প্রতিবেদন

ক্রমেই ভেঙে পড়ছে সামাজিক দূরত্ব অপ্রয়োজনেও রাস্তায় মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ এপ্রিল প্রথম রোজা। ২৪ এপ্রিল ছিল রোজা শুরুর আগের দিন। রোজার কেনাকাটা করতে গিয়ে তাই ২৪ এপ্রিল দেশের বাজার-হাটে বেশ ভিড় করে মানুষ। রোজার নিত্যপণ্যের পাশাপাশি মাছ-মাংস ও সবজি কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সবাই। এ সময় সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা হয়নি। একে অন্যের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে কেনাকাটা করেছে। ক্রেতাদের মাস্ক পরতে দেখা গেলেও বিক্রেতাদের বেশিরভাগই ছিলেন মাস্ক ছাড়া। যেসব বাজার একমুখী করে দেয়া হয়েছে, সেখানে বের হতে ও প্রবেশ করতে ক্রেতাদের কোনো দূরত্বই রক্ষা করতে দেখা যায়নি।
সবচেয়ে বেশি ভিড় ছিল সুপার শপগুলোতে। শপের ভেতর ও বাইরে উপচেপড়া ভিড় নিয়ে কেনাকাটা করেছে মানুষ। শপগুলোতে ক্রেতাদের লম্বা লাইন মূল সড়কেও চলে আসতে দেখা গেছে। শপের সামনে বৃত্তাকার দাগ মানা হলেও নিচে সড়কে চলে আসা লাইনে শারীরিক দূরত্ব রক্ষা করা হয়নি।
কেনাকাটার জন্য এ সময় মানুষকে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। ক্রেতাদের কেন্দ্র করে এসব শপের সামনে ভিড় ছিল ভিক্ষুকদের। সাহায্য পাওয়ার আশায় এসব দরিদ্র মানুষ জটলা করেছিল।
এমন পরিস্থিতিকে করোনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কিছু কিছু এলাকায় বাজার খোলা মাঠে বা রাস্তায় নিয়ে এলেও মনিটরিং না থাকায় সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা যাচ্ছে না। তাছাড়া যেসব বাজার একমুখী করে দেয়া হয়েছে, সেখানে ঢুকতে ও বের হতে নতুন করে করোনা সংক্রমণের শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। তারা বলেন, করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে হলে অবশ্যই সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করতে হবে এবং ক্রেতা-বিক্রেতা সবাইকে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। বাজারগুলো করোনার সংক্রমণে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মনিরা পারভীন স্বদেশ খবরকে বলেন, কোনোভাবেই সামাজিক দূরত্ব লঙ্ঘন করা যাবে না। করোনা থেকে রক্ষা পেতে আমাদের সামনে এখন একটাই পথ দূরত্ব রক্ষা করা ও সুরক্ষা সরঞ্জামাদি ব্যবহার করা। কীভাবে এ মাসে মানুষ বাজার করবে, হাটবাজারে যাবে, সেখানে কীভাবে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা পাবে, সে ব্যাপারে বিবেচনা করা উচিত।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, রমজানে মানুষ একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠে। এজন্য তাদের বাজার করতে যেতে একটু দেরি হয়। তাই বিষয়টি বিবেচনা করে দোকান খোলা ও বন্ধ করার সময় বাড়ানো যেতে পারে। এছাড়া ইফতারি বিক্রির বিষয়েও একটি নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। যদি প্রতিদিন সকাল ৬টার পরিবর্তে ৯টায় দোকান খুলে ২টার পরিবর্তে ৬টায় বন্ধ করা হয় তাহলে সবার জন্যই ভালো হবে।
এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, আরেকটা বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন।রাজধানীবাসীর বড় একটি অংশের ইফতারি কিনতে হয়। তাই কীভাবে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সবার জন্য ইফতারির ব্যবস্থা করা যায় সে বিষয়েও সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।
২৪ এপ্রিলেও দেশে এক দিনে করোনা সংক্রমণের নতুন রেকর্ড হয়েছে এবং প্রথমবারের মতো আক্রান্তের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৫০৪ জন আক্রান্ত হয়েছে। এর আগে এক দিনে সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল গত ২০ এপ্রিল ৪৯২ জন।
