প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

করোনার কারণে স্থবির বিশ্ব : ঘুরে দাঁড়ানোর উপায় খুঁজছে আক্রান্ত সব দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
কোভিড-১৯ বা নোভেল করোনা নামের এক অদৃশ্য প্রাণঘাতী ভাইরাসের কারণে পুরো বিশ্ব আজ কার্যত স্থবির। উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম- বিশ্বের সব প্রান্তে পৌঁছে গেছে এই অদৃশ্য শত্রুর ভয়াল থাবা। ৬ জুন পর্যন্ত ৬৬ লাখেরও বেশি মানুষের দেহে ছড়িয়েছে ভাইরাসটি। আক্রান্তদের মধ্যে ৪ লাখের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অবশ্য সুস্থ হয়েছেন প্রায় ৩৪ লাখ। চীনের উহান প্রদেশ থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটির কোনো ভ্যাক্সিন এখনো পর্যন্ত আবিস্কার করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাকে মহামারী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে এর সংক্রমণ ঠেকাতে সব দেশকে সামাজিক দূরত্ব বা সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং নিশ্চিত করতে বলেছে। অনেক দেশের সরকার সংস্থাটির পরামর্শ মেনে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউন, জরুরি অবস্থা জারি করে নিজেদের দেশের সমস্ত কিছু বন্ধ করে দেয়। কিন্তু এরপরও করোনার সংক্রমণ থামানো যায়নি। ইতালি, ফ্রান্স, ব্রিটেন, স্পেন রাশিয়া, যুক্তরাষ্টে এখনো মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে- পুরোপুরি থামছেনা মৃত্যুর মিছিল।
বাংলাদেশে প্রথম এক ব্যক্তির শরীরে কোভিট-১৯ বা করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি সনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। আক্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন ইতালি ফেরত। উল্লেখ্য, চীনের উহানে এই ভাইরাসের উৎপত্তি হলেও প্রায় পুরো বিশ্বে ছড়িয়েছে ইতালি ফেরত ব্যক্তিদের মাধ্যমে। প্রথম করোনা রোগী সনাক্তের পর থেকে বাংলাদেশেও দ্রুত বাড়তে থাকে আক্রান্তের সংখ্যা। ৬ জুন পর্যন্ত ৬৩ হাজার মানুষের শরীরে সনাক্ত হয়েছে ভাইরাসটি। আক্রান্তদের মধ্যে ৮৪৬ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরতে পেরেছেন ১৩ হাজার ৩২৫ জন আক্রান্ত রোগী।
সরকার দেশব্যাপী করোনা ভাইরাস রোগ মোকাবিলায় এবং এর ব্যাপক বিস্তার রোধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে গত ২৬ মার্চ থেকে কয়েক দফায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা দিয়ে জনগণকে ঘরে থাকার নির্দেশনা দেয়। অবশ্য কাঁচা বাজার, খাবার, ওষুধের দোকান, হাসপাতাল এবং গ্যাস, ইন্টারনেট, টেলিফোন সেবার মত অতি জরুরি পরিসেবারগুলো সাধারণ ছুটির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে প্রথম থেকে। করোনায় মৃত্যু ভয়ে ভীত হয়ে বেশিরভাগ মানুষ সরকারের এই ঘোষণা মেনে হোম কোয়ারেন্টিন পালন করছেন।
সাধারণ ছুটি বা স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকা- বন্ধ ছিল ৩০ মে পর্যন্ত। বেশ কিছু রপ্তানীমুখী তৈরি পোশাক কারখানার উৎপাদন চালু থাকলেও সাধারণ ছুটির কারণে ৩০ মে পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা- প্রায় পুরোপুরিভাবে বন্ধ ছিল। ফলে কর্মহীন হয়ে পড়েছিল হাজার হাজার অতি দরিদ্র, নি¤œবিত্ত মানুষ। অঘোষিত লকডাউনের প্রথমদিকে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে অনেককে কর্মহীন নি¤œবিত্ত পরিবারের পাশে খাদ্য, অর্থ সহায়তা নিয়ে দাঁড়াতে দেখা গেছে। কর্মহীন নি¤œবিত্ত মানুষের জন্য এখনো সরকারি ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও বেসরকারি উদ্যোগ সময়ের পরিক্রমায় স্বাভাবিকভাবে স্থিমিত হতে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতিতে ৩০ মের আগে থেকেই জীবিকার প্রয়োজনে বহু মানুষ বাধ্য হয়েছেন ঘর ছেড়ে কাজের সন্ধানে বের হতে। একদিকে পেটে ক্ষুদা, ঘরে খাবার নেই অন্যদিকে অদৃশ্য করোনার ভয়। ক্ষুধার্ত অসহায় মানুষকে আসলেই করোনার ভীতি আর আটকে রাখতে পারছে না ঘরে। ফলে কার্যত অঘোষিত লকডাউন ভেঙ্গে পড়েছিল। সরকারও বহুক্ষেত্রে বাস্তবতা বিবেচনায় মানবিক কারণে জীবিকার প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া অনাহারী মানুষগুলোর ব্যাপারে শৈথিল্য দেখাতে বাধ্য হচ্ছে। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে জীবিকার পথ। সাম্প্রতিক

দুই.
