খেলা

সর্বকালের সেরা নারী টেনিস অলরাউন্ডার স্টেফি গ্রাফ

ক্রীড়া প্রতিবেদক
কিংবদন্তি ক্রিস এভার্ট একবার বলেছিলেন, মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা বেশি জিতেছে ঘাসের কোর্টে (ফাস্ট কোর্ট), আমি বেশি জিতেছি মাটির কোর্টে (স্লো কোর্ট)। কিন্তু স্টেফি গ্রাফ দু’ধরনের কোর্টেই আমাদের চেয়ে বেশি শিরোপা জিতেছে। সে সত্যিকারের এবং সেরা একজন অলরাউন্ডার। জার্মান কিংবদন্তিকে নিয়ে করা তার সেই মন্তব্য যে বিন্দুমাত্র ভুল ছিল না তা স্টেফির ক্যারিয়ার গ্রাফ দেখলেই স্পষ্ট। সর্বকালের সেরা গ্র্যান্ডস্ল্যাম জয়ীদের তালিকার তিন নম্বরে তিনি। ২৪ শিরোপা নিয়ে তার আগে শুধু মার্গারেট কোর্ট। আর স্টেফির ২২ শিরোপাকে ছাড়িয়ে গেছেন সেরেনা উইলিয়ামস।
ইতিহাসে স্টেফিই একমাত্র খেলোয়াড়, যার হাতে এক বছরে চার গ্র্যান্ডস্ল্যামের পাশাপাশি অলিম্পিক স্বর্ণ (১৯৮৮) উঠেছিল। যাকে বলে গোল্ডেন স্ল্যাম। এছাড়া চারটি গ্র্যান্ডস্ল্যাম অন্তত চারবার করে জেতার একমাত্র নজির শুধু স্টেফির-ই আছে। ৭ বার উইম্বলডন, ৬ বার ফ্রেঞ্চ ওপেন, ৫ বার ইউএস ওপেন আর ৪ বার অস্ট্রেলিয়ান ওপেন।
স্টেফির ক্যারিয়ার শুরু সিনেমার গল্পের মতো। সিনেমায় যেমন ভিলেনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার বিষয় থাকে ঠিক তেমনি। ১৯৮২তে নিজ দেশ জার্মানির একটি পেশাদার টুর্নামেন্টে ১৩ বছর বয়সে ক্যারিয়ার শুরু করেন স্টেফি। প্রথম রাউন্ডের প্রতিপক্ষ ট্রেসি অস্টিন। এই আমেরিকান তিন বছর আগে ইউএস ওপেন জিতেছেন। এমন একজনের বিপক্ষে স্বভাবতই ভালো ফল পাননি স্টেফি, হেরেছেন ৬-৪, ৬-০ তে। ম্যাচ শেষে ট্রেসি কিশোরী স্টেফিকে সান্ত¡না দেয়ার জায়গায় বলেন, স্টেফির মতো খেলোয়াড় যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায়-রাস্তায় পাওয়া যায়। ট্রেসির ওই আচরণ মোটেও ভালো লাগেনি স্টেফির। মনে পুষে রেখেছিলেন ট্রেসিকে মোক্ষম জবাব দেয়ার তীব্র ইচ্ছা। সুযোগ আসে ১২ বছর পর। ততদিনে স্টেফি ১০টি গ্র্যান্ডস্ল্যাম শিরোপা জিতে নিয়েছেন। ১৯৯৪-এর ইন্ডিয়ান ওয়েলস টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচটিতে কোনো সুযোগ দেননি ট্রেসিকে। আমেরিকানকে হারিয়ে দেন স্টেফি ৬-০, ৬-০ গেমে। ওই ম্যাচের পর এ দুজন আর কখনোই কোর্টে মুখোমুখি হননি।
স্টেফির শুরুটা হয়েছিল ভুলে ভরা। কিন্তু দিনে দিনে নিজেকে এমন শুধরে নিয়েছেন যে, যে কোনো কোর্টে, যে কোনো পজিশনে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা ছিল তার। ঘাস, মাটি বা হার্ড কোর্ট, সার্ভ, ফোরহ্যান্ড বা ব্যাকহ্যান্ড সব দিকেই সমান পারদর্শী ছিলেন তিনি। ১৯৮৩ তে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করে দু’বছরেই নিজেকে ১২৪তম র‌্যাকিং থেকে তুলে আনেন সেরা দশে (ষষ্ঠ)। ১৫ বছর বয়সে ১৯৮৪ অলিম্পিক গেমসে পশ্চিম জার্মানির সর্বকনিষ্ঠ অ্যাথলিট হিসেবে নাম তোলেন।
