কলাম

জীবিকার চেয়ে জীবন বড়

মোহাম্মদ শাহজাহান
দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বেশ দ্রুত গতিতেই বেড়ে চলছে। ঊর্ধ্বমুখী এই প্রবণতা হয়তো বজায় থাকবে আরো কিছুদিন। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে যখন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশি, তখনই সেটা আরো ঢিলেঢালা হয়ে গেল। ২৬ এপ্রিল থেকে পোশাক কারখানা খুলে দেয়া হয়েছে। অন্য কারখানাগুলোও খুলতে শুরু করেছে। ১০ মে থেকে (সকাল ১০টা-বিকেল ৪টা পর্যন্ত) শপিংমল, দোকানপাটে ঈদের কেনাকাটা শুরু হয়েছে। শর্তসাপেক্ষে ৭ মে থেকে মুসল্লিরা মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত এবং রমজানের তারাবির নামাজ আদায় করছেন। এখন আরো ২ ঘণ্টা বাড়িয়ে সকাল ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ঘরের বাইরে চলাফেরা করা যাবে। ২৬ মার্চ থেকে দেড় মাস ধরে দেশে ছুটির নামে কার্যত লকডাউন (অবরুদ্ধ থাকা) চলছে। এরই মধ্যে করোনা দেশের ৬৪ জেলায় সংক্রমিত হয়ে গেছে। তবে দোকান-শপিনংমল খোলার আগেই রাস্তায় মানুষের সমাগম বেড়েছে। দোকান খোলার খবর শুনে মালিক-কর্মচারী গ্রাম থেকে শহরে ফিরতে শুরু করেছেন।
৫ মে আমাদের মিতভাষী স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক বলেছেন, ‘গার্মেন্টস, মার্কেট, শপিংমল, দোকাপাট খোলা হয়েছে, কাজেই সংক্রমণ যে বাড়বে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।’ দোকান মালিকেরা বলছেন, করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয় নিয়ে জীবিকার তাগিদে দোকান খুলতে হচ্ছে। দোকান মালিক সমিতির একজন নেতা বলেন, ‘ঘরে বসে তো বাঁচা যাবে না। বিদেশেও বিপণি বিতান চালু আছে। এতদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদারকির সময়েও মানুষ ঘরের চেয়ে বাইরে আড্ডা দেয়াটাই বেশি পছন্দ করেছে। তবে শিবচর, ঢাকার মিরপুরের একটি এলাকাসহ যেখানে মানুষ সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার চেষ্টা করেছে, সেসব স্থানে ভাইরাস খুব বেশি সংক্রমণ ছড়াতে পারেনি। সরকার সবকিছু শিথিল করে দেয়ার পর ৬ মে থেকেই রাস্তায় মানুষ নেমে পড়েছে। পাড়ায়-মহল্লায় বন্ধ থাকা দোকান খুলে গেছে। কাজে যোগ দিতে মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হতে শুরু করেছে। সাধারণত আমরা জানি, মানুষ যে হিংস্র প্রাণীকে ভয় পায়, যেমন বিষাক্ত সাপ, বিচ্ছু, বাঘ, পাগলা কুকুর ইত্যাদিÑ সেসব জীবজন্তু থেকে দূরে থাকে। এখন মানুষ করোনাকে ভয় পাচ্ছে, কিন্তু এর সংক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকার ব্যাপারে একেবারে উদাসীন। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু অমানবিক ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে। করোনা সন্দেহে মাকে রাস্তায় ফেলে রেখে সন্তান চলে গেছে। মৃতের লাশ পড়ে আছেÑ মানুষ ধারে কাছে যায় না। ৬ মে বিবিসির প্রবাহ অনুষ্ঠানে বলা হয়, খিলগাঁও কবরস্থানে একজনকে দাফন করা হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে পুরো কবর ভর্তি ছিল। একদিকে স্বজনরা নেই। অন্যদিকে উপস্থিত লোকজন ঐ পানিভর্তি কবরেই মৃত মানুষটিকে রেখে এসেছে। কি করুণ দৃশ্য! অথচ করোনার ছোবল থেকে বাঁচার জন্য মানুষের তেমন জোর কোনো প্রচেষ্টা নেই বললেই চলে। করোনা থেকে নিরাপদ থাকার প্রথম ও প্রধান উপায় সামাজিক দূরত্ব তথা শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করা। সাধারণ ছুটি বা লকডাউনের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে মূলত সামাজিক দূরত্ব বাড়ানোর জন্য, মানুষের সমাবেশ বন্ধ করার জন্য। একটাই উদ্দেশ্যÑ এক মানুষের শরীর থেকে করোনা ভাইরাস যেন হাঁচি-কাশির মাধ্যমে অন্যের শরীরে না ছড়ায়। দোকানপাট খোলার পর থেকে ঢাকা শহর দেখে কারো মনেই হবে না যে, দেশে সাধারণ ছুটি চলছে।
