অর্থনীতি

৯০ বছরে সবচেয়ে বড় মন্দা আনবে করোনা: আইএমএফ পূর্বাভাস

নিজস্ব প্রতিবেদক
বহুমুখী সংস্থা বিশ্বব্যাংকের পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) করোনার প্রভাবে চলতি বছর শেষে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। একই সঙ্গে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে বিশ্বব্যাপী মহামন্দা সৃষ্টি হবে, যা ১৯৩০ সালের মহামন্দাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে আইএমএফ। এর মানে, গত ৯০ বছরে এমন মহামন্দা আর হয়নি। এ ক্ষেত্রে ২০২০ সালে লাখো মানুষের মৃত্যু এবং অর্থনৈতিক অভিঘাতের ব্যাপকতা এ দুটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।
১৫ এপ্রিল প্রকাশিত নভেল করোনা ভাইরাস নিয়ে আইএমএফের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার প্রভাবে চলতি বছর শেষে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশে নেমে আসবে। আগামী অর্থবছর তা বেড়ে ৯ শতাংশে উন্নীত হবে। যদিও বিশ^ব্যাংকের প্রতিবেদনের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ১৩ এপ্রিল এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধি হিসাব করার সময় এখনো আসেনি। ৮ মাসের তথ্য-উপাত্ত তাদের কাছে রয়েছে। এতে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপর হবে বলে মনে করেন তিনি।
পূর্বাভাসে আইএমএফ জানিয়েছে, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে চলতি অর্থবছরে বিশে^র অর্থনীতি ৩ শতাংশ ছোট হবে। আর চলতি অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশে নেমে আসবে। এর আগে বিশ্বব্যাংকও জানিয়েছে, করোনার প্রভাবে চলতি বছর শেষে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে। অবশ্য সব স্বাভাবিক হলে ২০২২ সালে বৈশি^ক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৫ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত হবে বলেও জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
করোনার প্রভাবে বিশ^ অর্থনীতির কী পরিমাণ ক্ষতি হবে তার একটি ধারণা দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান মহামারীতে চলতি অর্থবছরের বাকি সময় ও আগামী অর্থবছর মিলে বৈশি^ক জিডিপির ৯ ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থের ক্ষতি হবে। যেটা জাপান ও জার্মানির যৌথ অর্থনীতির চেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানি, ইতালি, কানাডা, ব্রাজিল, যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধি অনেক কমে যাবে বলে জানিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটি জানিয়েছে, এবারের মহামন্দায় বিশে^র অনেক দেশের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হবে।
আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথ বলেছেন, সারা বিশে^ গত তিন মাসে এক নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে; যেটা কেউই ভাবতে পারেনি। চীন থেকে সংক্রমণ হওয়া বৈশি^ক মহামারী করোনা ভাইরাস সব ওলট-পালট করে দিয়েছে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রাণহানির সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। প্রতিদিনই মানুষ মারা যাচ্ছে। করোনা ভাইরাসে নতুন নতুন আক্রান্ত হচ্ছে। সংক্রমণ ঠেকাতে সারা বিশ্ব এখন অবরুদ্ধ। যোগাযোগব্যবস্থা অচল। শিল্পকারখানা চলছে না। এটি এমন একটি দুর্যোগ যেখানে মানুষের মৃত্যু ঘটছে। জীবিকা বন্ধ হয়ে গেছে। জোগান ও চাহিদা দুটোতেই টান পড়েছে। এমন পরিস্থিতি বিশ্ব এর আগে কখনো দেখেনি। ১৯৩০ সালের মহামন্দাকেও ছাড়িয়ে যাবে ২০২০ সালের মহামন্দা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে মন্দার ঢেউ বাংলাদেশেও পড়বে। এর ব্যাপকতা কিংবা গভীরতা হবে অনেক বেশি। কারণ, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির বড় দুটি বাজার ইউরোপ ও আমেরিকা। করোনার প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে ইউরোপ ও আমেরিকা। ফলে রপ্তানিতে বড় ধরনের ধাক্কা খাবে বাংলাদেশ। এ ছাড়া প্রবাসীদের পাঠানো আয়েও বড় ধরনের ধাক্কা আসবে। কারণ এরই মধ্যে ছয় লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি দেশে ফিরে এসেছেন। যারা প্রবাসে আছেন, তাদের আয়ও কমে যাবে। বৈশি^ক ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়ায় মন্দাকে আরও দীর্ঘায়িত করবে বলে জানান অর্থনীতিবিদরা।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, করোনার প্রভাবে বৈশ্বক চাহিদা কমে গেছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদাও কমে গেছে। এতে রপ্তানিতে ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশ। মধ্যপ্রাচ্যে তেলের দাম কমে আসায় অসংখ্য কর্মী ছাঁটাই হবেন। ফলে আমরা আগের মতো মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রবাসী আয় পাব না। এসব কারণে
মহামন্দায় আমাদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। বিশ্ব এর আগে মহামন্দা দেখেছিল সেই ১৯৩০ সালে। যদিও ওই মন্দার সূত্রপাত হয়েছিল ১৯২৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পুঁজিবাজারে ধসের মধ্য দিয়ে। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মন্দা চলেছিল ১৯৩০ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত। যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারের ধস পরবর্তী সময়ে প্রভাব পড়েছিল সারা বিশ্বে।
আইএমএফ বলছে, ১৯৩০ সালের ওই মহামন্দাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে ২০২০ সালের মহামন্দা। এমনকি ২০০৮ সালের মন্দা এই মন্দার কাছে কিছুই না। ১৯৩০ সালের সঙ্গে চলতি বছরের মহামন্দার পার্থক্য সম্পর্কে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ১৯৩০ সালের মহামন্দা ছিল শুধু অর্থনৈতিক অভিঘাতকেন্দ্রিক। কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রভাবে মানুষের মৃত্যু, স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির সঙ্গে যোগ হয়েছে অর্থনৈতিক অভিঘাত। তা ছাড়া করোনা ভাইরাস বিশে^র সব দেশের অর্থনীতিকে স্থবির করে দিয়েছে। কিন্তু ১৯৩০ সালের মন্দায় সব দেশকে ক্ষতির মুখে ফেলেনি।
আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথ বলেছেন, করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সব দেশ কার্যত অবরুদ্ধ। যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন। কলকারখানা বন্ধ। মানুষ ঘরে বন্দি। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নেমে এসেছে স্থবিরতা। এ অবস্থা কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে তা-ও নিশ্চিত নয়। এসব কারণে বিশ্ব আরেকটি মহামন্দার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এখন স্পষ্ট যে ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার পর সবচেয়ে ভয়াবহ মন্দার সামনে দাঁড়িয়ে পৃথিবী। এটা এক দশক আগের ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দাকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে।