অর্থনীতি

করোনাকালে রপ্তানি আয়ে ধস অব্যাহত

স্বদেশ খবর ডেস্ক
করোনা ভাইরাসের প্রভাবে রপ্তানি আয়ে ধস অব্যাহত রয়েছে। বিশ^ব্যাপী স্থবির অর্থনীতিতে চাহিদা কমে যাওয়াকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরের মে মাসে রপ্তানি আয় গত বছরের একই সময়ের চেয়ে কমেছে প্রায় ৬২ শতাংশ। এর আগের মাস এপ্রিলে কমেছিল ৮৩ শতাংশ। তব করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি আয়ে এই নেতিবাচক প্রবণতা কমে আসবে বলে আশা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
৮ জুন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) দেয়া সর্বশেষ হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের মে মাসে দেশের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৪১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এ সময় আয় হয় মাত্র ১৪৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মে মাসের চেয়ে এই আয় ৬১ দশমিক ৫৭ শতাংশ কম। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ৬৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ। গত অর্থবছরের এই সময় আয় ছিল ৩৮১ কোটি ৩৩ লাখ ডলার।
উদ্যোক্তারা জানান, করোনার প্রভাবে আগের মাস গত এপ্রিলে স্মরণকালের সবচেয়ে কম আয় হয়েছে। এপ্রিলে মাত্র ৫২ কোটি ডলার রপ্তানি আয় অর্জিত হয়। আগের অর্থবছরের তুলনায় ৮৩ শতাংশ আয় কমেছে এপ্রিলে। মার্চে কিছুটা কম এলেও ওই মাসে করোনার প্রভাবটা পুরোপুরি বোঝা যায়নি। এ কারণে রপ্তানি হ্রাসের হারটা ছিল মোটামুটি সহনীয়। রপ্তানি কম ছিল ১৮ শতাংশ। তবে বিশ^বাজারে করোনার হানা বাংলাদেশের আগেই শুরু হওয়ায় ফেব্রুয়ারি ও মার্চ থেকেই রপ্তানি আদেশ কমতে শুরু করে। মার্চে নতুন রপ্তানি আদেশ প্রায় বন্ধ ছিল। এপ্রিলজুড়ে বলতে গেলে পণ্য জাহাজীকরণ হয়নি। মে মাসে কিছুটা রপ্তানি আয় বেড়েছে।
সার্বিকভাবে চলতি অর্থবছরের জুন থেকে মে মাস পর্যন্ত গত ১১ মাসে রপ্তানি কম হয়েছে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ। এই সময়ের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় কম হয়েছে ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ। এই সময়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ১৫৫ কোটি ডলার। রপ্তানি হয়েছে ৩ হাজার ৯৫ কোটি ডলারের পণ্য। গত বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৭৭৫ কোটি ডলার।
ইপিবির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ১১ মাসে তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমেছে ১৯ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রা থেকে আয় কম হয়েছে ২৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। মোট ২ হাজার ৫৭০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ১৭৩ কোটি ডলার।
টেরিটাওয়েলসহ পোশাক খাতের সমজাতীয় পণ্য মিলে মোট রপ্তানিতে পোশাক খাতের অবদান ৮৬ শতাংশ। এ খাতের উদ্যোক্তাদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ মাসের মধ্যে মে মাসে ওভেন ও নিট খাতে পোশাক রপ্তানি কমেছে যথাক্রমে ১৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ ও ১৯ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সঙ্গে কমেছে লক্ষ্যমাত্রাও।
জানা গেছে, করোনা ভাইরাসের কারণে ১ হাজার ১৫০ কারখানার ৩১৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। ৪৬০ কোটি টাকা মূল্যের হিমায়িত চিংড়ির ২৯৯টি ক্রয়াদেশ স্থগিত বা বাতিল করেছে বিদেশি ক্রেতারা। দুই মাস ধরে সবজি রপ্তানি বন্ধ। আসবাবে নতুন কোনো ক্রয়াদেশ আসছে না। আর চীনের কারণে গত জানুয়ারিতে প্রথম চামড়া খাতেই বিপর্যয় নেমেছিল। ইউরোপ ও আমেরিকায় করোনা জেঁকে বসার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি খাত টালমাটাল হয়ে পড়েছে। দিন যত গড়াচ্ছে, সংকট ততই বাড়ছে। রপ্তানি আয় ধারাবাহিক কমছে।
শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা বাড়ছে। কাজ না থাকায় কারখানাও বন্ধ হচ্ছে। করোনায় আক্রান্তের এই সময়ে এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে রপ্তানি খাত।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি ড. রুবানা হক স্বদেশ খবরকে বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে তিন মাস ধরে পোশাক রপ্তানি কমছে। এই সময়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। করোনায় আক্রান্ত সারা বিশ^। এ জন্য সামনের দিনগুলোতে পোশাক রপ্তানি আয় নিম্নমুখী থাকবে বলে আমি মনে করি।
অন্যান্য বড় পণ্যের মধ্যে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে ২১ শতাংশের বেশি। লক্ষ্যমাত্রা থেকে আয় কম হয়েছে ২৬ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৭৩ কোটি ৯৩ লাখ ডলারের পণ্য। গত বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৯৪ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। চিংড়িসহ হিমায়িত মাছের রপ্তানি কম হয়েছে ১০ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে ৪২ কোটি ৬৬ লাখ ডলারের পণ্য। বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্যের রপ্তানি কম হয়েছে ৮ শতাংশের বেশি। ৭৮ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়েছে গত ১১ মাসে।
করোনায় ছোট-বড় সব পণ্যেরই রপ্তানি প্রবাহের একই চিত্র। ব্যতিক্রম শুধু ওষুধ, আসবাব ও পাট। করোনাকালেও কাঁচা পাটসহ সব ধরনের পাটপণ্যের রপ্তানি বেড়েছে। পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৮১ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের পণ্য। একইভাবে ওষুধের রপ্তানি বেড়েছে ১ শতাংশের কিছু কম। যদিও লক্ষ্যমাত্রা থেকে রপ্তানি আয় ২১ শতাংশ কমেছে। মোট ১২ কোটি ডলারের ওষুধ রপ্তানি হয়েছে এ সময়।
অবশ্য, এ প্রসঙ্গে রপ্তানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি ও সাংসদ আব্দুস সালাম মোর্শেদী স্বদেশ খবরকে বলেন, রপ্তানি আয়ের এমন ধস নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কভিড-১৯-এ সাধারণ ছুটির ফলে এমনটা হয়েছে। তবে আশার কথা, আমাদের ক্রয়াদেশ আছে। ক্রেতাদের চাপও আছে। আগামী মাস থেকে এই আয় বাড়বে। এ ছাড়া জাপান, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়াসহ প্রচলিত বাজারগুলোতেও চাহিদা বাড়ছে।