কলাম ফিচার

করোনাকালে আত্মশুদ্ধি ও আত্মজিজ্ঞাসা

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ
দ্রুত আমরা করোনার চলমান ওয়েভের পিক পয়েন্টের দিকে ধাবিত হচ্ছি, সংক্রমণ, আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা ঘোষিত-অঘোষিত মিলিয়ে বেড়েই চলেছে। এদিকে করোনার সংক্রমণ বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে অমানবিকতার বিস্তারও দেখছি আমরা। এমনকি লকডাউনের মধ্যে প্রচ- অমানবিক আচরণের শিকার হচ্ছে মানুষ। করোনায় আক্রান্ত বলে একটি পরিবারের শিশুসহ ছয়জনকে ঘরে আটকাতে ছয়টি তালা ঝুলিয়েছে প্রতিবেশীরা এমন ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে।
পরিবেশ প্রতিবেশে অভূতপূর্ব অনেক কিছুই ঘটছে, যা নিত্যবেদনা ও বিস্ময়ের উদ্রেক করে। করোনা সংক্রমণের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তনের মাত্রা এত ব্যাপক হতে চলেছে যে, এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা যেমন কষ্টকর, তেমনি নিকট অতীতকেও যেন স্মরণে আনার ফুরসত কমে যাচ্ছে। সবার মনেই এ প্রশ্ন জাগছে যে এর শেষ কোথায়?
করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয় এবং আক্রান্ত হলে অবহেলার আশঙ্কা বেড়ে চলেছে ব্যক্তি মানুষের মনে। অর্থনীতির সেই অনিবার্য শর্ত আর সব যদি ঠিক থাকে অর্থাৎ পরিবেশ, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা এবং অন্যের সাহায্য-সহযোগিতা আর নিজের মনোবল-বুদ্ধি-বিবেক-চিন্তাশক্তি ঠিকঠাক থাকলেই যেকোনো বয়সের মানুষের পক্ষে করোনা মোকাবিলা কঠিন হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আর সব তো ঠিক নেই, থাকছে না। ফলে এখন করোনা শুধু না অন্য যেকোনো ছোট-বড়-মাঝারি রোগ শোককেও ভয় পাচ্ছে মানুষ। এ ভয়ও পাচ্ছে যে, আক্রান্ত হলে কিংবা মারা গেলে তার পরিবার পরিজনকে এক ঘরে করতে লকডাউনে পাঠানো হবে, তার স্বাভাবিক জানাজা হবে না, সমাহিত হওয়ার ক্ষেত্রেও এক ধরনের অনীহা-অবজ্ঞা, এমনকি হাঙ্গামাও হতে পারে। এ সমস্যা যেন ব্যক্তিজনের, তার অন্যান্য আপনজন, পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজ এমনকি দেশ কর্তৃপক্ষও এখানে কেমন যেন উদাসীন ও প্রতিকারবিহীন।
এসব বাস্তব বিষয় বিবেচনায় এনেই স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায় বলা যায় মনরে! মনরে চল নিজের নিকেতনে। নিজে নিজে হতে হবে সচেতন, সাবধান। নিজেই নিজের শরীরের যতœ করা, মনকে ভালো খাবার দেয়া আর পরিবেশকে বান্ধব করে তোলার পদক্ষেপ নিতে হবে। কর্তৃপক্ষ যেমন বলেই দিয়েছেন, চিকিৎসক ও চিকিৎসার আশায় বসে না থেকে নিজেই দায়িত্বশীল হোন নিজের প্রতি।
ব্যক্তি নাগরিককে এখন বড় করুণ দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে ফিরে যেতেই হচ্ছে। তাকেই তার শক্তি ও সাহস এবং শান্তির প্রেরণা খুঁজতে হবে। নিজেকে নির্ভার করে তুলতে হবে। হিংসা, দ্বেষ, ঈর্ষা, রাগ, ক্ষোভ, ভয়, আশঙ্কা, সংকোচ, শঙ্কা, সংক্ষুব্ধতা সবই ত্যাগ করতে পারলে নিত্যনতুন উদ্যমে গৌরব প্রত্যাশায় উদ্বেল হয়ে উঠবে মন।