করোনা পরীক্ষার ব্যাপারে শুরুতে আমরা খুবই পিছিয়ে ছিলাম। কিন্তু সাধারণ ছুটির ঘোষণা সরকার সঠিক সময়েই দিয়েছিল। ২৬ মার্চের কিছুদিন আগে মার্চের মাঝামাঝি ছুটি শুরু হলে হয়তো আরো ভালো হতো। কিন্তু শ্রমিক-কর্মচারীদের যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া আকস্মিকভাবে পোশাক কারখানা খোলার সিদ্ধান্তটি সঠিক হয়নি। ১৭ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও জনস্বাস্থ্যবিদকে নিয়ে গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির ২৮ এপ্রিলের সভায় পোশাক কারখানা খুলে দেয়ার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ভিন্নমত প্রকাশ করে। কমিটির সিদ্ধান্ত ছিলÑ ‘সামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবে যে সকল পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তা পর্যায়ক্রমে শিথিল করার জন্য বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রয়োজন।’ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাও পরিস্থিতির আলোকে লকডাউন শিথিলের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। একজন জনস্বাস্থ্যবিদ বলেছেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে যে জরুরি বিষয়গুলো খোলা ছিল, সেটা ঠিক ছিল। কিন্তু এখন সংক্রমণ বাড়ছে, তখন জরুরি নয়, এমন বিষয়গুলোও খোলার সিদ্ধান্ত হবে বিপজ্জনক। ঈদের কেনাকাটার কথা বলে কেন এগুলো খুলে দেয়া হচ্ছে? এতে সামাজিক মেলামেশা বাড়বে যা হবে আরো বিপজ্জনক।’
কাজ করলে তো ভুল হবেই। তবে দেশ ও জাতির এই কঠিন পরিস্থিতিতে সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। বলা হচ্ছে, মানুষের জীবন বাঁচাতেই জীবিকার পথ খুলে দেয়া হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, জীবন বড় নাকি জীবিকা বড়? কিন্তু এটা মানতে হবে, জীবনের বিনিময়ে জীবিকা টেকে না। আক্রান্তের সংখ্যা যদি বেপরোয়া গতিতে বেড়ে যায়, তাহলে শুধু কলকারখানা, শপিংমল নয়Ñ সবকিছুই বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আগের ও বর্তমানের নেয়া সকল প্রস্তুতি ভেস্তে যাবে। করোনা মহামারির আগে থেকেই আমাদের করোনা মোকাবিলার সামর্থ্য নিয়ে কথা উঠে। ভুল-ত্র“টি হয়েছে। কিন্তু সময় শেষ হয়ে যায়নি। বিশেষ পরিস্থিতিতে কলকারখানা, হাট-বাজার খুলে দিলেও এখনো করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। মানুষকে সচেতন হতে হবে। জীবনকে কে ভালোবাসে না? পুলিশ বা অন্য কাউকে তাগাদা দিতে হবে কেন? নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জীবন বাঁচাতে প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। কিছুদিনের জন্য কী আমরা সংযমী হতে পারি না? বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না গিয়ে স্বজনদের ঘরে সময় দেই। আসুন না, করোনা মহামারির সময়ে জীবনকে একটু বেশি ভালোবাসার চেষ্টা করি। কলকারখানা, হাট-বাজার, বিপণি বিতানসহ সর্বত্র সর্বাবস্থায় সামাজিক দূরত্ব তথা শারীরিক দূরত্ব কঠোরভাবে মেনে চলার চেষ্টা করি।