প্রতিবেদন

করোনা মোকাবিলায় এগিয়ে আসছে বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ ও প্রতিষ্ঠান : ৫ হাজার শয্যার হাসপাতাল তৈরির প্রস্তাব বসুন্ধরার

বিশেষ প্রতিবেদক
বিশ্বে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণঘাতী নোভেল করোনা ভাইরাস। ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশেও। সঙ্কটময় এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পাশাপাশি মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন বেসরকারি শিল্প গ্রুপ, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা। ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে ও পরিস্থিতি মোকাবেলায় নগদ অর্থ, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা উপকরণ, ওষুধ, থার্মাল স্ক্যানার, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী ও মাস্ক সরবরাহ করছে তারা। মানুষকে সচেতন করতে বিভিন্ন পরামর্শের পাশাপশি অনেকে দিচ্ছে আর্থিক সহায়তা। সঙ্কট মোকাবেলায় নেয়া হচ্ছে বিশেষ উদ্যোগ। এর মধ্যে করোনা ভাইরাসের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ৫ হাজার শয্যার হাসপাতাল তৈরি করার প্রস্তাব সরকারের কাছে দিয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপ।
জানা গেছে, করোনা ভাইরাসের কারণে দেশে এই মুহূর্তে সাধারণ ছুটি চলছে। করোনা প্রাদুর্ভাবের আগে থেকেই নানামুখী সমস্যার মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকের রপ্তানি এখন নিম্নমুখী। ঘাটতি কাটাতে পারছে না রাজস্ব খাত। কিন্তু অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিটেন্সের ঊর্ধŸগতি থাকলেও নোভেল করোনা ভাইরাস সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে। এখন পর্যন্ত আক্রান্তের হার কম হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে করোনার বড় আঘাত এসেছে অনেক আগেই। পুরোপুরি স্থবির হয়ে গেছে দেশের শীর্ষ আমদানি, রপ্তানি ও রেমিটেন্সের বাজারগুলো। প্রতিনিয়ত বাতিল হচ্ছে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি আদেশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা ভাইরাসের মতো মহামারী সরকারের একার পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবেই এগিয়ে এসেছেন অনেকে। পাশাপাশি অন্যদেরও সাধ্যমতো এগিয়ে আসা দরকার।

বসুন্ধরা গ্রুপ
করোনা ভাইরাসের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের কাছে ৫ হাজার শয্যার হাসাপাতাল তৈরি করার প্রস্তাব দিয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপ। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীর এ প্রস্তাব দেন। এর আগে তিনি প্রধানমন্ত্রীর করোনা মোকাবিলা তহবিলে ১০ কোটি টাকার চেক হস্তান্তর করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে দেয়া বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের লিখিত প্রস্তাবে বলা হয়, রাজধানীর কুড়িলে বসুন্ধরার চারটি কনভেনশন সেন্টার ও একটি ট্রেড সেন্টারকে ৫ হাজার শয্যার হাসপাতালে রূপান্তরিত করা হবে। এছাড়া বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান ঢাকা সিটির চারটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের কাছে গরিবদের মধ্যে নিয়মিত খাবার বিতরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন।
বেক্সিমকো
বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারীর দরুন ব্যাপক প্রাণহানি ঘটছে ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর অত্যধিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে যে সকল স্বাস্থ্যসেবা কর্মী সরাসরি কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের সেবায় নিয়োজিত আছেন, তাদের সুরক্ষায় পিপিই (পারসোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট), ওষুধ ও টেস্ট কিট সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্পোরেট খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো গ্রুপ। বেক্সিমকো গ্রুপের ফার্মাসিউটিক্যাল বিভাগ বেক্সিমকো ফার্মা ইতোমধ্যেই দেশজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের মধ্যে এসব উপকরণ বিতরণ করা শুরু করেছে। বেক্সিমকো ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান এমপি ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত অনাড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্র ও কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় সরকার নির্ধারিত হাসপাতালগুলোর প্রতিনিধিদের কাছে প্রথম ধাপের উপকরণ
হস্তান্তর করেন। এই উদ্যোগে সহায়তা দিতে বেক্সিমকো গ্রুপ ১৫ কোটি টাকা বা ১.৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদান করেছে।

সামিট গ্রুপ
বিদেশফেরত যাত্রীদের হেলথ স্ক্রিনিং করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পাঁচটি থার্মাল স্ক্যানার দিয়েছে সামিট গ্রুপ। সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান বলেন, এই সঙ্কটের সময় বিশ্বমানের থার্মাল স্ক্যানারগুলো সরবরাহের মাধ্যমে দেশ সেবার সুযোগ পাওয়ায় আমরা কৃতজ্ঞ। সরকার চাইলে আরও সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আমরা।

