প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

২০২০-২০২১ অর্থবছরের ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট : করোনার ভয়াল থাবায় বিপর্যস্ত অর্থনীতি : বাজেট বাস্তবায়নে কঠিন চ্যালেঞ্জে সরকার

বিশেষ প্রতিবেদক
বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসে বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে জাতীয় বাজেট যথাসময়ে পেশ করা যায় কিনা সেই শঙ্কা যখন দেখা দিয়েছিল, তখন ১১ জুন ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
জাতীয় বাজেটকে সরকারের পক্ষ থেকে মানুষের জীবন-জীবিকা ও প্রত্যাশার অগ্রাধিকার বলে জানানো হয়েছে। বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এই বাজেট মানুষ বাঁচানোর বাজেট। সবসময় আয়ের চিন্তা করা হলেও এবার আমরা আগে খরচ করছি, আয়ের চিন্তা পরে করবো। মানুষের জীবন-জীবিকা আমাদের কাছে অগ্রাধিকার।
করোনা ভাইরাসে বিপর্যস্ত অর্থনীতির এই সময়ে এটাই এখন নির্মম বাস্তবতা। মহামারি করোনা ভাইরাস এর (কোভিড-১৯) কারণে বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার ও অতীতের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার চ্যালেঞ্জ নিয়েই এবারের বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে তা কতটুকু বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় তা সময়ই বলে দেবে। এমন প্রেক্ষাপট থেকে বিগত দিনের মতো অর্থনীতি আবারও উন্নয়নের মহাসড়কে উন্নীত হবে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের আশাবাদ।
তবে সিপিডি বলছে, বিদ্যামান করোনা ভাইরাস সমস্যা মোকাবিলায় বাজেটে যে ধরনের কাঠামো থাকা দরকার ছিল, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। কোভিড-১৯ নিয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক, মানবিক এবং অর্থনীতি খাতে যে ঝুঁকি দেখা দিয়েছে, বাজেটে তা মোকাবিলায় সে ধরনের কোনো সামাজিক কাঠামো নেই।
এছাড়া সিপিডি জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকিং কমিশন গঠন, দুদককে শক্তিশালী করা, ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া, প্রবাসী ও সরকারী কর্মচারী এবং শস্য ও পবাদিপশু বীমার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। আগামী বাজেটেও এইসব বিষয়ে সংস্কারের কোনো জোরালো বক্তব্য নেই।
সিপিডির মতে, বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া অনৈতিক ও অলাভজনক। এই সুযোগ দিয়ে সৎ করদাতাদের প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে। তাদের প্রতি সুবিবেচিত পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। কারণ যারা সৎ করদাতা তারা প্রচলিত হারে কর দিয়ে আসছেন। কিন্তু যারা কর ফাঁকি দিচ্ছেন বছরের পর বছর, তারা এই সুযোগে শুধুমাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়ে টাকাটা সাদা করে ফেলতে পারছেন। এই ধরনের সুবিধা দিয়ে আসলে কোনো লাভ হয় না। এটার জন্য আসলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