কিন্তু এই ইস্যুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় চলছে। কারণ অনেকেই সরকারের এমন শৈথিল্যে নাখোশ। তাদের দাবী করোনা মহামারীর এই মুহূর্তে মানুষকে রাস্তায় বের হতে দেয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। তাদের এক কথা Ñ আগে জীবন তারপর জীবিকা। আসলেই কি আগে জীবন তারপর জীবিকা?
ধরুন, দীর্ঘদিন সম্পূর্ণভাবে অর্থনৈতিক কর্মকা- বন্ধ থাকার পরেও আর্থিক সক্ষমতা থাকায় একজন ব্যক্তির কাছে আগামী আরো বেশ কিছুদিন বাসায় থেকেও সংসারের খরচ চালানোর মত যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা আছে। অথবা তিনি যে প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করেন সেখান থেকে লকডাউন পরিস্থিতিতে কাজ না করেও বাসায় বসে নিয়মিতভাবে বেতন পাচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও পাওয়ার ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত। তিনি কি এই মুহূর্তে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে কাজে বের হতে চাইবেন? নিশ্চিতভাবেই তিনি এই ঝুঁকি নেবেন না। কারণ মানুষ নিজের জীবনের চেয়ে বেশি অন্য কিছুকে ভালবাসে না। সুতরাং যেহেতু ঘর থেকে বের না হয়েও খরচ চালানোর মত সামর্থ্য আছে তাই তার কাছে এই মুহূর্তে অবশ্যই আগে জীবন তারপর জীবিকা।
কিন্তু অন্যদিকে গত প্রায় দুই মাস ধরে কর্মহীন অবস্থায় ঘরে বসে থাকায় একজন দিনমজুরের জমানো টাকা শেষ। তার হাতে নিজের, সন্তানের, স্ত্রীর জন্য খাবার কেনার, ঘরভাড়া দেয়ার টাকা নেই। ত্রাণ সহায়তাও মিলছে না আগের মত। তার এই মুহূর্তে কি করা উচিত? করোনা থেকে বাঁচতে অনাহার, অপুষ্টির কারণে স্ত্রী সন্তানসহ ধুঁকে ধুঁকে মরার জন্য অপেক্ষা করবেন নাকি পেটের দায়ে কাজের সন্ধানে ঘর থেকে বের হবেন? তার কাছে এই পরিস্থিতিতে জীবন আগে নাকি জীবিকা? নিশ্চয় জীবিকা।
প্রকৃত পক্ষে জীবিকার নিশ্চয়তা ছাড়া জীবন অর্থহীন। জীবিকার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়েই জীবন চলে- প্রাণ বাঁচে। সুতরাং যারা প্রায় দুইমাস জীবিকার সব পথ বন্ধ থাকার পরেও ‘আগে জীবন পরে জীবিকা’ তত্ত্বে এখনো সবকিছু বন্ধ রাখার দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিপ্লব করছেন, নিজেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ভবিষ্যতে চলার মত পর্যাপ্ত টাকা না থাকলে, ঘরে খাবার না থাকলে কি তারা একই কথা বলতেন? অপ্রিয় সত্য হল করোনা, লকডাউন, কোয়ারেন্টিন এসব উপভোগ করছেন বিশ্বের মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ। বাকী ৮৫ শতাংশ মানুষের কাছে এসব বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

তিন.
করোনা থেকে বাঁচতে লকডাউন অব্যাহত রাখা বা সবকিছু বন্ধ রেখে মানুষকে ঘর বন্দী করে রাখতে পারলেই যে করোনা ভাইরাসের বিস্তার বন্ধ হবেÑ এই রোগে কোন মানুষ প্রাণ হারাবে না এমন কোনো সম্ভাবনাও নেই। কারণ বিশ্বের কোন দেশে লকডাউন দিয়ে করোনা ভাইরাসকে ঠেকানো গেছে এমন কোন নজির নেই। লকডাউন দিয়ে আমেরিকা, ফ্রান্স, ইতালি বা ব্রিটেন – কোথাও তো মৃত্যুর মিছিল থামানো যায়নি। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও লকডাউনকে একমাত্র সমাধান বলেনি। বরং তারা বলছেন ভ্যাক্সিন আবিস্কার না হওয়া পর্যন্ত এই ভাইরাস থেকে মুক্তি নেই। লকডাউন বা সামাজিক দূরত্ব সাময়িক সমাধান মাত্র।
ধরা যাক, আগামীকালই সফলভাবে করোনার ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করতে সক্ষম হলেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু বিশ্বের মোট প্রায় ৭৭০ কোটি মানুষের কাছে এই ভ্যাক্সিন পৌঁছতে কত বছর লাগবে? ততদিন কি একটি দেশের পক্ষে সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে সব মানুষকে ঘরে বন্দী রেখে লকডাউন কার্যকর রাখা সম্ভব? তাছাড়া করোনা কখন নিঃশেষ হবে কেউ তো জানে না।
আসলে কোনো দেশই সে পথে হাঁটছে না। বরং সব দেশ করোনার ঝুঁকি মেনেই ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক কর্মকা- স্বাভাবিক করার পদক্ষেপ নিচ্ছে। চেষ্টা করছে করোনার সংক্রমণ কমিয়ে- জীবন ও জীবিকা দুইয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। পথ খুঁজছে বিরাট অর্থনৈতিক ক্ষতির ধাক্কা সামলানোর। এটি নিঃসন্দেহে কঠিন পথ। কিন্তু বিকল্প উপায় তো নেই। সামনে যে অপেক্ষা করছে দুর্ভিক্ষ, বিশ্ব মহা অর্থনৈতিক মন্দা!
আমাদের দেশে গত দুই মাসের লকডাউনে অর্থনীতির যে বিরাট ক্ষতি হয়েছে এর প্রভাব নিঃসন্দেহে ধনী গরীব সবার উপর পড়বে। মন্দার কারণে হাজার হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার সাথে বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানেও চাকরি হারানোর শঙ্কায় হাজার হাজার শ্রমিক।
ইতোমধ্যে কয়েক হাজার প্রবাসী শ্রমিককে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে চাকরিচ্যুত করে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আরো কয়েক লাখ প্রবাসী শ্রমিককে অচিরেই দেশে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনার কথা সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে জনশক্তি আমদানিকারক দেশগুলো। অর্থনৈতিক কর্মকা-ে স্থবিরতার ফলে বর্তমান পরিস্থিতেও দেশে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বেতন দিতে পারছে না- মন্দার কারণে অনেক কর্মীকে আগাম ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছে।
এই অর্থনৈতিক সংকট বৈশ্বিক। খোদ যুক্তরাষ্ট্রে শুধুমাত্র করোনার মহামারীর কারণে সবকিছু বন্ধ থাকায় নতুন করে প্রায় তিন কোটি মানুষ চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছে। যারা আগে জীবন পরে জীবিকার কথা বলে এখনো সবকিছু বন্ধ রাখার কথা বলছেনÑ লকডাউন কার্যকর করতে সরকারকে কঠোর হতে বলছেন তারা আসলে অনুধাবন করতে পারছেন না ক্ষুধার কষ্ট কেমন, কি এক কঠিন পরিস্থিতি আসছে সামনে! তাদের এই ব্যর্থতা বা নীরবতার কারণ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। আসলে তাদের খাবারের কষ্ট নেই, ঘরভাড়ার চিন্তা নেই। কিন্তু সারাদেশের প্রায় ৭০ লক্ষ পরিবহন শ্রমিক, হাজার হাজার দিনমজুর, দোকান কর্মচারী, কারখানা শ্রমিক, ভিক্ষুক, পথশিশুর তো মাসের পর মাস বসে বসে খাওয়ার মত টাকা নেই। এই পরিস্থিতিতে এদের ঘরে খাবার নেই, মাথা গোঁজার ঠাই নেই। অনাহারে, অপুষ্টিতে এরা তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে নীরবে। তাদের কথা তো রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে। এদের সংখ্যা তো কয়েক কোটি।

চার.
