প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

করোনাকালে সেবা সংস্থাগুলো মানবিক না হয়ে দানবিক আচরণ করছে

বিশেষ প্রতিবেদক
বৈশ্বিক মহামারী করোনার ভেতরেই আমাদের জীবন চলছে, চলছে জীবিকা। কিন্তু সবসময়ই একটা আতঙ্ক মনের ভেতর চেপে আছে। আক্রমণের ভয় আছে, আর এর সঙ্গে আছে আক্রান্ত হলে টেস্ট করাতে পারা বা না পারার ভয়। সঙ্গে আছে প্রয়োজনীয় মুহূর্তে করোনা নাকি করোনা নাÑ এই চক্রে পড়ে চিকিৎসা না পেয়ে এ হাসপাতাল ও হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসাহীন হয়ে মরে যাবার ভয়।
বিদ্যমান বাস্তবতায় পরীক্ষা এবং চিকিৎসায় প্রতারণার অভিযোগ আসে রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল, জেকেজি হেলথ কেয়ায় ও রিজেন্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে করোনাকালে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে বিপাকে পড়ে হাজার হাজার গ্রাহক। লকডাউনে মিটার রিডিং না করেই বিদ্যুৎ বিল করার অভিযোগ উঠে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। করোনাকালে সেবা সংস্থাগুলো মানবিক না হয়ে যখন দানবিক আচরণ করছে, তখন রাষ্ট্রের কাছেই সাধারণ মানুষ অভিযোগ করবেÑ এমনটাই ধারণা করা যায়। অথচ করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে জালিয়াতির অভিযোগে এই অভিযুক্তদের সাথে সরকার বা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালীদের সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
মহামারির এমন দিনে যখন মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা, জালিয়াতি হয়, তখন সমাজের সর্বোচ্চ অধঃপতন ঘটছে বলেই মনে করতে হয়। করোনার এমন আগ্রাসী সময়ে মানুষ কোথায় মানবিক হয়ে উঠবে তা নয়; বরং আরো যেন হিংস্র, অমানবিক হয়ে উঠছে। মহামারির মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনার নানা অভিযোগ ওঠার পর এই খাতে সংস্কার এবং তাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।
করোনার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা না করেই ভুয়া রিপোর্ট দেয়াসহ নানা অনিয়ম ধরা পড়ায়
সম্প্রতি রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখা বন্ধ করে দেয়া হয়। এর পরপরই রিজেন্ট গ্র“পের চেয়ারম্যান মো. শাহেদকে প্রধান আসামি করে ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা (মামলা নম্বর- ৫) করে র‌্যাব। এরপর বেরিয়ে আসে কুকীর্তির বিস্তীর্ণ ইতিহাস। গাড়ি চাপা দিয়ে পথচারীকে আহত করে সেই আহত ব্যক্তিকে নিজের হাসপাতালে ভর্তি করে লাখ
লাখ টাকার ভুয়া বিল করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মতো অপরাধও সামনে চলে আসে।
বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, ‘শাহেদ করিম একাই জালিয়াতি করেছেন, বিষয়টি এমন নয়। অনেকেই করোনাকালে দুর্নীতি করেছেন, করছেন। কয়েকটি হাসপাতালের জালিয়াতির খবর তো মিডিয়াই পেল। মহামারির এমন দিনে যখন মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা, জালিয়াতি হয়, তখন সমাজের সর্বোচ্চ অধঃপতন ঘটছে বলেই মনে করতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভেঙে পড়া সমাজের খেসারত হিসেবে দুর্ভিক্ষও দেখা যেতে পারে।
আবার অশান্তি চরম অবস্থায়ও রূপ নিতে পারে, যা গোত্রে গোত্রে হানাহানিও তৈরি করবে।’

আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভুতুড়ে বিল
২৩ মে করোনা শনাক্ত হওয়ার পর রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে ভর্তি হন সাইফুর রহমান। ২ জুন তিনি হাসপাতাল থেকে রিলিজ নেন। সেখানে চিকিৎসকের বিল ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৭০০ টাকা, হাসপাতাল বিল এক লাখ ১৪ হাজার ৫৭০ টাকা, ইনভেস্টিগেশন বিল ১৯ হাজার ৪৭৫ টাকা, ওষুধের বিল পাঁচ হাজার ২২৬ টাকা ৮৫ পয়সা, এর সঙ্গে সার্ভিস চার্জ ১২ হাজার ৯০৩ টাকা। মোট বিল লেখা হয়েছে এক লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ টাকা।’