ব্যবসা ও বিনিয়োগে বড় ছাড়
করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় অগ্রাধিকার দিয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বাজেটে সামাজিক সুরক্ষায় উদ্যোগের পাশাপাশি ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিকে সচল করতে বিনা প্রশ্নে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগও রাখা হয়েছে। দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষায় কিছু কর সুবিধার পাশাপাশি করোনা ভাইরাসের ক্ষতি মেটাতে করপোরেট করেও কিছুটা ছাড় দেয়া হয়েছে। অর্থ পাচার ঠেকাতে বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। বাড়ানো হয়েছে ব্যক্তি করমুক্ত আয়ের সীমাও। করোনা পরিস্থিতির জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে করহার খুব বেশি না বাড়িয়েও ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য বড় অঙ্কের বাজেটের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। যার আকার ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। করোনা সংকটে থাকা অর্থনীতিতে বিশাল বাজেট প্রস্তাব ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, বাজেটের অর্থসংস্থান নিয়েও। বড় এ বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। বাজেট ঘাটতি ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি।
অর্থনৈতিক উত্তরণ ও ভবিষ্যৎ পথ পরিক্রমা শিরোনামের এবারের বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়ার পরিকল্পনায় আর্থিক খাতে বিদ্যমান তারল্য সংকট আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
করোনার কারণে দেশের ব্যবসা স্থবির। অর্থনীতির চাকা স্তিমিত হয়ে পড়েছে। আমদানির পাশাপাশি রপ্তানি আয়ও আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। এতে করে কর রাজস্ব আয় কমছে। করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘ হওয়ায় আগামী অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আয়ও কমার পূর্বাভাস দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রবাসী আয়েও ধস নেমেছে। জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে চাকরি হারিয়ে ইতোমধ্যেই ১৪ লাখ প্রবাসী দেশে ফিরেছেন। করোনায় চাহিদা ও ভোগ কমে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ। করোনা পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, তা বলতে পারছেন না কেউই।
এ অবস্থার মধ্যে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনের স্বপ্ন দেখছেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল। যদিও করোনা সংকটের মধ্যে জিডিপি ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হার প্রাক্কলন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, সামগ্রিক অর্থনীতি, এনবিআরের কাঠামোগত শক্তি ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়নি। প্রতিবারই সরকার উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার বাজেট দেয়। বছর শেষে দেখা যায় রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রায় ঘাটতি থাকে। করোনা পরিস্থিতির কারণে আমাদের প্রাক্কলন হচ্ছে ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব আয় হতে পারে। তাই প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়তে হতে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো ১০ মেগাপ্রকল্পে ৫৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞ বিদেশিরা না আসায় কাজে ধীরগতি তৈরি হয়েছে। ফলে প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার সময় বৃদ্ধি ও সঙ্গে বাড়বে ব্যয়।
এদিকে বিশাল বাজেটের অর্থসংস্থানে রাজস্ব আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস সিগারেট ও মোবাইল ফোন সেবার ওপর বাড়তি কর আরোপ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে উচ্চমধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের ভ্রমণ এবং আমানতের ব্যয় কিছুটা বাড়ছে। ব্যাংকে ১০ লাখ টাকার বেশি আমানতের ওপরও বাড়তি কর আরোপ করা হয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লঞ্চের টিকিট আগে ৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর ছিল, নতুন অর্থবছরে তা বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। চার্টার্ড বিমান ও হেলিকপ্টার ভাড়ার ওপর সম্পূরক শুল্ক ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রসাধন সামগ্রী, গাড়ির নিবন্ধন মাশুলও বাড়ছে।
অবশ্য করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতির বিষয়টি বিবেচনা করে প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যবসাবাণিজ্য চাঙ্গা করা ও বিনিয়োগ বাড়াতে নানা পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। পুঁজিবাজারে তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির করপোরেট কর আড়াই শতাংশীয় পয়েন্ট কমানোর পাশাপাশি অর্থনীতিতে অপ্রদর্শিত অর্থ ফিরিয়ে আনতে মাত্র ১০ শতাংশ জরিমানায় বিনা প্রশ্নে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হয়েছে। আড়াই বছর ধরে দরপতনে থাকা পুঁজিবাজারেও কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এর আগে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক তহবিল গঠন করলেও এর কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। এছাড়া বিনিয়োগ বাড়াতে অন্তত ৬টি খাতে দেয়া হয়েছে কর অবকাশ সুবিধা। তবে এসব উদ্যোগে অর্থনীতি কতটা সচল হতে পারবে, তা নিয়েও রয়েছে সংশয়। অবশ্য অপরিবর্তিত থাকছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি, ব্যাংক, বীমা, মোবাইল অপারেটর ও সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের করপোরেট ট্যাক্স হার।