এত দীর্ঘ সময় দেশের অর্থনীতি স্থবির থাকায় জাতির সামনে এক ভয়াবহ কঠিন পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে যা প্রকৃতপক্ষে কারোরই কাক্সিক্ষত নয়। তাই অর্থনৈতিক কর্মকা- চালু করতে হবে দ্রুত। মানুষের জীবিকার সব রুদ্ধ দ্বার খুলে দিতে হবে। স্বাভাবিক করতে হবে জনজীবন। সরকার ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে দেশের সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি মোকাবিলায় প্রায় লাখ কোটি টাকার আর্থিক প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে। অতি দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্য সহায়তা ছাড়াও দেশের কৃষি, শিল্প খাতের উৎপাদন সচল রাখার জন্যই এই বিশেষ প্যাকেজ। এগুলো যথার্থ অর্থে সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ। অন্য রাষ্ট্রগুলো তাই করছে। এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হল এই অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
অর্থনৈতিক কর্মকা- পুনরায় চালু করতে গিয়ে, জীবনযাত্রাকে স্বাভাবিক করতে করোনা ভাইরাসকে তুচ্ছ ভাবার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। এটি অবশ্যই একটি প্রাণঘাতী ছোঁয়াচে রোগ। এই ভাইরাসে আক্রান্তদের ৮০-৮৫ শতাংশ ঘরে এবং ১৫-১৮ শতাংশ হাসপাতালে সাধারণ চিকিৎসায় পুরোপুরি সুস্থ হলেও বৈশ্বিক হিসেবে গড়ে ২ শতাংশ মানুষ মারা যাচ্ছে। সংখ্যার হিসেবে মৃত্যু হার মাত্র ২ শতাংশ হলেও মোট আক্রান্তের হিসেবে মৃত্যুর সংখ্যা যথেষ্ট উদ্বেগের ও শঙ্কার। তবে ম্যালেরিয়া, নিউমোনিয়া, হৃদরোগ, কিডনির জটিলতা, কিংবা ক্যান্সারÑ কোনো জটিল রোগেরই মৃত্যুহার একেবারে শূন্য নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী শুধুমাত্র ইনফ্লুয়েঞ্জাজনিত রোগেই প্রতি বছর সারাবিশ্বে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষ মারা যায়। অর্থাৎ প্রতি মাসে ৫৪ হাজারের বেশি মানুষ শুধুমাত্র সাধারণ জ্বর সর্দি কাশিতে মারা যাচ্ছে। শুধুমাত্র ইনফ্লুয়েঞ্জা নয়, পানিবাহিত রোগ ডায়রিয়ায় ২০১৭ সালে প্রায় ১৬ লক্ষ মানুষ মারা গেছে। টিকা থাকা সত্ত্বেও ২০১৮ সালেও ১৫ লক্ষ মানুষ যক্ষায় মারা গেছে।
এইসব খবর অবশ্য কোন মিডিয়ায় সেভাবে আসে না- তোলপাড় হয় না ফেসবুক, লকডাউন হয় না কোন অঞ্চলÑ যেমনটা হচ্ছে করোনায়। যদিও ডায়রিয়া, যক্ষা, ইনফ্লুয়েঞ্জাও করোনার মতো ছোঁয়াচে রোগ।

পাঁচ.
