রাজনীতি

রংপুরে জাতীয় পার্টিতে অস্থিরতা চলছেই

নিজস্ব প্রতিবেদক
রংপুরে জাতীয় পার্টি (জাপা) এবং রংপুর-৩ আসনের এমপি সাদ এরশাদের দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছেছে। সাদ এরশাদকে বাদ রেখে রংপুর জেলা জাপা তথা এরশাদের দুর্দিনের কা-ারিদের সঙ্গে নিয়ে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে এইচ এম এরশাদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিক পালনের প্রস্তুতি। ১৪ জুন সেন্ট্রাল রোডে জাপার দলীয় কার্যালয়ে জেলা ও মহানগর জাপা আয়োজিত এক যৌথ আলোচনা সভায় এমনই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা। সেই সঙ্গে সম্প্রতি সাদ এরশাদ কর্তৃক তারা ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী দিয়ে পার্টির নেতা, প্রবীণ নেতার ওপর হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয় এবং রংপুরের জাপার গৃহীত সিদ্ধান্তের যারা বিরোধীতা করেছেন, এই যৌথ সভা থেকে সাদ এশাদ পন্থিদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে করা হয়েছে। এমনকি এরশাদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী অনুষ্ঠানে তাদের উপস্থিতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় যৌথ সভায়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য, রংপুর মহানগর সভাপতি ও রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। তিনি বলেন, সাদ এরশাদ জাতীয় পার্টির এমপি। কিন্তু তিনি জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কোনো প্রকার সম্পর্ক না রেখে বহিরাগতদের লালনপালন করছেন। রংপুরের জাতীয় পার্টি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা পার্টির মঙ্গলের জন্য নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত প্রসন করে ঢাকায় বসে যারা এর বিরোধিতা করেছেন, তারা যদি বিমানেও সৈয়দপুরে আসে তবুও তাদের সৈয়দপুর থেকে বিতারিত করা হবে।
তিনি বলেন, রংপুরে জাতীয় পার্টি (জাপা)সহ যারা এরশাদের ক্রান্তি কালে ঢালের মত থেকে কাজ করেছে তারা কেউ বসে থাকবে না। আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করে যাবো। যার যেমন সাধ্য আছে সহযোগিতা করেন এরশাদের মৃত্যুবার্ষিকী পালনে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যারা বিরোধীতা করেছে, তারা রংপুরের মাটিতে পা রাখতে পারবেন না। এখানে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তা পার্টির স্বার্থে নেয়া হয়েছে। রংপুর মহানগরীর ৩৩টি ওয়ার্ডকে পুনরায় ঢেলে সাজানো হবে। আগামী দিনের সকল প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হওয়ার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সভায় সকল নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে এরশাদের কবর সংস্কার, আগামী ১৪ জুলাই এরশাদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে কবর জিয়ারত, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে মাইকিং, দোয়া খায়ের ও মিলাদ মাহফিল আযোজনে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই কর্মসূচিতে সাদ এরশাদের ভাড়াটিয়া গু-া ও বহিরাগতরা মাথাচারা দিলে তাদের প্রতিহত করা জন্য জোর দাবি জানানো হয় যৌথ সভা থেকে।
করোনাকালের আগেই জাতীয় পার্টি তাদের কার্যক্রমের কারণে জনগণের কাছে একটি আঞ্চলিক দলে পরিণত হয়। কারণ, তাদের সব কার্যক্রমই যেন রংপুরকেন্দ্রিক। একটি জাতীয় রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম যেমন সরা দেশেই বিস্তৃত থাকে, এরশাদের মৃত্যুর আগে থেকেই তা অদৃশ্য হয়ে যায়। এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির রাজনীতি আরো রংপুরকেন্দ্রিক হয়ে যায়। এর প্রমাণ পাওয়া রংপুরে ঘটে যাওয়া জাতীয় পার্টির ন্যাক্কারজনক কর্মকা-ে।
ডিও লেটারে স্বাক্ষর করাকে কেন্দ্র করে রংপুর-৩ আসনে জাতীয় পার্টির (জাপা) সংসদ সদস্য সাদ এরশাদ ও তার স্ত্রী মাহিমা এরশাদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। ২ জুন পল্লীনিবাসের মূল ভবনের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় নেতাকর্মীরা চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করেন। পরে সিটি মেয়রের অনুসারী নগরীর ২৭ নম্বর ওয়ার্ড জাপার সাধারণ সম্পাদক টিপু সুলতানকে (৩২) আটক করে পুলিশ।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ৩ জুন দিনভর উত্তপ্ত ছিল রংপুর। টিপু সুলতানের মুক্তির দাবিতে সিটি মেয়র ও মহানগর জাপার সভাপতি মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার নেতৃত্বে দলের নেতাকর্মীরা নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল করেন। এছাড়া পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করেছেন সাদ এরশাদ ও মেয়র মোস্তফা। এরপর এরশাদের বাড়ি পল্লীনিবাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২ জুন সাদ এরশাদের সঙ্গে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করার জন্য পল্লীনিবাসে যান মহানগর জাতীয় পার্টির ২৭, ২৮, ৩০, ৩১, ৩২ ও ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা। সেখানে সাদ এরশাদের কাছে স্বাক্ষরের জন্য একটি ডিও লেটার দেন টিপু সুলতান। স্বাক্ষর না করে ডিও লেটার ছিঁড়ে ফেলা হলে নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের মাঝে হাতাহাতি এবং চেয়ার-টেবিল ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
এক পর্যায়ে তাজহাট থানার পুলিশ ডেকে সাদ এরশাদ টিপু সুলতানকে ধরিয়ে দিলে আরেক দফা উত্তেজনা দেখা দেয় ও হাতাহাতি হয়। তবে স্ত্রীসহ সাদ এরশাদ অক্ষত থাকেন।
আর এসবের প্রেক্ষিতেই ১৪ জুন যৌথ সভা করে সাদ এরশাদ ও তার পন্থিদের রংপুরে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে জাতীয় পার্টি।
যৌথ সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, জাপার কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আ. রাজ্জাক, রংপুর মহানগর জাপার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেন, কেন্দ্রীয় কমিটি যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক ও রংপুর জেলা জাপার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাফিউল ইসলাম শাফী, সহ সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব খতিবর রহমান, রংপুর মহানগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক জাহিদুল
ইসলাম, মহানগর যুব সংহতি সভাপতি শাহিন হোসেন জাকির, ও সাধারণ সম্পাদক মো. আলাল উদ্দিন কাদেরী শান্তি, মহানগর শ্রমিক পার্টির সাধারণ সম্পাদক মো. মাজহার ইসলাম মন্টু, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির জেলা আহ্বায়ক আবুল হোসেন, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির মহানগর আহ্বায়ক ফারুখ ম-ল, ছাত্র সমাজ মহানগর সভাপতি ইয়াসীর আরাফাত আসিফ, আসলাম, ইঞ্জিনিয়ার সুমন, মুহিন, কাওছার, নাজির। এছাড়াও সভায় জেলা ও মহানগর জাপা এবং সকল সহযোগি ও অঙ্গ সংগঠনের সভাপতি ও সম্পাদকগণ সভায় অংশ নেন।