প্রতিবেদন

করোনা সংক্রমণের নতুন ধাপে দেশ : অধিক সতর্কতার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে সংক্রমণ শনাক্তের ১০৩তম দিনে এসে করোনা ভাইরাসে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা এক লাখ ছাড়াল। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বে শীর্ষ আক্রান্ত যে ১৮টি দেশে লাখের ওপরে রোগী শনাক্ত হয়েছে, সে তালিকায় প্রবেশ করল দেশটি। শুধু তাই নয়, শনাক্ত রোগীর সংখ্যায় বিশ্বে ১৭ নম্বরে থাকা কানাডাকেও ছাড়িয়ে গেল বাংলাদেশ। ১৮ জুন, গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ৮০৩ জন। মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ১ লাখ ২ হাজার ২৯২ জনে। একই সময় আক্রান্তদের মধ্যে আরও ৩৮ জন মারা গেছেন। মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৩৪৩ জন।
লাখের ঘরে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে সংক্রমণের নতুন ধাপেও উন্নীত হলো বাংলাদেশ। গত ২৫ মের পর থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত প্রায় চার সপ্তাহ পরীক্ষা অনুপাতে মোট শনাক্তের হার গড়ে ২০ শতাংশের মধ্যে ছিল। এ হার ২০-২২ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। কিন্তু ১৮ জুনই প্রথম তা বেড়ে ২৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ হলো।
দেশে করোনা রোগীর সংখ্যা লাখ পেরোনোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দুই ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একদিকে পরীক্ষা অনুপাতে সংক্রমণের হার বেড়ে যাওয়ায় স্পষ্ট হলো যে দেশে সংক্রমণ বাড়ছে। একইভাবে লাখ পেরোনোর পর অধিকাংশ দেশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে যে, আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশে সংক্রমণের গতি আরও ঊর্ধ্বমুখী হবে। কারণ লাখের পর বিভিন্ন দেশে সংক্রমণ গতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। কারণ সংক্রমণের হার ও গতি বাড়লে আক্রান্ত ব্যক্তিরা আগের চেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষকে আক্রান্ত করবে। এমনকি অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের লাখের ঘরে পৌঁছতে সবচেয়ে বেশি সময় লাগায় দেশে করোনা মোকাবিলার দুর্বলতাও উঠে এসেছে। অন্য দেশগুলো সংক্রমণ দেখা দেয়ার পর দ্রুত বেশিসংখ্যক মানুষকে পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করে দ্রুত নিয়ন্ত্রণের পথে এগোতে থাকে। এর ফলে শনাক্তের সংখ্যা দ্রুত লাখের ঘরে পৌঁছায়। কিন্তু বাংলাদেশে পরীক্ষা কম হওয়ায় শনাক্তের সংখ্যাও লাখে পৌঁছতে দেরি হয়। তবে এ দেরির কারণে অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সংক্রমণ বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এমন পরিস্থিতিতে দেশে করোনা সংক্রমণের নতুন ধরনের উদ্বেগ তৈরি হলো বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ব্যাপারে দেশে করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, সংক্রমণের হার বাড়ল। এখন আরেকটা স্টেজে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ পরীক্ষা অনুপাতে শনাক্তের হার ২৩ শতাংশের ওপরে চলে যাচ্ছে। গড়ে ২০ শতাংশ ছিল। এরপর ২২ শতাংশ হলো। এখন ২৩ শতাংশ পার হলো। আরেকটা লেভেলে চলে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে উঠছে। নতুন মাত্রায় সংক্রমণের হারটা বেড়ে যাচ্ছে। এটা অবশ্যই উদ্বেগজনক। কিন্তু নিয়ন্ত্রণে তো কিছু করা হচ্ছে না।
বাংলাদেশের শনাক্তের সংখ্যা লাখ ছাড়াতে ১০৩ দিন লাগলেও শীর্ষ আক্রান্ত দেশগুলোর লেগেছে সর্বোচ্চ ৯৯ ও সর্বনিম্ন ৪৫ দিন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তের শীর্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম শনাক্ত হয় ২০ জানুয়ারি ও ২৯ মার্চ ৭০তম দিনে মোট রোগী লাখ ছাড়ায়। আক্রান্তের শীর্ষ তালিকা ধারাবাহিকতায় ব্রাজিলে ৭০তম দিনে, রাশিয়ায় ৯১তম দিনে, ভারতে ১১১তম দিনে, যুক্তরাজ্যে ৭৮তম দিনে, স্পেনে ৬৩তম দিনে, পেরুতে ৭৭তম দিনে, ইতালিতে ৬৩তম দিনে, চিলিতে ৯২তম দিনে, ইরানে ৭৮তম দিনে, জার্মানিতে ৭২তম দিনে, তুরস্কে ৪৫তম দিনে, পাকিস্তানে ১০৪তম দিনে, মেক্সিকো ৯৯তম দিনে, ফ্রান্সে ৮৩তম দিনে ও সৌদি আরবে ৯৯তম দিনে লাখ ছাড়ায়।