সামাজিক দূরত্ব রক্ষার মাধ্যমে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে গত ১২ এপ্রিল দেশের সব হাটবাজার খোলা জায়গায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। একইভাবে সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হাটবাজার খোলা রাখার সময়সীমা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এদিকে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে রমজানে রাস্তায় কোনো ধরনের ইফতারসামগ্রী তৈরি ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ত্রাণ বিতরণ অথবা ইফতারসামগ্রী বিতরণের নামে জনসমাগম যেন না করে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তবে ত্রাণ বিতরণে তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে হবে। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।
ইতোমধ্যেই রাজধানীসহ দেশের বেশিরভাগ এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার সরিয়ে মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গায় বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। তবে ঢাকার বাইরে জেলা শহর ও সদর এলাকার কিছু বাজার খোলা জায়গায় বসানো হলেও উপজেলা ও গ্রামের বাজার এবং হাটগুলো আগের স্থানেই রয়েছে। অন্যদিকে রাজধানীর দুই সিটির তালিকাভুক্ত প্রায় ২৮টি বড় কাঁচাবাজারের মধ্যে ১৪-১৫টি বাজার সরিয়ে উন্মুক্ত স্থানে নেয়া সম্ভব হয়েছে। অন্যসব বাজারের ব্যবসায়ীরা খোলা জায়গায় যেতে রাজি হচ্ছেন না।
খোলা জায়গায় বাজার এনেও সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করতে দেখা যাচ্ছে না মানুষকে। বিশেষ করে রোজার কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে এসব বাজারে ভিড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লঙ্ঘিত হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব। বিশেষ করে রাজধানীর যেসব বাজারকে একমুখী করে দেয়া হয়েছে, সেখানে বের হতে ও প্রবেশ করতে ক্রেতাদের ঠেলাঠেলি করতে দেখা গেছে। এছাড়া মাছ-মাংস ও সবজির দোকানে গায়ের সঙ্গে গা ঘেঁষেই কেনাকাটা করছে মানুষ।
একইভাবে রাজধানীর বাইরে শুধু জেলা শহরের বাজারগুলোকেই খোলা জায়গায় আনা হয়েছে। এসব বাজারের সংখ্যা খুবই কম। উপজেলা ও গ্রামের বাজার এবং ছোট-বড় হাটগুলো আগের মতোই রয়েছে। ফলে সেখানে আগের মতোই সামাজিক দূরত্ব রক্ষা পাচ্ছে না।
রোজার সময়ও বাজারগুলোতে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়ায় ভিড় বেশি হচ্ছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, রমজান মাসে মানুষ কেনাকাটা করে দুপুরের পর। ওই সময় দোকানপাট বন্ধ থাকলে একদিকে ক্রেতারা নিত্যপণ্য কেনাকাটা করতে পারবেন না, অন্যদিকে ক্ষতির মুখে পড়বেন ব্যবসায়ীরা। নির্দিষ্ট সময়ে দোকান খোলা থাকলে ওই সময় মানুষ কেনাকাটা করতে ভিড় করেন। এতে করে করোনারোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয় না। যদি দীর্ঘ সময় দোকান খোলা থাকে তাহলে ক্রেতারা সুবিধামতো সময়ে কেনাকাটা করতে পারবেন। এতে বাজার কিংবা দোকানে ভিড় কম হবে। এছাড়া রমজান মাসে ইফতারি বিক্রির বিষয়টি বিবেচনা নিয়ে সারাদিন খোলা রাখা প্রয়োজন। তা না হলেও মুদি ও খাদ্যপণ্যের দোকান খোলা রাখার সময় বাড়ানো উচিত।

অপ্রয়োজনেও রাস্তায় মানুষ
প্রথম রোজার আগের দিন রাজধানীর খিলগাঁও থানাধীন সিপাহীবাগ টেম্পুস্ট্যান্ড এলাকার চারদিকে মানুষ আর মানুষ। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায়। কেউ দোকানে কেনাকাটা করছে, কেউ দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে, কেউ আবার চা-সিগারেট খাচ্ছে। অধিকাংশের মুখে মাস্ক পর্যন্ত নেই। অথচ করোনা সংক্রমণের ঝুঁকির কারণে এলাকাটিতে ‘লকডাউন’ চলছে।
