প্রতিবেদন

সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রসৈনিক কামাল লোহানীর প্রস্থান

স্বদেশ খবর ডেস্ক
করোনায় আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন ভাষাসংগ্রামী, মুক্তিযোদ্ধা ও বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব¡ কামাল লোহানী। ২০ জুন রাজধানীর মহাখালীতে শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। তিনি এক ছেলে, দুই মেয়েসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক প্রকাশ করেছেন। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ শোকবার্তায় বলেন, ‘সাংবাদিকতা ছাড়াও আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে কামাল লোহানীর অসামান্য অবদান ছিল। তিনি বাঙালি সংস্কৃতির উন্নয়নের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথিকৃৎ ছিলেন। তার (লোহানী) মৃত্যুতে দেশ একজন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও একজন দুর্দান্ত সংস্কৃতি ব্যক্তিত্বকে হারিয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক শোকবার্তায় বলেন, ‘আমরা কামাল লোহানীর মৃত্যুতে প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বকে হারিয়েছি। কামাল লোহানী বাঙালির ভাষা আন্দোলন, আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় এবং স্থানীয় সংস্কৃতি বিকাশের আন্দোলনে তিনি ছিলেন শীর্ষস্থানীয়, আদর্শ ও গুণী ব্যক্তিত্ব।’
কামাল লোহানীর ছেলে সাগর লোহানী বলেন, ‘অনেক দিন ধরে বাবার ফুসফুস ও কিডনিতে সমস্যা। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে করোনা পরীক্ষা করতে দেয়া হয়। পরে জানা যায় তার করোনা পজিটিভ। পরে তাকে মহাখালীর শেখ রাসেল হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। করোনায় আক্রান্ত হওয়া ছাড়াও ফুসফুস-কিডনির জটিলতার সঙ্গে হৃদরোগ-ডায়াবেটিসের সমস্যাতেও ভুগছিলেন তিনি।’
এদিকে কামাল লোহানীর মৃত্যু খবর ছড়িয়ে পড়লে শোকের ছায়া নেমে আসে দেশজুড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক যেন হয়ে ওঠে শোকবই।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাবেক এই সভাপতির মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয় রাজধানীর উদীচীর কার্যালয়ে। কামাল লোহানীর মরদেহ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাজধানীর তোপখানা রোডে উদীচীর কার্যালয়ে নেয়া হয়। এর আগে রাজধানীর শেখেরটেকের কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে তার মরদেহ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী গোসল করানো হয়। সেখান থেকে আনা হয় উদীচী কার্যালয়ে। এ সময় উদীচীর পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদনসহ জাতীয় শ্রমিক জোট, ওয়ার্কার্স পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটি, বিবর্তন সাংস্কৃতিক ফোরাম, কেন্দ্রীয় খেলাঘর, হাতেখড়ি, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন, নবনাট্য সংঘ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটি, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীসহ বিভিন্ন সংগঠন এবং ব্যাক্তি কামাল লোহানীর মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। শ্রদ্ধা নিবেদনের শেষ পর্যায়ে উদীচীর পক্ষ থেকে সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করা হয় ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’, ‘ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’, ‘কে বলেছে হয় না’ এবং ‘ও আলোর পথযাত্রী’ গানগুলো। এরপর তার মরদেহবাহী গাড়িটি জাতীয় পতাকা এবং উদীচীর পতাকা দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। পরে মরদেহ দাফনের জন্য নেয়া হয় তার গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জে।
কামাল লোহানীর ছেলে সাগর লোহানী বলেন, ‘সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা চিন্তা করে বড় পরিসরে কোনো কিছু করতে পারিনি। সিরাজগঞ্জে আমাদের গ্রামের বাড়িতে মায়ের কবরেই ওনাকে সমাহিত করব।’
কামাল লোহানীর শেষ ইচ্ছে ছিল তার দেহটি যেন চিকিৎসা গবেষণায় দান করা হয়। কিন্তু সেটি পূরণ হচ্ছে না জানিয়ে উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জামশেদ আনোয়ার তপন বলেন, কামাল লোহানীর ইচ্ছা ছিল তার মরদেহ দান করবেন। করোনা আক্রান্তদের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা নেই, তাই এই মুহূর্তে দেহটি দান করা যাচ্ছে না।’