বিল দিতে না পারায় হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জের কাগজ নিয়েও বের হতে পারছিলেন না সাইফুর। শেষ পর্যন্ত অনেক অনুরোধ করে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান তিনি। পরে অবশ্য হাসপাতালের বিল নিয়ে সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট ও স্যোশাল মিডিয়ায় আলোচনার ঝড় উঠলে রোগীকে ‘সরি’ বলে ৫৪ হাজার ৮৮০ টাকা কেটে রেখে বাকি টাকা ফেরত দেয় আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল।
সাইফুর বলেন, ‘আমার কোনও অপারেশন করা হয়নি। আইসিইউতে ছিলাম না। অক্সিজেন দেওয়াও লাগেনি। কেবল নাপা আর গ্যাসের ট্যাবলেট দিয়েছে তারা। বাকি ওষুধ বাইরে থেকে কিনে খেয়েছি।’

জেকেজি কেলেঙ্কারি
করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা না করেই রিপোর্ট দেয়ার অভিযোগ ওঠে জেকেজি হেলথ কেয়ারের বিরুদ্ধে। সরকারের কাছ থেকে বিনামূল্যে নমুনা সংগ্রহের অনুমতি নিয়ে অর্থ নিচ্ছিল জেকেজি।
কোভিড-১৯ পরীক্ষা না করেই রিপোর্ট ডেলিভারি দেয়া জেকেজি হেলথকেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা এ চৌধুরী ও প্রধান নির্বাহী আরিফ চৌধুরীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার পাশাপাশি গত ২২ জুন জেকেজি হেলথকেয়ারের সাবেক গ্রাফিক্স ডিজাইনার হুমায়ুন কবীর হিরু ও তার স্ত্রী তানজীন পাটোয়ারীকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ জানতে পারে, জেকেজি হেলথকেয়ার থেকে ২৭ হাজার রোগীকে করোনার টেস্টের রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ৫৪০ জনের করোনার নমুনা আইইডিসিআরের মাধ্যমে সঠিক পরীক্ষা করানো হয়েছিল। বাকি ১৫ হাজার ৪৬০ জনের রিপোর্ট প্রতিষ্ঠানটির ল্যাপটপে তৈরি করা হয়। জব্দ করা ল্যাপটপে এর প্রমাণ মিলেছে। জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে সাবরিনা জানান, জেকেজির সাত-আট কর্মী ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করেন।
নমুনা পরীক্ষার জন্য বিদেশি নাগরিকদের জন্য নেয়া হতো ১০০ ডলার (প্রায় ৮ হাজার ৫০০ টাকা)। বাংলাদেশিদের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা। যদিও দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতির ভিত্তিতে বিনামূল্যে তাদের স্যাম্পল কালেকশন করার কথা ছিল।

ধরাকে সরাজ্ঞান করেছেন
রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক
করোনা মহামারীর সুযোগে ধরাকে সরাজ্ঞান করেছেন রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক। করোনার নকল সনদ তৈরি করে একই সঙ্গে রোগী ও সরকারের কাছ বিল আদায় করা, মিরপুর শাখা পরিদর্শনের সময় মন্ত্রণালয়ের দুজন কর্মকর্তাকে অস্ত্রের মুখে তাড়িয়ে দেয়া, লাইসেন্স ছাড়াই ৭ বছর ধরে হাসপাতাল চালানো, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্টিকার ও ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড লাগিয়ে রেজিস্ট্রেশনবিহীন ব্যক্তিগত গাড়ি চালানো ও কর্মচারীদের বেতন ভাতাদি পরিশোধ না করার মতো অসংখ্য অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে র‌্যাব। ছয় হাজার রোগীর কাছ থেকে কমপক্ষে সাড়ে ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় এই রিজেন্ট।
অভিযানের পরপরই রিজেন্ট হাসপাতালের এমডি মাসুদ পারভেজ গ্রেপ্তার হলেও পলাতক ছিল মূল হোতা সাহেদ। গত ১৫ জুলাই ভোর সোয়া ৫টার দিকে সাহেদকে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার শাখরা কোমরপুর সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেফতার করে র‌্যাবের বিশেষ একটি দল।
করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসায় অনিয়ম-প্রতারণার অভিযোগ এনে উত্তরা পশ্চিম থানায় রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদকে এক নম্বর আসামি করে ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। উত্তরায় রিজেন্টের প্রধান কার্যালয়সহ রোগীদের স্থানান্তরের পর সিলগালা করা হয়েছে উত্তরা ও মিরপুরের হাসপাতাল।
এদিকে র‌্যাব রিজেন্টের উত্তরা ও মিরপুর শাখা সিলগালা করায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালের কার্যকর বাতিল করা হয়েছে।
জানা গেছে, করোনা তা-বের শুরুতেই গত মার্চে র‌্যাব জানতে পারে উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালে প্রধান শাখায় চিকিৎসার নামে চরম অনিয়ম দুর্নীতি ও অরাজকতা চলছে। তখন থেকেই মূলত র‌্যাব গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে। এ সময় র‌্যাবের হাতে তথ্য আসে করোনা উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা এবং বাড়িতে থাকা রোগীদের করোনার নমুনা সংগ্রহ করে ভুয়া রিপোর্ট প্রদান করছে রিজেন্ট হাসপাতাল। এছাড়াও সরকার থেকে বিনামূল্যে করোনা টেস্ট করার অনুমতি নিয়ে রিপোর্ট প্রতি সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা করে আদায় করা হতো। এভাবে রোগীর সঙ্গে প্রতারণা করে মোট ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে রিজেন্ট হাসপাতাল। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সাহেদ ও এমডি মাসুদ সরাসরি ডিল করতেন অনিয়ম, অপরাধ ও প্রতারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো। তাদের বিশ্বস্ত এক ডজন কর্মীও ছিল। এ সম্পর্কে র‌্যাব জানতে পারে, করোনা টেস্টের জন্য আসা রোগীদের বিনামূল্যে নমুনা সংগ্রহ করার কথা ছিল রিজেন্টের। কিন্তু তারা প্রায় ১০ হাজার জনের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে, প্রত্যেকের কাছ থেকে তারা টাকা নিয়েছে। এসব নমুনার অর্ধেকের বেশি পরীক্ষা না করেই রিপোর্ট দিয়েছে, যা সম্পূর্ণ প্রতারণা। রিজেন্ট সরকারকে জানিয়েছে তারা কোভিড রোগীদের ফ্রি চিকিৎসা দিচ্ছে। এই বলে তারা সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ ক্লেইম করেছে।

সাহেদ-আরিফ-সাবরিনার
ব্যাংক হিসাব জব্দ
করোনাভাইরাস পরীক্ষার ভুয়া সনদ প্রদানের দায়ে অভিযুক্ত রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদ, জেকিজি হেলথ কেয়ারের মালিক আরিফুল চৌধুরী ও তার স্ত্রী ডা. সাবরিনার ব্যক্তিগত এবং প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা সব ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এনবিআরের কেন্দ্রিয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) থেকে ব্যাংকগুলোকে এই নির্দেশনা দেয়া হয়।
নির্দেশনায় উল্লেখিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের একক এবং যৌথ নামে থাকা সব ধরনের ব্যাংক হিসাবের লেনদেন অপ্রচলনযোগ্য (ফ্রিজ) করতে বলা হয়।
সিআইসির মহাপরিচালক আলমগীর হোসেন বাসসকে জানান, ব্যাংক হিসাব জব্দ রাখার পাশাপাশি এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাব লেনদেনের বিবরণী সাত দিনের মধ্যে পাঠাতে বলা হয়েছে।
এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব প্রতিষ্ঠানের গত পাঁচ বছরের ব্যাংক লেনদেনের তথ্য ও কর ফাইলে দেখানো তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে। এর মধ্যে অসামঞ্জস্যতা দেখা গেলে বিদ্যমান আয়কর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বাড়তি বিদ্যুৎ বিল করার অভিযোগ
