন অনেকেই। বলা যায় এবারের ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় হয়েছে ভার্চুয়াল জগতে। এমন শুভেচ্ছা বিনিময় ঈদ কারো কাম্য নয়। এমন পরিস্থিতি, ঘরবন্দি ঈদ আর না আসুক আমাদের জীবনে। করোনা কারণে ঘরবন্দি হয়ে আমরা বঞ্চিত হয়েছি একের পর এক আনন্দ-উৎসব থেকে। তাই এই করোনাকালের ঈদের প্রধান প্রার্থনাই ছিলÑ করোনামুক্ত হোক আমাদের এই সুন্দর পৃথিবী।
করোনাকালের ঈদে এবার আনন্দ নয় ছিল বিষাদের সুর। আনন্দকে রেখে এসেছে দূরে। এমন ঈদ হবে কল্পনাতেও ছিল না বিশ্ববাসীর। যে আনন্দ মানুষকে একঘেয়ে জীবন থেকে বাইরে টেনে আনে, শামিল করে উৎসবে, সে আনন্দ যেন আজ নির্বাসিত। বলা হয়, ঘরে থাকতে। নিরাপদে থাকতে। ঘরে থাকাই যে এখন নিরাপদ!
সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে ঈদ করতে হয়েছে ভার্চুয়ালি। মোবাইলে ভিডিও কলে কথা বলে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রায় সবাই। ঈদের আনন্দ পরিবারের সঙ্গে উপভোগ করতে না পারাটাও হতাশাকে বাড়িয়ে তোলে। পরিবারের কাছে থাকলে হয়তো চারদিকে চলা আতঙ্কটা কম অনুভব হতো। নিজেকে সুস্থ রাখার পাশাপাশি পরিবার আত্মীয় স্বজনেরাও যেন সুস্থ থাকে সেই চিন্তা থেকে অনেকেই গ্রামের বাড়ি যাননি। এ যেন রংহীন অন্যরকম এক আনন্দহীন ঈদ।
করোনার কারণে বিপর্যস্ত অর্থনীতি, মানুষের জীবন-জীবিকা, সমাজ, মানুষের মনোজগতও। আবার এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য ছিল বাড়তি এক মহাবিপদ। সমাজের অধিকাংশের জন্য ঈদ তাই আনন্দের না হয়ে দেখা দেয় এক অন্য বাস্তবতা। বাংলাদেশের উপকূলের বিশাল এক এলাকা হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত। ঘর-বাড়ি ভেঙেছে। ঈদের দিনও পানিতে তলিয়ে ছিল ফসলের ক্ষেত। এ অবস্থায় কেমন হয়েছে বিপুল সংখ্যক উপকূলবাসীর ঈদ তা কেবল ভুক্তভোগীরা ভালো জানেন।
করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি সুদূর চীনে। দেশটির হুবেই প্রদেশের উহানের রোগটি ঠিকই পাড়ি দিয়েছে কয়েক সমুদ্র দূরত্ব। পরাশক্তির দেশগুলো আজ নির্জীব, নিস্তব্ধ। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে মীমাংসার জন্য। এত ক্ষমতা! আনবিক, পারমাণবিক অস্ত্র, ইউরেনিয়ামের গুঁড়োÑ সবকিছু মূল্যহীন হয়ে পড়েছে জীবন বাঁচাতে। বিশ্ববাসী জীবনের দামে কিনে নিয়েছে ব্যর্থতাকে। দিনকে দিন লম্বা হচ্ছে ব্যর্থতা নামের রেলগাড়িটির অবয়ব। করোনা ভাইরাস আমাদের জীবনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েই ক্ষ্যান্ত হয়নি, কেড়ে নিয়েছে সামাজিক বন্ধনও। বড় একা করে দিয়েছে সামাজিক মানুষকে। এবারের ঈদের জামাতে ছিল না আনন্দের রেশ। ঈদগাহ ফাঁকা ছিল। নামাজ হয়েছে মসজিদে। দূরে দূরে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় শেষে আর দূরত্ব মেনে বাসায় ফিরেছে মানুষ। কাছে থেকেও এ যেন কত অচেনা! অথচ একই পাড়ায়, একই মহল্লায় ছেলে বয়স থেকে বুড়ো বয়সে এসে থেমেছে জীবন।
এদিকে মুসলমানদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশবাসীসহ বিশ্ববাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে জাতির উদ্দেশে দেয়া এক ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের মহামারির কারণে সারা বিশ্ব আজ বিপর্যস্ত। অগণিত মানুষের প্রাণহানি ছাড়াও এই মহামারি মানুষের রুটি-রুজির উপর চরম আঘাত হেনেছে। সংক্রমণ যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য জরুরি কিছু সেবা ছাড়া বন্ধ করে দিতে হয়েছে অফিস-আদালত, কল-কারখানা, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানসহ সবকিছু। লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। হারিয়েছেন তাঁদের রুটি-রুজির সংস্থান। এসব কর্মহীন মানুষের সহায়তার জন্য সরকার সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। খাদ্য সহায়তা ছাড়াও দেয়া হচ্ছে নগদ অর্থ।
