অর্থনীতি

ভালো কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের শেয়ারবাজার অনেক দিন ধরেই খুব নড়বড়ে। তার ওপর যুক্ত হয়েছে করোনা ভাইরাস মহামারীর আঘাত। টানা ৬৬ দিন বন্ধ থাকার পর গত ৩১ মে থেকে শেয়ারবাজারে আবার লেনদেন চালু হলেও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। নতুন করে চালুর পর ১৬ কার্যদিবস লেনদেনে এখনো পর্যন্ত প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) একশ কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হয়েছে মাত্র ৫ কার্যদিবস। এ পরিস্থিতিতে ২১ জুন ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন লেনদেনের রেকর্ড হলো। এদিন লেনদেন ডিএসইতে হয়েছে মাত্র ৩৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা। ২০০৭ সালের ২৩ এপ্রিলের পর এত কম লেনদেন আর হয়নি।
আসলে শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক পতন ঠেকাতে আগেই বাজারে শেয়ারের সর্বনিম্ন মূল্যস্তর বেঁধে দেয়ায় এখন সূচকের বড় ধরনের পতনের সুযোগ নেই। শেয়ারের সর্বনিম্ন মূল্য বেঁধে দেয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও বড় বড় বিনিয়োগকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা কিছুটা অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন। আর শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা নানা জটিলতা আর আইনি ফাঁকফোকর তো আছেই। এ অবস্থায় মন্দ কোম্পানির আইপিও বন্ধ করতে জোরদার পদক্ষেপ গ্রহণ করার ইতিবাচক ঘোষণা দিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) নতুন চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম।
২০ জুন সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল রিসোর্সেস লিমিটেড আয়োজিত পুঁজিবাজার, মুদ্রাবাজারসহ সংশ্লিষ্ট খাতে ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য প্রভাববিষয়ক এক ওয়েব সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে স্থানীয় ভালো ভালো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন বক্তারা।
এক্ষেত্রে ব্যাংক থেকে বর্তমানে কম সুদে ঋণ পাওয়া, তালিকাভুক্ত হলে নানা ধরনের কমপ্লায়েন্সের মধ্যে আসার বাধ্যবাধকতাসহ কিছু সমস্যার কথাও তুলে ধরেন তারা। একই সঙ্গে বিগত সময়ে আইপিওতে আসা বিভিন্ন কোম্পানির মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা।
এই পরিপ্রেক্ষিতে এসইসি চেয়ারম্যান বলেন, আগামী দিনে কোনো মন্দ কোম্পানির আইপিও যাতে আসতে না পারে, সে জন্য ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে কমিশন। তিনি বলেন, কোনো আইপিও অনুমোদনের আগে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ভালোভাবে যাচাই করা হবে। কোম্পানি পরিদর্শন করা হবে। এ বিষয়ে এনবিআর, বাংলদেশ ব্যাংক ও এফআরসিসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে কাজ করবে কমিশন।
দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর অনুমোদন নিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া মানহীন বিভিন্ন কাগুজে কোম্পানি শেয়ারবাজারে বিশৃঙ্খলার একটি অন্যতম কারণ। এসব কোম্পানির কারণে বিপুল সংখ্যক সাধারণ ক্রেতা প্রতারিত হন। আবার অনেক কোম্পানি বাস্তবে ক্রিয়াশীল থাকলেও খারাপ ব্যবস্থাপনা আর অসৎ উদ্দেশ্যের কারণে ক্রেতারা প্রতারিত হন। সবচেয়ে বড় জালিয়াতি করা হয় আর্থিক প্রতিবেদন তৈরিতে। অভিযোগ রয়েছে এ ধরনের মানহীন কোম্পানিগুলো এনবিআর, ব্যাংক আর শেয়ারবাজারের জন্য প্রয়োজনানুসারে আলাদা আলাদা তিনটি আর্থিক প্রতিবেদন বানিয়ে জমা দেয়। এমন জালিয়াতি রোধে এসইসির নতুন চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম যে পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তা হয়তো একটি ভালো সমাধান নিয়ে আসতে পারে। তিনি জানিয়েছেন, এখন সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল-এফআরসির কাছে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন থাকবে। এফআরসির ওয়েবসাইট থেকে সেই প্রতিবেদন অনুসরণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক, এসইসি ও এনবিআর। ফলে আগামী দিনে তিন ধরনের ব্যালান্সশিট বানিয়ে তিন জায়গায় দেয়ার সুযোগ থাকবে না।
প্রস্তাবিত বাজেটে শেয়ারবাজারকে চাঙ্গা করতে যেসব পদক্ষেপ আশা করা হয়েছিল তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি। এসইসি চেয়ারম্যানও বলছেন, বাজেটে পুঁজিবাজার সম্পর্কিত কিছু ইস্যু মিস হয়ে গেছে। পুঁজিবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তিন বছরের লক-ইন আরোপ, তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির করপোরেট কর হারের ব্যবধান ১০ শতাংশ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা, জিরো কুপন বন্ডের কর সুবিধা তুলে নেয়ার মতো কিছু প্রস্তাবনা আছে, যা পুঁজিবাজারের জন্য অনুকূল নয়। এটা সত্যি যে, ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিলেও তিন বছর বাজারে টাকা ফেলে রাখতে হলে কেউই বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ অবস্থায় শেয়ারবাজার ঠিক করতে সবার আগে দরকার সুশাসন নিশ্চিত করা আর বিনিয়োগকারীর আস্থা ফেরানো। একই সঙ্গে সরকারি ভালো কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনার এক যুগ ধরে ঝুলে থাকা প্রক্রিয়া দ্রুত ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সরকারি-বেসরকারি, দেশি-বিদেশি ভালো কোম্পানিগুলোই পুঁজিবাজারের বড় শক্তি হয়ে ওঠার কথা। নতুন কমিশন সে লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে সেটাই কাম্য।