প্রতিবেদন

ধীরে ধীরে করোনা সংক্রমণ জয় করছে পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই পুলিশ সদস্যরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছিলেন। মে মাসে সংক্রমণ লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছিল। একপর্যায়ে বাহিনীতে আক্রান্ত ২৬ শতাংশে পৌঁছে যায়। তবে সংক্রমণরোধে কর্তৃপক্ষের সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং শনাক্তের প্রাথমিক পর্যায়ে আদর্শ চিকিৎসা নিশ্চিত করায় চলতি মাসে আক্রান্তের সংখ্যা কমে এসেছে। বর্তমানে ২৩ দশমিক ২ শতাংশ পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত। সুস্থতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ দশমিক ৯২ শতাংশে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
পুলিশ হেডকোয়ার্টাস জানায়, পুলিশের সবচেয়ে বড় ইউনিট ডিএমপিতে প্রায় ৩৪ হাজার ফোর্স রয়েছে। এদের মধ্যে ২ হাজার ৫০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। আর সারা দেশে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ক্যাডার কর্মকর্তাসহ পুলিশে ফোর্স রয়েছে ২ লাখ ১২ হাজার। এখন পর্যন্ত মোট ৮ হাজার ৬৬৬ সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ৩০ জন। সুস্থ হয়েছেন ৫ হাজার ৩৫৫ জন। সুস্থদের বেশিরভাগই আবার কাজে যোগ দিয়েছেন।
এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিতে গিয়েই পুলিশের ৩০ সদস্য জীবন দিয়েছেন, অনেকে আক্রান্ত। তাদের অবদান জাতি ভুলবে না। মহামারী আমাদের আরও মানবিক পুলিশ হিসেবে মানুষের মনে স্থান করে দিয়েছে। করোনায় মৃতদেরও যখন স্বজনরা ফেলে যাচ্ছে, পুলিশ তাদের দাফন-সৎকার করছে। ফলে সাধারণ মানুষ এখন পুলিশের ভূয়সী প্রশংসা করছে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান, করোনা আক্রান্ত বাহিনীর সদস্যদের চিকিৎসায় রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে (সিপিএইচ) ১৫টি আইসিইউ, ১৪টি হাই-ডিপেন্ডেসি ইউনিট (এইচপিইউ) ও ২৫০টি শয্যা রয়েছে। মে মাসে ব্যাপকহারে সংক্রমণ দেখা দিলে বেসরকারি ইম্পালস হাসপাতাল ভাড়া নেয়া হয়। আর দ্রুত ট্রাফিক পুলিশ ব্যারাক-১ ও ২, ১১০ শয্যার একটি হাসপাতালকে অস্থায়ীভাবে ৩৫০ শয্যা এবং গোয়েন্দা প্রশিক্ষণ স্কুলে (ডিটিএস) অস্থায়ী ১১০টি শয্যা প্রস্তুত করা হয়। বর্তমানে এসব হাসপাতালে রোগীর চাপ কমে গেছে। এখন ট্রাফিক পুলিশ ব্যারাক-১-এ ১৬০, ট্রাফিক পুলিশ ব্যারাক-২-এ ২১৯ এবং ডিটিএসে মাত্র ৩৫ রোগী ভর্তি আছেন।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) সাইফুল ইসলাম শান্ত বলেন, ‘শুরুর তুলনায় পুলিশে সংক্রমণের হার কমে এসেছে। আমাদের নির্ধারিত হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা ও পরিচর্যা দেয়া হচ্ছে। রোগীদের মানসিক শক্তি বাড়াতে সম্ভব সবকিছুই করা হচ্ছে। এর ফলে রোগীরা দ্রুত সেরে উঠছেন।’ তিনি
আরও বলেন, ‘সিপিএইচসহ অস্থায়ী হাসপাতালগুলোতে ১২০ চিকিৎসক, ১৩০ নার্স ও ৮০ ওয়ার্ড বয় নিরলসভাবে কাজ করছেন। তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনে চিকিৎসা দিচ্ছেন। গরম পানি, জিঙ্ক, ভিটামিন সি, খনিজ পদার্থ, প্রোটিন ছাড়াও রোগীদের মৌসুমি ফল দেয়া হচ্ছে। কর্মরতদের সচেতন করা হচ্ছে। এসব পদক্ষেপেরই সুফল আসতে শুরু করেছে।’
করোনাজয়ী রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে কর্মরত সাদ্দাম হোসেন জানান, শনাক্তের পর ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু রাজারবাগ পুলিশ লাইনস হাসপাতালে চিকিৎসকদের আন্তরিক সেবা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকিতে মনোবল ফিরে পান। দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন।
ডিএমপির ওয়ারী থানার এসআই সাইফুল ইসলাম জানান, সেবামূলক কাজে তারা ভয় পান না। করোনাকালে মানুষের পাশে দাঁড়ানো অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। দায়িত্ব পালনের সময় পরিবারের কথাও মনে থাকে না। তবে ঘরে ফেরার সময় যদি তার কারণে পরিবারের কেউ আক্রান্ত হয়, এ নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকে। এজন্য বাড়তি সতর্কতা নেন বলে জানান তিনি।
কর্মকর্তারা জানান, করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউন, জননিরাপত্তা ছাড়াও অসহায়দের খাদ্যসহায়তা দিচ্ছে পুলিশ। লকডাউন এলাকায় পাহারা, কোয়ারেন্টিনে থাকা ব্যক্তিদের নজরদারি, রোগীকে হাসপাতালে আনা, মৃতদের দাফন ও সৎকারে গিয়েই সংক্রমিত ও অনেক সদস্যের মৃত্যু হচ্ছে। তবে এ মহামারীতে পুলিশের এক নতুন মানবিক ভাবমর্যাদা মানুষের মধ্যে গড়ে উঠেছে। এখন সতর্কতা হিসেবে ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের প্রয়োজন না হলে থানার বাইরে দায়িত্বে পাঠানো হচ্ছে না। তিন-চার ধাপে ভাগ করে ডিউটি দেয়া হচ্ছে। যাতে একটি অংশ সংক্রমিত হলেও অন্যরা কাজ চালিয়ে নিতে পারেন। আক্রান্তদের দেখাশোনায় গঠন করা হয়েছে বিশেষ টিম।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, ‘পুলিশের মাঠকর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে। সিনিয়র কর্মকর্তা ও লাইন চিফরা বিভিন্ন ইউনিটে গিয়ে কথা বলা ছাড়াও হাসপাতাল ভিজিট করছেন। পরিবারের সদস্যদের খোঁজ রাখছেন। পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ ও তার ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে। এসব কারণে এখন সদস্যরা কম সংক্রমিত হচ্ছেন।’