কলাম

চুপচাপ থাকো, মানিয়ে নাও!

চিররঞ্জন সরকার
স্কুল থেকে ফেরার পথে কিছু ছেলে নিয়মিত মেয়েটিকে ‘টিজিং’ করে। মেয়েটি এক দিন বাড়ি ফিরে মাকে জানায়। মা শোনেন, তারপর নরম গলায় বলেন, ছেলেরা একটু অমন করেই থাকে। তুই ওদের দিকে তাকাস না। একটু মানিয়ে নে। আদরের মেয়েটিকে বিয়ে দেয়ার সময়ও বারবার মানিয়ে চলার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়। সেজন্য হয়তো আদরের মেয়েটি সংসার টিকিয়ে রাখার স্বার্থে পরিবার থেকে প্রাপ্ত ‘মানিয়ে চলো’ শিক্ষার কারণে শ্বশুরবাড়ির লোকদের নানাবিধ অত্যাচার মুখ বুঝে সহ্য করে। বাংলাদেশের হাজার হাজার নারী এভাবে মানিয়ে নেয়ার দুর্বিপাকে পড়ে জীবন খুইয়ে চলেছে। তারপরও মানিয়ে নেয়ার শিক্ষা আমরা দিয়েই যাচ্ছি।
অফিসে অন্যায়ভাবে আপনাকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। সুপারভাইজার বাজে আচরণ করছে। একজন শুভাকাক্সক্ষী সহকর্মীর সঙ্গে শেয়ার করুন। সেও বলবে, অফিসে এমন হয়েই থাকে। একটু মানিয়ে নিন, অ্যাডজাস্ট করে চলুন। সমাজে এটা বেশ প্রচলিত তত্ত্ব যে, বস ইজ অলয়েস রাইট। কাজেই বস যদি ঠিক নাও থাকেন তারপরও বসের কথা শুনতে হবে বা বসের আদেশ পালন করতে হবে। নিজের বিবেকবুদ্ধি দিয়ে যেটা যেটা অন্যায় বলে মনে হচ্ছে, বসের আদেশ বলে সেটাই করতে হচ্ছে। নিজের বিচার-বুদ্ধি-বিবেক বা চিন্তাশক্তি এখানে প্রবলভাবে ব্যর্থ। নিয়োগকর্তার প্রতি আনুগত্য হয়তো প্রত্যাশিত। নিয়োগকর্তা বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ মেনে চলা অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বের মধ্যেও পড়ে। তেমনিভাবে নিয়োগকর্তারও উচিত অধস্তন কর্মীকে প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না করা। বঞ্চিত করলে সেটাকে কখনোই সততা বলে ধরে নেয়া যায় না। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে হামেশাই দেখা যায় অধিকার হরণের ঘটনা, যা কর্মীর মনোবল দুর্বল করে দেয়। তারপরও সবাই মেনে নিয়ে এবং মানিয়ে নিয়েই চলছে!
আমাদের সমাজে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সন্তান-সন্ততিদের মানিয়ে চলা বা খাপখাইয়ে নেয়ার শিক্ষাটা বেশ জোরেশোরেই দেয়া হয়। জীবনে চলার ক্ষেত্রে প্রতি পদে আমরা শিখি এই অ্যাডজাস্ট করা বা মানিয়ে নেয়ার শিক্ষা! সেটা অন্যায়-অবিচার হলেও। এই মানিয়ে চলার অর্থই হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে অন্যায়ের সঙ্গে এক ধরনের আপস করা। অন্যায়কারীর সঙ্গে সমঝোতা করে টিকে থাকা। এভাবে সৃষ্টি হচ্ছে একটি প্রতিবাদহীন ‘মানিয়ে নেয়া’ প্রজন্ম।
হ্যাঁ, পরিস্থিতি বিবেচনায়, বাস্তবতার কারণে হয়তো অনেক সময় মানিয়ে নিতেই হয়। মানিয়ে নেয়ার কোনো বিকল্প থাকে না। কিন্তু সব ক্ষেত্রে মানিয়ে নেয়ার প্রবণতা কি সুস্থ এবং স্বাভাবিক বলে গণ্য হতে পারে? আসলে সবকিছুকে মানিয়ে নিতে নিতে এখন এমন একটা অবস্থায় আমরা পৌঁছে গিয়েছি, যখন কোথাও অন্যায়, অবিচার হতে দেখলে আমরা প্রতিবাদে না করে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টাটাই সবার আগে করি। সে দুর্নীতি দেখলেও, অন্যায় হতে দেখলেও! খুন, ডাকাতি, ধর্ষণ, জুলুম দেখলেও। রাষ্ট্রশক্তির অন্যায়-অনাচার-জুলুম দেখলেও। মানিয়ে চলার মধ্যেই যেন মেলে এক ধরনের আত্মতুষ্টি! বড়রা ছোটদের বলবে, মানিয়ে চলো। ছোটরাও বিশেষ পরিস্থিতিতে বড়দের বলবে মানিয়ে চলতে। আমরা ছোট-বড় নির্বিশেষে শিখে গিয়েছি মানিয়ে চলতে!
