কলাম

স্বাস্থ্য খাতের দুর্দশা এবং প্রস্তাবিত বাজেট

রাজেকুজ্জামান রতন
বাজেট ২০২০-২১ ঘোষিত হয়েছে। করোনা মহামারীর কারণে বাজেট অধিবেশন হবে খুবই সংক্ষিপ্ত। ফলে ধারণা করা যায়, ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার যে বাজেট ঘোষিত হয়েছে ৩০ জুন সেটাই সংসদে সর্বসম্মতভাবে পাস করা হবে। প্রশ্ন উঠছে, যে মহামারীর আশঙ্কায় বাজেট অধিবেশন সংক্ষিপ্ত হলো, সেই মহামারীর কালে স্বাস্থ্য খাত প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পেয়েছে কি? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ হলো, একটি দেশে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশ এবং বাজেটের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ বরাদ্দ করা উচিত। এবং তাদের পর্যবেক্ষণ হলো, এই অঞ্চলে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ হয় বাংলাদেশে। চিকিৎসাক্ষেত্রে মাথাপিছু ব্যয় মালদ্বীপে ২০০০ ডলার, শ্রীলঙ্কায় ৩৬৯ ডলার, ভারতে ২৬৭ ডলার, পাকিস্তানে ১২৯ ডলার আর বাংলাদেশে ৮৮ ডলার। বিশ্বে চিকিৎসার জন্য গড়ে মানুষ ব্যক্তিগতভাবে খরচ করে ৩২ শতাংশ বাকিটা দেয় রাষ্ট্র। বাংলাদেশে বিষয়টা পুরো উল্টো। সরকার খরচ করে ২৮ শতাংশ আর মানুষের পকেট থেকে খরচ হয়ে যায় ৭২ শতাংশ। ফলে ধারণা করা হয় শুধু চিকিৎসার এই ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায় ৪০ লাখ মানুষ। এই পরিস্থিতিতে করোনা সংক্রমণ চিকিৎসাক্ষেত্রে এক নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে। বাজেটের প্রতি মানুষের তাই প্রবল আগ্রহ ছিল যে চিকিৎসা খাতে বরাদ্দ কেমন হবে, কত হবে এবং সরকারের পরিকল্পনা কী?
কভিড-১৯ সংক্রমণে বৈশ্বিক মহামারীর এই সময়ে বৃহত্তম বাজেট, ৮.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা, বাজেটের আকার গত বাজেটের তুলনায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা বাড়লেও সে অনুপাতে গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়েনি। বেশি আয়ের মানুষদের ব্যক্তিগত আয়কর কমিয়ে দেয়া হলেও ভ্যাটের আওতা বাড়ানো হয়েছে, ফলে সাধারণ মানুষকে পরোক্ষ কর দিতে হবে বেশি। ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলে, অনলাইন শিক্ষা, যোগাযোগ ও ব্যবসার কথা বলে মোবাইল ব্যবহারকারীদের ১০০ টাকায় ৩৩ টাকা ২৫ পয়সা কর আরোপ করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ যেন কর আদায়ের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে আর ধনীরা সদয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছেন প্রতিবারের মতো এবারের বাজেটেও।
এতো গেল সাধারণভাবে বাজেটের কথা। দীর্ঘদিন ধরে কিছু কথা বলা হচ্ছে যেমন-স্বাস্থ্য খাতের প্রতি সরকারের উপেক্ষা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম বরাদ্দ, যা বরাদ্দ করা হয় তার বিরাট অংশ দুর্নীতির অজগর গিলে খায়, অপ্রয়োজনীয় ও অপচয়মূলক ব্যয় করার অতি আগ্রহ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ভক্সগুর, দুর্দশাগ্রস্ত করে ফেলেছে এবং জনগণের নাগালের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে নিম্নমানের চিকিৎসা এবং ব্যয়বহুল পর্দা, বালিশ, বই এবং যন্ত্রপাতি কেনার রেকর্ড বাংলাদেশের। কিন্তু পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত এসব সংবাদ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়ে সরকারের স্বাস্থ্য খাতে অভাবনীয় উন্নতির কথা প্রচার করেছে সংশ্লিষ্ট মহল। চীনের উহান থেকে করোনা সংক্রমণের সংবাদ পাওয়ার তিন মাস পর বাংলাদেশে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছিল ৮ মার্চ ২০২০। তখন থেকেই সরকার দলের নেতারা বলে আসছেন আমাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি আছে, শুধু তাই নয় আমাদের প্রস্তুতি বিশ্বের অন্যান্য দেশের চাইতে ভালো। সে কারণেই অনেক দেশ নাকি আমাদের কাছে সাহায্য চাইছেন। কিন্তু ৮ মার্চের পর গত তিন মাসে প্রমাণ হলো বাস্তব পরিস্থিতি তেমন নয় বরং হতাশাজনক। