অর্থনীতি

পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার চলছেই

নিজস্ব প্রতিবেদক
২০১০ সালের পর দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘ সময়ের মন্দা চলছে এখন। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নগদ অর্থের সংকটে ২০১৮ সাল থেকে মন্দার শুরু হলেও তাতে পতনে রূপ দিয়েছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। ২৬ মাস ধরে বিদেশিরা টানা দেশের পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৮ সাল থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদেশিরা দেশের পুঁজিবাজার থেকে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ তুলে নিয়েছেন।
বিদেশি পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সিকিউরিটিজ হাউজগুলো জানিয়েছে, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন না হওয়া বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহারের বড় কারণ। এ ছাড়া কিছু বিদেশি তহবিল অবসায়নে যাওয়ায় দেশের পুঁজিবাজার থেকে বিদেশিদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার বেড়েছে। এর বাইরে পুঁজিবাজার ও ব্যাংক খাতে কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এসব কারণে চলতি বছর বিদেশি বিনিয়োগ প্রতাহারের হার আরও বাড়তে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে।
দেশের পুঁজিবাজার পরিস্থিতির অবনতির সঙ্গে সঙ্গে বিদেশিদের বিনিয়োগ প্রত্যাহারের পরিমাণও বাড়ছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৮ সালে বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি করে ৫৯৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার বিনিয়োগ তুলে নেন। পরের বিনিয়োগ প্রত্যাহারের পরিমাণ ছিল ৪৮৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা। আর চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই তাদের নিট শেয়ার বিক্রির পরিমাণ ছিল ৩০৩ কোটি টাকা। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রভাব বাড়তে থাকায় গত ২৬ মার্চ দেশের পুঁজিবাজার বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে মার্চ মাসের বিদেশি বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাজার-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সরকারি সিদ্ধান্তে নামমাত্র ডাউনপেমেন্টে খেলাপি ঋণ নিয়মিতকরণসহ সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্তে ব্যাংক খাতে মন্দঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে করে ব্যাংক খাতের মুনাফা আরও কমে যাওয়ার শঙ্কায় বিদেশিরা চলতি বছর শেয়ার বিক্রির পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সবচেয়ে বড় মূলধনি কোম্পানি গ্রামীণফোনের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির দ্বন্দ্বও এ ক্ষেত্রে প্রভাব রেখেছে। এ ছাড়া সরকারের নির্দেশে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক মেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মেয়াদ আরও ১০ বছর বাড়ানোয় এ খাত থেকে বিদেশিরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এসইসির এমন আইন চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে একটি বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান মামলাও করে।
সর্বশেষ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের প্রভাবে পুঁজিবাজারের বড় পতন ঠেকাতে এসইসি যেভাবে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের সর্বনি¤œ মূল্য বেঁধে দিয়ে ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করেছে, তাতেও আপত্তি জানিয়েছেন বিদেশিরা। এমনকি করোনার প্রভাবে সরকারের সাধারণ ছুটির সঙ্গে মিল রেখে যেভাবে পুঁজিবাজার বন্ধ রাখা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। বর্তমানে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা ছাড়া বিশে^র প্রায় সব দেশের পুঁজিবাজারে লেনদেন অব্যাহত রয়েছে। কবে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেয়া হবে এবং পুঁজিবাজার খুলবে তা জানতে চেয়েছে আবার্দিন স্ট্যান্ডার্ড ইনভেস্টমেন্ট নামক একটি বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। জানা যায়, দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বড় আকারে আসা শুরু হয় ২০১০ সালের ধসের পর থেকে। ধস-পরবর্তী সময়ে শেয়ারের তলানিতে নেমে এলে ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত নিট বিনিয়োগে ইতিবাচক ধারা ছিল। এ সময় টানা ৭ বছরে বিদেশিরা ৮ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা নিট বিনিয়োগ করেছেন। তবে গত ২৪ মাসের টানা শেয়ার বিক্রির পরও এখনো বিদেশিদের ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ রয়েছে।
জানা গেছে, ২০১৮ সালের পর থেকে বিদেশিরা সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেন বিএটি বাংলাদেশের শেয়ার থেকে। ২০১৮ হিসাব বছরের জন্য কোম্পানিটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ বোনাস ঘোষণা করা হয়। আর এই বোনাস ঘোষণায় স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এই কোম্পানির শেয়ার দর প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। আর এ সুযোগে বিদেশিরা এ কোম্পানির উল্লেখযোগ্য পরিমাণের শেয়ার বিক্রি করে দেন। আর ২০১৯ সালে বিটিআরসির সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরুর পর গ্রামীণফোন থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিনিয়োগ তুলে নেন তারা। এ ছাড়া গ্লাক্সোস্মিথক্লাইন, বার্জার, জিএসপি ফাইন্যান্স, আইএলএফএসএল, সিঙ্গার, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, ওরিয়ন ফার্মা, ফিনিক্স ফাইন্যান্স, সিটি ব্যাংক, আইডিএলসি, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, এনবিএল, বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি, আইএফআইসি, রানার অটোমোবাইল, ইসলামী ব্যাংক, বেক্সিমকো লিমিটেডসহ উল্লেখযোগ্য কিছু কোম্পানির শেয়ার থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেন বিদেশিরা।