বলা হয়, অন্যায়কারী আর অন্যায়ের সমর্থনকারী সমান অপরাধী। কিন্তু আমরা এটা বিশ্বাস করি না। আমরা বরং প্রবলভাবে বিশ্বাস করতে শিখেছি যে, বোবার কোনো শত্র“ নেই। সেজন্য আমরা কথা বলতে পারলেও বলি না, বোবা সেজে থাকি অথবা বোবা বানানোর চূড়ান্ত আয়োজন বিদ্যমান থাকায় বোবার মতো আচরণ করি। অহেতুক শত্র“ সৃষ্টি করে কী লাভ? সব সময় সবার কাছে সমান গ্রহণযোগ্য হওয়ার মানসে অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে মুখ বুজে থাকি এবং শত্র“-মিত্র, অন্যায়কারী, সবার সঙ্গে সমঝোতা করে চলি। কিন্তু প্রশ্নটা দাঁড়ায়, এভাবে আর কত দিন? আর কত দিন মানিয়ে চলতে হবে? অনেকের কাছে হয়তো মানিয়ে চলাই চলতি সময়ের পক্ষে সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতি! তাতে কারও সঙ্গেই অশান্তিতে জড়াতে হয় না! এভাবে দেখলে বেশির ভাগ পরিস্থিতিই মোটামুটি এড়িয়ে চলা সম্ভব। তা সে বিপদই হোক বা আপদ! আর এই ভাবনাটাই ভালো করে বুঝেছে শাসকযন্ত্র। সাধারণ মানুষের মনের এই সুবিধাবাদী নীতিকে দেখেই শাসক বুঝতে পারে, তারা কত দূর অবধি মানিয়ে নিতে পারে।
পৃথিবী বদলায়, সমাজ পাল্টায়। তাও মানিয়ে নেয়ার মধ্যে যে নেতিবাচক মনোভাবই কাজ করে, তা বোধ হয় আমরা বুঝেও না-বোঝার ভান করি। কিন্তু সমাজের মধ্যে এক শ্রেণির মানুষও থাকেন, যারা এই নেতিবাচক দিকের কুফল বুঝেই মানিয়ে নেয়ার ‘সংস্কৃতি’র বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। তাদেরই শাসক তথা সমাজপ্রভুরা দেশদ্রোহী বা সমাজের পক্ষে ক্ষতিকর বলে অভিহিত করে। রাজনীতির খেলায় মানিয়ে নেয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই করে যাওয়া মানুষজনকেই আক্রমণের শিকার হতে হয় চিরকাল।
আমরা সারা পৃথিবীর যেকোনো মানিয়ে নেয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদকেই দুহাত তুলে সমর্থন জানাই! অথচ, ঘরের পাশে অন্যায় ঘটলে, মানিয়ে নেয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হলে তাকে কতটা স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন করি, সে এক বিরাট প্রশ্ন! কেউ প্রতিবাদ করলেই তাকে আগে থেকে স্থির করা কিছু তকমা দিয়ে দেগে দিয়ে বিষয়টাকে সরলীকৃত করে তোলার চেষ্টা করি। আবার তার প্রতিক্রিয়ায় কেউ প্রতিবাদ করলে তাকেও আক্রমণ করতে দ্বিধা বোধ করি না। সমস্যার গভীরে না গিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি আর যত সেই সিদ্ধান্তকে নিজেদের মনের মতো যুক্তিতে বাঁধতে যাই, ততই তা শাসকের সমর্থন পায়। মূল সমস্যাকে গৌণ করে অন্য সমস্যাকে মুখ্য করে তোলা হয় এভাবেই।
আমরা অনেক কিছুই মেনে নিয়েছি! রাষ্ট্রশক্তির যথেচ্ছাচার মেনে নিয়েছি! সংকীর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি! আসলে, এই মানিয়ে নেয়াই এখন আমাদের ‘সংস্কৃতি’! কিন্তু মুশকিল হলো, সবাই তো আমাদের মতো নয়! কেউ কেউ তো একটু অন্যভাবেও ভাবতে পারেন! পৃথিবীর যেকোনো দেশেই প্রতিবাদ মূলত নবীন প্রজন্মই করে। ছাত্রসমাজই করে। তা সে তিয়েনআন মেন স্কয়ারই হোক বা টিএসসি কিংবা শাহবাগে অথবা যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই হোক। ছাত্রসমাজই এই মানিয়ে নেয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে। তাই চিরকাল শাসকের চক্ষুশূল বুদ্ধিদীপ্ত উজ্জীবিত ছাত্রছাত্রীরাই। সমস্যা হলো, ছোট মাপের রাজনীতি নবীন প্রজন্মকে দিশা না দেখিয়ে নিজেদের ফায়দা তোলার জন্যই ব্যস্ত থাকে। এটাই গণতন্ত্রের করুণ বাস্তবতা!