বিজিএমইএ
করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকারকে এক লাখ পিস মাস্ক দিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। সংগঠনটির সভাপতি রুবানা হক জানান, সাধারণ মানুষের সচেতনতা এবং সুরক্ষার জন্য আমরা সরকারকে এক লাখ পিস মাস্ক দিয়েছি। তিনি বলেন, কারখানার মালিকরা পর্যাপ্ত মাস্ক তৈরি করে বিভিন্ন স্থানে বিনামূল্যে সরবরাহ করছেন। রুবানা হক বলেন, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে দু-একদিনের মধ্যেই পারসোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) সরকারের কাছে
হস্তান্তর করবে বিজিএমইএ।

আরএফএল
করোনা ভাইরাস বিস্তার রোধে নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে দেশের অন্যতম বড় শিল্প গ্রুপ প্রাণ-আরএফএল। সরকারকে বিভিন্ন সহযোগিতার পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করছে এই শিল্প প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে বিনামূল্যে বিতরণ করছে করোনা প্রতিরোধের আনুষঙ্গিক পণ্য। ইতোমধ্যে ৩ হাসপাতালে মাস্ক-হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়েছে গ্রুপটি। হাসপাতাল তিনটি হলোÑ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল এবং হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
জানতে চাইলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ শুরু থেকেই মানুষকে সচেতন করতে কাজ করছে। আমাদের বিভিন্ন স্টেক হোল্ডার, কর্মী, জরুরি ভিত্তিতে যারা মাঠে কাজ করছেন এমন লোকদের মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক উপকরণ দিচ্ছি। এছাড়া করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা সংগঠনকে আমরা প্রয়োজনীয় সহায়তা করছি।

ব্র্যাক
নোভেল করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে এগিয়ে এসেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ব্র্যাক’। এ বিষয়ে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, কোভিড-১৯ এর ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্র্যাক অতি দ্রুততার সমর্থ বৃদ্ধির সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। লাখ লাখ মানুষের কাছে স্বাস্থ্যবার্তা পৌঁছে দেয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে মাস্ক তৈরি করতে শুরু করেছি। এখন আমরা দেশেই পিপিই বা সুরক্ষা পোশাক তৈরির বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। তিনি বলেন, আমাদের ৪৫ হাজার স্টাফ, ৫০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী সারাদেশে কমিউনিটি লেভেলে কাজ করবে। পাশাপাশি ডিজিটাল মিডিয়ার মাধ্যমেও একটা ক্যাম্পেনে যাচ্ছি। এখন শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না, সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে। তিনি জানান, ব্র্যাক তার ঋণ কর্মসূচীর কিস্তি জমাদান ২৪ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিত রেখেছে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও সংক্রমণ মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবার্তা ও সাবানসহ অন্য উপকরণ বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্যাকেট তরল সাবান, স্যানিটাইজার ও সাবান বিতরণ, সিটি করপোরেশনগুলোর সহযোগিতায় শহরের বিভিন্ন বস্তি এলাকা এবং জনসমাগমস্থলে হাত ধোয়ার সুবিধা ও গণপরিবহনে জীবাণুনাশক প্রয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

স্কয়ার
করোনা ভাইরাসের প্রকোপ মোকাবেলায় দেশের ডাক্তার ও নার্সদের জন্য ১০ হাজার পার্সোনাল প্রটেকশন ইক্যুইপমেন্ট (পিপিই) দিয়েছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কাছে ১০ হাজার পিপিই হস্তান্তর করে প্রতিষ্ঠানটি। কোম্পানিটি জানায়, পিপিইগুলো দেশেই তৈরি করা হয়েছে।
এদিকে, জাতীয় এ দুর্যোগে প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এগিয়ে এসেছে বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠন। সঙ্কটময় সময়ে করোনা শনাক্তের কিট কিনতে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট এ্যান্ড হাউজিং এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব)। সংগঠনটির সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন কাজল জানিয়েছেন, সরকারকে আর্থিক সহায়তা হিসেবে কিট কেনার জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে ২৫ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। দেশের এ পরিস্থিতিতে সরকারের পাশে থেকে সহায়তা করা জরুরি। যারা এগিয়ে এসেছে তাদের ধন্যবাদ দিচ্ছি পাশাপাশি অন্যরাও সাধ্যমতো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে এটাই প্রত্যাশা করছি।