রাজনীতি

খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সুর বেজে উঠছে বিএনপিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে ৬ মাসের জন্য যে জামিন পেয়েছেন, তার প্রায় অর্ধেক সময় শেষ হয়েছে। ২৫ মার্চ খালেদা জিয়া জামিন পান। এর পরদিনই করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে দেশ কার্যত লকডাউনে চলে যায়। বয়োবৃদ্ধ খালেদা জিয়াও নিজ বাসা ফিরোজায় কোয়ারেন্টিনে চলে যান। দীর্ঘ জেলজীবনের পর খালেদা জিয়া এখন আছেন দীর্ঘ কোয়ারেন্টিনে।
খালেদা জিয়ার মুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্য অনেক শর্তের মধ্যে অন্যতম শর্ত ছিল, তাঁকে দেশেই অবস্থান করতে হবে। চিকিৎসার জন্য তাঁকে দেশের কোনো হাসপাতালের শরণাপন্ন হতে হবে। কোনো অবস্থাতেই তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে পারবেন না।
তবে জামিনাবস্থায় দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে কোয়ারেন্টিনে থাকার পর খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সুর শুনা যাচ্ছে। কোয়ারেন্টিনে থাকাবস্থায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। শিমুল বিশ্বাসও কথা বলেছেন খালেদা জিয়ার সঙ্গে। স্থায়ী কমিটির আরো কিছু সদস্যের সঙ্গেও খালেদা জিয়ার কথা হয়েছে। যদিও খালেদা জিয়ার সঙ্গে ওই নেতাদের কী কথা হয়েছে, তা মিডিয়ায় প্রকাশ করা হয়নি। তবে এখন ধারনা করা হচ্ছে, চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েই আলোচনা হয়েছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারামুক্ত হওয়ার পর গত দুই মাসে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন। তবে তার ডায়াবেটিস পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের চিকিৎসায় গঠিত টিমের প্রধান দলের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
সম্প্রতি এই চিকিৎসক নেতা বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের চিকিৎসার ব্যাপারে লন্ডন থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান। তার নির্দেশনায় দলের চিকিৎসকরা চেয়ারপারসনকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, বিগত দিনে চেয়ারপারসন দেশের বাইরে চিকিৎসা নিয়েছেন। এখন পুরোপুরি সুস্থ হতে হলে তাকে দেশের বাইরে যেতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। প্রয়োজনে আদালতের নির্দেশনা নিতে হবে।
গত ২৫ মার্চ সরকারের নির্বাহী আদেশে ৬ মাসের জন্য শর্তসাপেক্ষে জামিনে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। কারামুক্তির প্রায় দুই মাসের মাথায় রোজার ঈদের দিন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ জ্যেষ্ঠ কয়েক নেতাকে সাক্ষাৎ দেন তিনি। করোনা পরিস্থিতির কারণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ওই সাক্ষাৎ শেষে বিএনপি মহাসচিব বলেছিলেন, উন্নতি যেটুকু হয়েছে, তা হচ্ছে তার মানসিক অবস্থা আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। শারীরিক অবস্থার খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।
মির্জা ফখরুলসহ সেদিন খালেদা জিয়ার সঙ্গে আরও যারা সাক্ষাৎ করেছিলেন তারা হলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেদিন বিছানায় বসে নয়, চেয়ারে বসে নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন খালেদা জিয়া। চেয়ারপারসনের সঙ্গে বেশিরভাগ কথা হয় করোনা ভাইরাস ও দেশবাসী কেমন আছে তা নিয়ে। চেয়ারপারসন কমই বলেছেন, শুনেছেন বেশি। পরিবারের মাঝে থাকায় তার মানসিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে ধীরে ধীরে। করোনা পরিস্থিতিতে দলের নেতাদের দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন খালেদা জিয়া।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, শারীরিক অবস্থার চেয়ে মানসিকভাবে শক্তিশালী আছেন খালেদা জিয়া। সাক্ষাতে খালেদা জিয়া তাদের জানিয়েছেন, তার কাছে যে কয়েকটি পত্রিকা যেত তা তিনি বিস্তারিত পড়তেন। একই সংবাদ পাঁচবারও পড়েছেন। দলের নেতারা কে কী করেছেন তা তার জানা আছে।
খালেদা জিয়ার ছোটভাই শামীম ইস্কান্দার পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে নির্বাহী আদেশে তার মুক্তি চেয়ে আবেদন করেছিলেন গত ১০ মার্চ। এরপর ২৫ মার্চ সরকারের নির্বাহী আদেশে ৬ মাসের জন্য মুক্তি পান তিনি। মুক্তির পর তার বোন সেলিমা ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, পরিবারের আবেদনের পাশাপাশি করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি তার মুক্তির বিষয়টি ত্বরান্বিত করেছে বলে তারা মনে করেন।
ফলে খালেদা জিয়া করোনা ভাইরাসের কারণে নিজ বাসা ফিরোজায় কোয়ারেন্টিনে চলে যান। কোয়ারেন্টিনে থাকাবস্থায় দলের নেতাদের সাক্ষাৎ না দিলেও মুক্ত খালেদা জিয়া লন্ডনে তার পুত্রের সঙ্গে টেলিফোনে সার্বক্ষণিক যোগাযোগই রাখেন। দল ও নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে মাতা-পুত্রের প্রতি দিনই কথা চলতে থাকে।
বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে. তারেক রহমান ও তার চিকিৎসক স্ত্রী জোবায়দা রহমানের পরামর্শেই খালেদা জিয়া লন্ডনে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়তে সম্মত হন। কিন্তু দেশ ছাড়তে হলে খালেদা জিয়ার জন্য সরকারের আরেকটি নির্বাহী আদেশ বা আদালতের অনুমতি লাগবে। সে ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া কোন প্রক্রিয়ায় এগোবেন, তা নিয়েই দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে। আর এভাবেই বিএনপি শিবিরে চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার বিদেশে যাওয়ার সুর বেজে উঠছে।