কোভিড ১৯ কারণে গত ফেব্র“য়ারি থেকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের আবাসিক পোস্ট পেইড মিটারের গ্রাহকদের মাসিক বিল নেওয়া বন্ধ থাকে। এতে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো চরম ক্ষতির মুখে পড়ে। তখন এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘জুনের মধ্যে বিদ্যুতের আবাসিক গ্রাহকেরা বিদ্যুতের বিল না দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। কেননা, করোনা মহামারীর মধ্যে গত মাসে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে বিপাকে পড়ে হাজার হাজার গ্রাহক। লকডাউনে মিটার রিডিং না করেই বিদ্যুৎ বিল করার অভিযোগ ওঠে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে সঠিক বিল দেয়ার দাবিও করে গ্রাহকেরা।
এরকম পরিস্থিতির কারণ, বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হওয়ার পর ২৬ মার্চ থেকে দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় যে আবাসিক গ্রাহকরা ফেব্র“য়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত তিন মাসের বিল দেরিতে দিতে পারবেন।
জুন মাসে বিল পরিশোধ করতে হবে এবং বিলম্বিত বিল পরিশোধে কোনো অতিরিক্ত জরিমানা নেয়া হবে না।

স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশে করোনাভাইরাস চিকিৎসায় প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. শাহেদের ব্যাপারে তথ্য এবং নথিপত্র চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং এনবিআরসহ নয়টি প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি দিয়েছে দুদক।
অন্যদিকে নমুনা পরীক্ষা নিয়ে জেকেজি হেলথ কেয়ারের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ডিবি পুলিশকে।
করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে এসব অভিযোগ ওঠার পর স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। এখন আবার আলোচনায় এসেছে স্বাস্থ্যখাতে সংস্কার এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্ন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক বলেছেন, স্বাস্থ্যখাতকে একেবারে ঢেলে সাজানোর বা সংস্কারের কথা বিভিন্ন সময় বলা হলেও এই খাত অস্থায়ী পরিকল্পনার ভিত্তিতে বা ইমারজেন্সি ব্যবস্থাপনায় সব সময়ে চলছে।
দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর পরই গত মার্চ মাসে সরকারের কেন্দ্রীয় ঔষাধাগার থেকে সরবরাহ করা এন৯৫ মাস্ক এবং পিপিইসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা সামগ্রীর মান নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল।
এনিয়ে আলোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই এখন প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে রিজেন্ট হাসপাতাল এবং জেকেজির বিরুদ্ধে।
সংক্রমণ শুরুর আগের কয়েকমাসেই ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্বাভাবিক দামে পর্দা কেনাসহ বিভিন্ন হাসপাতালের নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে দুদক ১১টি মামলা করেছে।
দুর্নীতির উৎস এবং সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রায় ছয় মাস আগে দুদক স্বাস্থ্যখাতে সংস্কারের কিছু সুপারিশও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দিয়েছিল।
দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, সংস্কারের প্রশ্নে কতটা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে-তা তারা এখনও জানতে পারেননি।
‘আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কিছু রিফর্ম করার জন্য বলেছিলাম। দুর্নীতির উৎস কী-সেগুলো আমরা চিহ্নিত করেছি। আমরা সেগুলো মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানিয়েছি। এখন মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির ফাঁকফোকর বন্ধ করার জন্য সংস্কারের কিছু পদক্ষেপ নেয়ার কথা ছিল। কতটুকু কী করেছে, আমরা একটা পর্যালোচনা করে দেখার চেষ্টা করছি।’