অর্থনীতিতে টাকার সরবরাহ বাড়ানো
বড় চ্যালেঞ্জ
করোনায় সংকুচিত হয়ে পড়া অর্থনীতিতে টাকার সরবরাহ বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়ায় সরকার নিজেই চলছে ধার করে। আবার বেসরকারি খাতও চলতি মূলধন সংকটে রয়েছে। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প, কারখানার জন্য ইতোমধ্যেই ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এনবিআরের আয়ের উৎসগুলোকে ঋণ দিয়ে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করছে সরকার। তারপরও ব্যবসাবাণিজ্যে চাঙ্গাভাব ফেরেনি। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে টাকার সরবরাহ বাড়াতে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ বিনা প্রশ্নে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার প্রস্তাব করেছেন মুস্তফা কামাল।
বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, করোনা ভাইরাসজনিত সংকটের কারণে পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনা এবং মানুষকে নতুনভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা সময়ের দাবি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দারও পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে আমাদের অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।
এমন পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ১০ শতাংশ কর দিয়ে আবাসন ও পুঁজিবাজারে বিনা প্রশ্নে বিনিয়োগ করার সুযোগ রেখেছেন তিনি। অস্বাভাবিক সময়ে অস্বাভাবিক পদক্ষেপের প্রয়োজন হয় মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী অর্থনীতির মূল স্রোতে অর্থ প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়কর অধ্যাদেশে দুটি ধারা সংযোজনের প্রস্তাব করেছেন।
অর্থ পাচার ঠেকাতে আন্ডার ইনভয়েসিং, ওভার ইনভয়েসিং ও ভুয়া বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থ পাচার করলে ৫০ শতাংশ জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। চার বছর স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা কিছুটা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ব্যক্তি খাতের করমুক্ত আয়ের সীমা আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ টাকায় উন্নীত করা হচ্ছে।

স্থানীয় শিল্পে সুবিধা
করোনা ভাইরাস মহামারীর কারণে স্থানীয় শিল্পে সুবিধা দিতে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১২-এর কয়েকটি ধারায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। স্থানীয় উৎপাদনমুখী শিল্পের জন্য কাঁচামাল আমদানির ওপর আগাম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে সাধারণভাবে স্থানীয়ভাবে তৈরি সব পণ্যের দাম কিছুটা কমবে।
দেশে টেক্সটাইল শিল্পের বিকাশের জন্য পলিয়েস্টার, রেয়ন ও অন্যান্য সব সিনথেটিক সুতার ওপর মূসক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে প্রতি কেজিতে সুনির্দিষ্ট ৬ টাকা করা হয়েছে এবং সব ধরনের কটন সুতার ওপর কর প্রতি কেজিতে ৪ টাকা থেকে কমিয়ে ৩ টাকা করা হয়েছে। এসএমই শিল্পের পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা দেয়ায় সেসব পণ্যের দাম কমবে। মৎস্য, পোলট্রি ও ডেইরি খাতের জন্য সয়াবিন অয়েল কেক ও সয়া প্রোটিন কনসেনট্রেট আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা দেয়ায় এসব পণ্যের দাম কমতে পারে। মূসক অব্যাহতি দেয়ায় কৃষি যন্ত্রপাতির দামও কমবে। এতে কৃষক সুফল ভোগ করবেন। একইভাবে ১৫ শতাংশ ভ্যাট মওকুফের প্রস্তাব থাকায় কমতে পারে সোনার দামও। রপ্তানিতে প্রায় ৮৫ শতাংশ অবদান রাখা তৈরি পোশাক খাতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা আগের হার বহাল রয়েছে। প্রবাসী আয়েও চলতি অর্থবছর ২ শতাংশ হারে দেয়া নগদ সহায়তা অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে।

অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাব উত্তরণে চারটি কর্মপন্থা
করোনা ভাইরাসে অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাব উত্তরণে চারটি কর্মপন্থা নির্ধারণের কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে কর্মসৃজনকে প্রাধান্য দেয়া হবে এবং বিলাসী ব্যয় নিরুৎসাহিত করার কৌশল নেয়া হবে। এছাড়া ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বল্প সুদে কিছু ঋণ সুবিধা প্রবর্তন করা যাতে অর্থনৈতিক কর্মকা- পুনরুজ্জীবিত হয় এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ে। হতদরিদ্র ও কর্মহীন হয়ে পড়া নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী ও অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মকা-ে নিয়োজিতদের সুরক্ষা দিতে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বাড়ানো হবে। এছাড়া মূল্যস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রেখে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন মুস্তফা কামাল।

কোন খাতে কত বরাদ্দ
আগামী অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল, যা বাজেটের ১৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। বিদায়ী বছরের শিক্ষা খাতে বিদায়ী অর্থবছরের চেয়ে আসন্ন অর্থবছরে ৫ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এবারের বাজেটে নতুন হিসেবে করোনা ভাইরাসজনিত ছুটির ক্ষতি পুষিয়ে পাঠ্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষার উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। এজন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের জোগান রাখার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী।
করোনা ভাইরাসের কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে। এতে প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতায় সেই ক্ষতির কথা উঠে এসেছে।
বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বাড়ানো ইতিবাচক হলেও খাতটির ব্যবস্থাপনায় যে বেহাল দশা, তাতে বর্ধিত বরাদ্দ কতটুকু কাজে লাগবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। করোনা ভাইরাসের মহামারী মোকাবিলায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে বাজেটে। কভিড-১৯-এর পরীক্ষা কিটের আমদানি, উৎপাদন ও ব্যবসা পর্যায়ে মূসক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি পিপিই ও মাস্কসহ সার্জিক্যাল মাস্কের উৎপাদন এবং ব্যবসা পর্যায়ে মূসক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া কভিড-১৯ নিরোধক ওষুধ আমদানি, উৎপাদন ও ব্যবসা পর্যায়ে মূসক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। ফলে কমছে এসব পণ্যের দাম।
করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে সামাজিক সুরক্ষা খাতের আওতায় নেয়ার প্রস্তাব রয়েছে বাজেটে। যদিও এ খাতের বরাদ্দের বড় অংশই পেনশনে যাবে। সংকটকালীন একটি বিশাল জনগোষ্ঠী দারিদ্র্য সীমার নিচে পড়ে গেছে। উল্লেখযোগ্য অংশ চাকরি হারিয়েছে। বাজেটে নতুন কর্মসংস্থানের চারটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২ হাজার কোটি বরাদ্দ রাখা হলেও তা অপ্রতুল।
অর্থমন্ত্রী বাজেট বলেছেন, করোনা মহামারীর কারণে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্যপ্রবণ ১০০টি উপজেলায় সব দরিদ্র প্রবীণ ব্যক্তিকে বয়স্ক ভাতার আওতায় আনা হবে। এতে ৫ লাখ নতুন উপকারভোগী যোগ হবে। এ উপজেলাগুলোর সব বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারীকে ভাতার আওতায় আনা হবে। এতে নতুন যোগ হবে সাড়ে তিন লাখ উপকারভোগী। এছাড়া নতুন করে ২ লাখ ৫৫ হাজারসহ মোট ১৮ লাখ অসচ্ছল প্রতিবন্ধীকে ভাতা দেয়া হবে। যদিও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে থাকা দেশে এবার দুর্যোগ ও ত্রাণের বাজেট কিছুটা কমছে।
আগামী অর্থবছরে ঋণের সুদ, ভর্তুকি ও অবসরভাতা পরিশোধে ব্যয় হবে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভর্তুকি ও প্রণোদনাবাবদ ৪৭ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা ও অবসরভাতা ও গ্র্যাচুইটিবাবদ ২৭ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে। আর ঋণের সুদ পরিশোধবাবদ ৬৩ হাজার ৮০১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। বাজেট বরাদ্দে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৬৪ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের ১১ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
করোনার প্রভাব মোকাবিলায় বিগত বছরগুলোর মতো কৃষি খাতে ভর্তুকি, সার-বীজসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ প্রণোদনা ও সহায়তা কার্ড, কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা, স্বল্প সুদ ও সহজ শর্তে বিশেষ কৃষিঋণ সুবিধা অব্যাহত রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। প্রস্তাবিত বাজেটে ২৯ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ২ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা বেশি। ফসল কর্তন কার্যক্রমে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি কেনায় কৃষককে ভর্তুকি দেয়া অব্যাহত থাকবে। বর্তমানে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ডধারী কৃষকদের সংখ্যা ২ কোটি ৮ লাখ ১৩ হাজার ৪৭৭ জন।
এ অবস্থায় ভালো বাজেট

কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

প্রস্তাবিত ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটকে অর্থনৈতিক উত্তরণের বাজেট অভিহিত করে পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ তাৎক্ষণিক বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বলেন, যখন সারা বিশ্ব এক মহামারীর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশও এক মন্দ সময় পার করছে। বেকারত্ব বেড়েছে, দারিদ্র্য বেড়ে গেছে। এ দারিদ্র্য হার ২০ শতাংশে নেমে এসেছিল। এখন বলা হচ্ছে তা ৩৫ শতাংশে পৌঁছে গেছে। অনেক মানুষ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে খাদ্য প্যাকেট বা নগদ অনুদানের ওপরে। সেটা একটা দিক। আরেকটি দিক হলো, কভিড-১৯ সংক্রমণ বাড়ছে। যত পরীক্ষা হচ্ছে তত শনাক্তের সংখ্যা বাড়ছে। অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাজেটটা আসল। কঠিন সময়ে এমন বাজেট দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই।
স্বাস্থ্য খাতে ২৯ হাজার কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। এটা চিরায়ত যেটা থাকে, বাজেটের ৫ শতাংশ আর জাতীয় আয়ের শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। এটা বাড়েনি। এটা বাড়ানো যেত। কারণ, সার্বজনীন স্বাস্থ্য তো এক বছরে হবে না। কিন্তু এর একটি ভিত্তি নির্মাণের প্রচেষ্টা থাকতে পারত। কমিউনিটি ক্লিনিককে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্য পরিষেবা বাড়ানোর চেষ্টা করা যেতে পারত।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে অনেক টাকা বাড়ানো হয়েছে। সেটা সঠিক আছে। কারণ অনেক মানুষকে বেশ কিছুদিন সহায়তা করতে হবে। এবার আসি কৃষিতে। ধান-চালের বাইরে অন্য খাত যেমন পোলট্রিতে বেশ অসুবিধা হয়ে গেছে। এখানে ২২ হাজার কোটি টাকা দেয়া হয়েছে কৃষি খাদ্য ও মৎস্যে। পল্লী উন্নয়নে ৩৯ হাজার কোটি টাকা আছে। টাকা আছে কিন্তু ঠিকমতো ব্যয় তো করতে হবে।
৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটির বাজেট। রাজস্ব আয় হবে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর থেকে আসবে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি। ৪৮ হাজার কোটি অন্যদিক থেকে। এনবিআরের এ বছর নির্ধারিত যে লক্ষ্য ছিল সেখানে ৫ থেকে ২০ শতাংশ কম হয়েছে। আগামী বছর সমস্যার উন্নতি খুব বেশি হবে বলে আমার মনে হয় না। সেখানে সমস্যা আছে।