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৬৫৪টি এবং এসব হাসপাতালে মোট শয্যার সংখ্যা ৫১,৩১৬টি। আর বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৫,০৫৫টি, যেখানে মোট শয্যার সংখ্যা ৯০,৫৮৭টি। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে অনুমিত জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪৬ লাখ। সেই হিসাবে প্রতি ১,১৫৯ জন ব্যক্তির জন্য হাসপাতালে একটি শয্যা রয়েছে। চিকিৎসাসেবার মান বিবেচনা করলে প্রতি ৫০০ জন মানুষের জন্য কমপক্ষে ১ জন ডাক্তার ও ৩ জন নার্স থাকা প্রয়োজন। কিন্তু দেশে রেজিস্টার্ড ডাক্তারের সংখ্যা কমবেশি ৯৩ হাজার সে হিসেবে প্রতি ১৮০০ মানুষের জন্য একজন ডাক্তার এবং প্রায় ৩৫০০ মানুষের জন্য একজন নার্স আছেন। এই তথ্য প্রমাণ করে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা কোথায় আছি। অন্যদিকে গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে বরাদ্দকৃত ২৫ হাজার কোটি টাকার পুরোটা খরচ করতে পারেনি বলে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে। অথচ হাসপাতালগুলোতে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা, আইসিইউ, ভেন্টিলেটরসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই।
করোনা মহামারী আমাদের উদ্বেগ, আশঙ্কাকে যেমন প্রমাণ করেছে তেমনি চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে উন্মোচন করে দিয়েছে। করোনা পরীক্ষার জন্য ১ কোটির ওপর টেলিফোন পেয়ে এখন পর্যন্ত যা পরীক্ষা করা হয়েছে তা মাত্র ৫ শতাংশ। দেশের ৪৪টি জেলায় করোনা টেস্টের কোনো পিসিআর মেশিন নেই। করোনা এবং নন-করোনা রোগীদের ন্যূনতম চিকিৎসা না পাওয়া, ডাক্তার, নার্স, চিকিৎসাকর্মীদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ না করা, নিম্নমানের সামগ্রীর কারণে সাড়ে তিন হাজারের বেশি চিকিৎসাকর্মী করোনা আক্রান্ত হওয়া, ৪০ জনের বেশি ডাক্তার ও ১০ জন নার্সের করোনায় মৃত্যু, রোগী ও চিকিৎসাকর্মীদের সম্পর্কের অবনতি, স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রে এক আতঙ্কজনক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। হাসপাতালে হাসপাতালে ছুটতে ছুটতে পথে মৃত্যুবরণ করার দুঃখজনক ঘটনা যেমন দেখছি আমরা তেমনি বাণিজ্যিক হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা বাণিজ্যের নির্মমতা প্রত্যক্ষ করছেন দেশবাসী। সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে আত্মতুষ্টির ঢেঁকুর মিলিয়ে গিয়েছে দেশের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির ন্যূনতম চিকিৎসা না পাওয়ার বেদনাময় ঘটনা প্রত্যক্ষ করে।
বাংলাদেশে গত কয়েক বছর স্বাস্থ্য খাতে বেশ কিছু দুর্নীতির কেলেঙ্কারির বিষয় সামনে এসেছে। গত বছরের শুরুতে দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল স্বাস্থ্য খাতে ১১টি উৎস থেকে দুর্নীতি হয়, যার মধ্যে রয়েছে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও পণ্য কেনাকাটা। সে সবের কোনো সুরাহা তো হয়নি বরং এই করোনা দুর্যোগকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে মুন্সীগঞ্জে তৈরি মাস্ক চীনের ভাউচার দিয়ে বিল করার খবর পত্রিকায় এসেছে।