এশিয়ার ৪৯টি দেশের মধ্যে মাত্র ৬টি দেশে করোনা রোগী লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত ৪৫তম দিনে লাখ ছাড়িয়েছে তুরস্কে এবং সবচেয়ে দেরিতে ১১১তম দিনে লাখ ছাড়িয়েছে ভারতে।
দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে মাত্র তিনটি দেশে (ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ) রোগী লাখ ছাড়িয়েছে। বাকি চারটি দেশে (নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা) ১০ হাজারের কম করে রোগী আছে। আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১১ দেশের কোনোটিতেই রোগী লাখ পেরোয়নি।
অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে শনাক্তের সংখ্যা লাখে পৌঁছতে দেরি হওয়া প্রসঙ্গে বিশ্ব
স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, আমাদের দেশে সংক্রমণের যে হার ও গতি দেখছি, এ দুটোই টেস্টের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আমরা যত টেস্ট করেছি, শুধু ততই সংক্রমণ পেয়েছি। যখন টেস্ট বেশি হয়েছে, তখন সংক্রমণ বেশি পেয়েছি। কিন্তু পৃথিবীর অন্যান্য দেশ অধিক জনসংখ্যার লোককে টেস্ট করেছে। যেমন কোরিয়া প্রতিদিন ২০ হাজার টেস্ট করেছে, ভুটানের মতো দেশ প্রতি লাখে দুই হাজারের বেশি টেস্ট করেছে। ফলে টেস্ট যত বেশি হবে সংক্রমিত লোককে ততবেশি চিহ্নিত করা সহজ হবে। তাহলে আমাদের কাজ হলো যারাই সংক্রমিত হচ্ছে, তাদের আটকানো। মানে হাসপাতালে আইসোলেশনে নেয়া। আমরা কিন্তু সেটা করিনি। বেশিরভাগ লোক হাসপাতালে যাওয়ার চেয়ে নিজে নিজে বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিয়েছে। এই বাড়িতে চিকিৎসা নেয়াটাও সংক্রমণ বাড়িয়েছে। কারণ বাড়িতে সঠিকভাবে সবকিছু মানা সম্ভব নয়। যে কারণে অন্য লোকের হয়েছে।
অবশ্য লাখে পৌঁছানোর দেরিকে ভিন্নভাবে দেখছেন অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমাদের এখানে একসঙ্গে অনেক রোগী আসেনি। ইউরোপে ও চীনে একসঙ্গে অনেক লোক আক্রান্ত হয়েছে। ওদের অবস্থাটা একটু আলাদা ছিল। আমাদের ধীরে ধীরে হয়েছে। আমরা সময় পেয়েছি। কিন্তু নিয়ন্ত্রণে কাজ করিনি। সচেতনতা সৃষ্টি করেছি। মাস্ক পরতে বলেছি। কিন্তু নিয়ন্ত্রণে মূল কাজটা করিনি। চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াইনি। এগুলো কিন্তু তিন মাসে করা যেত। করেনি। আমরা যেগুলো টেস্ট করে যাদের শনাক্ত করছি তাদেরই তো ঠিকমতো আইসোলেট করছি না। করলেই তো কমে যেত। গত ২৪ ঘণ্টায় যে ৩ হাজার ৮০০-এর মতো আক্রান্ত হলো, এরাই তো সংক্রমণ ছড়াচ্ছে।
লাখের ঘর ছাড়ানো ও সংক্রমণের হার বৃদ্ধির ফলে কী ধরনের উদ্বেগ তৈরি হলো প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, সংক্রমিত লোকের সংস্পর্শে যারা এসেছে, সেই সংখ্যাটা তিন-পাঁচ হতে পারে। গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় চার হাজার শনাক্ত হয়েছে। একেকজন সংক্রমিত লোক যদি গড়ে তিনজনকে সংক্রমিত করে, আমাদের দেশে এ সংখ্যা পাঁচের বেশি হবে। কারণ এখানে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। সংস্পর্শে বেশি লোক আসে। সে হিসাবে প্রতিদিন ২০ হাজার লোককে কোয়ারেন্টিনে নেয়ার কথা (স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় হোম ও
প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে নেয়া হয়েছে ২ হাজার ৮২১ জনকে)। আমরা কিন্তু সেটা নিচ্ছি না। ফলে যারা সংস্পর্শে আসছে, তাদের মধ্যে যারা সংক্রমিত, তারা ছড়াচ্ছে। সুতরাং নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যা যা করার দরকার, সেটা করা হচ্ছে না। সংক্রমণ বাড়ছে।
