প্রতিবেদন

যে কারণে ঢাকা ছাড়ছে নিম্ন আয়ের মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজশাহীর আতিকুল ইসলাম স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে বাস করেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। চাকরি করতেন নারায়ণগঞ্জে একটি পোশাক কারখানায় উচ্চপদে। করোনা ভাইরাসের মহামারীতে মার্চের শেষে সাধারণ ছুটিতে বন্ধ হয়ে যায় তার প্রতিষ্ঠান। পরবর্তী এক মাসের মধ্যে কারখানা চালু হলেও করোনা সংক্রমণের শঙ্কায় তিনি কাজে যোগ দেননি। ফলে গত তিন মাস উপার্জন বন্ধ আতিকুল ইসলামের। এ পরিস্থিতিতে ব্যয়বহুল রাজধানী ছেড়ে রাজশাহীতে গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
আতিকুল ইসলামের ছেলে তানভীর সাগর বলেন, ঢাকায় থাকতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বাসাভাড়া। প্রতি মাসে ২৫ হাজার টাকা ভাড়া লাগছে। এছাড়া নিত্যপণ্যসহ অন্যান্য জিনিসপত্রের উচ্চমূল্যও সমস্যা। পরিস্থিতির চাপে পরিবার নিয়ে আমরা গ্রামে যাচ্ছি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনাকালে কাজ হারানো রাজধানীর লাখো মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছেন। গত তিন মাসে অর্থনৈতিক শ্রেণি কাঠামোতেও বদল এসেছে। এ সময়ে নিম্ন-মধ্যবিত্ত নেমেছে নিম্নবিত্তে আর নিম্নবিত্ত আরও দরিদ্র হয়ে পড়েছে। এদের বেশিরভাগই খেয়ে-পরে কোনোরকম টিকে থাকলেও বাড়িভাড়া নিয়ে বড় চাপে পড়েছেন। পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন। কেউ কেউ পরিবার গ্রামে পাঠিয়ে মেসে উঠছেন। এ অবস্থায় ঢাকার বাড়ির মালিকরা ভাড়াটিয়া সংকটে পড়েছেন। অধিকাংশ বাসার সামনে বাড়িভাড়ার বিজ্ঞাপন ঝুলছে।
বাড়িওয়ালাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করোনা সংকটে গত ২৬ মার্চ দেশে সাধারণ ছুটি শুরু হলে শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী অনেকে গ্রামের বাড়ি চলে যান। তাদের বেশিরভাগ এখনো ফেরেননি। তবে তাদের অনেকেই এতদিন বাড়িভাড়া পরিশোধ করেছেন। সাধারণ ছুটি শেষ হলেও পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ায় অধিকাংশই বাসা ছেড়ে দেন। আবার যারা এতদিন পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকায় ছিলেন তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় তারা বাসা ছেড়ে গ্রামমুখী হচ্ছেন। এতে বিপাকে পড়েছেন রাজধানীর অধিকাংশ বাড়িওয়ালা।
রাজধানীর বাসিন্দাদের ৮০ শতাংশই ভাড়া বাসায় থাকেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এক হিসাবে দেখা যায়, গত ২৫ বছরে রাজধানীতে বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। একই সময়ে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ২০০ শতাংশ। অর্থাৎ এ সময়ে নিত্যপণ্যের দামের তুলনায় বাড়িভাড়া বৃদ্ধির হার প্রায় দ্বিগুণ। সংগঠনটির অন্য এক হিসাব বলছে, ঢাকার ২৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ, ৫৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া প্রায় ৫০ শতাংশ, ১২ শতাংশ ভাড়াটিয়া আয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ টাকা ব্যয় করেন বাসা ভাড়ায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে রাজধানীতে লোকসংখ্যা ছিল ৬৮ লাখের সামান্য কিছু বেশি। কিন্তু ১৯৯১ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত সময়ে রাজধানীর লোকসংখ্যা লাফিয়ে বেড়েছে। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টাসের ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাসিন্দা ১ কোটি ৭০ লাখ। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের তথ্য বলছে, ২০০৭ সালের পর খরা, ঘূর্ণিঝড়সহ নানা কারণে দেশের ভেতর উদ্বাস্তু হয়েছে প্রায় ৫৭ লাখ মানুষ। এসব মানুষের অধিকাংশই কর্মের সন্ধানে ঢাকায় প্রবেশ করে। যারা রাজধানীর বস্তিগুলোতে বাস করে আসছিল। তবে করোনার ধাক্কায় এসব মানুষের জীবনে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে।
করোনা ভাইরাস বিশ্বে মহামারী রূপে ছড়ানোর প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক শ্রম সস্থা (আইএলও) গত এপ্রিলে একটি প্রতিবেদন দেয়। ওই প্রতিবেদনে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, করোনার কারণে চলতি বছর বিশ্বের ১৯ কোটি মানুষ পূর্ণকালীন চাকরি হারাবে। এর মধ্যে ১২ কোটিই এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের। একই সময় ঢাকাভিত্তিক বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) হিসাব দেয়, করোনার কারণে দেশের অন্তত দেড় কোটি মানুষ স্থায়ী কাজ হারিয়েছে।
ঢাকার বস্তিগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টানা তিন মাস অর্থনৈতিক কর্মকা- প্রায় অচল থাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের অবস্থা শোচনীয় রূপ ধারণ করেছে। প্রথমদিকে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণ দেয়া হলেও সেই কর্মসূচি এখন নেই বললেই চলে। ফলে পেট চালানো কঠিন হয়েছে বেশিরভাগ পরিবারের। এ পরিস্থিতিতে বাড়িভাড়া ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা নিয়ে আরও বিপদে পড়েছেন নিম্নবিত্ত মানুষ। বাড়িভাড়া ও কিস্তি থেকে বাঁচতে অনেকে রাতের আঁধারে ঢাকা ছেড়ে পালাচ্ছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে।
ধানমন্ডিতে দেখা যায়, প্রায় সব বাড়ির সামনে বাড়িভাড়ার বিজ্ঞাপন ‘টু-লেট’ ঝুলছে। এর কারণ জানতে চাইলে মধুবাজারের বাড়ির মালিক আসলামউদ্দিন টিটো বলেন, আমার পাঁচতলা বাড়ির তিনটি তলা গত দুই মাস ধরে ফাঁকা। আগে টু-লেট লাগানোর এক সপ্তাহের মধ্যে বাসাভাড়া হতো। কিন্তু এখন ভাড়াটিয়া পাওয়া যাচ্ছে না। শংকর এলাকার বাড়ির মালিক সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমার বাসার চারটি ফ্ল্যাট খালি। যারা আছেন তারাও সম্পূর্ণ ভাড়া দিচ্ছেন না। মানুষের ইনকাম কমে গেছে, অনেকে চাকরিচ্যুত হয়েছেন। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তেমন ব্যবসা না হওয়ায় পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে গেছেন। অনেকের ইনকাম না থাকায় দুই মাস ধরে বাসাভাড়া দিতে পারেননি।
ভাড়াটিয়া পরিষদের সভাপতি বাহরানে সুলতান বাহার বলেন, আমরা যা খোঁজ পাচ্ছি, তাতে অনেকে ১০ হাজার টাকার জিনিস ১-২ হাজার টাকায় বিক্রি করে বাড়িভাড়া শোধ করে চলে যাচ্ছে। অনেকে আসবাবপত্রও দিয়ে যাচ্ছে। বাড়িওয়ালাদের নির্যাতন সইতে না পেরে ইতোমধ্যে ৫০ হাজারের বেশি ভাড়াটিয়া এভাবে চলে গেছেন। আরও অনেকে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। তারা একসঙ্গে তিন মাসের বিদ্যুৎ বিল চাইছে, এতে মানুষ আরও বিপদে পড়েছে।