যেহেতু কোভিড ১৯ বা করোনা মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ, তাই বাস্তবতা বিবেচনায় সবকিছু খুলে দিলে স্বাভাবিকভাবেই সংক্রমণের হার বাড়বে। বিশ্বের অন্যতম ঘন বসতির দেশ হিসেবে আমাদের শঙ্কাটাও এক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে বেশি। তাই অর্থনৈতিক কর্মকা- চালু করার সাথে সাথে আক্রান্তদের পর্যাপ্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তির অধিকার একজন মানুষের প্রাথমিক মৌলিক অধিকার। তাই যেকোনো মূল্যে প্রতিটা মানুষের এই অধিকারটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু আমাদের দেশের চিকিৎসাসেবা খাত প্রায় পুরোটাই বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দখলে। এটি অবশ্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চরিত্রের ফল- দেশটা তো সমাজতান্ত্রিক নয় বরং পুঁজিবাদী। করোনার এই সংকটে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মালিকদের স্বার্থপর ভূমিকা মানুষকে আহত করেছে। সত্যিকার অর্থে তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নেই। তাই এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রকেই ভূমিকা নিতে হবে- মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। এজন্য সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বৃহত্তর স্বার্থে দায়িত্ব থেকে কাউকে সরিয়ে দিতে হলে সেটিও করা উচিত। মোট কথা করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা। অবশ্য এখনো পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত মানুষ যেটুকু সেবা পেয়েছেন বা পাচ্ছেন তার প্রায় সবটাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানেইÑ বেসরকারি হাসপাতালে নয়। কারণ বেসরকারি হাসপাতালগুলো সেভাবে এগিয়ে আসেনি কোথাও। উল্টো অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, এমনকি বিনা চিকিৎসায় প্রাণ হারানোর মত অমানবিক দৃষ্টান্তও আছে বেশকিছু। তাই এই ক্রান্তিলগ্নে সরকারি হাসপাতালের বাইরে আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে সরকারকে। প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে সাময়িকভাবে রাষ্ট্রীয়করণ করা হোক। মানুষের জীবনের প্রয়োজনে এই জাতীয় সংকটে সরকার কঠোর হলে গুটিকয়েক ব্যবসায়ী ছাড়া বেশিরভাগ মানুষ অবশ্যই সরকারের পাশে থাকবে। মূল কথা, এই সংকটে রাষ্ট্র বা সরকারকেই দাঁড়াতে হবে মানুষের পাশে- পুঁজিপতি বেসরকারি হাসপাতালের মালিকেরা অতীতে যেমন দাঁড়াননি ভবিষ্যতেও দাঁড়াবেন না। মানুষের বিপদে তাদের এই নীরবতা স্বাভাবিক। কারণ করোনার চিকিংসায় মুনাফা কম, বরং ঝুঁকি বেশি। পুঁজির ধর্মই তো মুনাফা। তাই জীবন তাদের কাছে গৌণ, মুনাফাই মূখ্য।

ছয়.
প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় গত ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত দেশ লকডাউনে ছিল। ফলে সব ধরনের উৎপাদন বন্ধ থাকায় ভেঙে পড়েছে বাজার ব্যবস্থা। পাশাপাশি বড়, মাঝারি, ছোট সব ধরনের শিল্পখাত বিপর্যস্ত।
লকডাউন পুরো মে মাস জুড়ে অব্যাহত থাকায় মাস শেষে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ২ লাখ ১৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। যা গত অর্থবছরের মোট উৎপাদনের প্রায় ৯ শতাংশ। আর দিনে এই ক্ষতির পরিমাণ ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। গত এক মাসে আর্থিক ক্ষতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। তবে কৃষি খাতে উৎপাদন বন্ধ না হলেও ফসল সংগ্রহ ও বাজারজাত নিয়ে কৃষকরা বেকায়দায় রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিসহ ব্যবসাবাণিজ্যে। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে যতো দেরি হবে, আমাদের বাণিজ্য আগের অবস্থানে ফিরতেও ততো দেরি হবে।
