রাজনীতি

করোনা উপদ্রুতদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ নিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপির পারস্পরিক দোষারোপ চলছেই

নিজস্ব প্রতিবেদক
করোনা উপদ্রুতদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ নিয়ে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক দোষারোপ অব্যাহত আছে। বিএনপি থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সরকারি ত্রাণ তছরূপ করছে। অপরদিকে আওয়ামী লীগ অভিযোগ করছে, বিএনপি সামান্য ত্রাণ কার্যক্রমও না চালিয়ে দোষারোপের রাজনীতিতে নেমেছে।
করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় বাংলাদেশের পর্যায়ক্রমে সক্ষমতা বাড়ছে বলে মনে করেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ২৫ এপ্রিল সংসদ ভবনের বাসা থেকে অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন তিনি।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনা ভাইরাস সংকট মোকাবিলা, সংক্রমণ রোধ এবং নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি মুহূর্ত নিরলসভাবে মনিটর করছেন, নির্দেশনা দিচ্ছেন। আমাদের সক্ষমতাও পর্যায়ক্রমে বাড়ছে। করোনা টেস্টের জন্য নির্ধারিত কেন্দ্রসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। টেস্টিং ক্যাপাসিটি প্রতিদিনই বাড়ছে। যদিও এই সমস্যা আজকে সারা দুনিয়ায়, সারা বিশ্বে আজকে টেস্টিং ক্যাপাসিটি ও পিপিইর সংকট রয়েছে। তারপরও বাংলাদেশ সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রতিদিনই এই টেস্টিং ক্যাপাসিটি বাড়াচ্ছে।
ওবায়দুল কাদের বলেন, আমাদের ফ্রন্টলাইন ওয়ার্কার চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরলসভাবে দিবারাত্রি কাজ করে যাচ্ছেন। প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব সর্বক্ষণ শেখ হাসিনার নির্দেশে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ত্রাণ সমন্বয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। দলীয় প্রধানের নির্দেশনা অনুযায়ী তৃণমূল পর্যায়ে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক ত্রাণ কমিটি হবে। এই ত্রাণ সুবিধা পাওয়ার উপযোগীদের তালিকা দ্রুততার সঙ্গে প্রণয়ন করে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ত্রাণকাজ পরিচালনায় আমি নেতাকর্মীদের আহ্বান জানাচ্ছি।
ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক বলেন, তালিকা প্রণয়নে কোনো প্রকার বৈষম্য করা চলবে না। দলমত নির্বিশেষে যার যা প্রাপ্য ঠিক সেই অনুযায়ী তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। দ্রুত তালিকা করে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা এখন দুইটা জিনিসের সঙ্গে লড়াই করছি। একটা হলো করোনা ভাইরাস, একে প্রতিরোধ করা। আরেকটি হচ্ছে গরিব অসহায় মানুষদের সুরক্ষা দেওয়া।
ত্রাণ কার্যক্রমে বাধা দেয়ার যে অভিযোগ বিএনপি করছে সে প্রসঙ্গ টেনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, আমি বলতে চাই, কে বাধা দিয়েছে? কোথায় বাধা দিয়েছে? তথ্য-প্রমাণ দিন। এই অমানবিক কাজ যারা করছে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। এটা নিঃসন্দেহে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। শেখ হাসিনার সরকার কঠোর অবস্থানে, চালচোরদের ক্ষমা নেই।

ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণের সুরক্ষার রাজনীতি করতে বিএনপির প্রতি তথ্যমন্ত্রী আহ্বান
তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণকে সুরক্ষা দেয়ার রাজনীতি করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আমি আহ্বান জানাব, আসুন অন্য রাজনীতি নয়, আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণকে সুরক্ষা দেয়ার রাজনীতিটাই করি।
তথ্যমন্ত্রী ২২ এপ্রিল রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে আরও বলেন, এখন রাজনীতি করার সময় নয়, একে অপরকে দোষারোপ করার সময় নয়, এখন সময় হচ্ছে সব রাজনৈতিক দল মিলে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে এ মহাদুর্যোগ মোকাবিলা করার।
এ সময় পরিসংখ্যান তুলে ধরে ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা শনাক্তের পর দুঃখজনকভাবে এ পর্যন্ত ১২০ জনের প্রাণহানি হয়েছে এবং ৩ হাজার ৭৭২ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। আমরা নিহতদের আত্মার শান্তি ও আক্রান্তদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি।
তিনি বলেন, কাছাকাছি সময় গত ১১ মার্চ তুরস্কে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর এ পর্যন্ত সেখানে ২ হাজার ২৫৯ জন মারা গেছেন ও ৯৫ হাজার ৫৯১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ আমাদের পরিস্থিতি এখনো অনেক দেশের চেয়ে ভালো। কিন্তু সেটি যেন আরও খারাপের দিকে না যায়, সেজন্য সরকারের পাশাপাশি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
দেশে করোনার পরিস্থিতি মোকাবিলার পূর্ব প্রস্তুতি সম্পর্কে তথ্যমন্ত্রী বলেন, বিশ্বে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ও বাংলাদেশে করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার আগে থেকেই দলের সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশে আওয়ামী লীগ জনগণকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য সরকারের পাশাপাশি কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের ত্রাণ উপকমিটি শুরু থেকেই ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করে আসছে এবং একেবারে উপজেলা পর্যায় ও ছোট ছোট পৌরসভা এমনকি পাড়া মহল্লা পর্যন্ত ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো হয়েছে এবং এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
এ সময় ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপকমিটির পক্ষ থেকে দেয়া করোনা প্রতিরোধ সামগ্রী চট্টগ্রাম জার্নালিস্ট ফোরাম ঢাকার সভাপতি শাহেদ সিদ্দিকী ও সদস্য এবং সাবেক সভাপতি মুজিব মাসুদের হাতে তুলে দেন তথ্যমন্ত্রী। দলের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়–য়া এবং ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

