ফিচার

ডিপ্রেশন নিয়ে কিছু ভুল ধারণা

ডা. সাদমান শাবাব হাসান
মেজর ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডার বা ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন বর্তমানে অন্যতম প্রধান একটি মানসিক রোগ। অনেকের কাছে ডিপ্রেশন কেবল বিষণè মেজাজ যা আপনা-আপনিই দূর হয়ে যায়। আবার অনেকের কাছে ডিপ্রেশন কেবল কিশোর বয়সের আবেগমাত্র। এসব ভুল ধারণাই চিকিৎসার প্রধান অন্তরায়।

কারণ
ডিপ্রেশনের প্রকৃত কারণ অজানা থাকলেও রোগসৃষ্টিকারী বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে জানা গিয়েছে। এর মধ্যে জেনেটিক উপাদান অন্যতম। প্রথম জীবনের মানসিক বঞ্চনা ও দুর্দশা পরবর্তী জীবনে ডিপ্রেশন সৃষ্টি করতে পারে। দুশ্চিন্তা ও রোগব্যাধি এটিকে আরও বাড়ায়। মস্তিষ্কের সেরোটোনিন ও নরএড্রেনালিন নামক পদার্থের ঘাটতি এবং অনিয়ন্ত্রিত কর্টিসল হরমোন বৃদ্ধিকে ডিপ্রেশন সৃষ্টির রাসায়নিক ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। কিছু স্নায়বিক ও হরমোনের রোগ এবং কিছু ওষুধ যেমন স্টেরয়েড ও জন্মনিরোধক পিল সরাসরি মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে ডিপ্রেশন ঘটাতে পারে। গর্ভাবস্থায়ও ডিপ্রেশন হওয়ার ঝুঁকি অনেক।

লক্ষণ
বিষণè মন ও আগ্রহহীনতা/ আনন্দহীনতা ডিপ্রেশনের প্রধান লক্ষণ; এর সঙ্গে নৈরাশ্যবাদ, অপরাধবোধ, আত্মসম্মানবোধের অভাব, আত্মঘাতী ভাবনা, খাদ্যে অরুচি, ক্লান্তি, ঘুমের ব্যাঘাত, ওজনে পরিবর্তন ও ধীরগতি যদি দুই সপ্তাহের অধিক সময় ধরে উপস্থিত থাকে তবে তাকে মেজর ডিপ্রেশন ধরা যায়। এগুলোর মধ্যে ২-৪টি লক্ষণ উপস্থিত থাকলে সেটি মাইনর ডিপ্রেশন হিসেবে চিহ্নিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে মেজর ডিপ্রেশনে রূপ নিতে পারে। ডিপ্রেশন তুলনামূলকভাবে নারীদের ও ১৮-২৫ বছর বয়সীদের বেশি হলেও আত্মহত্যার ঝুঁকি পুরুষ ও বয়স্কদের বেলায় বেশি। লক্ষণে মিল থাকায় এডজাস্টমেন্ট ডিজঅর্ডার বা ডিসথাইমিয়াকে ডিপ্রেশন ভেবে ভুল হতে পারে।

করণীয়
সর্বপ্রথমে রোগীর পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের রোগীর প্রতি সহমর্মী হতে হবে। রোগী পুরুষ বা নারী যেই হোক না কেন; যেকোনো বয়সেরই হোক না কেন; তাকে অবহেলা বা উপহাস করা যাবে না। এজন্য উচিত প্রথম থেকেই পারিবারিক মেলবন্ধন দৃঢ় করা এবং একে অপরের সঙ্গে মুক্তভাবে কথা বলার অভ্যাস করা। অবসাদের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে আগে তার সঙ্গে মানবিকভাবে কথা বলতে হবে, যেন সে কোনোভাবে লজ্জিত না হয়। তাকে বুঝতে ও বোঝাতে হবে। অনেকের কার্যকলাপ দেখে মনে নাও হতে পারে সে অবসাদগ্রস্ত, সেক্ষেত্রে তার প্রতি মনোযোগ বাড়াতে হবে।
অনেকের ধারণা, চিকিৎসা যেহেতু সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনোরোগবিদ করেন, তাই সমাজ রোগীকে পাগল ভাববে। এই ভয়ে অনেক রোগীকে চিকিৎসকের কাছে নেয়া হয় না। আবার অনেকের ধারণা, একবার এ রোগে ওষুধ খাওয়া শুরু করলে সারা জীবন খেতে হবে। এসব ভুল ধারণা থেকে বের হওয়া জরুরি। অন্যান্য রোগের মতোই এ রোগের উপযুক্ত চিকিৎসা প্রয়োজন। দ্রুত চিকিৎসা হলে দ্রুত আরোগ্য মিলবে। চিকিৎসক রোগীর আচরণ ও মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ওষুধ বা সাইকোথেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা শুরু করেন। কেবল ওষুধের মাধ্যমেই প্রায় তিন-চতুর্থাংশ রোগী সুস্থ হয়ে যায়। সুস্থ হওয়ার পর এক বছর ওষুধ চালিয়ে ধীরে ধীরে তা কমিয়ে আনা হয়। ওষুধের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকায় ক্রমাগত চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকা প্রয়োজন।

ডিপ্রেশনের নানা ধরন
ডিপ্রেশন মনের এলোমেলো অবস্থা। মন খারাপ, দুঃখ পাওয়া, রাগ বা প্রিয় কিছু হারালে সাধারণত মানুষের জীবনে ডিপ্রেশন জায়গা করে নেয়। ডিপ্রেশন বাড়তে থাকলে এর প্রভাব পড়ে প্রতিদিনের জীবনে। আর্থরাইটিস, অ্যাজমা, হার্টের সমস্যা থাকলে, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, ওবেসিটি সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা ডিপ্রেশনে পড়লে তাদের শারীরিক অবস্থা দিন দিন আরও খারাপ হতে পারে। ডিপ্রেশনের নানা ধরন হয়। কিছু হয়তো মেজাজের ওপর প্রভাব ফেলে, কিছু শরীরে। তবে ধরন বিভিন্ন সময় বদলায়। পুরুষ, নারী এমনকি শিশুভেদেও ডিপ্রেশনের ধরন হয় বিভিন্ন রকম।