আন্তর্জাতিক

ব্রেক্সিট-উত্তর ইউরোপ গন্তব্য কোন পথে

হাসান জাবির
ইইউ বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন নামক জোটটির জন্ম ১৯৫৭ সালে। সেই সময় এর নাম ছিল ইউরোপীয় ইকোনমিক কমিউনিটি বা ইইসি। নতুন ইউরো জোট ইইসি কার্যত ট্রিট্রি অব রোম-এর আওতায় বিশেষায়িত আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট ‘ইউরোপীয় কয়লা ও স্টিল কমিউনিটি’কে নিজেদের সঙ্গে একীভূত করে নেয়। এই সূত্র ধরে পহেলা জানুয়ারি ১৯৫৮ যাত্রা শুরুর পর ১৯৯৩ সালে ইইসির পরিবর্তে ইইউ নাম ধারণ করে এই অর্থনৈতিক জোট। তৎপরবর্তী অভিন্ন ইউরোপীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গঠনমূলক সংস্কার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইইউকে নতুন পরিচিতি এনে দেয়। একক মুদ্রা ইউরো প্রবর্তন, শেঞ্জেন চুক্তির মতো আন্তঃসদস্য ভিসা সহজীকরণ ব্যবস্থার উদ্ভব ইইউ জোটের ইতিহাসে মাইলফলক ঘটনা। ২৮টি সদস্য দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামরিক বিষয়াদি-সংক্রান্ত অভিন্ন নীতি প্রণয়নপূর্বক ইউরোপের সামগ্রিক স্বার্থ সুরক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে ইইউ। অন্যদিকে গত দশকের শুরুতেই রুশ-ইউরোপ বহুমুখী জ্বালানি সম্পর্ক সম্প্রসারণ, নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলার মতো ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ইইউ বিশ্ব দরবারে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তুলে ধরেন। এই সূত্র ধরে আমেরিকার পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে সমানভাবে গুরুত্ব দিলে একটি শক্তিশালী জোট হিসেবে ইইউর অবস্থান সুসংহত হয়। ওই সময় ইউরো জোটের অভিন্ন পররাষ্ট্রনীতির এই বাঁক আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথে বড়োসড়ো পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু ইইউ পররাষ্ট্রনীতির এই ধারাবাহিকতা দ্রুতই ভেঙে পড়ে। ব্যাপারটি কিছুটা এরকমÑ রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি-বাণিজ্যের বিস্তারÑ ইউরোপের জন্য প্রথমে প্রণোদনা এবং পরে দ্রুতই এটি তাদের জন্য অশনিসংকেত হয়ে ওঠে। কেননা এই সূত্র ধরেই ইউরোপ-আমেরিকা ঐতিহাসিক সম্পর্ক জটিল সমীকরণের দিকে বাঁক নেয়। এক্ষেত্রে আমেরিকার দুশ্চিন্তার প্রধান কারণ ছিল ইউরোপে নিজ নিয়ন্ত্রণ সংকুচিত হওয়ার পুরোনো ভয়। অন্যদিকে ইউরোপিয়ান র‌্যাপিড রি-অ্যাকশনারি ফোর্স নামে নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলার নীতিগত সিদ্ধান্তটি আন্তঃআটলান্টিকস সম্পর্কের মৌলিক চেতনাকে মøান করে। এই আলোকেই জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো রাষ্ট্রগুলো ন্যাটোকে এড়িয়ে যাওয়ার উপযুক্ত সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করেন। এর বাস্তবসম্মত একটি উদাহরণ হচ্ছেÑ গত দশকে ন্যাটো সদস্য ফ্রান্স ও রাশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরবরাহ চুক্তি স্বাক্ষর। রুশ-পশ্চিমা সম্পর্কের অতীত ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায় এবং আজকের পরিবর্তিত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে ফ্রান্সের ওই সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক, একই সঙ্গে উচ্চাভিলাষী। কিন্তু বিপরীতে ছিল প্রচুর ঝুঁকি। মূলত ঘটনাটি ফ্রান্সের পরাশক্তিমূলক অবস্থান সুদৃঢ় করার সুপ্ত আকাক্সক্ষারই বহিঃপ্রকাশ। এতে করে ন্যাটোকেন্দ্রিক ফ্রান্স মার্কিন ঐতিহাসিক মতপার্থক্য আবার প্রকাশ্যে আসে। ব্যাপারটি এরকম ছিল যে মস্কোর সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রেখে ইউরোপের নেতৃত্ব দিতে ফ্রান্সের ঐতিহাসিক আগ্রহ এখনো প্রবল। তাই সে বরাবর আমেরিকার সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক নির্ভরশীলতা কমাতে চায়। এতদুদ্দেশে ফ্রান্সের অতীত ভূমিকাসমূহের চাইতেও অধিক আকর্ষণীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে ভাবা হয়েছিল গত দশকের রুশ-ফ্রান্স সামরিক চুক্তিটি। যেটি ইতিমধ্যে ইউক্রেন-সংকটের জের ধরে প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। সমসাময়িক কালে জার্মানির সঙ্গে রাশিয়ার জ্বালানিনির্ভর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনকেও আমেরিকা ভালোভাবে নেয়নি। ইউরোপের এরকম প্রস্তুতির প্রাক্কালেই সেখানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার জন্ম হয়। যে দুটি ঘটনা একই সঙ্গে রাশিয়া ও ইউরোপের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠে। এর প্রথমটি রুশ-ইউক্রেন দ্বন্দ্বের অনাকাক্সিক্ষত সূত্রপাত এবং পর্যায়ক্রমে এর বিস্তার। এক্ষেত্রে রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়াকে নিজ ভূখ-ে একীভূতকরণ ওয়াশিংটন-মস্কো
সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ডেকে আনে। এর ফলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে গৃহীত মার্কিন পদক্ষেপে শামিল হতে ইউরোপকে উৎসাহিত করে আমেরিকা। বলা চলে মার্কিন কলাকৌশলের কাছে নতিস্বীকার করে ইউরোপ রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরোপিত হিংসাত্মক নিষেধাজ্ঞায় শরিক হয়। ফলে দ্রুততার সঙ্গে রুশ-ইউরোপ উঠতি মৈত্রীর গতিপথে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। এই রেশ না কাটতেই সিরিয়ায় রুশ সামরিক হস্তক্ষেপ ইউরোপীয় দেশগুলোর আতঙ্কে ঘি ঢালে। ইত্যবসরে আমেরিকা আতঙ্কিত ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক ঢেলে সাজানোর সুযোগ পায়। এক্ষেত্রে ইরান পরমাণু চুক্তিতে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ মার্কিন স্বার্থের অনুকূলে ইউরোপের প্রক্সি ভূমিকা প্রত্যক্ষ করে বিশ্ব। এরকম কিছু ঘটনায় নিজেদের মান অভিমান, রাগ-জেদ, হুঁশিয়ারি ও পাল্টা হুঁশিয়ারির যবনিকাপাত ঘটিয়ে আটলান্টিসের ভঙ্গুর ঐক্য সংহতি আবার মজবুত হয়। কিন্তু সহসাই নাজুক হয়ে পড়ে ইউরোপের সামগ্রিক পরিস্থিতি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইউরোপের সামগ্রিক সক্ষমতা ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে। অন্যদিকে মার্কিন সামরিক ছত্রছায়ায় ইউরোপের নিরাপত্তা অন্বেষণের ধারাবাহিক আগ্রহের কারণে অঞ্চলটি আবার আমেরিকা ও রাশিয়ার মিলিটারি বাফারে পরিণত হওয়ার পর্যায়ে আছে।
দ্বিতীয় ঘটনাটি হচ্ছে ব্রিটেনÑ এক্সিট যা বহুলভাবে পরিচিতি পাওয়া শব্দ ব্রেক্সিটের সম্প্রসারণ। অর্থাৎ ইইউয়ের প্রভাবশালী সদস্য ব্রিটেন নিজের সদস্যপদ থেকে চূড়ান্তভাবে সরে যাওয়ায় ইতিমধ্যে ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে ইইউ। একই সঙ্গে ইউরোপের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাও পড়েছে ঝুঁকির মধ্যে। এই ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে প্রস্তাবিত ইঙ্গ-মার্কিন নয়া বাণিজ্য কাঠামো। ইঙ্গ-মার্কিন দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন আশঙ্কা ইউরোপের জন্য মারাত্মক চাপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এর সঙ্গে ইইউয়ের সমন্বয় না ঘটলে ভিকটিম হতে পারে জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালির বিশেষায়িত রপ্তানি সেক্টর। যে