প্রতিবেদন

বাজার সয়লাব নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজারে কড়া নজরদারির পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর অনেক ফার্মেসিতে নকল ও ভেজাল স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জাম হ্যান্ড স্যানিটাইজার-স্যাভলন বিক্রি হচ্ছে। কেউ বেশি মুনাফার আশায় আবার কেউ না বুঝে নকল ও অননুমোদিত এসব হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং স্যাভলন বিক্রি করছেন। অনেক নামিদামি ফার্মেসিতেও মিলছে এসব ভেজাল পণ্য। বিক্রয়কারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে ঢাকা জেলা প্রশাসন ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। তার পরেও থেমে নেই এসব নকল পণ্য বিক্রি।
চিকিৎসকরা বলছেন, এসব নকল ও ভেজাল হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং স্যাভলন শরীরের ত্বকের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি। এছাড়া এগুলো করোনা প্রতিরোধে কোনো ভূমিকাই রাখে না।
ভেজাল এসব পণ্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনাকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করে মুনাফা বৃদ্ধির আশায় এসব নকল ও ভেজাল পণ্য বিক্রি করছেন তারা। এসব পণ্য সরবরাহকারীরা ফার্মেসিতে পণ্য দিয়ে বলে বিক্রি করে টাকা দিয়েন। এছাড়া অনেকে বিদেশি পণ্য বলে বিভিন্ন ব্রান্ডের এসব ভেজাল পণ্য বিক্রি করছেন।
ঢাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহনাজ হোসেন ফারিবা বলেন, শাহবাগ ও আজিজ সুপার মার্কেট বাংলাদেশের মেডিসিনের সেন্ট্রাল মার্কেট। সেখানে এসব ভেজাল পণ্য বিক্রি হচ্ছে। অভিযান পরিচালনার সময় ফার্মেসি মালিকরা জানান, তাদের কাছে সরাসরি বিক্রেতা এসে বলছে সচেতনতার জন্য হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানানো হয়েছে। দেখেন তো বিক্রি করতে পারেন কি না। কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে বলে, বিক্রি করে টাকা দিয়েন। কিছু ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে এগুলো বানানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, স্যাভলন হাতে নিয়ে গন্ধটা চেক করতে চাইলাম, আমার হাত ৬ ঘণ্টা ধরে জ্বলেছে। হাত অনেকটা পুড়ে গেছে। দোকানের এগুলো কোনটা আসল কোনটা নকল তা বুঝতে পারা খুবই কঠিন।
নকল স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রয়কারীদের বিরুদ্ধে করোনাকালীন অভিযান অব্যাহত থাকবে জানিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগ) মো. আবু আশরাফ সিদ্দিকী বলেন, ‘করোনা মহামারীর এই দুর্যোগের সময় কিছু অসাধু এবং বিকৃত রুচির লোক লাভবান হওয়ার জন্য মানুষকে প্রতারিত করে যাচ্ছেন। ভেজাল হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ওষুধ, মাস্ক যারা বিক্রি করছেন তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা করোনাকালীন একটি চলমান প্রক্রিয়া।’
সম্প্রতি রাজধানীর শাহবাগ, আজিজ সুপার মার্কেট এবং তোপখানা রোড এলাকায় বিভিন্ন ফার্মেসিতে ঢাকা জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়েছে। অভিযানের সময় দেখা গেছে এসব এলাকার মেসার্স শাহরীন ড্রাগস, মেসার্স মুক্তি ড্রাগ স্টোর, মেসার্স ওয়ার্ল্ড ফার্মা, মেসার্স সেবা মেডিসিন কর্নার, মেসার্স মেডিকোর্স ফার্মেসি এবং মেসার্স ভুঁইয়া ফার্মেসিতে নকল ও অননুমোদিত হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং স্যাভলন বিক্রি হচ্ছে। নকল সুরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রির দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ৪১ ধারা এবং ড্রাগ অ্যাক্ট ১৯৪০ এর ২৭ ধারায় ৮টি মামলায় ৫১ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহনাজ হোসেন ফারিবা। এর আগে শাহবাগ ও হাতিরপুল এলাকায় ভুয়া হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিক্রির অপরাধে চার মামলায় ১২ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করে ঢাকা জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। শাহবাগে সুপর্ণা ড্রাগল্যান্ডকে স্যাভলন বিক্রির জন্য ১০,০০০ টাকা অর্থদ- প্রদান করা হয়েছে। আর হাতিরপুলে রাস্তায় ভুয়া স্যানিটাইজার বিক্রির জন্য ৩টি মামলায় ২৫০০ টাকা অর্থদ প্রদান করা হয়েছে। দুটি অভিযানে সার্বিক সহায়তা করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) এস এম শামীম।
এস এম শামীম বলেন, ‘করোনাকালীন কেউ যেন নকল স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রি করতে না পারেন সে বিষয়ে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে বাজার থেকে নকল সুরক্ষা সরঞ্জাম দূর করা পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ওষুধ প্রশাসনকে আরও জোরদার ভূমিকা রাখতে হবে।
এদিকে রাজধানীর কোতোয়ালি থানাধীন বাবুবাজার ও মিটফোর্ড এলাকায় নকল ও ভেজাল স্যানিটাইজার তৈরির অপরাধে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে তাদের তৈরিকৃত ১৯০০ লিটার নকল ও ভেজাল স্যাভলন এবং ৫০০ লিটার নকল ও ভেজাল হেক্সিসল উদ্ধার করা হয়।
কোতোয়ালি থানার ওসি মো. মিজানুর রহমান বলেন, চক্রটি করোনার কারণে এই দুই নম্বরি ব্যবসা শুরু করেছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে কেমিক্যাল কিনে এনে নকল ও ভেজাল স্যাভলন ও হেক্সিসল তৈরি করে বাজারজাত করছে। গ্রেপ্তারদের রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে বিস্তারিত জানা যাবে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক শেখ আব্দুল্লাহ বলেন, এসব ভেজাল হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা স্যাভলন ব্যবহারে যাদের শরীরে অ্যালার্জি থাকে তাদের ত্বকে একজিমা বা অ্যালার্জিজনিত চুলকানি বা ক্ষত দেখা দিতে পারে। এছাড়া এগুলো তৈরিতে যদি খারাপ ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করে তাহলে হাতের কেমিক্যাল ড্যামেজ হতে পারে যেটা স্থায়ীভাবে ত্বকের ক্ষতি করতে পারে। আবার ওই কেমিক্যাল যদি দীর্ঘ সময় হাতে লাগানো থাকে ত্বকের কোনো কাটা দিয়ে যদি রক্তে মিশে যায় তবে নানা রকম সমস্যা হতে পারে। এসব ভেজাল হ্যান্ড স্যানিটাইজার করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে কোনো কাজে আসবে না।