দুদক চেয়ারম্যান আরও বলেছেন, ‘সংস্কারের সুপারিশে আমরা দুর্নীতির বিষয়টা এনেছি এবং দুর্নীতি কোথায় কোথায় হচ্ছে, সেগুলো আমরা দেখিয়েছি। কারণ, আমরা মামলায় দেখেছি, শুধু বাক্স সাপ্লাই করা হয়েছে। মামলায় আমরা দেখেছি, ভেন্টিলেটার নেয়া হয়েছে। ভেন্টিলেটারের অ্যাক্সেসরিজ কেনা হয় নাই। এগুলোতো অনিয়ম ও দুর্নীতি।’
বিশ্লেষকরা বলেছেন, স্বাস্থ্যখাতে কখনও সেভাবে সংস্কার হয়নি। যুগ যুগ ধরে এই খাত ঢাকা থেকে এককেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়েছে। সে কারণে সিন্ডিকেটের দখলে দুর্নীতি হচ্ছে এবং চিকিৎসা সেবার বেহালদশা থাকছে বলে তারা মনে করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা বলেছেন, স্বাস্থ্যখাত পরিচালনার পদ্ধতি পুরো ঢেলে সাজানোর জন্য একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের কথা বিভিন্ন সময় আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি।
‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত বহুদিন ধরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলছে। অনেক সময় আমরা দেখছি, সেই সিন্ডিকেটের শক্তি সরকারের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। কিন্তু সরকারের হাত কোনো সিন্ডিকেট বা কোনো গ্র“পের থেকে কখনও ছোট হতে পারে না। আমরা মনে করি, সরকারের হাত সিন্ডিকেটের চেয়ে বড় হবে।’
অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা বলেছেন, ‘স্বাস্থ্যখাতে প্রচুর কেনাকাটা আছে। এই কেনাকাটা থেকে দুর্নীতিটা হচ্ছে। সেকারণে আমরা মনে করি, দক্ষ জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন গঠন করা দরকার।’
আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক আ ফ ম রুহুল হক এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি।
তিনিও মনে করেন, স্বাস্থ্যখাতের মূল সমস্যা হচ্ছে পুরোনো ধাঁচের ব্যবস্থাপনা। সেকারণে কোনো সংকট দেখা দিলে তাতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু স্থায়ী কোনো পরিকল্পনা হয় না।
অধ্যাপক রুহুল হক বলেছেন, ‘স্বাস্থ্যবিভাগে এখন যে সংস্কার দরকার তা হলো আমূল পরিবর্তন। এটি করতে হলে আমাদের অনেকে মিলে বসে কী কী পরিবর্তন করা যায়-তা আলোচনা করে ব্যবস্থাপনাটি করতে হবে। তা না হলে স্বাস্থ্যবিভাগের দুর্নীতি বলেন, ডাক্তারদের অনুপস্থিতি বলেন বা হাসপাতালগুলোর ব্যবস্থা সঠিক হচ্ছে না বলেন-এগুলো কখনই ঠিক হবে না।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা আপনারা জানেন, একেবারে সেন্ট্রাল ম্যানেজমেন্ট। একজন মন্ত্রী এবং একজন ডিজি সারাদেশের এত শত শত হাসপাতাল এক জায়গা থেকে কন্ট্রোল করেন। আমি মনে করি বড় হাসপাতালগুলো এবং মেডিকেল কলেজকে ডিসেন্ট্রলাইজ করা দরকার। যেমন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসাবে কাজ করছে। সে রকম করতে হবে।’
সরকারি হাসপাতালগুলোর বেহালদশা নিয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা হলেও স্থায়ী পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে না বলে বিশ্লেষকরা বলেছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, যখন কোনো সমস্যা হয়, তখন তাতে তাৎক্ষণিক কিছু ব্যবস্থা নেয়া হয়। সংস্কার করা হচ্ছে না কেনÑএখানে সরকারের আন্তরিকতা বা রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব আছে কিনা?
এমন প্রশ্নে অধ্যাপক রুহুল হক বলেছেন, ‘আপনি যে কথা বলেছেন, আমরা কিন্তু এখন তাৎক্ষণিক বা অ্যাডহক ব্যবস্থা নিচ্ছি। যে সমস্যাটা হলো অর্থাৎ যেখানে চাকা লিক হয়ে গেলো, সেখানে একটু তালি দিচ্ছি। ইমারজেন্সি ব্যবস্থাপনায় সকল সময়ে চলছে। ব্যবস্থাপনার বিকেন্দ্রিকরণ করার জন্য আমাদের একটি হেলথ কমিশন দরকার বলে আমি মনে করি।’
অধ্যাপক রুহুল হক আওয়ামী লীগ সরকারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিনি কেন তখন এসব সংস্কার করেননি?