আমরা এক সর্বনাশা ভাবনায় আচ্ছন্ন। ‘কী হবে এসব করে’ বা ‘ঝামেলা বাড়িয়ে কী লাভ’, আমাদের এই নির্বিকার অবস্থান ক্রমেই দৈত্যদের অবাধ বিচরণের পথ করে দিচ্ছে। আমরা মেনে নিতে শিখে গিয়েছি আর ভেবে নিয়েছি, যাই ঘটুক না কেন, আমাদের কিছু হবে না!
এক অন্য রকম ঝরা সময় এখন। সব সময় নিরাপত্তাহীনতা আর আতঙ্ক সর্বস্তরে সর্বক্ষেত্রে বয়ে চলেছে। প্রতিবাদে মুখর হওয়াই সম্ভবত পরিত্রাণের পথ। কিন্তু শাসকের কাছে কতটা সেই প্রতিবাদ পৌঁছাতে পেরেছে, সেটা প্রশ্ন। পরিবর্তন কখনোই প্রবীণরা একা আনতে পারেননি। সব সময়ই উদ্যম দেখিয়েছে যৌবনই। তা সে রাশিয়ায় বিপ্লবই হোক বা আমেরিকার পুলিশি ব্যবস্থা পরিবর্তনের চলমান আন্দোলনই হোক। বাংলাদেশে প্রতিটি অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে কিন্তু তরুণসমাজই রুখে দাঁড়িয়েছিল।
সব ধরনের অন্যায়-অপকর্ম আমরা নির্বিকার চিত্তে মেনে নিচ্ছি আর অন্য প্রান্ত আরও উৎসাহিত হচ্ছে। সর্বস্তরে যেভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ হওয়া দরকার, তা হয়ে উঠছে না। যাদের প্রতিবাদ করার কথা তারাও কেমন যেন চুপচাপ! আসলে, ওই মানিয়ে নেয়ার অভ্যাস! আর আমরা অভ্যাসের দাস! সমস্যার গভীরে গেলে দেখা যায়, যেকোনো সমস্যার ক্ষেত্রে দিশাহীনতাই এ দেশে প্রকটভাবে দেখা দিচ্ছে। নেই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি। নেই সমস্যা থেকে উত্তরণের কোনো আন্তরিক উদ্যোগ।
এদিকে ক্রমেই সমাজ দেহের দগদগে ঘা উন্মোচিত হচ্ছে। সবখানে অনিয়ম, সবখানে দুর্নীতি, অনাচার। অথচ আমরা এজন্য কোথাও কোনো কার্যকর প্রতিবাদের ভাষা রচনা করতে পারছি না। রাজনীতির খেলায়, মানিয়ে নেয়ার খেলায় আজ অভ্যস্ত আমরা! যাই ঘটুক, চুপচাপ থাকো, মানিয়ে নাও! মানিয়ে নাও, সবকিছু মানিয়ে নাও!
না, সব ক্ষেত্রে মানিয়ে নেয়া বা মেনে নেয়ার শিক্ষা থেকে আমাদের বের হয়ে আসার সময় হয়েছে। সমস্ত স্তাবকতা, ভীরুতা আর আপসকামিতার ঊর্ধ্বে উঠে আসুন আমরা প্রতিবাদী হই।
লেখক: লেখক ও কলামনিস্ট