আন্তর্জাতিক

জাতিসংঘ: চালকের আসনে চীন

স্বদেশ খবর ডেস্ক
করোনা ভাইরাস নিয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাকে (ডব্লিউএইচও) চীনের পক্ষপাতিত্ব করার অভিযোগ তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপর তিনি ডব্লিউএইচওতে যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল স্থগিত করে দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কৌশলগতভাবে চীন জাতিসংঘে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে। কয়েক বছর ধরেই জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার উঁচু থেকে নিচু পদের বিভিন্ন জায়গায় চীনা নাগরিকরা চাকরি পেয়েছেন। অথবা অন্যভাবে বললে, জাতিসংঘের অভ্যন্তরে এশিয়ার ক্ষমতাধরদের আধিপত্য বাড়ছে। এই প্ল্যাটফর্ম থেকেই আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও সেনা-সম্পর্ক রক্ষা করা হয়। চীন তাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে বিশেষত আফ্রিকায় গত কয়েক বছরে বেশ আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছে। গত ১০ বছর আগেও ওই মহাদেশের ঋণ ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ অর্থনীতির দেশের তুলনায় কম। জাতিসংঘের এক হিসাব মতে, আফ্রিকায় চীন ১৪০ বিলিয়ন ডলারের মতো বিনিয়োগ করেছে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের নামে। বৈশ্বিক পর্যায়ে আফ্রিকার বিভিন্ন ইস্যু সমাধানেও সাহায্য করছে চীন।
আফ্রিকার সমর্থন চীনের প্রতি যাওয়ায় জাতিসংঘের অনেক সংস্থাও স্বাভাবিকভাবে শি চিনপিংমুখো হয়েছে। এজন্যই ডব্লিউএইচও প্রধান ইথিওপিয়ার নাগরিক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়াসিস দোষারোপ করে ওয়াশিংটন প্রশাসন জানায়, ভাইরাসটি মানুষের মধ্যে ছড়ায় না এমন বক্তব্য চীনের হয়ে সমর্থন ও প্রকাশ করেছিলেন তেদ্রোস নিজে। আর তার কারণেই করোনা নিয়ে চীনের ভুল স্বচ্ছতা প্রশংসিত হচ্ছে।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ইনস্টিটিউট ফর সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র গবেষক অ্যালিস একম্যানের মতে, ‘২০১২ সাল থেকেই শি চিনপিং বৈশ্বিক ব্যবস্থায় কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করেন। এটা খুব স্পষ্ট যে, চীন তখন থেকেই তার উচ্চাকাক্সক্ষা মাফিক এই পুনর্গঠনকে চালিত করার কথা বলে আসছে। এই পুনর্গঠনেরই একটি অংশ জাতিসংঘ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পিঠটান ও চীনের প্রবেশ।’
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের সংখ্যা যত বেড়েছে চীন তত আর্থিক সহায়তা বাড়িয়েছে। ফলে জাতিসংঘে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে জাপানকে টপকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে চীন। দেশটির কর্মকর্তারা কৌশলের অংশ হিসেবে নিজেদের বিভিন্ন সংস্থার সদর দপ্তর তৈরি করেছে বিদেশের মাটিতে। ইউনেস্কোতেও ভালো প্রভাব পেইচিংয়ের।
সারা বিশ্বে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা কাজ করছেন। এদের মধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব বিস্তারকারী প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার ফলে সংস্থার মধ্যে এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়। লিসবনের নোভা ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ক্যাটিয়া বাতিস্তার মতে, ‘যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিকভাবে আর নেতৃত্ব দিচ্ছে না। ইউরোপ নিজের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। আর চীন তার নিজের স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছে। আর এটাই হবে বেশ চিন্তার কারণ।’
রোমের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (এফএও) এবং মন্ট্রিলভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনেও (আইসিএও) প্রভাব বিস্তার করেছে চীন। ২০১৯ সালে সাবেক চীনা মন্ত্রী ক্যু দংগিও এফএও’র প্রধান হন আর ২০১৫ সাল থেকেই আইসিএও’র দখল আরেক চীনা কর্মকর্তা ফ্যাং লুইয়ের হাতে।
ভিয়েনাতে অধিকাংশ পশ্চিমা শক্তিই জাতিসংঘের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের প্রতি আগ্রহ দেখায়নি। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চীন ইউএনআইডিতে প্রবেশ করে। ২০১৩ সাল থেকেই সংস্থাটির নির্বাহী প্রধান সাবেক চীনা মন্ত্রী লী ইয়ং। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে বের হয়ে গিয়েও প্রভাব ঠিকই তাদের হাতে রেখেছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। চীন এখন রাশিয়া ও ইইউকে নিয়ে চালকের আসনে।