প্রতিবেদন

জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : করোনার ভয়ে মানুষকে না খেয়ে মরতে দিতে পারি না

নিজস্ব প্রতিবেদক
মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন প্রধনমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, রাজনীতি করতে গিয়ে নাসিম ভাইকে সব সময় আমার পাশে পেয়েছি। রাজনীতিতে পাশে থেকে যারা সাহস ও সমর্থন দিয়েছেন, তারা একে একে আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। নাসিম ভাইয়ের পর ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ ভাইও চলে গেলেন। এটা আমার জন্য খুবই দুঃখজনক।
সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ও ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহর মৃত্যুতে ১৪ জুন জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘করোনার ভয়ে তো আমরা মানুষকে না খাইয়ে মারতে পারি না। তাদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থাটা আমাদের নিতে হবে। যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি, সেখানে লকডাউন করে তা আটকানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ আমি সংসদে আসব। কিন্তু অনেক জায়গা থেকে আমাকে সংসদে আসতে নিষেধ করা হয়েছিল। ভীষণভাবে বাধা দেয়া হয়েছে।’ বলা হয়েছে, ‘না না, আপনি যাবেন না, নেত্রী যাবেন না।’ তা আমি বললাম, ‘হুমকি, বোমা, গ্রেনেড কত কিছুই তো মোকাবিলা করে করে এ পর্যন্ত এসেছি। এখন কী একটা অদৃশ্য শক্তির ভয়ে ভীত হয়ে থাকব।’
সরকারপ্রধান বলেন, ‘পার্লামেন্টের মেম্বার, আমাদের আওয়ামী লীগের পরিবারের একজন সদস্য তাকে হারিয়েছি। আমাদের কেবিনেটের একজন সদস্য তাকেও হারালাম। আর সেখানে আমি সংসদে যাব না, এটা তো হয় না।’
করোনা সংক্রমণে আজ সারা বিশ্বই আতঙ্কিত উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই আতঙ্কটা এমন পর্যায়ে চলে যাচ্ছে যেটা সত্যি খুব দুঃখজনক। এখানে উন্নত দেশ, অনুন্নত দেশ বা উন্নয়নশীল দেশ, অস্ত্রের দিক থেকে শক্তিশালী, অর্থের দিক থেকে শক্তিশালী অথবা হয়তো দরিদ্র রাষ্ট্র কোনো ভেদাভেদ নেই। সব যেন এক হয়ে গেছে এক করোনা ভাইরাসের ভয়ে ও আতঙ্কে। সব জায়গায় কিন্তু একই অবস্থা। আমেরিকা থেকে শুরু করে আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় এই ওয়েবটা চলছে।’
করোনা পরিস্থিতিতে গভীর শোকার্ত পরিবেশে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বক্তৃতার সময় শোকে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন শেখ হাসিনা। অনেক কষ্টে তিনি বক্তব্য শেষ করেন। রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে প্রয়াত দুই নেতার অবদানের কথা তুলে ধরেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।
প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যের শুরুতেই বলেন, মাননীয় স্পিকার, অত্যন্ত কষ্ট নিয়ে এখানে দাঁড়াতে হচ্ছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে মোহাম্মদ নাসিমের অবদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘তাকে ১৪ দলের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। কারণ তিনি সবাইকে নিয়ে চলতে পারতেন। শরিক দলের সদস্যরাও তাকে ভালো জানতেন। তিনি সফলতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মৃত্যুতে বিরাট ক্ষতি হয়েছে নিঃসন্দেহে।’
শেখ আবদুল্লাহর মৃত্যুতে যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ হওয়ার নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১০টা-সাড়ে ১০টার দিকে শুনলাম তিনি খুব অসুস্থ। তাকে হাসপাতালে নিতে হবে। তার বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে না নিয়ে নেয়া হলো সিএমএইচে। কিন্তু জাহাঙ্গীর গেট পার হতে না হতেই তার আরেকটা হার্ট অ্যাটাক হলো এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনটা অ্যাটাক। রাত ১১টা বাজে খবর এলো তিনি নেই। এই যে একই দিনে দুজনের মৃত্যু আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোহাম্মদ নাসিমের বাবা মোহাম্মদ মনসুর আলী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে রাজনীতি করতেন। যখন ছোট ছিলাম সেই সময় মোহাম্মদ নাসিম ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের একটা পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। সব থেকে বড় কথা, ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক যখন মোহাম্মদ নাসিমের বাবাকে ডেকে নিয়ে যায় মন্ত্রী হওয়ার জন্য, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি কী করে ভাবলে আমি তোমার মন্ত্রিসভায় আসব? তা কখনই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৫ আগস্ট আমাদের বাসায় আক্রমণ হয়েছে শুনে মনসুর আলী অনেক চেষ্টা করেছিলেন, এমনকি বাসা থেকে চলে গিয়েছিলেন কিছু করা যায় কি না। যেহেতু মোশতাকের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এ জন্য জাতীয় চার নেতার সঙ্গে তাকেও কারাগারে হত্যা করা হয়।’
মোহাম্মদ নাসিম একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর আমার একটা প্রচেষ্টা ছিল শহীদ পরিবারগুলোর ছেলেমেয়েদের নিয়ে আওয়ামী লীগকে আরও ঐক্যবদ্ধ করা। রাজনীতি করতে গিয়ে নাসিম ভাইকে সব সময় আমার পাশে পেয়েছি। এটা ঠিক যে চলার পথ এত সহজ ছিল না। সে প্রতিটি ক্ষেত্রে আমার পাশে থেকেছে, সমর্থন দিয়েছে।’