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ঘন ঘন সতর্কবাণী উচ্চারণ করছে, করোনা সংক্রমণ সহজে শেষ হবে না। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ডিসেম্বরে দ্বিতীয় দফা ভয়াবহ আকারে করোনার প্রাদুর্ভাব হতে পারে। আজ হোক কাল হোক করোনা প্রতিরোধের টিকা আবিষ্কার হবে। আপাতদৃষ্টিতে করোনার স্থায়ীত্ব ৪/৫ মাসের বেশি নয়। চীন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ আরো কিছু দেশে তো করোনা সংক্রমণ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। জার্মানির পরিস্থিতিও বেশ ভালো। এমনকি কঠিন অবস্থায় নিপতিত হওয়া ইতালিতে লকডাউন তুলে দেয়া হয়েছে। মৃত্যুহার অনেক কমে গেছে। উল্লেখ্য, করোনায় ইতালিতে ত্রিশ হাজার লোক মারা গেছেন। লকডাউন তো বেশিদিন রাখা যাবে না। কিন্তু এ ব্যাপারে কৌশলী হতে হবে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক জেনেভায় ৬ মে বুধবার অনলাইন ব্রিফিংয়ে লকডাউন তুলে নেয়ার ক্ষেত্রে ছয়টি পরামর্শ দিয়েছেন। পরামর্শগুলো হলো : ১. জোরদার নজরদারি, রোগীর সংখ্যা কম ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসতে হবে; ২. প্রত্যেক রোগী চিহ্নিত, পৃথককরণ, পরীক্ষা ও পরীক্ষা করা এবং রোগীর সংস্পর্শে আসা সব ব্যক্তিকে শনাক্ত করার সক্ষমতা স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় থাকতে হবে; ৩. স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও নার্সিং হোমের মতো বিশেষ ব্যবস্থাগুলোয় সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমে আসতে হবে; ৪. কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অন্য যেসব জায়গায় মানুষকে যাতায়াত করতে হয়, সেসব স্থানে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে; ৫. বিদেশ-ফেরত ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি থাকতে হবে এবং ৬. ‘নতুন স্বাভাবিকতায়’ সমাজের সবাইকে সজাগ ও সংশ্লিষ্ট করতে হবে এবং এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তাদের ক্ষমতায়ন করতে হবে।
মহাপরিচালক বলেন, যদি দেশগুলো অন্তর্বর্তী সময়টায় খুব যতœবান না হয় এবং ধাপে ধাপে বিধিনিষেধ শিথিল না করে, তাহলে মহামারি আবারো ছড়িয়ে পড়ার কারণে আবার লকডাউনে ফিরে যেতে হতে পারে। তিনি ভাইরাস প্রতিরোধে হাত ধোয়া ও বৈশ্বিক সংহতির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘সুরক্ষিত থাকার খুব সাধারণ একটি কৌশলই হচ্ছে এখন সেরা কৌশল। আর সেটা হচ্ছে হাত পরিষ্কার করা। হাত ধোয়ার এই অভ্যাস জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। ভাইরাসের বিরুদ্ধে আমরা জাতীয় ঐক্য ও বৈশ্বিক সংহতির মাধ্যমে এক সঙ্গে লড়াই করে যাবো। এই ভাইরাসের প্রতিষেধক হলো জাতীয় ঐক্য ও বৈশ্বিক সংহতি এবং মানবিক চেতনা।’ মোদ্দা কথা হচ্ছে, লকডাউন প্রত্যাহার বা শিথিল যাই করা হোক, মূল কাজগুলো বাদ দেয়া যাবে না। হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্বের নিয়ম কানুন মেনে চলা, রোগীর সন্ধান, পৃথককরণ, পরীক্ষা ও সব রোগীর চিকিৎসার বিষয়টি শিথিল করা যাবে না।
দেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শনাক্তের দুই মাস পূর্ণ হওয়ার দিন ৮ মে দেশে মৃত্যুর সংখ্যা দুশো ছাড়িয়ে গেছে। প্রথমে শনাক্তের খবর সরকারিভাবে জানানো হয় ৮ মার্চ। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু প্রথম ১০০ ছাড়িয়েছিল সংক্রমণ শনাক্তের ৪৪তম দিনে। মৃত্যুর সংখ্যা ১০০ থেকে ২০০ ছাড়াতে সময় লেগেছে ১৮ দিন। এখন পর্যন্ত আক্রান্তদের ৯৮ শতাংশই শনাক্ত হয়েছে সংক্রমণের দ্বিতীয় মাসে। বিশ্বে যেসব দেশে আক্রান্তের পাল্লা ভারী, সেসব দেশেও প্রথম দু’মাসে মোট আক্রান্তদের ৯৮ শতাংশের বেশি শনাক্ত হয় দ্বিতীয় মাসে। বিশ্লেষকদের অভিমত, বাংলাদেশে এখনো সংক্রমণের প্রথম ঢেউ চলছে। দেড় মাস ধরে পুরো সময় সরকারি ছুটি বা লকডাউনের (অবরুদ্ধ) মধ্যে কেটেছে। এরই মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। আক্রান্তের শীর্ষে থাকা দেশগুলোতেও সংক্রমণের তৃতীয় মাসে পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে দেখা গেছে। তবে ঐসব দেশে সংক্রমণের দু’মাসের মাথায় আক্রান্তের সংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। ঐ দেশগুলোতে আমাদের তুলনায় শনাক্তের পরীক্ষাও হয়েছে অনেক বেশি। ৮ মার্চ শনক্তের এক মাসের মাথায় ৮ এপ্রিল দেশে মোট রোগী ছিলেন ২১৮ জন। তখন পর্যন্ত ২২ জেলায় সংক্রমণ বিস্তার লাভ করে। ৮ মার্চ থেকে ৯ মে পর্যন্ত রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১২ হাজার ৭৭০ জন, মারা গেছেন ২১৪ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ২৪১৪ জন। ৯ মে পর্যন্ত ১ লাখ ১৬ হাজার ৯১৯ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে দুই মাস শেষে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ২১৯ জন। মোট আক্রান্তের প্রায় শতভাগ অর্থাৎ ৯৯ দশমিক ৯০ ভাগই আক্রান্ত হয় দ্বিতীয় মাসে। ইতালিতে সংক্রমণের দুই মাসে মোট আক্রান্ত ছিলেন ৯২ হাজার ৪৭২ জন। এসব রোগীর ৯৮ দশমিক ৭৮ শতাংশই আক্রান্ত হয় দ্বিতীয় মাসে। স্পেনে দ্বিতীয় মাসে ওই সময় পর্যন্ত মোট আক্রান্তের ৯৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ আক্রান্ত হন। যুক্তরাজ্যে প্রথম দু’মাসে আক্রান্ত হন ২৫ হাজার ১৫৪ জন। এর ৯৯ দশমিক ৮৫ শতাংশই আক্রান্ত হন দ্বিতীয় মাসে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে আক্রমণ খুবই ভয়াবহ রূপ নেয় তৃতীয় মাসে। প্রথম দু’মাসের তুলনায় তৃতীয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ৯৭ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে ৮৫ শতাংশ আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। একইভাবে তৃতীয় মাসে স্পেনে ৫৫ শতাংশ ও ইতালিতে ৫৪ শতাংশ আক্রান্তের সংখ্যা প্রথম দু’মাসের তুলনায় বেড়ে গিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতা অনেক বেশি। একজন থেকে অন্যজনে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে একজন সংক্রমিত রোগীর মাধ্যমে অনেকে সংক্রমিত হয়ে পড়ছে। দেশের কোনো জেলা বাকি নেই। সকল জেলাতেই সংক্রমণ অনেকটা ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। করোনা আক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তি চিহ্নিত করা এবং তাদের নজরদারির বিষয়টি নিশ্চিত না হলে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড-১৯ আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার কাজটিকে বলছে ‘কনট্রাক্ট ট্রেসিং’। অর্থাৎ আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে অনুসরণ করতে হবে, খুঁজে বের করতে হবে, তার ওপর নজরদারি করতে হবে। উপসর্গ দেখা দেয়া মাত্র পরীক্ষার আওতায় নিতে হবে এবং রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসা দিতে হবে। দেশে শুরু থেকে ‘কনট্রাক্ট ট্রেসিং’ এর কাজ শুরু করে আইইডিসিআর। প্রথমদিকে মার্চ মাসে মাদারীপুর জেলার শিবচর এলাকায় ৯ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়। আইইডিসিআর-এর তিনজন স্বাস্থ্যকর্মী ২০ ও ২১ মার্চ ওই ৯ জনের মধ্যে ৬ জনের কনট্রাক্ট ট্রেনিং করেছিলেন। ৯ জনের সংস্পর্শে আসা ৩৫০ জনকে চিহ্নিত করা হয়। এদের মধ্যে ১০৭ জনকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। বাকি ২৪৩ জনের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
কনট্রাক্ট ট্রেসিংয়ের শুরুটা ভালো হলেও এখন তা আর হচ্ছে না। ঢাকায় বন্ধ হয়ে গেছে। তবে উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নেতৃত্বে চলমান রয়েছে বলে আইইডিসিআর সূত্রে জানা গেছে। আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, কোনো ভালো উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে দেয়া হয় না। ভালো কাজ করে পুরস্কৃত হন না। খারাপদের দাপটে ভালোরা টিকতে পারে না। আইইডিসিআর-এর প্রায় ৪০ জনের একটি চিকিৎসক দল কনট্রাক্ট ট্রেসিংয়ের কাজটি শুরু করেছিলেন। একজনের সংস্পর্শে প্রায় ১০০ জন এসেছিলেন, এমন তথ্যও তারা জানতে পারেন। সংস্পর্শে আসা মানুষ খুঁজতে তাদের কেউ কেউ নরসিংদী ও গাজীপুর পর্যন্ত গেছেন। বন্ধ হয়ে যাওয়া কনট্রাক্ট ট্রেসিংয়ের কাজটি অবিলম্বে চালু করা উচিত। কারণ, আক্রান্তের সংস্পর্শে আসা মানুষ চিনতে পারলে সংক্রমণকে থামিয়ে দেয়া সহজ হয়। সারা দেশে যদি সম্ভব নাও হয়, যে যে জেলায় এখনো সংক্রমণ কম, সেখানে কনট্রাক্ট ট্রেসিং শুরু করতে হবে। তাহলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
করোনার তাণ্ডব কখন শেষ হবে জানি না। কিন্তু এই ভাইরাস দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। গত ২/৩ মাস ধরে করোনাকালে অসুস্থ রোগী হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা পাচ্ছে না। করোনা উপসর্গ নেই, তবুও করোনার অজুহাতে চিকিৎসকগণ রোগী দেখছেন না। রোগী গেলেই খোঁজ হয় করোনা পরীক্ষার সনদপত্র। করোনা পরীক্ষা করাটাও যে খুব সহজ নয়, এটাও সবার জানা হয়ে গেছে। অসুস্থ রোগী অনেকটা পলাতক আসামির মতো হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ভিখেরীর মতো ঘুরে ঘুরে মারা যাচ্ছেন। শুরুতে না হয় এমন একটা অব্যবস্থা ছিল। এ নিয়ে তো লেখালেখিও কম হচ্ছে না। আসলে স্বাস্থ্যখাতের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা মনে হয়, অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তাই এদিকে কারো খেয়াল নেই। এখন অবশ্য কোনো গুরুতর অসুস্থ রোগী ছাড়া কেউ হাসপাতালে যেতে চান না। সর্বশেষ আইসিইউ সাপোর্টের অভাবে মারা গেলেন সরকারের অতিরিক্ত সচিব গৌতম এইচ সরকার। একদিকে সরকারের পদস্থ কর্মকর্তা, অন্যদিকে মেয়ে একজন চিকিৎসক। তারপরেও একাধিক হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে অনেকটা বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন। গৌতম সরকারের মেয়ে ডা. সুস্মিতা জানান, কোথাও চিকিৎসার সুযোগ না পেয়ে ৭ মে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাবাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করি। ভর্তির পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগী কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত কিনা তা জানার চেষ্টা করেনি। তবে ভর্তি করাতে অন্যদের মতো তাদেরকেও নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। চিকিৎসক মেয়ে হিসেবে কিডনিতে অসুস্থ বাবাকে বহুদিন ধরেই দেখভাল করছেন সুস্মিতা। বাবার রোগ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানা সুস্মিতা ভর্তির পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানান তার বাবার কিডনির সমস্যা রয়েছে। নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতে হয়েছে। হঠাৎ প্রেসার বেড়ে গেলে শ্বাসকষ্ট দেখা দিতো। কোনো কোনো সময় লাংসে পানিও আসতো। আবার চিকিৎসায় ভালো হয়ে গেছেন। তবে শ্বাসকষ্ট থাকলেও তাঁর বাবা যে করোনা আক্রান্ত নন, একথা বোঝাতে তিনি ব্যর্থ হন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। ৮ মে শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে রোগীর অক্সিজেন ফল করতে শুরু করে। তবে হাসপাতালের কোনো ডাক্তার রোগীর ধারে কাছে যাননি। তারা ওষুধ বুঝিয়ে দিয়েছেন। সুস্মিতা নিজেই তাঁর বাবাকে ওষুধ খাওয়ান। সুস্মিতার ভাই অক্সিজেন দিয়েছেন। ৮ মে করোনা পরীক্ষার কথা বলা হলেও করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত আইসিইউ সাপোর্ট না পেয়ে ৯ মে শনিবার মারা যান গৌতম আইচ। স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ৩৩৩ হটলাইন নম্বরে কর্মরত ডা. সুস্মিতা আক্ষেপ করে জানান, তার বাবাকে কুর্মিটোলায় ভর্তির আগে কয়েক ঘণ্টায় ঢাকার ল্যাবএইড, ইউনাইটেড হাসপাতাল, মহাখালী ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল, স্কয়ার হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী কার্ডিয়াক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, মিরপুরের রিজেন্ট হাসপাতালসহ আশপাশের আরো কয়েকটি হাসপাতালে তাঁর বাবার চিকিৎসা করাতে ব্যর্থ হন। একজন চিকিৎসকের বাবা এবং সরকারের অতিরিক্ত সচিবের অনেকটা বিনা চিকিৎসায় ও হেলাফেলায় মৃত্যু থেকে আমাদের হালের চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে কিছুটা আন্দাজ করা যায়।
করোনা ভাইরাস বিস্তারের পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিভিন্ন দেশে আক্রান্তদের ৯৮ শতাংশই শনাক্ত হয়েছে সংক্রমণের দ্বিতীয় মাসে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ইতালিসহ সর্বোচ্চ আক্রান্ত দেশগুলোতে করোনা সংক্রমণ তৃতীয় মাসে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ৮ মে থেকে আমাদের তৃতীয় মাস শুরু হয়েছে। এ মাসে যে সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের দেশে করোনা পরীক্ষার ব্যাপারে শুরু থেকেই যে অবহেলা করা হয়েছে তা হচ্ছে অমার্জনীয় অপরাধ বা ব্যর্থতা। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে যে ৫/৬ হাজার মানুষের নমুনা পরীক্ষা করা হয়, তা দিয়ে আসলে প্রকৃত চিত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না। ৯ মে পর্যন্ত দেশে মাত্র সোয়া লক্ষ নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। ১৬/১৭ কোটি মানুষের দেশে যদি অন্তত ১ কোটি লোকের পরীক্ষা করা হতো, তাহলে সংক্রমণ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করা যেত। সংক্রমণের তৃতীয় মাসেও যদি প্রতিদিন ২৫/৩০ হাজার মানুষের নমুনা পরীক্ষা করা যায়, তাহলেও কিছুটা রক্ষা হতে পারে। সংক্রমণের তৃতীয় মাসে আমাদের যখন