করোনা প্রতিরোধে অন্যতম অবলম্বন হতে পারে নিজের মনের জোর। শত-সহস্র উপায় হাতড়িয়ে কিন্তু টেকসই একটাই মাত্র পথ ও পন্থা পাওয়া গেছে ‘ঘরের বাহির না হওয়া এবং ঘন ঘন সাবান দিয়ে দুই হাত ধোয়া’। এর আধ্যাত্মিক ও আর্থসামাজিক তাৎপর্য ব্যাপক। বিশ্বনবী (সা.)-এর সুস্পষ্ট উপদেশ ছিল যে শহরে মহামারী, সে শহর থেকে কেউ বাইরে যাবে না এবং বাইরের কেউ সে শহরে আসবে না।
চীনের উহানে উদ্ভূত করোনা মহামারী আজ সারা বিশ্বে মানুষের যাতায়াতেই ছড়িয়েছে। আমাদের বাংলাদেশেই রাজধানী ও আশপাশের হটস্পটের মানুষদের গ্রামে ছুটি কাটানোর সুযোগ, ঈদ শপিংয়ে উদ্বুদ্ধ হওয়া এবং ঈদ উদযাপনের নামে জেলায় জেলায় যাওয়া-আসার মধ্য দিয়ে আজ পুরো দেশই হটস্পট হতে চলেছে। একদিকে ঘরের বাইরে না যাওয়ার আহ্বান, অন্যদিকে প্রচ- স্ববিরোধী ব্যবস্থাপনায় সবই বুমেরাং হয়ে দেখা দিচ্ছে। ভুক্তভোগী হচ্ছে একেকজন মানুষ। করোনাকালের প্রতিটি দিন নতুন নতুন আশঙ্কা, ভয় ও দুঃসংবাদের অবয়বে হাজির হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠারহিত ও দুশ্চিন্তাহীন জীবনযাপনে আত্মপ্রত্যয়ী হতে হবে, থাকতে হবে আশাবাদী।
আশাবাদী হওয়া এবং থাকার ব্যাপারে ইবাদত-উপাসনায় যার যার সৃষ্টিকর্তার প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণে এবং কর্মে নিবেদিত নিষ্ঠার মানসিকতায় জাগ্রত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। এই আশাবাদের ক্ষেত্রে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে যার যার সম্পর্কের বিষয়টির সূক্ষ¥ পর্যালোচনা হতে পারে। সৃষ্টিকর্তা মহীয়ান, গরীয়ান, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, পরম দয়ালু ও দাতা (রাহমানুর রাহিম)। আল্লার সার্বভৌমত্ব একক ও অদ্বিতীয়। এক বিস্ময়কর প্রক্রিয়ায় আমার জন্ম, শৈশব, কৈশোর, যৌবনকাল পেরিয়ে বর্তমান পর্যায়ে আমি উপনীত। এসেছিলাম একা, তারই বিধানমতো, আমার নিয়তির মতো আমি শেষ হয়ে যাব, চলে যাব একা একা। এখন প্রশ্ন হলো আল্লাহর সৃষ্টি আমি আমার নিয়ন্তার প্রতি আমার আত্মসমর্পণ (মুসলিমুন), নির্ভরশীলতা (তাওয়াক্কুল) ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের স্বরূপ কী?
করোনাকালে দেশে দেশে ধর্ম ও মতবাদে এ স্বরূপ সন্ধান ও আত্মস্থকরণের তাগিদ অনুভূত হয়েছে, হচ্ছে তীব্রভাবে। এই সেদিন ইতালির এক হাসপাতালে করোনাযুদ্ধে জয়ী ৯৩ বছর বয়সী রোগীকে রিলিজের দিন ভেন্টিলেশনে অক্সিজেন ব্যবহার বাবদ ৫০০০ ইউরোর একটা বিল ধরিয়ে দেয়া হয়। বৃদ্ধ কেঁদে দিলেন, চিকিৎসকরা বললেন, কাঁদছেন কেন, এটা মাত্র এক দিনের অক্সিজেনের বিল, অসুবিধা থাকলে এটি আপনাকে পরিশোধ করতে হবে না। বৃদ্ধ বললেন, আমি পুরো বিল পরিশোধ করতে পারব, কিন্তু আমার চিন্তা এবং ভয় সারা জীবন প্রকৃতি থেকে কত অক্সিজেন অবলীলায় পেয়েছি, এজন্য কোনো দিন কাউকে কিছুই দিইনি, দিতে হয়নি, বিধাতার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশও করিনি।