স্টেফির সমসাময়িক সাবাতিনি, সেলেস, কাপ্রিয়াতি ও হিঙ্গিসদের মতো টেনিস তরুণী ছিলেন। তারা সবাই ১৫-১৬ বছর বয়সে ওমেন্স ট্যুর নিয়মিত খেলা শুরু করেন। কিন্তু মেয়েকে একটানা টুর্নামেন্ট খেলা থেকে বিরত রাখেন বাবা পাভেল স্লোজিল। উদ্দেশ্য মেয়ের ক্যারিয়ার দীর্ঘ করা। ১৯৮৫ সালে ১৬ বছর বয়সে স্টেফি বছরে মাত্র ১০টি টুর্নামেন্টে খেলেন। অথচ তার চেয়ে এক বছরের ছোট আর্জেন্টিনার গ্যাব্রিয়েলা সাবাতিনি খেলেছিলেন ২১টি। এর ফলও পেয়েছেন স্টেফি। তার মতো সাফল্য বা উচ্চতা বাকিদের কেউই পাননি। ১৯৮৬-৮৭ সালের দিকে টেনিসে কোর্টে রাজত্ব ছিল নাভ্রাতিলোভা ও এভার্টের। দুজনকেই চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো একমাত্র খেলোয়াড় হয়ে উঠে আসেন স্টেফি। যদিও সেমিফাইনাল বা ফাইনালে গিয়ে বারবার দুজনের কাছে স্টেফি ব্যর্থ হচ্ছিলেন। কিন্তু ধৈর্য ও একাগ্রতা তাকে কক্ষচ্যুত হতে দেয়নি।
১৯৮৭তে গ্র্যান্ডস্ল্যামে প্রথম সাফল্য পান স্টেফি। ছয়টি টুর্নামেন্ট জিতে সে বছরের ফ্রেঞ্চ ওপেনে পা রাখেন। হাইলাইটস হয়েছিল মিয়ামিতে সেমিফাইনালে নাভ্রাতিলোভা ও ফাইনালে এভার্টকে হারানো। সেবার ফ্রেঞ্চ ওপেন যে নিজের প্রথম গ্র্যান্ডস্ল্যাম করতে যাচ্ছেন স্টেফি, তা অনুমান করাই যাচ্ছিল। করেও দেখান। ফাইনালে নাভ্রাতিলোভাকে পেয়ে ৬-৪, ৪-৬, ৮-৬-এ ম্যাচ জিতে নেন স্টেফি। পরের বছর মানে ১৯৮৮ সাল তো তার গোল্ডেন জয়ের বছর। ১৯৮৭ সালে ফ্রেঞ্চ ওপেন জিতে র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষে ওঠা স্টেফি অবস্থানটি রেকর্ড ১৮৬ সপ্তাহ পর্যন্ত ধরে রেখেছিলেন।
কোচ এবং ম্যানেজার হিসেবে বাবা পাভেল সব টুর্নামেন্টেই একসঙ্গে থাকতেন। তাই টেনিস বাদে অন্য কিছুতে মন দেয়া কঠিন ছিল স্টেফির। এক টুর্নামেন্টে ‘প্রেম করেন কিনা’ এমন প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘আমার মাথায় শুধু টেনিস, টেনিস আর টেনিস।’ তবে ১৯৯৯ তে ক্যারিয়ারের ইতি টানার পর এই প্রেমের জন্যই শিরোনামে ছিলেন স্টেফি। টেনিসের আরেক তারকা আন্দ্রে আগাসীর সঙ্গে তার প্রণয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ে টেনিস বিশ্বে। ২০০১ সালে বিয়ে করেন দুজনে। ছেলে জেডেন আর মেয়ে জ্যাজকে নিয়েই আছেন স্টেফানি মারিয়া স্টেফি গ্রাফ। ২০২০-এ এই কিংবদন্তি পা রাখলেন জীবনের ৫১তম বসন্তে।