ফিচার

পোশাক-পরিচ্ছদে শিষ্টাচার

মুফতি নূর মুহাম্মদ রাহমানী
পোশাক মানুষের সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের পরিচায়ক। এর মাধ্যমে মানুষের রুচিবোধ ও পছন্দজ্ঞান সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়। পোশাক পরিধানে মানুষের ব্যক্তিত্ব যেমন আলো ছড়ায়, তেমনি যথাযথভাবে না পরলে তা ব্যক্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই পোশাকের ব্যাপারে সচেতনতা একান্ত কাম্য।
ইসলামে কোনো পোশাককে আলাদাভাবে ভিন্ন মর্যাদা দেয়া হয়নি। মৌলিক কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছে মাত্র। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পোশাক-পরিচ্ছদে পরিবর্তন হতে পারে; তবে পোশাক পরার যে লক্ষ্য তা যেন ব্যাহত না হয়। যে পোশাক মানুষের চলাফেরা রুদ্ধ করে দেয়, মুরুব্বিদের সামনে দাঁড়াতে কুণ্ঠিত হতে বাধ্য করে, সেটা আদর্শ পোশাক হতে পারে না। আবহাওয়া ও জলবায়ু ভেদে পোশাক ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু কোনো অশালীন পোশাক কখনই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। নিুে পোশাকের কয়েকটি শিষ্টাচার নিয়ে আলোচনা করা হলো।
নতুন পোশাক পরার সময় নতুন পোশাক পরিধান করার সময় আল্লাহর প্রশংসা ও হামদ বর্ণনা করে দোয়া পড়তে হয়। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ফারুক (রা.) বলেন, যখন কোনো ব্যক্তি নতুন পোশাক পরিধান করে, তখন তার জন্য রাসুল (সা.) কর্তৃক নির্দেশনা মোতাবেক এই দোয়া পড়া ‘আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি কাসানি মা ওয়ারি বিহি, ওয়া আতাজাম্মালু বিহি ফি হায়াতি।’ অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহপাকের জন্য, যিনি আমাকে স্বীয় স্পর্শকাতর স্থান আবৃতকারী পোশাক পরিধান করিয়েছেন। আর এর মাধ্যমে আমি জীবনকে সাজিয়ে তুলি। (মাআরিফুল কোরআন: ৩/৫৩৪-৫৩৫)

পুরনো পোশাক
নতুন পোশাক বানানোর সময় পুরনো পোশাক গরিব-অসহায় মানুষকে দান করে দেয়া উচিত। কেননা, মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি নতুন পোশাক পরিধান করার পর পুরনো পোশাকটি অসহায়-দরিদ্রদের দান করে দেবে, সে মৃত্যু ও জীবনের সর্বাবস্থায় আল্লাহতায়ালার জিম্মাদারি এবং আশ্রয়ে এসে গেল।’ (মাআরিফুল কোরআন: ৩/৫৩৫)

অহংকার নয়
এমন পোশাক কখনই পরিধান করা উচিত নয়, যার দ্বারা অহংকার এবং গরিমা প্রকাশ পায়। কেননা কারও জন্যই অহংকার ও বড়ত্ব সৌন্দর্য নয়। যদি কেউ এ কাজ করে অহংকারে লিপ্ত হয়, তার ব্যাপারে নবীজি (সা.)-এর নির্দেশনা হলো, ‘যা ইচ্ছা খাও। যা ইচ্ছা পরিধান করো। এই দুটি জিনিস যেন তোমাকে ভুল ও গোনাহে লিপ্ত না করে, একটি হলো অপচয়। অপরটি হলো অহংকার। (সহিহ বোখারি, হাদিস: ২/৮৪০)

অমুসলিমদের ধর্মীয় পোশাক
ইসলাম অমুসলিমদের পোশাক থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে বলেছে। কারণ, তাদের পোশাক গ্রহণ করলে তাদের সঙ্গে সাদৃশ্যতা তৈরি হয়। আর অন্য ধর্মাবলম্বীদের সাদৃশ্যতা অবলম্বন করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন নবীজি (সা.)। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি কোনো গোত্রের সাদৃশ্যতা অবলম্বন করবে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন তাদের সঙ্গে তার হাসর হবে। (মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল ২/৫০)

টাখনুর ওপরে
পুরুষদের লুঙ্গি, সালোয়ার, প্যান্টসহ যেকোনো পোশাক টাখনুর ওপরে পরিধান করতে হবে। কেননা টাখনুর নিচে কাপড় ঝোলানোর ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর শাস্তির বাণী এসেছে। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘টাখনুর যে অংশ লুঙ্গির নিচে থাকবে, ওই অংশ জাহান্নামে যাবে। (সহিহ বোখারি, হাদিস: ৫৭৮৭)