এমন প্রশ্নের জবাবে রুহুল হক বলেন, ‘আমি ডাক্তারদের প্রমোশনের পদ্ধতিসহ কিছু বিষয়ে সংস্কার করেছি। কিন্তু পুরো স্বাস্থ্যখাতের ব্যবস্থাপনা বিকেন্দ্রীকরণ করা বা আমূল পরিবর্তন আনা অনেক বড় বিষয়। মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সবাই মিলে এই পরিবর্তন আনতে হবে। এটা অনেক আলোচনার বিষয়। আমি চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সফল হইনি।’
আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক এই স্বাস্থ্য মন্ত্রী অধ্যাপক রুহুল হক দাবি করেন, সংস্কারের ব্যাপারে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু তারপরও কেন সংস্কার করা যাচ্ছে নাÑসে প্রশ্নে সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে রিজেন্ট হাসপাতাল এবং জেকেজির জালিয়াতিসহ দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষাপটে বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, ‘স্বাস্থ্যখাতে সবকিছু নিয়মনীতির মধ্যে চলছে।’

রাজনৈতিক প্রভাব কতটা
বাংলাদেশে করোনাভাইরাস পরীক্ষা নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছে জেকিজি হেলথ কেয়ারের মালিক আরিফুল চৌধুরী ও চেয়ারম্যান সাবরিনা আরিফ। অন্যদিকে পরীক্ষা এবং চিকিৎসায় প্রতারণার অভিযোগে আলোচিত আরেকজন রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. শাহেদকেও গ্রেফতার করে র‌্যাব।
করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে জালিয়াতির অভিযোগে এই অভিযুক্তদের সাথে সরকার বা
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালীদের সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
যখন পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার অভিযোগ উঠেছে, তখন সরকারি কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে
রাজনৈতিক প্রভাব কতটা বিবেচনায় আসেÑ নতুন করে সেই প্রশ্ন এসেছে।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, স্বাস্থ্যখাতসহ যে কোনো সরকারি কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক যোগাযোগ বা প্রভাবের বিষয়টিই মূল বিবেচনায় আসে এবং সেজন্য এই সুযোগ নিয়ে অনেকে দুর্নীতি বা অনিয়ম করার সাহস পাচ্ছে।
জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত জেকেজির কর্ণধার সাবরিনা আরিফ এবং তার স্বামী আরিফুল হক চৌধুরী, দু’জনকেই জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকার তেজগাঁও থানা পুলিশ।
পুলিশের তেজগাঁও অঞ্চলের উপ কমিশনার হারুন অর রশিদ বলেছেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত দু’জনেই করোনাভাইরাস পরীক্ষার কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানোর বিষয়টি দাবি করেছেন।
‘তারা গোপনে টাকার বিনিময়ে স্যামপল কালেকশন করেছে এবং অবৈধভাবে ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে। সব কিছু মিলিয়ে এত সাহসতো হঠাৎ করে হওয়ার কথা না।’
জেকেজির প্রভাব খাটিয়ে কাজ পাওয়ার অভিযোগ পুলিশের তদন্তে অগ্রাধিকার পাচ্ছে বলে কর্মকর্তারা বলেছেন।
প্রতারণার নানা অভিযোগে অভিযুক্ত রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. শাহেদ ওরফে শাহেদ করিম নিজেকে আওয়ামী লীগের
আন্তর্জাতিক উপকমিটির সদস্য বলে দাবি করতেন।
যদিও আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, মো. শাহেদের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী অনেক নেতার সাথে মো. শাহেদের ছবি নিয়ে ফেসবুকে নানা আলোচনা চলছে এখনও।
দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড: ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, সরকারি ক্রয় এবং যে কোনোখাতে কাজ দেয়ার ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাব মূল বিবেচনার সংস্কৃতি হয়ে গেছে। সেখানে মহামারি পরিস্থিতির কারণে স্বাস্থ্যখাতে যেহেতু জরুরিভিত্তিতে মৌখিকভাবেই কেনাকাটা বা কাজ দেয়া হচ্ছে, সেজন্য তাতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো ও অনিয়ম বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