মানবসম্পদ নিয়ে আলোচনা নেই
হোসেন জিল্লুর রহমান

মানবসম্পদ খাত নিয়ে বাজেটে তেমন আলোচনা হয়নি জানিয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, কভিড-১৯ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেশের সব খাতেই প্রভাব ফেলেছে। বাজেটের বিভিন্ন আলোচনায় অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের বিষয়টিতে জোর দেয়া হচ্ছে।
মানবসম্পদ খাতেও কভিডের প্রভাব অনেক বেশি, যদিও এ বিষয়ে তেমন কোনো আলোচনা হচ্ছে না। প্রস্তাবিত বাজেটেও পিছিয়ে পড়া মানবসম্পদ খাতের পুনরুদ্ধারের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে আলোকপাত করা হয়নি। নীতি-নির্ধারকরা কেন জানি এ বিষয়টিকে এড়িয়ে যাচ্ছেন।
মানবসম্পদ খাতের উন্নয়ন না করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। যদিও বাজেটে শিক্ষাসহ মানবসম্পদ সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে বরাদ্দের হার সন্তোষজনক পর্যায়ের নয়।
এখনও জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে মানবসম্পদ খাতের উন্নয়নে বড় আকারের বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি বরাদ্দকৃত অর্থ ও সুস্পষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য দিক নির্দেশনাও থাকতে হবে।

রাজস্ব লক্ষ্য অবাস্তব
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান

এক কথায় বললে এ মহামারীর বছরে সরকারের এমন উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আহরণ পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত হয়নি। স্বাভাবিক বছরেও সরকারের পরিকল্পনামাফিক রাজস্ব আহরণ হয় না। আমরা অনেকবার বলেছি আড়াই লাখ কোটি টাকার ওপর রাজস্ব সংগ্রহের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাজেট বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে। কিন্তু সরকার এ বছর সেটি বাড়িয়ে করেছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরকে দেবে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এত গ্রোথ কীভাবে হবে সেটা ভেবে দেখা দরকার ছিল।
সামগ্রিক দিক বিবেচনায় মনে হয়েছে সরকার চেষ্টা করেছে এ বাজেট যতটা জনবান্ধব করা যায়। স্বাস্থ্য খাতের যে তলানি বাজেট ছিল সেটি কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে এ খাতে আরও জোরদার পরিকল্পনা দরকার ছিল। কৃষি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক নিরাপত্তা এসব খাতের পরিধি বেড়েছে। তবে যতটা বেড়েছে তার চেয়ে আরও দরকার ছিল। কারণ করোনাকালে সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে নিম্ন আয়ের মানুষ। ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প বাড়ানো দরকার ছিল।

ঘাটতি আরও বাড়বে
আহসান এইচ মনসুর

রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি; দ্বিতীয়ত, রাজস্ব বোর্ডের কাঠামোগত শক্তি এবং তৃতীয়ত, বাজেট বাস্তবসম্মত হলো কি না? এর সবদিক বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, বাস্তব লক্ষ্যমাত্রার ওপর ভিত্তি করে হয়নি। প্রতিবার দেখা যায় সরকার উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার বাজেট দেয়। সেখানে রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা বড় একটি ঘাটতি থাকে। এ বছর কভিড-১৯ অর্থনীতি প্রায় অচল করে দিয়েছে।
ফলে আমাদের প্রাক্কলন বলছে, ২ লাখ ১০ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব আহরণ হতে পারে। সেখানে সরকারের ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার ওপর যাবে সেটা বোধগম্য নয়। সরকার একতরফা এনবিআরের তথ্য নিয়ে এটা করেছে। ফলে এ বাজেট বাস্তবায়নে বড় ঘাটতির মুখে পড়তে হবে।
করোনা সংকটের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সরকার চেষ্টা করেছে বাজেট বাস্তবসম্মত করতে। স্বাস্থ্য খাতে এবার বরাদ্দ বেড়েছে। তবে এ খাতে দুর্নীতি একটি বড় সমস্যা। সেগুলো বন্ধ করতে হবে। পরিকল্পনা, নিয়োগ, স্বাস্থ্য সরঞ্জামাদির কেনাকাটা বাড়াতে হবে। বরাদ্দের টাকাটা জনকল্যাণে সঠিকভাবে ব্যয় করতে হবে। তাহলে বরাদ্দের প্রকৃত সুফল পাবে জনগণ।