রাজনীতি

রংপুরকেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ থাকছে জাতীয় পার্টির রাজনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশ যখন বিপর্যস্ত, সরকার যখন পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য এবং ঘরবন্দি মানুষের দুর্দশা লাঘবে প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেÑ তখন দেশের প্রধান বিরোধীদল এরশাদের জাতীয় পার্টির ভূমিকা অনেকের মনেই প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। সরকার যখন প্রায় লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, গরিব-নি¤œবিত্তদের জন্য রেশনের ব্যবস্থা করেছে, ৫০ লাখ পরিবারকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা প্রদান করেছে, তখন জাতীয় পার্টির নেতাদের কোনো ধরনের ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নিতে দেখা যায়নি। দলটি নিজেরা তো ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নেয়ইনি, সরকারকে সহায়তা করার মতো কোনো কার্যক্রমেই তাদের দেখা যায়নি। করোনা প্রাদুর্ভাবের মধ্যে দলটির ঘাঁটি বলে পরিচিত রংপুরেও কোনো ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নিতে দেখা যায়নি জাতীয় পার্টিকে। উপরন্তু, ত্রাণের আশায় কিছু মানুষকে এরশাদের বাড়িকে ঘেরাও করে বিক্ষোভের খবরও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
করোনাকালের আগেই জাতীয় পার্টি তাদের কার্যক্রমের কারণে জনগণের কাছে একটি আঞ্চলিক দলে পরিণত হয়। কারণ, তাদের সব কার্যক্রমই যেন রংপুরকেন্দ্রিক। একটি জাতীয় রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম যেমন সারা দেশেই বিস্তৃত থাকে, এরশাদের মৃত্যুর আগে থেকেই তা অদৃশ্য হয়ে যায়। এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির রাজনীতি আরো রংপুরকেন্দ্রিক হয়ে যায়। এর প্রমাণ পাওয়া রংপুরে ঘটে যাওয়া জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ একটি ন্যাক্কারজনক কর্মকা-ে।
ডিও লেটারে স্বাক্ষর করাকে কেন্দ্র করে রংপুর-৩ আসনে জাতীয় পার্টির (জাপা) সংসদ সদস্য সাদ এরশাদ ও তার স্ত্রী মাহিমা এরশাদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। ২ জুন পল্লীনিবাসের মূল ভবনের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় নেতাকর্মীরা চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করেন। পরে সিটি মেয়রের অনুসারী নগরীর ২৭ নম্বর ওয়ার্ড জাপার সাধারণ সম্পাদক টিপু সুলতানকে (৩২) আটক করে পুলিশ।
রাতের এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ৩ জুন দিনভর উত্তপ্ত ছিল রংপুর। টিপু সুলতানের মুক্তির দাবিতে সিটি মেয়র ও মহানগর জাপার সভাপতি মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার নেতৃত্বে দলের নেতাকর্মীরা নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল করেন। এছাড়া পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করেছেন সাদ এরশাদ ও মেয়র মোস্তফা। এরপর এরশাদের বাড়ি পল্লীনিবাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২ জুন সাদ এরশাদের সঙ্গে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করার জন্য পল্লীনিবাসে যান মহানগর জাতীয় পার্টির ২৭, ২৮, ৩০, ৩১, ৩২ ও ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা। সেখানে সাদ এরশাদের কাছে স্বাক্ষরের জন্য একটি ডিও লেটার দেন টিপু সুলতান। স্বাক্ষর না করে ডিও লেটার ছিঁড়ে ফেলা হলে নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের মাঝে হাতাহাতি এবং চেয়ার-টেবিল ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
এক পর্যায়ে তাজহাট থানার পুলিশ ডেকে সাদ এরশাদ টিপু সুলতানকে ধরিয়ে দিলে আরেক দফা উত্তেজনা দেখা দেয় ও হাতাহাতি হয়। তবে স্ত্রীসহ সাদ এরশাদ অক্ষত থাকেন।
এ ঘটনার প্রতিবাদ ও টিপু সুলতানের মুক্তির দাবিতে ৩ জুন নগরীর সেন্ট্রাল রোডে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। তিনি অভিযোগ করেন, সাদ এরশাদ এমপি হওয়ার পর দলের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করেন না। কাউকে পল্লীনিবাসের বাসায় যেতে দেন না। কিছু সুবিধাবাদী বহিরাগত নিয়ে একটি বলয় তৈরি করেছেন। একটি ডিও লেটারে স্বাক্ষর নেয়ার জন্য গেলে টিপু সুলতানকে সাদ এরশাদ পুলিশ ডেকে ধরিয়ে দেন। আমরা তার নিঃশর্ত মুক্তি চাই।
সংবাদ সম্মেলনে মহানগর যুগ্ম সম্পাদক লোকমান হোসেন, জেলা জাপার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক, মহানগর যুব সংহতির সভাপতি জাকির, সম্পাদক শান্তি কাদেরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। পরে জাপার নেতাকর্মীরা সাদ এরশাদের বিরুদ্ধে নগরীতে বিক্ষোভ করেন।
এদিকে পল্লীনিবাসে স্ত্রীকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাদ এরশাদ বলেন, আমার বাবা এরশাদ মারা যাওয়ার পর এখানকার কিছু নেতা চান না এরশাদের পরিবারের লোকজন রাজনীতি করুক। এখানে কিছু নেতা আছেন, তারা তাদের কথামতো আমাকে চলতে বলেন। ডিও লেটারে স্বাক্ষর করিনি বলে আমাকে ও আমার স্ত্রীকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। জাতীয় পার্টিকে ধ্বংস করার জন্য একটি মহল আমাকে হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু করেছে, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ২ জুন রাতে। সংবাদ সম্মেলনে উভয় নেতাই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।
এ বিষয়ে তাজহাট থানার ওসি রোকনুজামান বলেন, হামলার ঘটনায় টিপু সুলতানকে আটক করা হয়েছে। তবে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। বিশৃঙ্খলা এড়াতে পল্লীনিবাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারা দেশ তো বটেই, রংপুরেই এমন ভঙুর অবস্থা হয়েছে জাতীয় পার্টির। করোনাকালে সরকার যখন মানুষকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে উদ্বুদ্ধ করছে, তখন রংপুরে জাতীয় পার্টি সরকারি নির্দেশকে উপেক্ষা করে মিছিল করছে, বিক্ষোভ করছে। সেই মিছিল, সেই বিক্ষোভ আবার নিজ দলের নেতারা, নিজ দলের নেতাদের বিরুদ্ধেই করছেন। এতে জাতীয় পার্টি যে রংপুরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক দলে পরিণত হয়েছে, সেই বিষয়টিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।