রেশমি কাপড়
পুরুষদের জন্য রেশমি কাপড় ব্যবহার করা জায়েজ নেই। এর থেকে বিরত থাকতে হবে। নারীদের জন্য রেশমি কাপড় পরিধান করা সম্পূর্ণ বৈধ। হাদিস শরিফে এসেছে, নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য রেশমি কাপড় এবং স্বর্ণ ব্যবহার করা হারাম; কিন্তু নারীদের জন্য তা হালাল। (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১৭২০)

গাঢ় লাল ও হলুদ পোশাক
পুরুষদের জন্য গাঢ় লাল এবং হলুদ পোশাক পরা মাকরুহ। তবে হালকা রঙের পোশাক পরিধান করতে পারবে। (রদ্দুল মুহতার: ১/১৪৭)

নারী ও পুরুষের পোশাক
পুরুষরা মহিলাদের পোশাক পরিধান করবে না এবং নারীরাও পুরুষদের পোশাক পরবে না। এমনটা করলে নবীজি (সা.)-এর বদ দোয়ার উপযুক্ত হতে হবে। হাদিস শরিফে এসেছে, আল্লাহর রাসুল (সা.) নারীদের সাদৃশ্যতা অবলম্বনকারী পুরুষ ও পুরুষদের সাদৃশ্যতা অবলম্বনকারী নারীদের ওপর অভিসম্পাত করে বলেছেন, ‘হে মুসলমানরা! এ ধরনের লোকদের তোমরা নিজেদের ঘর থেকে বের করে দাও। (সহিহ বোখারি, হাদিস: ৫৫৪৭)

আঁটসাঁট পোশাক
যে পোশাক যেটা শরীরের সঙ্গে আঁটসাঁট হয়ে লেগে থাকে সে ধরনের পোশাক পরা থেকে বিরত থাকা আবশ্যিক কর্তব্য। হাদিসে এমন পোশাক পরিহিতা নারীদের পোশাক পরার পরও নগ্ন বলা হয়েছে। যাদের জন্য দোজখের শাস্তির বাণীও উচ্চারিত হয়েছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১২৮)
দোজখে এমন এমন লোক যাবে, যাদের মধ্যে ওই সব নারীও থাকবে যারা কাপড় পরা সত্ত্বেও নগ্ন ছিল।

মিহি-পাতলা পোশাক
এমন পাতলা পোশাক পরা নারীদের জন্য জায়েজ নেই, যাতে পোশাকের অভ্যন্তরের অঙ্গ প্রকাশ পায়। পুরুষদের জন্যও ওই ধরনের পাতলা পায়জামা বা লুঙ্গি পরা জায়েজ নেই। অবশ্য পুরুষদের অন্যান্য পোশাক পাতলা হলে অসুবিধা নেই। কেননা পুরুষের সতর শুধু পায়জামা, প্যান্ট কিংবা লুঙ্গি দ্বারা ঢেকে যায়। (ফাতাওয়া দারুল উলুম ১/১৪৮)

মানানসই পোশাক
পুরুষ ও নারীরা সর্বদা এমন পোশাক পরা উচিত, যা তাদের জন্য আভিজাত্য ও সৌন্দর্যের পরিচায়ক হয়। পারতপক্ষে এমন পোশাক পরা উচিত নয়, যাতে সৌন্দর্যহীনতা প্রকাশ পায়। কেননা আল্লাহ পাক বলেন, হে আদম সন্তান! প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা সুন্দর পোশাক পরিধান করবে। (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)
সাধ্য অনুযায়ী সুন্দর পোশাকমুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন, পোশাককে সৌন্দর্য বলে ব্যক্ত করা হয়েছে। এর দ্বারা একটি মাসলাও প্রকাশ পায় যে নামাজে উত্তম হলো, শুধু সতর ঢাকে এতটুকু পোশাককে যথেষ্ট মনে না করে; নিজের সাধ্যানুযায়ী সুন্দর পোশাক পরার চেষ্টা করা। নবীজি (সা.) এর নাতি হুসাইন (রা.)-এর অভ্যাস ছিল নামাজের সময় সবচেয়ে উত্তম ও উৎকৃষ্ট পোশাক পরা। তিনি বলতেন, আল্লাহতায়ালা সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন; এজন্য আমি মহান আল্লাহর জন্য সৌন্দর্য গ্রহণ করছি। অতঃপর উপরোক্ত আয়াতটি তিনি তিলাওয়াত করতেন।’ (মাআরিফুল কোরআন: ৩/৫৭৩)