অর্থনৈতিক কর্মকা- এবং উৎপাদন ব্যবস্থাকে পুনরায় সচল করতে আমরা ইতোমধ্যে ১ লাখ ১ হাজার ১১৭ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছি। যা জিডিপি’র ৩.৬ শতাংশ। রপ্তানিমুখী শিল্প, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্প, কৃষি, মৎস্যচাষ, হাঁসমুরগি ও পশুপালন খাতসহ ১৮টি অর্থনৈতিক খাতকে এসব প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় আনা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরো উল্লেখ করেন, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে করোনা ভাইরাসের এই মহামারি সহসা দূর হবে না। কিন্তু জীবন তো থেমে থাকবে না। যতদিন না কোনো প্রতিষেধক টীকা আবিষ্কার হচ্ছে, ততদিন করোনা ভাইরাসকে সঙ্গী করেই হয়তো আমাদের বাঁচতে হবে। জীবন-জীবিকার স্বার্থে চালু করতে হবে অর্থনৈতিক কর্মকা-। বিশ্বের প্রায় সব দেশই ইতোমধ্যে লকডাইন শিথিল করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ অনির্দিষ্টকালের জন্য মানুষের আয়-রোজগারের পথ বন্ধ করে রাখা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে তো নয়ই। এ বছর আমরা সশরীরে পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হতে বা ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে না পারলেও টেলিফোন বা ভার্চুয়াল মাধ্যমে আত্মীয় স্বজনের খোঁজখবর নিব। এভাবেই সকলের সঙ্গে একযোগে আল্লাহ প্রদত্ত এই মহান নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করবো।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে বলেন, ঝড়-ঝঞ্ছা-মহামারি আসবে। সেগুলো মোকাবিলা করেই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজন জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সঙ্কট যত গভীরই হোক জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে তা উৎড়ানো কোনো কঠিন কাজ নয়। এই সত্য আপনারা আবারও প্রমাণ করেছেন। আপনাদের সহযোগিতা এবং সমর্থনে আমরা করোনা ভাইরাস মহামারির আড়াই মাস অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে সমর্থ হয়েছি। যতদিন না এই সঙ্কট কাটবে, ততদিন আমি এবং আমার সরকার আপনাদের পাশে থাকব ইনশাআল্লাহ।
এই মুহূর্তে গোটা বিশ্বই একটা কঠিন সময় পার করছে। করোনা ভাইরাসের কারণে মানবজাতি শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিতেই পড়েনি, পঙ্গু করে দিয়েছে অর্থনীতি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং লকডাউনের নিয়ম অনুসরণ করেই কেবলমাত্র এই পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব। তাই পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে ধর্মীয় নেতারাও এবার ঈদে মানুষকে জনাসমাগম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন। লকডাউনের মধ্যে নিজ নিজ বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিরাপদ ঈদ উদযাপনের আহ্বান জানান।
বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস আজ গোটা পৃথিবীর মানুষের জীবনকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। সামান্য কয়েক ন্যানোমিটারের এক আলোক আণুবীক্ষণিক বস্তুর কাছে গোটা পৃথিবীর মানুষই অসহায়। সত্যিকার অর্থে এ বছর তেমনভাবে কারো মাঝেই সে অর্থে ঈদ আনন্দ প্রতিফলিত হয়নি বললে অত্যুক্তি হবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুযায়ী সমগ্র পৃথিবীর ২১৫টি দেশ ও অঞ্চল করোনা ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়েছে। প্রতিদিন যেমন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাজারো মানুষ এ প্রাণঘাতী করোনা দ্বারা সংক্রমিত হচ্ছেন, ঠিক তেমনিভাবে প্রতিনিয়ত ঝরে যাচ্ছে শত শত প্রাণ। গোটা পৃথিবী যেন এক মৃত্যুপুরী।