হঠাৎ সেনাবাহিনীর তিনটি গাড়ি এলাকায় গিয়ে অপ্রয়োজনে রাস্তায় ঘোরাফেরা না করার জন্য মাইকিং করে। সেনাবাহিনীর গাড়ি দেখে কিছু মানুষ রাস্তা থেকে সরে যায়। সেনাবাহিনী চলে যেতে আবার যেই সেই অবস্থা।
স্থানীয় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক আলতাফ হোসেন হাওলাদার আক্ষেপ করে বলেন, দেখেন এত মানুষ সবাই কী প্রয়োজনে বের হয়েছে? একে অন্যের সঙ্গে ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়াচ্ছে, হাঁটছে। কারও কারও মুখে মাস্ক পর্যন্ত নেই। করোনায় আমরা মরব না তো কারা মরব।
সিপাহীবাগ টেম্পুস্ট্যান্ডের মতো একই অবস্থা খিলগাঁও রেলগেট, তিলপাপাড়া, খিলগাঁও কাঁচাবাজার, মাদারটেক এলাকায়ও। তবে যখনই পুলিশ বা সেনাবাহিনীর গাড়ি দেখছে লোকজন সরে পড়ছে। পুলিশ বা সেনাসদস্যরা সরে যেতেই আবার রাস্তায় আসছে মানুষ।
পুলিশের আইজি বেনজীর আহমেদ দায়িত্ব নেয়ার পরই দেশবাসীকে সতর্ক করে বলেছিলেন ‘ঘরে থাকবেন, না-কি কবরে থাকবেন’ আপনারাই সিদ্ধান্ত নেবেন। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে সরকার নির্দেশিত সামাজিক দূরত্ব অর্থাৎ ঘরে থাকার বিষয়ে জনসাধারণকে সতর্ক করে তিনি বলেন, সরকার নির্দেশিত সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা নাগরিক দায়িত্ব। এটি বাস্তবায়নে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বলপ্রয়োগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিজেকে, পরিবারকে ও দেশকে রক্ষার স্বার্থে নিজেদের শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করা। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার এ কথা বলা সত্ত্বেও অনেকেই তা লঙ্ঘন করছেন। এখন বলব, আপনি ঘরে থাকবেন, না-কি কবরে যাবেন, এই সিদ্ধান্তটা আপনার। সবাই ঘরে থাকবেন আর কেউ কেউ বাইরে থাকবেন এটা হতে দেয়া হবে না। ন্যূনতম প্রয়োজনে বাইরে যাওয়া, আড্ডা দেয়া, অনর্থক ঘোরাঘুরি থেকে সবাইকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানান বেনজীর আহমেদ।
পুলিশ বা সরকারের পক্ষ থেকে যতই নির্দেশনা দেয়া হোক, কিছু মানুষ কোনোভাবেই সেগুলো মানছে না। অপ্রয়োজনে ঘোরাফেরা করায় ও ঘরের বাইরে থাকার বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত রাজধানীতে চলছে মোবাইল কোর্ট। নাগরিকদের করা হচ্ছে জরিমানা। দেয়া হচ্ছে কান ধরে উঠবস করাসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তি। কিন্তু একশ্রেণির মানুষ এসবে কোনো কথাই শুনছে না।
তবে রাজধানীর গুলশান, ধানমন্ডি, বনানী, মহাখালী, নয়াপল্টন, সেগুবাগিচাসহ কিছু এলাকায় মানুষ অপ্রয়োজনে খুবই কম বের হচ্ছে। তার তুলনায় খিলগাঁও, মাদারটেক, মান্ডা, নন্দীপাড়া, যাত্রাবাড়ী, মাতুয়াইল, জুরাইন, কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, হাজারীবাগ, উত্তরখান, দক্ষিণখান, বাড্ডার কিছু এলাকায় মানুষ অপ্রয়োজনে রাস্তায় ঘুরছে।
নগরীতে মানুষজনের অপ্রয়োজনে বের হওয়া ও আড্ডা দেয়া প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান স্বদেশ খবরকে বলেন, আমরা বরাবরই বলে আসছি অপ্রয়োজনে রাস্তায় নয়। ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলুন। এরপরও অনেকে সেটা মানছে না। সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটিতে অকারণে ঘোরাফেরা নিয়ন্ত্রণ করতে ডিএমপি রাজধানীজুড়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। প্রতিদিনই ডিএমপির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মামলা ও জরিমানা করছেন। সাধারণ মানুষ সচেতন না হলে আইন প্রয়োগ করে তাদের ঘরে রাখা সম্ভব নয়।