প্রতিবেদন

ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন : চাহিদা সুনির্দিষ্ট হলে করোনায় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়াটা সহজ হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
করোনা ভাইরাসের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় তহবিল গঠন করেছে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) বিভিন্ন সংস্থা। এসব সংস্থা থেকে বাংলাদেশকে বেশি পরিমাণে আর্থিক সহায়তা পেতে হলে আগে থেকে দরিদ্রদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা করতে হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
স্বদেশ খবরকে তিনি বলেন, দরিদ্রদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা করলে সরকার দাতা সংস্থাগুলোকে বলতে পারবে যে, দেশের দরিদ্র দুই কোটি মানুষকে ছয় মাস খাদ্য দেব, নগদ অর্থ দেব। এজন্য সত্যিকার অর্থেই আমাদের সহায়তা প্রয়োজন। দরিদ্রদের জন্য কোনো কর্মসূচি ঘোষণা না করে দাতাদের কাছে অর্থ সহায়তা চাইলে তা খুব একটা ফল দেবে বলে মনে হয় না।
এরই মধ্যে হতদরিদ্রদের জন্য সরকার চাল, বিনামূল্যে ওষুধ ও আবাসন নিশ্চিত করার কথা বলেছে। রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের শ্রমিকদের বেতনভাতা দেয়ার জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করারও ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেবা খাত ও দেশের মানুষের চাহিদা মেটাতে গড়ে ওঠা শিল্প খাতের কর্মহীন হয়ে পড়া ৫ কোটি ২০ লাখ শ্রমিকের আর্থিক সহায়তার বিষয়ে সরকার কী ভাবছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তা বাড়ানো হয়নি। শহুরে দরিদ্রশ্রেণির বড় অংশ কর্মহীন হয়ে গ্রামে চলে গেছে। কিন্তু গ্রামে যাদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় নানা সুবিধা দেয়া হয়, সে তালিকায় এদের কারও নাম নেই। এদের জন্য সরকারের তরফ থেকে কী করা হচ্ছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
দরিদ্রদের খাদ্যভিত্তিক সহায়তা বিতরণ করা কঠিন হবে। কারণ যারা শহর থকে কর্মহীন হয়ে গ্রামে ফিরেছে, তারা কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় নেই। সারা দেশেই তারা ছড়িয়ে পড়েছে। দেশজুড়ে খাদ্য বিতরণ করা এ সময়ে কঠিন হয়ে পড়বে। তাছাড়া খাদ্য বিতরণ শুরু হলে দরিদ্ররা লাইনে দাঁড়িয়ে খাদ্য সংগ্রহ করবে। তাতে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সবচেয়ে ভালো হবে স্থানীয় সরকার ও এনজিওদের সহায়তায় কর্মহীন দরিদ্রদের তালিকা করে তাদের সহায়তার উদ্যোগ নেয়া। খাদ্য দিক বা অর্থ, শুরুতে কর্মহীনদের চিহ্নিত করতেই হবে। নগদ দিলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে কিনতে যাবে। সেক্ষেত্রে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় যেভাবে নগদ সহায়তা বা ভাতা দিয়ে থাকে, সেভাবে নগদ দিতে হবে। তাহলে খাদ্য সরবরাহ করতে যে বিপুল পরিমাণ লোকবলের দরকার হবে, তা লাগবে না। আর দরিদ্ররা নগদ টাকা পাওয়ার পর তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যসহ অন্যান্য সামগ্রী কিনতে পারবে। যারা আগে দরিদ্র ছিল না, এখন হয়ে গেছে, তাদের ক্রয়ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে হবে। এটা নিশ্চিত করা গেলে আপাতত সংকট ঠেকানো সম্ভব হবে।
গ্রামীণ দরিদ্রদের চেয়ে এখন শহুরে দরিদ্রদের অবস্থা বেশি খারাপ। কারণ গ্রামে বোরো মৌসুম চলছে। কিছুদিনের মধ্যে ধান কাটা শুরু হবে। কিন্তু শহুরে শ্রমিকদের কোনো কাজ নেই। আর সরকার রপ্তানিমুখী খাতগুলোর শ্রমিকদের জন্য তহবিল গঠন করার কথা বলেছে। রপ্তানিমুখী খাতসহ শিল্প খাতে শ্রমিকের সংখ্যা এক কোটিরও কম। সেবা খাত ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শ্রমিক সংখ্যা এর প্রায় পাঁচগুণ। তাদের জন্য উদ্যোগ নেয়া দরকার। আর বোরো মৌসুমে কৃষক কীভাবে ধান কাটবেন ও মাড়াই করবেন, সে বিষয়ে এখনই প্রচার চালানো দরকার। বলা হচ্ছে যে, তিন ফুট দূরে থাকতে হবে। তাহলে কৃষক যাতে ধান কাটার সময় পরস্পর থেকে তিন ফুট দূরে থাকে সে বিষয়ে এখনই সচেতন করতে হবে। ধান কেটে চালকলে পৌঁছাতে হবে, পরে সেই চাল দোকানে যেতে হবে। কতদিন এভাবে চলতে হবে, তা এখনই বলা মুশকিল। একটাই ভরসা, গরম বাড়লে যদি প্রাদুর্ভাব কমে যায়।
অনানুষ্ঠানিক খাতে ৫ কোটি ২০ লাখেরও বেশি শ্রমিক। এদের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা সহ্য করার ক্ষমতা অনেকেরই নেই। কারণ তাদের তেমন কোনো সঞ্চয় নেই। বিকল্প আয়ের কোনো পথও নেই। তাদের জন্য কোনো কর্মসূচি এখনই ঘোষণা করা দরকার। ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশই এ ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
করোনা ভাইরাসের কারণে আমদানি-রপ্তানি কমায় রাজস্ব আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এক্ষেত্রে সরকারকে সাময়িকভাবে ঋণ করতে হবে। এটা ব্যাংক থেকে হোক বা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেই হোক। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবি, জাইকা, আইএমএফসহ অনেকে করোনার জন্য বিশেষ অর্থ তহবিল গঠন করেছে। ওইসব তহবিল থেকে যাতে পর্যাপ্ত সহায়তা পাওয়া যায়, সেজন্য এ কর্মসূচিগুলো ঘোষণা করা জরুরি। কোনো বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণার পর তার ভিত্তিতে সাহায্য পাওয়া যতটা সহজ, কর্মসূচি ছাড়া সাহায্য পাওয়া ততই কঠিন। সরকার যদি বলে যে, আমি এক কোটি লোককে জীবিকা নির্বাহের জন্য মাসে এত টাকা দিচ্ছি, আমার সরবরাহ ব্যবস্থা যাতে সচল থাকে, সেজন্য আমি এ উদ্যোগ নিয়েছি। আমার এ ওষুধ লাগছে, এ পরিমাণ যন্ত্রপাতি লাগছেÑ এসব বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরতে পারলে দাতাদের কাছ থেকে অর্থ পাওয়া অনেক সহজ হবে।