বেশি বেশি সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন ছিল, তখন আমরা করেছি এর উল্টোটা। তবে লকডাউন শিথিল বা কোথাও তুলে দেয়া হলেও সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতেই হবে। এটা সেটা খুলে দিয়ে জনগণের কাছে যেন এই বার্তা না যায় যে, বিপদ কেটে গেছে। বরং জনগণকে একথা বুঝাতে হবে যে, বিপদ তো কমেইনি, অনেক বেড়েছে। প্রতিটি মানুষকে নিজের সুরক্ষার বিষয়ে সচেতন ও যতœবান হতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য করোনার ঝুঁকি সম্পর্কে জনগণের মধ্যে এখনো সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। এ ব্যাপারে গণমাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে ব্যাপক প্রচারণা প্রয়োজন। প্রত্যেক মানুষকে বুঝতে হবে যে, তাঁর নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জীবনের নিরাপত্তা তাকেই নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অদূরদর্শী ও ভুল সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও যেসব দোকান ও শপিংমল তাদের দোকানপাট বিপণি বিতান না খোলার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন, তাদেরকে অবশ্যই ধন্যবাদ। সরকার আসলে এখনো ভুল পথে হাঁটছে। তাদের অনেক সিদ্ধান্তই অদূরদর্শী। কারো সাথে কারো সমন্বয় নেই। দেশকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সামনে মোটামুটি দুটি পথ খোলা আছে। বেশি বেশি পরীক্ষা করার মাধ্যমে সংক্রমিতকে পৃথক রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। আর লকডাউন অকার্যকর হয়ে গেলে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করা। হার্ড ইমিউনিটি মানে দেশের প্রায় ৯০ ভাগ জনগোষ্ঠীকে ভাইরাসে আক্রান্ত হতে হবে আর সে পথে হাঁটলে লাখ লাখ মানুষ মারা যাবে। কাজেই কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় হার্ড ইমিউনিটি। শপিংমল, দোকানপাট খোলা নয় জনসমাগম বৃদ্ধির সকল সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেই ভালো হয়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তাঁর উপদেশক, মন্ত্রী ও আশপাশের লোকজন প্রধানমন্ত্রীকে বাস্তবসম্মত পরামর্শ দেয়ার ক্ষমতা, সৎসাহস ও যোগ্যতা রাখেন না। তাই যদি হতো তাহলে একটি দৈনিকের সম্পাদকীয় নিবন্ধে (সংবাদ, ১০ মে ২০২০) আক্ষেপ করে বলতে হতো নাÑ ‘এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, শপিংমলের মালিকদের মতো যৌক্তিক এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি। সে ধরনের সিদ্ধান্ত যদি করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই নেয়া হতো তাহলে আজকে আমাদের এ সংকটের মধ্যে পড়তে হতো না।’
মনে রাখতে হবে রাষ্ট্রনায়কদের বড় শত্র“ হচ্ছে তোষামোদকারী চক্র। কবিগুরু বলেছেন, ‘নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো।’ দেশের প্রাচীন দৈনিক সংবাদের একটি ছোট্ট উদ্ধৃতি দিয়ে আজকের লেখা শেষ করতে চাই। ৮ মে পত্রিকাটি সম্পাদকীয় নিবন্ধের শেষাংশে লিখেছে : ‘উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সবার আগে জাতীয় কারিগরি কমিটির মতামত নিতে হবে। করোনা ভাইরাস এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যার প্রভাবে হয় অর্থনীতি, নয় মানুষের জীবন বিপন্ন হবে। আমরা বিশ্বাস করি, একটি গণতান্ত্রিক সরকার নাগরিকদের জীবনের বিনিময়ে অর্থনীতি রক্ষার পথে হাঁটতে পারে না।’