কারণে ইউরোপের সঙ্গেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন হতে পারে আমেরিকার। বিশেষ করে মার্কিন উচ্চ প্রযুক্তি পণ্যের রপ্তানিবাজার সচল রাখার আশু প্রয়োজনীয়তা এখানে প্রাসঙ্গিক। তাই বিকল্প হিসেবে পূর্ব ইউরোপীয় বাজারে একচেটিয়া প্রবেশ নিশ্চিত করতে চাইবে তারা। এখানে আমেরিকার প্রচুর সামরিক স্বার্থও জড়িত। ইতিমধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ-উত্তর যুগে পূর্ব ইউরোপকে কাছে টানার প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক সফলতা পেয়েছে আমেরিকা। সেখানে নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার পাশাপাশি মার্কিন ইচ্ছায় পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোতে একধরনের রাজনৈতিক সংস্কার সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। এরকম সম্ভাবনা পশ্চিম ইউরোপের সম্পদশালী দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, যা একই সঙ্গে রাশিয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংগত কারণেই ব্রিটেন ও আমেরিকার মধ্যকার বাণিজ্য সম্প্রসারণ অনিবার্য হয়ে উঠবে। কিন্তু ইইউয়ের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্কে কী হবে তা এখনো অনিশ্চিত। এই শঙ্কার মধ্যে ইউরো জোটের বর্তমান নীতিনির্ধারক রাষ্ট্রগুলো নিজেরাও সংশায়িত। পরিস্থিতির ভিন্নতায় উপযুক্ত কৌশল গ্রহণপূর্বক করণীয় নির্ধারণে তারা রীতিমতো অপারগ। তাই ইউরোপের দৃষ্টিÑ আমেরিকা ও ব্রিটেনের কর্মকৌশলের দিকে। এই ভিন্ন প্রেক্ষাপট ইউরোপের অর্থনৈতিক জীবনের পূর্বতন চাকচিক্যকে ধূসর করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে ঘটনাগুলো ইউরোপকে পুনর্বার মার্কিন অর্থনৈতিক প্রণোদনার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছেÑ আমেরিকা কী প্রক্রিয়ায় ইউরোপের পাশে থাকবে? ঐক্যের বিপর্যয়জনিত রাজনৈতিক দুর্বল ইউরোপের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ইচ্ছা মার্কিনিদের কাছে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ব্রিটেন আমেরিকা সম্পর্ক কাটছাঁট হওয়ার সুযোগ নেই। ফলে অদূর ভবিষ্যতে ব্রিটেনের অর্থনৈতিক চেহারায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসন্ন বলে মনে করা হচ্ছে। এই বাস্তবতা আন্তঃইউরোপ বিভাজনের পথ উন্মুক্ত করে নিজেদের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ইতিহাসকেই পুনর্জীবিত করতে পারে। করোনায় বিপর্যস্ত ইতালির সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্যে আমরা এরকম ইঙ্গিত প্রত্যক্ষ করি। নিজেদের দুর্যোগে প্রয়োজনীয় সাহায্য না পেয়ে ইতালি ইইউ ত্যাগের হুমকি দিয়েছে। একই সঙ্গে ইইউয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। ইতালি ও স্পেনের করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা রোধে ইইউয়ের নামমাত্র ভূমিকা জোটটির শক্তিশূন্যতার লক্ষণ। এটি ব্রেক্সিট-উত্তর বাস্তবতা। এই পরিপ্রেক্ষিতেই ইইউ ভাঙনের গুঞ্জনমুখর গণমাধ্যম। তবে ইইউ ভেঙে পড়বে কি না, তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। কিন্তু এটি খুব নিশ্চিত যে, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ভাটা এবং ব্রেক্সিটের ফলাফল ইউরোপের মার্কিননির্ভরতা আগের যেকোনো সময়ের চাইতে বৃদ্ধি করবে। এই নির্ভরতা ইউরোপকে সামরিক, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে অঞ্চলটির রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়বে। একটু সময় অতিক্রান্ত হলেই সবকিছু পরিষ্কারভাবে সবারই দৃষ্টিগ্রাহ্য হবে।