প্রায় দুই মাসে বাংলাদেশ কি পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে প্রাথমিকভাবে তার একটি ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের একটি গবেষক দল। তাদের হিসাবে, লকডাউন দীর্ঘায়িত হলে প্রতিদিনের ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। এরই মধ্যে দেশের অন্তত ১৪টি খাতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি করোনা ভাইরাসের কারণে রমজান ও ঈদকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক আয়োজন এবার নিষ্প্রভ ছিল। যা অর্থনীতিতে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ২০১৮-২০১৯ সালের জিডিপির ভিত্তিতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে স্বল্পমেয়াদি বা চলতি ক্ষতির পরিমাণ কত হবে তা হিসাব করার একটা প্রয়াস নেয়া হয়েছে। অর্থনীতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট থাকে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি কিছুটা উৎসবকেন্দ্রিক। যেমন- পহেলা বৈশাখ, রোজা, ঈদ ও বৌদ্ধপূর্ণিমা। এ উৎসবগুলো সার্বজনীন। এ বছর এ উৎসবগুলো হয়নি। ফলে ক্ষতি হবে কিন্তু ক্ষতির পরিমাণ আরও বড়। এই ক্ষতির পরিমাণ লকডাউনের মেয়াদ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে পারে, যা প্রতিবেদনে এই মুহূর্তের হিসাব করা সম্ভব হয়নি।
আবদুল হামিদ বলেন, কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে গড়ে মোট অনুমিত চলতি ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত দেশ অবরুদ্ধ অবস্থায়। এতে অনুমিত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে কমপক্ষে ২ লাখ ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
লকডাউনের অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিতের পাশাপাশি নতুন নতুন উপায় খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ।
তার মতে, এই অবরুদ্ধ দশা দীর্ঘস্থায়ী হলে বেশিরভাগ ছোট-খাটো ব্যবসা এবং ছোট পরিসরের উৎপাদক প্রতিষ্ঠান সহজে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। ফলে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ ও ফরওয়ার্ড লিঙ্কেজ চেইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রন্ত হবে। বাংলাদেশের রেমিটেন্সের বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঘটায় প্রবাসী আয়েও ধস নামবে।

সাত.
করোনার এই পরিস্থিতিতে সবকিছু খুলে দেয়া নিঃসন্দেহে সরকারের একটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কিন্তু এছাড়া আর উপায় কি? করোনায় মারা যেতে পারে এই ভয়ে হাজার হাজার মানুষকে নিশ্চিতভাবে অনাহারে অপুষ্টিতে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া তো সমাধান নয়। করোনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, ফ্রান্স, ব্রিটেন, ইরান, ব্রাজিল, পার্শ্ববর্তী ভারত, পাকিস্তান প্রত্যেকেই সবকিছু খুলে দিচ্ছে। তাদের মত বড় অর্থনৈতিক শক্তি যদি এতদিনের লকডাউনের বোঝা বইতে না পারে আমাদের মত দেশের পক্ষে কিভাবে সেটি সম্ভব?
করোনাকে যুদ্ধ হিসেবে নিয়েছিল পুরো বিশ্ব। এখনো এই অদৃশ্য শত্রুকে হারানো যায়নি। কিন্তু মানব সভ্যতার ইতিহাসে করোনাই তো একমাত্র অদৃশ্য শত্রু নয়। এর আগেও বহুবার প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে মানুষকে। মাত্র একশ বছর আগেও স্প্যানিশ ফ্লু নামের এক অদৃশ্য প্রাণঘাতী ভাইরাসের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে ৫ কোটি মানুষকে। তৎকালীন মোট বিশ্ব জনসংখ্যার বিচারে মৃতের এই অংকটি বিশাল। কিন্তু মানবজাতি শেষ হয়ে যায়নি। বৈরি প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে- সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
এই নশ্বর পৃথিবীতে জন্ম-মৃত্যু একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় ৭৭০ কোটি মানুষের এই পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে দুই লাখের বেশি মানুষকে স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন রোগ, দুর্ঘটনা, বার্ধক্য প্রভৃতি কারণে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যেতে হয়। মৃত্যুর এসব প্রচলিত আদি কারণের সাথে নতুন করে যুক্ত হল করোনা নামের ভাইরাসটি। যদিও শক্তি হারিয়ে ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে করোনা। বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর সংখ্যা কমছে- বাড়ছে সুস্থতার হার।
করোনা এ যাত্রায় হয়তো অনেককে পরাজিত করবেÑ জীবন কেড়ে নেবে। কিন্তু পুরো মানবজাতিকে কী পরাজিত করতে পারবে? নিশ্চয় পারবে না। মানবজাতির অতীত ইতিহাস সেটাই সাক্ষ্য দেয়।
তাই করোনার কাছে পরাজিত হওয়ার ভয়ে কাপুরুষের মত ঘরে বসে না থেকে নির্ধারিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমাদের স্বাভাবিক জীবন যুদ্ধে নামার প্রস্তুতি নেয়াই শ্রেয় হয়েছে। আমরা কেউ তো অমর নই। মৃত্যুকে কি জয় করা যায়! মরতে তো হবেই।