মহামারি করোনা ভাইরাসে কাবু গোটা বিশ্ব। করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে তাই সামাজিক দূরত্ব মেনে চলায় গুরুত্ব দেয়া হয়। মানুষের প্রাণ বাঁচাতে কারফিউ, লকডাউন দেয়া হয় ঈদের দিনেও। করোনা ভাইরাসের মহামারির মধ্যেই সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ২৪ মে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়েছে। কোনো কোনো দেশে সামাজিক দূরত্ব মেনে মসজিদ বা ঈদগাহ ময়দানে ঈদের নামাজ আদায় করা হলেও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে করোনা ঠেকাতে মসজিদে নামাজ আদায়ের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ফলে সেখানে নিজ নিজ বাড়িতে নামাজ আদায় করছেন মুসল্লিরা। তবে সুরক্ষা ও শারীরিক দূরত্বের বিষয়কে গুরুত্ব দেয়ার কারণে এবারের উদযাপন একেবারেই অন্যরকম। কোনো কোনো দেশে কড়া লকডাউনের মধ্যেই ঈদ উদযাপিত হয়েছে, কোনো কোনো দেশ আবার বিধিনিষেধ শিথিলও করে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা এক মাসের সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতর উদযাপন করে। সকালে তারা খুতবায় অংশ নেয়, জামাতে নামাজ আদায় করে, নামাজ শেষে হাসিমুখে কোলাকুলি করে। তবে এবারের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। বিশ্বজুড়ে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়েই চলছে। অনেক দেশেই চলছে লকডাউন। পবিত্র রমজান মাসজুড়ে করোনার বিধিনিষেধের মধ্যেই মুসলমানেরা সিয়াম সাধনা করেছে। বিভিন্ন দেশে ঈদুল ফিতরের উৎসবেও কম-বেশি বিধিনিষেধ ছিল। সৌদি আরব, মিসর, তুরস্ক ও সিরিয়া করোনার বিস্তার ঠেকাতে ঈদে গা ঘেঁষে জামাতে নামাজ আদায়সহ গণজমায়েত নিষিদ্ধ করে। সৌদি আরবে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ২৩ মে থেকে পাঁচ দিনের কারফিউ জারি করে। দিন-রাতজুড়ে এই কারফিউ চলে। মক্কা ও মদিনার দুটি পবিত্র মসজিদে সাধারণ মুসল্লিদের উপস্থিতি ছাড়াই ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
করোনার ব্যাপক সংক্রমণের মুখে গত মার্চেই ইরানে নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। নাগরিকদের ঈদের সময় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানানো হয়। তবে ইরানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী আগেই সতর্ক করে দিয়ে বলেন, স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে নতুন করে করোনার সংক্রমণের ঢেউ আসুক, তা তারা চান না। ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া ও আফগানিস্তানে ঈদের কেনাকাটা উপলক্ষে ব্যাপক জনসমাগম লক্ষ করা যায়। সে সময় করোনার স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত হয়। ইন্দোনেশিয়ায় এখনো অনেক মসজিদ বন্ধ। তাই রাস্তার ওপরই নারী ও পুরুষ ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেন। জেরুজালেমের পবিত্র আল আকসা মসজিদ ঈদের পর মুসল্লিদের জন্য খুলে দেয়া হয়। অস্ট্রেলিয়ার সিডনির পশ্চিমাঞ্চলীয় লাকেমবা মসজিদে ঈদুল ফিতরের সময় সাধারণত শত শত মুসল্লির আগমন ঘটে। করোনার কারণে মুসল্লিদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে মাথায় রেখে এবার মসজিদের পক্ষ থেকে ফেসবুকের মাধ্যমে ঈদের জামাত ও খুতবা পাঠের আয়োজন করা হয়।
বৈশ্বিক মহামারি করোনা ঈদের আনন্দ গ্রাস করে নিয়েছে। করোনা ভাইরাসের কারণে ঈদ-আনন্দের সব অনুষঙ্গ থেকে বিরত থাকতে হচ্ছে সবাইক। মহাসমারোহে হইচই করে ছুটে বেড়ানো শিশুরাও আজ ঘরবন্দি। এর চেয়ে কষ্ট আর কী হতে পারে! ঈদ আনন্দের সব অনুষঙ্গ ত্যাগ করেও যদি পৃথিবী থেকে করোনা বিদায় নিত, তাহলে শান্তি পেত মন। অথচ আমরা এখনো ধারণাও করতে পারছি না কবে এই করোনা ভাইরাস বিদায় নেবে মানবজাতির কাছ থেকে।
করোনা-আক্রান্ত ঈদ আমাদের উপলব্ধির দরজা খুলে দিয়েছে নতুনভাবে। করোনাকে একটি বিশেষ কারণে ধন্যবাদ জানাতে হয় আর সেটি হচ্ছে করোনার এ পরিস্থিতির আবির্ভূত না হলে আমরা কখনো আশেপাশের মানুষের দুঃখ-কষ্টকে এভাবে সামনাসামনি প্রত্যক্ষ করতে পারতাম না। এবারের ঈদ আমাদের শিক্ষা দিয়ে গেল মানুষের মধ্যকার সব ধরনের বিভেদ চিরতরে দূর করার। পাশাপাশি মানবতার কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করাই হোক জীবনের মূলমন্ত্র।