এদিকে লাখ পেরোনোর পর অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সংক্রমণের গতি আরও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে বলে মনে করছেন এ দুই বিশেষজ্ঞ। তাদের মতে, যেহেতু এখন বেশিসংখ্যক আক্রান্ত হবে সেহেতু আক্রান্তরা আরও বেশিসংখ্যক মানুষকে সংক্রমিত করবে।
বিশ্ব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত যে ১৮টি দেশে করোনা শনাক্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে, তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ২২ লাখ, ব্রাজিল ৯ লাখ, রাশিয়া ৫ লাখ, ভারত ৩.৬৬ লাখ পার করেছে। শীর্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্রে দিনে সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার ৯৩০ জন শনাক্ত হয়েছে গত ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত। এখনো দিনে ২০ থেকে ২৫ হাজার করে শনাক্ত হচ্ছে। অন্যদিকে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সংক্রমণ এখন বাড়ছে। রাশিয়া ৮৯ দিনে প্রথম এক লাখ শনাক্ত করে। এরপর গড়ে প্রতি ১০ দিনে এক লাখ পার করতে থাকে দেশটি। আর ব্রাজিল প্রথম এক লাখ ছাড়ায় ৬৮ দিনে। এরপর ১১ দিনে আরও এক লাখে এবং ৬ দিনে পরের এক লাখ পার করে দেশটি। গত ২৭ মে থেকে প্রতি চার দিনে নতুন করে এক লাখ শনাক্ত হচ্ছে দেশটিতে। ভারতে দিনে ১০ হাজারের বেশি ও পাকিস্তানে ৭ হাজারের বেশি শনাক্ত হচ্ছে। ভারতে প্রথম এক লাখ পার হতে সময় লেগেছে ১১০ দিন। এরপর মাত্র ১৫ দিনেই আরও এক লাখ যুক্ত হয়। এরপর ১০ দিনে আরও এক লাখ। অন্যদিকে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে ৮ মার্চ, তার ১০ দিনের মাথায় প্রথম মৃত্যুর খবর আসে। প্রথম রোগী শনাক্তের ২৮ দিন পর ৬ এপ্রিল শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১০০
ছাড়ায়। ১৪ এপ্রিল এক হাজার ছাড়ায় শনাক্ত রোগী। এরপর ৪ মে ১০ হাজার, ১৫ মে ২০ হাজার এবং ২ জুন ৫০ হাজার ছাড়িয়েছিল শনাক্ত রোগীর সংখ্যা। পরের ১৬ দিনেই শনাক্ত রোগীর সংখ্যা এক লাখ ছাড়াল।
এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উপায় সম্পর্কে অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে তিনটা ‘টি’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ টেস্টিং, কন্টাক্ট ট্রেসিং ও ট্রিটমেন্ট। এর মধ্যে সঠিক ট্রেসিং করছি না। এটা ডব্লিউএইচওর পরামর্শ। সেটা সঠিকভাবে মানছি না। টেস্টের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ টেস্টিং করছি। খুবই কম টেস্ট হচ্ছে। সুতরাং আমরা নিয়ন্ত্রণে যে ব্যর্থতা, তা তো দেখাই যাচ্ছে। আবার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে সেটাও পাচ্ছি না। উপজেলা হাসপাতালে আইসোলেশনের ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে অক্সিজেন, অক্সিজেন ক্যানোলা ও অক্সিজেন মাস্ক নেই। এই তিনটা জিনিস সমৃদ্ধ আইসোলেশন দরকার। এ কারণে অনেক রোগী উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে না। অথচ এটা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া জেলা হাসপাতালে আইসিইউ বেড, ভেন্টিলেশন, অক্সিজেন মাস্ক ও সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সরবরাহ নেই। সুতরাং সেখানেও অনেক রোগী যাচ্ছে না।
একমাত্র যখন বেশি শ্বাসকষ্ট হয়, তখনই শুধু হাসপাতালে যায়। এমনকি মানুষ বাসায় অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে রাখছে। কিন্তু আমরা কি জানি কখন অক্সিজেন নিতে হবে? জানি না। এটা মনিটর করতে হবে। একজন ডাক্তার ও নার্স থাকতে হবে। কখন কমছে-বাড়ছে, সে অনুযায়ী অক্সিজেন দিতে হবে। এগুলো সংক্রমণ বাড়ানোর কারণ।
এ বিশেষজ্ঞ বলেন, নিয়ন্ত্রণ করার দরকার ছিল আক্রমণাত্মক গতিতে বা পথে। কিন্তু আমরা করছি উল্টো। করোনা এগোচ্ছে, আমরা পেছনে পেছনে দৌড়াচ্ছি। নিয়ন্ত্রণে গতি এমন হতে হবে যাতে আমরা করোনার গতিকে অতিক্রম করতে পারি। সেটা হচ্ছে না। ফলে বাড়ছে।