প্রতিবেদন

সীমান্তে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ভারত-চীনের

নিজস্ব প্রতিবেদক
লাদাখের সীমান্তে চীনা ও ভারতীয় সেনাদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর সংশ্লিষ্ট সীমান্ত এলাকায় সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছে চীন ও ভারত। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিস স্যাটেলাইট ছবির বিশ্লেষণ করে এই তথ্য জানিয়েছে দ্য এক্সপ্রেস।
গত ১৫ জুন অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত ও ৭৬ জন আহত হয়েছে। লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় হিমালয়ের ১৪ হাজার মিটার উঁচুতে চীনা সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর মতে, চীনেরও ৪৩ সেনা নিহত হয়েছে। তবে পেইচিংয়ের পক্ষ থেকে তা নিশ্চিত না করায় চীনা হতাহতের বিষয়টি অস্পষ্ট রয়ে গেছে। পৃথকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ৩৫ চীনা সেনা নিহতের কথা বলা হয়েছে।
সমস্যার শুরু গালওয়ান ভ্যালি দিয়ে। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু পার্লামেন্টে একবার বলেছিলেন, ‘গোটা দুনিয়ায় এমন সৃষ্টিছাড়া জায়গা আর কোথায়ই বা আছে যেখানে একটা গাছ তো দূরে থাক; কোনো ঘাস পর্যন্ত জন্মায় না? অমন জায়গা আমাদের থেকেই বা কী লাভ?’ অমন বক্তব্যের কিছুদিন পরেই ভারত টের পায় ওই ভ্যালির গুরুত্ব কতটা। বাষট্টির চীন-ভারত যুদ্ধে প্রধানতম ফ্ল্যাশপয়েন্ট হয়ে উঠেছিল গালওয়ান পোস্ট, সেখানে চীনা বাহিনীর গোলাবর্ষণে ৩৬জন ভারতীয় সেনার মৃত্যুর পরই আনুষ্ঠানিকভাবে দু’দেশের যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।
ওই যুদ্ধের পর পরবর্তী প্রায় ছয় দশকে চীন কিন্তু গালওয়ান ভ্যালির ওপর সেভাবে কোনো দাবিই জানায়নি, কোনো সেনা মোতায়েনও করেনি। তবে সেই পরিস্থিতি আমূল পাল্টে গেছে চলতি বছরের গ্রীষ্মে, যখন চীন গোটা গালওয়ান ভ্যালির ওপরেই নিজেদের সার্বভৌমত্ব দাবি করছে। কারাকোরামে তৈরি হওয়া গালওয়ান নদীটি আকসাই চীনের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এসে মিশেছে লাদাখের শিয়ক নদীতে, যা আবার সিন্ধুর একটি প্রধান উপনদী। ভারত ও চীনের বিতর্কিত সীমান্তরেখার (এলএসি বা লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল) কাছে এই গালওয়ানের প্রশস্ত উপত্যকাই আজ আবার দু’দেশের প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত।
গালওয়ান ভ্যালির পাশ ঘেঁষেই দৌলত বেগ ওল্ডি যাওয়ার নতুন রাস্তা। ভ্যালিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই দৌলত বেগ ওল্ডিতে ভারতের স্বার্থ বজায় রাখা যাবে। দৌলত বেগ ওল্ডিই হিমালয়ের প্রধান কানেক্টিংপয়েন্ট বা ট্রানজিট পয়েন্ট। সেখানে শুধু বিমান অবতরণের জন্য বিশ্বের উচ্চতম এয়ারস্ট্রিপ আছে তাই নয়, সিয়াচেন হিমবাহের যুদ্ধক্ষেত্রে রসদ ও সেনা পৌঁছে দেয়ার জন্যও দৌলত বেগ ওল্ডির গুরুত্ব অনেক। একে কেন্দ্র করেই ভারতের সঙ্গে চীনের সীমান্ত বিরোধের সূত্রপাত।
কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, চীন গালওয়ান ভ্যালির ওপর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার সঙ্গে গত বছর ভারতের কাশ্মীরের বিশেষ স্বীকৃতি বিলোপের সম্পর্ক রয়েছে। ৩৭০ ধারা বাতিল করে ভারত যে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করে সেখানে চীনের ‘নতুন অনেক এলাকা’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
ভূ-রাজনৈতিক কারণে চীন এখন সরাসরি কাশ্মীর বিতর্কে প্রবেশ করতে চাইছে, যার প্রথম ধাপ গালওয়ান ভ্যালি বা প্যাংগং লেক কব্জা করার চেষ্টা করা।
এছাড়া লাদাখের রাজধানী লেহ থেকে সড়কপথে দৌলত ওল্ডি যেতে সময় লাগে আড়াই দিন প্রায়। কিন্তু ডারবুক শিয়ক হয়ে দৌলত বেগ ওল্ডি পর্যন্ত যে নতুন রাস্তা ভারত বানিয়েছে, তাতে এই সময়টা কমে মাত্র পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লাগবে। রাস্তাটা গেছে ভারত-চীনের এলএসি বরাবর। চীন চাইছে এই ভ্যালি কব্জা করে নতুন রাস্তাটিকে নিষ্ক্রিয় করা। নতুন এই রাস্তাকে কেন্দ্র করেই চীনের সঙ্গে নতুন করে ঝামেলা শুরু ভারতের।