প্রত্যাশা ছিল অতীতের এই ভুল পদক্ষেপ থেকে শিক্ষা নিয়ে এই করোনার সময়ে বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ করা হবে, দুর্নীতির ছিদ্র এবং পুকুর চুরি বন্ধ করা হবে, স্বাস্থ্যসেবাকে ব্যবসা নয় জনগণের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হবে। কিন্তু মাস্ক, গ্লাভস, পিপিই নিয়ে ভয়াবহ দুর্নীতির খবর, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি উচ্চমূল্যে কেনা, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং উপকরণ ছাড়াই আইসিইউ-এর সংখ্যা বাড়িয়ে ঘোষণা করা, শ্বাসকষ্টের এবং আইসিইউ-এর জন্য অত্যাবশ্যকীয় হাই ফ্লো অক্সিজেন না থাকা, অক্সিজেন সিলিন্ডারের সংকট এবং এর সুযোগে বহুগুণ বেশি দামে অক্সিজেন সিলিন্ডার বিক্রির খবর সারা দেশের মানুষের কাছে এই বার্তা দিয়েছে যে জনগণের চিকিৎসা সুরক্ষা বাড়েনি। আবার দুর্নীতির খবর প্রচারের পরও দৃশ্যমান তৎপরতা ও শাস্তি না দেখে এটাই ধারণা হচ্ছে যে দুর্নীতিবাজরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে অনেকেরই ধারণা ছিল এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাত অনেক বেশি গুরুত্ব পাবে। কিন্তু বাজেটে অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাবনায় তেমনটা দেখা যায়নি। ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত মোট বাজেটের ৫.১ শতাংশ অর্থাৎ ২৯ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি অর্থ স্বাস্থ্য খাতে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। যা গত অর্থবছরের তুলনায় তিন হাজার কোটি টাকার মতো বেশি। এর মধ্যে কভিড-১৯ মহামারী মোকাবিলায় দুটি জরুরি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। একটি বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় এক হাজার ১২৭ কোটি টাকার। অন্যটি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের দেয়া এক হাজার ৩৬৬ কোটি টাকার। এই আড়াই হাজার কোটি টাকা বাদ দিলে প্রকৃত বাজেট বৃদ্ধি হয়েছে বাস্তবে এক হাজার কোটি টাকার মতো। এই সামান্য বর্ধিত বরাদ্দ স্বাস্থ্য খাতের ঘা দূর করা নয় বরং ঘায়ে মলমের প্রলেপ লাগানোর মতো। এর বাইরে ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে কিন্তু এই প্রস্তাবিত অর্থ কীভাবে খরচ করা হবে তার সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই। স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমান খান সংবাদ মাধ্যমের কাছে শুধু স্বাস্থ্য খাতে চলমান কিছু কর্মকা-ের কথাই উল্লেখ করেন। তিনি জানান, হৃদরোগ, কিডনি ও ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যবস্থা বাড়ানোর জন্য বিভাগীয় শহরগুলোতে ১০০ শয্যা বিশিষ্ট ক্যানসার হাসপাতাল তৈরি করা হবে। বিদ্যমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এবং সব জেলা সদর হাসপাতালে নেফ্রোলজি ইউনিট ও ডায়ালিসিস কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা এবং স্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষা কাঠামো বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি। কিন্তু এই করোনা দুর্যোগে তাৎক্ষণিক বরাদ্দ এবং চিকিৎসাসেবার কী হবে সে ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য বা প্রস্তাবনা নেই তাদের। স্বাস্থ্য খাতে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা সেবা, রোগ প্রতিরোধ, অবকাঠামো উন্নয়ন, জনবল বাড়ানো, সুশাসন নিশ্চিত করা এই সকল দিক ঢেলে সাজানোর জন্য ব্যাপক মাত্রার এবং টেকসই সংস্কার যা দরকার তার তেমন কোন উল্লেখ দেখা গেল না এই বাজেটে।
আমাদের মন্ত্রী, এমপি’রা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতেন না তাই এ ব্যাপারে তাদের খুব বেশি ভ্রƒক্ষেপ ছিল না। চিকিৎসার ক্ষেত্রে উচ্চবিত্তদের বিদেশমুখিনতা, মধ্যবিত্তদের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক, দরিদ্রদের সরকারি হাসপাতাল এই বিভাজন ছিলই। শুধু ভারতেই বছরে ২ বিলিয়ন ডলার বা ১৭ হাজার কোটি টাকা চলে যেত চিকিৎসার জন্য। এবার বৈশ্বিক মহামারীর জন্য বিদেশে যেতে না পারায় আহাজারি তীব্র হয়েছে। করোনার আগে স্বাস্থ্য খাতে এই দুর্দশা ছিল। করোনা দেখিয়ে দিয়েছে দুর্বলতার জায়গাগুলো। জনগণ তা দেখে আতঙ্কিত হলেও যারা দেখবার তারা কী দেখলেন?