বিএনপি ত্রাণ দিচ্ছে আর
চুরি করছে আ.লীগ: রিজভী
বিএনপি পকেটের টাকার ত্রাণ দিচ্ছে, আর সরকারি দলের মেম্বার-চেয়ারম্যান জনগণের টাকায় কেনা ত্রাণ চুরি করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
২১ এপ্রিল রাজধানীর কাফরুল থানা বিএনপির উদ্যোগে ইব্রাহিমপুর কাফরুল এলাকায় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধনের সময় তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় ড্যাবের সহকারী মহাসচিব ডাক্তার শাকিল, ঢাকা মহানগর উত্তরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম, কাফরুল থানা বিএনপির নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। এরপর বিএনপির নেতাকর্মীরা দুস্থ ও গরিব মানুষের বাসায় বাসায় গিয়ে খাদ্যদ্রব্য পৌঁছে দেন।
রিজভী বলেন, দেশ একটা কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্ব মহামারীর মধ্যে পতিত হয়েছে। এ কারণে প্রতিটি মানুষ আতঙ্কে ও শঙ্কার মধ্যে দিন যাপন করছে। তাইওয়ান ও ভিয়েতনামে আগাম প্রস্তুতির কারণে করোনার তেমন সংক্রমণ হয়নি। তারা আগে থেকেই মানুষকে সচেতন করতে পেরেছে। কিন্তু আমাদের দেশে তা করা হয়নি।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বলেন, সরকারি ত্রাণ জনগণের টাকায় কেনা। সেই ত্রাণ সাধারণ জনগণ পাচ্ছে না। ত্রাণের চাল তেল ডাল পাওয়া যাচ্ছে আওয়ামী লীগের মেম্বার চেয়ারম্যানের বাড়িতে। মহামারীর মধ্যে শুরু হয়েছে চাল ডাল চোরদের উৎসব।
রিজভী বলেন, মহামারীর মধ্যে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করা হচ্ছে, মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কুষ্টিয়ায় একজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সরকার মনে করছে বিএনপি যেভাবে মানুষের সহযোগিতায় এগিয়ে আসছে, ত্রাণ বিতরণ করছে, তাতে তাদের মুখ আর থাকছে না। এদিকে সরকারি দলের লোকেরা ত্রাণ চুরি করছে। আর বিএনপির লোকেরা পকেটের টাকায় ত্রাণ দিচ্ছে। এজন্য সরকার জুলুমের পথ বেছে নিয়েছে। তারা যতই গ্রেপ্তার করুক আমরা এই মহামারীতে মানুষের পাশে আছি এবং থাকব।

টাস্কফোর্সের নামে ‘বিভ্রান্তির ভাইরাস’
ছড়াচ্ছে বিএনপি: কাদের
করোনা ভাইরাস চিকিৎসায় দেশের ভিআইপিদের জন্য বিশেষ হাসপাতাল তৈরির বিষয়টিকে স্রেফ গুজব বলে জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ২৪ এপ্রিল সংসদ ভবন এলাকার সরকারি বাসভবন থেকে অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি। করোনা প্রতিরোধে বিএনপি জাতীয় টাস্কফোর্স বা জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার নামে ‘বিভ্রান্তির ভাইরাস’ ছড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী কাদের।
তিনি বলেন, চিকিৎসাক্ষেত্রে ভিআইপিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে একটি মহল প্রচারণা চালাচ্ছে। ভিআইপিদের জন্য আলাদা হাসপাতাল তৈরির বিষয়টি স্রেফ গুজব। আমি যতটুকু জানি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ধরনের কোনো প্রস্তাবে সমর্থন দেননি। রোগীকে রোগী হিসেবে দেখব, এখানে ধনী-দরিদ্র, বিত্তবান-বিত্তহীনের কোনো বিষয় নেই। কারণ করোনা দলমত-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে কাউকে ছাড় দেবেÑ এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই।
ওবায়দুল কাদের বলেন, আমাদের দেশে কেউ কেউ করোনা প্রতিরোধে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান করেছেন। কিন্তু সারা দুনিয়ায় করোনা প্রতিরোধে কোথাও টাস্কফোর্স দলীয়ভাবে বা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গড়ে তোলার কোনো নজির নেই। এ সময়ে যার যার দায়িত্ব সতর্কতার সঙ্গে পালন করা দায়িত্বশীলতার পরিচয়। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের প্রয়োজন রয়েছে। ভালো পরামর্শ কোনো রাজনৈতিক দল যদি সরকারকে দেয়, তাহলে অবশ্যই করোনা প্রতিরোধের জন্য সেই ভালো পরামর্শ সরকার সানন্দে গ্রহণ করবে।
ওবায়দুল কাদের বলেন, করোনা প্রতিরোধে জাতীয় টাস্কফোর্স বা জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলাার নামে বিএনপি অহেতুক বিভ্রান্তির ভাইরাস ছড়াচ্ছে। অদৃশ্য শক্তিকে মোকাবিলা করার জন্য আজকে যার যার দায়িত্ব পালন করা উচিত। প্রত্যেকেরই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য।