‘রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, রাজনৈতিক ব্লেসিং, পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত-এই ধরনের উপাদানগুলো কার্যাদেশ থেকে শুরু করে, যারা কাজ পেয়ে থাকেন, এই পুরো প্রক্রিয়াটার মধ্যেই কিন্তু একটা সাংস্কৃতিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে গেছে।’
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, ‘এটা এখন আর গোপনীয় বিষয় নয় যে কারা লাইসেন্স পাবে বা কারা কোন কন্ট্রাক্ট বা কাজ পাবে এবং সেজন্য তাদের রাজনৈতিক যোগাযোগ। সমস্যা দেখা দেয়ার পরই আমরা দেখি, এসবের পিছনে যে সব ব্যক্তি থাকে, তাদের সাথে রাজনৈতিক যোগাযোগগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘যেহেতু রাজনৈতিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে, সুতরাং তারা রাজনৈতিক আশ্রয় এবং প্রশ্রয়ে দুর্নীতি এবং অনিয়মের মতো কাজে জড়িয়ে পড়ে। এবং তারা মনে করে, তারা সে সমস্ত কাজ করে পার পেয়ে যাবে।’
বিশ্লেষকরা বলেছেন, রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে পার পাওয়া যাবেÑ এমন চিন্তা যেহেতু কাজ করে, সেজন্য র‌্যাব যখন রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালায়, সে সময়ই হাসপাতালটির মালিক মো. শাহেদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন করার সাহস পেয়েছিলেন।

কঠোর অবস্থানে ক্ষমতাসীন দল
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাসহ আগের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রেও সরকার অপরাধের সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিচ্ছে। তিনি দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না।
‘সাম্প্রতিক সময়ে যারা ধরা পড়লো বা যাদের অপকর্ম উদঘাটিত হলো, কোনো পত্রিকার হেডলাইন দেখে কিন্তু সরকার এটা করতে বাধ্য হয়নি। শেখ হাসিনার সরকার নিজস্ব উদ্যোগে এই সমস্ত কালপ্রিটদের চেহারা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছে এবং দে হ্যাভ ব্রট দেম টু দ্য বুক।’
কিন্তু যখন কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি বা অপরাধ প্রকাশ পাচ্ছে, তখন সরকার বা আওয়ামী লীগ নেতারা নানা ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলে থাকেন। পরে আর তৎপরতা থাকে না। ফলে বার বার এ ধরণের ঘটনা ঘটছেÑ এমন অভিযোগ তারা বিবেচনা করেন কিনা?
এমন প্রশ্নে মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘রাজনৈতিক কোনো প্রভাব নয়। আওয়ামী লীগ সরকার একদিকে নিজেরা এগুলো উন্মোচন করছে এবং শুধু উন্মোচন করে থেমে যায়নি। তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ আইন অনুযায়ী স্বচ্ছ্বতার সাথে এগুচ্ছে।’
আওয়ামী লীগের নেতাদের বক্তব্য হচ্ছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর বহু বছরের পুরোনো সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা তারা করছেন। কিন্তু বিশ্লেষকদের তাতে সন্দেহ রয়েছে।
শুরু থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে বর্তমান সরকার। ইতোপূর্বে নিজ দলের লোকদেরও ছাড় দেয়া হয়নি। এবার স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি দলের ছত্রছায়ায় করোনাকে কেন্দ্র করে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করলেও
শেষ রক্ষা হচ্ছে না তাদের। অন্য সব দুর্নীতি-অনিয়মের মতোই স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে সরকার।
ইতোমধ্যে কোভিড-১৯ পরীক্ষায় ভুয়া রিপোর্ট, মাস্ক ও সুরক্ষা সামগ্রী কেনায় অনিয়মসহ স্বাস্থ্যখাতে সার্বিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলছে চিরুনি অভিযান। তৎপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পাশাপাশি নানা অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছে। রিজেন্টসহ বেশকিছু হাসপাতাল ও ক্লিনিক সিলগালা করা হয়েছে। কোভিড পরীক্ষায় অক্ষম বেসরকারী বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইতোমধ্যে চুক্তি বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
সমাজে একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী সব সময় ক্ষমতাসীনদের কাছাকাছি অবস্থান করতে পছন্দ করে। নানা ফাঁকফোকর দিয়ে এরা প্রবেশ করে নিজেদের আখের গুছাতে থাকে। বর্তমান সরকার শুরু থেকেই এসব দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।