অর্থনীতি

করোনাকালেই ৯% সুদ কার্যকরের মোক্ষম সময়

স্বদেশ খবর ডেস্ক
উচ্চ সুদহারের কারণে ব্যবসা-বিনিয়োগ এমনিতেই অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। দুর্বল বিনিয়োগের সময় করোনা ভাইরাস আঘাত হেনে ল-ভ- করে দিচ্ছে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা। উৎপাদন, বিপণনসহ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ভেঙে পড়ছে বিদ্যমান ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো। এ
অবস্থায় এক অঙ্কের সুদহার কঠোরভাবে কার্যকর হলে ব্যবসায়ীদের পক্ষে ঋণ নিয়ে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা করতে হবে। তা না হলে করোনা ভাইরাসে ভেঙে পড়া অর্থনীতির সোজা হয়ে দাঁড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বেকার
হয়ে পড়া প্রাতিষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের দুর্দশা বাড়ার পাশাপাশি বেকারত্ব বাড়ার আশঙ্কাও করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। তা ছাড়া, অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের বারবার ঘোষণা দেয়া, ব্যাংক মালিকদের বিভিন্ন শর্ত পূরণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সার্কুলার জারির পর এক অঙ্কের সুদহার কার্যকর না হলে সরকারের নীতি-ঘোষণায় ব্যবসায়ীদের আস্থাহীনতা দেখা দেয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে এক অঙ্কের সুদহার কার্যকরের উদ্যোগ সরকার প্রথম নেয় ২০১৭ সালে। ওই সময়কার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের এ জন্য বেশ কিছু সুবিধাও দেন। তবুও ব্যাংক মালিকরা নানা অজুহাতে তা কার্যকর করেননি। চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এক অঙ্কের সুদহার কার্যকরের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, এত বেশি সুদে ঋণ নিয়ে কোনো ব্যবসায়ীর পক্ষে টিকে থাকা কঠিন। তিনি তাঁর সরকারের সুদহার কমিয়ে দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনার কথা জানান। বিভিন্ন সুবিধা নিয়েও এক অঙ্কের সুদহার কার্যকর না করায় ব্যাংক মালিকদের সমালোচনাও করেছেন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালও এক অঙ্কের সুদহার কার্যকর করার কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও খাতবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিসহ সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষ নেতারা বারবার এক
অঙ্কের সুদহার কার্যকর করার ওপর জোর দিয়েছেন।
সর্বশেষ অন্তত ১ জানুয়ারি থেকে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে এক অঙ্কের সুদহার কার্যকর করার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। পরে ব্যাংক মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে তিনি ঘোষণা দেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব ধরনের ঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন। সে বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। ব্যাংক মালিকরা তিন মাস সময় চেয়েছেন। উভয়পক্ষ মিলে ১ এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড বাদে সব ধরনের ঋণে এক অঙ্কের সুদহার কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয়। বলা হয়, এর কোনো ব্যত্যয় হবে না। ওই সময় ব্যাংক মালিকরাও একই কথা বলেন। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি
আমানতের ৫০ ভাগ ৬ শতাংশ সুদে বেসরকারি ব্যাংকে আমানত রাখা বাধ্যতামূলক করে দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। ১ এপ্রিল থেকে এক অঙ্কের সুদহার কার্যকর করার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকও সার্কুলার জারি করে।
দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম এ বিষয়ে বলেন, সিঙ্গেল ডিজিটের সুদহার দেশের ব্যবসাবাণিজ্যের জন্য খুবই জরুরি। আগেও এর প্রয়োজনীয়তা ছিল। এখন করোনা ভাইরাসে ব্যবসাবাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পর এর প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।
তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসের এই সংকট কেটে গেলে ব্যবসা বিনিয়োগের জন্য এক অঙ্কের সুদহারের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যাবে। কারণ উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য পুঁজির খুবই সংকট হতে পারে।
এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ একটা বড় বাধা। এই বাধা দূর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে এখনকার পরিস্থিতিতে ব্যাংক পরিচালনায় ব্যাংক ব্যবসা পরিচালনার ধরন পাল্টাতে প্রয়োজন হতে পারে। এতে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় কমে আসতে পারে।
ঢাকায় বিশ^ব্যাংকের ঢাকা অফিসের পরামর্শক ড. জাহিদ হোসেন এ বিষয়ে বলেন, করোনার আগেও সবকিছুতে একধরনের মন্দা ছিল। এর মধ্যেই সব ঋণের জন্য একধরনের সুদের হার ঘোষণা করা হয়েছে। এখন করোনার কারণে এটির বাস্তবায়ন আরও শঙ্কায় ফেলবে। কারণ করোনার কারণে ব্যবসাবাণিজ্যে নতুন নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এসব ঝুঁকির মধ্যে ব্যাংকাররা নতুন করে ঋণ দিতে চাইবে না। ৯ শতাংশ সুদে ঋণ ও ৬ শতাংশ সুদে আমানত কার্যকর করতে ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় কমাতে হবে। ব্যাংক প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। বাড়াতে হবে তদারকি। আর অবশ্যই খেলাপি ঋণ কমাতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ স্বদেশ খবরকে বলেন, এক অঙ্কের সুদহার কার্যকর করলে করোনা ভাইরাস-পরবর্তী সময়ে এর সুফল পাবে অর্থনীতি। এতে দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে, যা করোনায় দুর্বল হওয়া অর্থনীতির জন্য খুবই প্রয়োজন। একসময় ভোক্তা ঋণের ক্ষেত্রে বেশি সুদের পক্ষে ছিলাম আমরা। এখন মনে হচ্ছে সে ক্ষেত্রেও এক অঙ্কের সুদহারই প্রয়োজন। কারণ
মানুষ কেনাকাটা না করলে অর্থনীতি সচল হবে না। টাকার হাতবদল বাড়বে না। এখন থেকে করোনা ভাইরাস-পরবর্তী এক বা দুই বছর ব্যাংক ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিট রাখা উচিত হবে। এতে ভোক্তার চাহিদা ও বাজার চাঙ্গা হবে।
তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতির পর নতুন কোনো বিনিয়োগকারী আসতে চাইবেন না। আর তখন যদি সুদহারও উচ্চ থাকে, তাহলে তারা আরও আগ্রহ হারাবেন। তাই এক অঙ্কের সুদহার কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে।