প্রতিবেদন

করোনার এই সময়ে দেশের সব বিমানবন্দর সুনসান

নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের সব কটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কিছুদিন আগেও প্রায় ২৪ ঘণ্টাই ব্যস্ততা থাকত। একের পর এক ফ্লাইট নামত। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পেতেন না দম ফেলার ফুসরত। এক বেল্ট থেকে অন্য বেল্টে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাতেন গোয়েন্দারা। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে প্রায় সারা বিশ্বের সঙ্গে আকাশপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় চিরচেনা সেই পরিবেশ আর নেই দেশের তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কোনোটিতেই। একই পরিস্থিতি অভ্যন্তরীণ সব বিমানবন্দরেও। সব মিলে দেশের সব কটি বিমানবন্দরেই বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা। নেই কোনো কোলাহাল, হাঁকডাক।
করোনা ভাইরাস মহামারী আকার ধারণ করায় বাংলাদেশের এখন প্রায় সারা বিশ্বের সঙ্গেই আকাশপথের যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। চলছে শুধু চীনের ফ্লাইটগুলো। এ কারণে ফাঁকা বিমানবন্দরে দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনেকটা অলস সময় পার করছেন। তবে তাদের অনেকেরই নেই করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের সরঞ্জাম।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ২০ হাজারের বেশি যাত্রী যাতায়াত করত। করোনার কারণে দেশের প্রধান এই বিমানবন্দরজুড়েই এখন পিনপতন নীরবতা; পরিণত হয়েছে অনেকটা ভুতুড়ে এলাকায়। গত দুদিন শাহজালাল বিমানবন্দর ঘুরে এ চিত্র পাওয়া গেছে। খোঁজ নিয়ে একই চিত্র পাওয়া গেছে দেশের সব কটি বিমানবন্দরেই।
এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান স্বদেশ খবরকে বলেন, করোনা পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাওয়ায় গত ২২ মার্চ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করার ঘোষণা দেয় বেবিচক। কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ওমান, সিঙ্গাপুর, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ফ্লাইট বাংলাদেশে অবতরণ করতে না পারার নোটিস টু এয়ারম্যান (নোটাম) জারি করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়িয়ে এখন ৩০ এপ্রিল করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত ফ্লাইট চলাচল শুরু হবে।
তিনি বলেন, বিমানবন্দরে কর্মরত প্রত্যেক কর্মীর স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। হ্যান্ড স্যানিটাইজারের পাশাপাশি হাত ধোয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। আল্লাহর রহমতে এখন পর্যন্ত বিমানবন্দরের কোনো কর্মী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হননি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দিনে ২৮টি এয়ারলাইনসের ১২০টির বেশি ফ্লাইট ওঠানামা করত শাহজালাল বিমানবন্দরে। এখন বাংলাদেশ থেকে শুধু চীনে যাত্রীবাহী একটি ফ্লাইট চলছে। বন্ধ রয়েছে অন্য সব ফ্লাইট। চীন থেকে ফ্লাইট এলেও করোনা আতঙ্কে যাত্রী আসছেন কম। ফ্লাইট না থাকায় বিমানবন্দর ফাঁকা হয়ে পড়েছে। কর্মরত বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের কর্মীদেরও ব্যস্ততা নেই বললেই চলে। যদিও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কায় আছেন তারা। বিদেশগামী ও বিদেশ থেকে আসা প্রত্যেক যাত্রীর ইমিগ্রেশন কার্যক্রমের জন্য সতর্ক থাকতে হচ্ছে ইমিগ্রেশন পুলিশকে। মাস্ক, গ্লাভস ব্যবহার করলেও যাত্রীদের সংস্পর্শে আসায় ইমিগ্রেশন পুলিশসহ অনেকেই আছেন করোনা সংক্রমণের শঙ্কায়।
চট্টগ্রামের শাহ আমানত ও সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেরও একই
অবস্থা। একই অবস্থা অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোতেও।
গত দুদিন শাহজালাল বিমানবন্দর ঘুরে আরও দেখা যায়, পার্কিং জোন এখন পুরোই ফাঁকা; যেখানে স্বাভাবিক সময়ে গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা পাওয়া যেত না। এখন বিমানবন্দরে আসা গাড়িগুলোর জট সামলাতে ব্যস্ত হতে হয় না আর্মড পুলিশ সদস্যদের। দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে ব্যস্ত থাকতেন যেসব পুলিশ সদস্য, তারাও নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন চেকপোস্টগুলোতে। দর্শনার্থীদের ভিড় না থাকায় টিকিট কাউন্টারগুলো ফাঁকা। যাত্রী না থাকায় টার্মিনালগুলোতে নেই যাত্রীদের কোনো লাইন। বিমানবন্দরের ভেতরের বেশির ভাগ দোকানপাটই বন্ধ। কাজ না থাকায় ভেতরে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা পার করছেন অলস সময়। তবে করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে যেভাবে থাকা প্রয়োজন তারা সেভাবে নেই। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারও কারও মুখে মাস্ক দেখা যায়নি। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অনেকের হাতেই দেখা যায়নি গ্লাভস, তাদের মুখে ছিল না মাস্ক। এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী স্বদেশ খবরকে বলেন, জীবনের তাগিদে কাজ করতে হচ্ছে। কাজ না করলে খাব কী? তবে পরিবার খুব আতঙ্কে থাকে।
বিমানবন্দরের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন স্বদেশ খবরকে বলেন, ফ্লাইট না থাকায় কাজের চাপ নেই বললেই চলে। পুরো বিমানবন্দরেই কোলাহলমুক্ত পরিবেশ। এই পরিবেশ দেখতে আর ভালো লাগে না। দেশের সব কটি বিমানবন্দরে একই অবস্থা বিরাজ করছে। শাহজালালে তাদের অন্তত ১ হাজার ১০০ সদস্য দায়িত্বরত। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারাও কাজ করছেন। ইউএস বাংলা ও চায়না এয়ারলাইনসের কয়েকটি ফ্লাইট চলাচল করলেও নেই তেমন যাত্রী। তিনি বলেন, সুরক্ষিত অবস্থায় আমরা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা দিয়ে আসছি।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসা যাত্রীদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যান প্রাইভেটকারের চালক মোহাম্মদ রহমত। স্বদেশ খবরকে তিনি বলেন, বিমাববন্দর অচল হয়ে যাওয়ায় আমরা বেকায়দায় পড়েছি। করোনা ভাইরাসের আগে প্রতিদিন যাত্রী নিয়ে ঢাকার বাইরে যেতাম। এখন অলস সময় পার করছি। আয়-রোজগার না থাকায় সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। সামনে কী হবে আল্লাহই ভালো জানেন।