আল্লাহ আমাদের রব (প্রভু), হাবিব (বন্ধু) তিনি আমাদের ভুল শুদ্ধ উভয় পরিবেশ পরিস্থিতিতেও পালন করেন, রক্ষা করেন। আমরা আমাদের কর্মক্ষেত্রে, সংসারে জাগতিক নিয়মে আমাদের নিয়ন্ত্রককে ভয় পাই। মান্য গণ্য করি, তার হুকুম তামিলে তৎপর থাকি, তাকে খুশি করতে সমীহ করতে সচেষ্ট থাকি। কদাচিৎ তার অবাধ্য হই, তিনি মাইন্ড করতে পারেন এই চিন্তায় বা বোধ বিশ্বাসে চিন্তাভাবনায় সব সময় সতর্ক থাকি। সেখানে আমাদের সৃষ্টিকর্তার প্রতি, সব নিয়ন্ত্রকের নিয়ন্ত্রণ কর্তার প্রতি, তার হুকুম আহকাম পালনের প্রতি, তাকে সম্মান সমীহ করার ক্ষেত্রে তাকে ভক্তি ও ভয় করার ক্ষেত্রে এত অমনোযোগী, এত অবজ্ঞা অবহেলা কেন? কেন আমরা তারই আরেক সৃষ্টিকেই আমাদের উদ্ধারকারী ভাবি? কেন তার কাছে বিপদে উদ্ধার চেয়ে, উদ্ধার পেয়ে, পরে আমাদের বিচক্ষণতার জন্যই আমরা উদ্ধার পেয়েছি জাতীয় অহংকার ও গর্বে আমরা স্রষ্টাকে ভুলে যাই কেন? তিনি সামনে নেই বলে? তিনি সরাসরি আমাকে তিরস্কার করছেন না বলে? তার প্রতি আমার অগাধ আস্থা, তার একত্বের মহত্ত্বের স্বীকৃতিতে কেন কৃপণতা, ব্যত্যয়? তিনি ভুল ধরছেন না ভুল ধরার জন্য, তিরস্কার করার জন্য সশরীরে সামনে নেই বলে? তিনি অবশ্যই সর্বত্র বিরাজমান।
করোনাকালে আমাদের নিজেদের কর্মকা-ের এবং বোধ-বিশ্বাসের সালতামামি হতে পারে। নামাজের মধ্যে আল্লাহর সন্দর্শন সাক্ষাৎ (মেরাজ) হয়ে থাকে এটা জানি কিন্তু তার সঙ্গে সাক্ষাতের প্রটোকল কি প্রকৃত অর্থে মানি? তাহলে নামাজে অমনোযোগিতা আসে কীভাবে? কেন নামাজে যা পড়ছি তার প্রতি মনোযোগ থাকছে না। সব দেখেশুনে মনে হয় যেন অভিনয় করে চলেছি। কোরআনে আল্লাহ বলছেন, তোমরা একই অপকর্ম বারবার করো অথচ তোমরা কেতাব পড়ো, অর্থাৎ জেনেশুনেও তোমরা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করো। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো। মোনাজাতে এটাও বলছি, হে আল্লাহ যদি আমি বা আমরা ভুল করি তুমি আমাদের ভুলের জন্য পাকড়াও করোনা, আমাদের ওপর এমন বোঝা চাপাইও না, যেমন বোঝা অতীতের ভাইদের ওপর চাপিয়েছিল আমি যা বহন করতে পারি এমন বোঝা আমার ওপর দাও। [ সুরা বাকারা, শেষ আয়াত]।
এ মোনাজাত করছি কিন্তু বারবার তো একই ভুল করে চলেছি একই অবাধ্যতা চলছে। তাহলে ওই মোনাজাত কী? ওটা কি তাহলে মন থেকে বলছি না? আমরা এখনো মনের মধ্যে অন্যের অনিষ্ট কামনা করছি কি না এখনো মানবতাকে অপমান, অবমাননা, কারও কারও দাবি ও অধিকার হরণের মানসিকতায় আছি কি না, প্রবঞ্চনা-প্রতারণার পথ খুঁজে ফিরছি কি না এসবই নিজেকে নিজের মধ্যে আত্মজিজ্ঞাসায় আত্মানুসন্ধানে ব্যাপৃত হলেই মিলবে প্রভু নিরঞ্জনের ক্ষমা, ভালোবাসা, প্রেমদর্শন ও বিপদ থেকে উদ্ধার।
আমাদের উপলব্ধির উপলব্ধিতে আসুক: ঈড়ৎড়হধ, ঃযব ঢ়ধহফবসরপ ংববসং ঃড় যধাব ধৎৎরাবফ ঃড় ংযধশব ঁঢ় ঃযব ড়িৎষফ ঃড় ৎবসড়াব ধষষ ঃযব ফঁংঃ ড়ভ রহযঁসধহরঃু, রহবয়ঁধষরঃু, ষঁংঃ, মৎববফ, ভধষংবযড়ড়ফ, ধহফ ঢ়ৎরফব ঃযধঃ যধং বহমঁষভবফ ঃযব ড়িৎষফ রিঃয বারষ ধপঃং ড়াবৎ ধ ঢ়বৎরড়ফ ড়ভ ঃরসবৃ খবঃ’ং ৎবভষবপঃ, ৎবঢ়বহঃ ধহফ ষবধৎহৃ খবঃ’ং ধিংয ড়ঁৎ ঝঙটখঝ, হড়ঃ ড়হষু যধহফং!
লেখক: সাবেক সচিব এবং
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান