প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

করোনায় জীবন-জীবিকার যুদ্ধ : চাকরি হারাচ্ছেন অনেকেই : কেউবা টিকে থাকার লড়াইয়ে বদল করছেন পেশা

বিশেষ প্রতিবেদক
বিশে^ করোনার মহামারী কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি বেকারত্ব ও দারিদ্রতা ঘিরে ধরছে পৃথিবীকে। চাকরি হারানোর প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবন যাপন, ক্রয় ক্ষমতায়। মানুষ বাধ্য হচ্ছে জীবন যাপনের মানে পরিবর্তন আনতে।
করোনা মহামারীতে কর্মহীন হওয়া অসহায়ত্বের গল্প এখন রাজধানীর প্রতিটি অলি গলিতে। বেঁচে থাকতে নানানভাবে চলছে তাদের লড়াই। তারপরও পরিবারের চাহিদা মেটানো অনেকটাই দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে অনেকের।
গত সাত মাসে করোনায় লক্ষ লক্ষ প্রাণ ঝরে গেছে। আক্রান্তের সংখ্যা কোটি ছাড়িয়েছে। প্রতিদিন এই তালিকায় যোগ হচ্ছে নতুন নতুন সংখ্যা। গত জুন মাসে আক্রান্ত এবং মৃত্যু দুটোই বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ ছুটি শেষে এখন জোনভিত্তিক লক ডাউন চলছে। কারণ জীবন-জীবিকা দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা যায় না। কিন্তু এখন সবকিছু চললেও তা অনেকটাই থেমে থেমে। অনেকে যা সঞ্চয় করেছিল তাও কারো কারো শেষ হওয়ার পথে। ফলে ভবিষ্যতে কি হবে, তার উত্তর অনেকের কাছেই নেই। সমাজের বিত্তবানরা হতদরিদ্রদের সাহায্যে এগিয়ে এলেও বর্তমানে তারা খেই হারিয়ে ফেলেছেন। কেননা এসব মানুষের সংখ্যা নেহায়েত অল্প নয়। করোনাকালে পরিবর্তন হচ্ছে জীবন-জীবিকা। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা অনেকেই চাকরি হারিয়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে পেশা পরিবর্তন করেছেন। আবার শহরের জীবন ফেলে ফিরছেন গ্রামের জীবনে।
খরচ বাঁচাতে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। অনেক চাকরিজীবীর বেতন কমে গেছে, আবার একেবারেই পাননি অনেকে।
করোনা ভাইরাস পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জীবিকায় প্রভাব ফেলছে। ফলে মানুষ জীবন যাপন প্রক্রিয়া বদলাতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে বেসরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে
চাকরিচুত্যি, কম বেতনে জীবন যাপন করতে হচ্ছে। কর্মী ছাঁটাই যেন করোনাকালে একটি নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। করোনার কারণে অর্থনীতিতে যে পরিবর্তন আসতে চলেছে তা খুব দ্রুতই শেষ হবে না। পরবর্তী দশকে অর্থনীতির এই ধারা বিশ^কে ভোগাবে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। অর্থনীতিকে করোনার প্রভাব ও নতুন পেশা নিয়ে চিন্তা করতে হবে কয়েকটি দিক থেকে।
বিবিসি রেডিওতে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বিশ^ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ম্যালপাস বলেছেন, করোনা ভাইরাস বিশে^র ৬ কোটি মানুষকে নতুন করে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে। এ ৬ কোটির বেশি মানুষকে প্রতিদিন এক ডলারের কম অর্থ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে হতে পারে।
তিনি আরো বলেন, করোনা ভাইরাস অর্থনীতির জন্য এক বিধ্বংসী আঘাত। এটি ঠেকাতে লকডাউন শতকোটি মানুষের জীবন ও জীবিকায় প্রভাব ফেলেছে, যা উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, দরিদ্র দেশগুলোর মানুষ কেবল বেকারই নয়, অনানুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রও হারাচ্ছে।
বিশ^ব্যাংক ও তার সহযোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে, তবে এটা যথেষ্ট নয় বলেও তিনি মনে করেন। সেজন্য দরিদ্র দেশগুলোর জন্য ঋণ ও ত্রাণ দেয়ার আহবান জানান তিনি। দারিদ্রতা মানুষের এমন এক অবস্থা যে তা থেকে মুক্তি পেতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন দরকার হয় এবং সেই সাথে পর্যাপ্ত সুযোগের। প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করারটাও সময়সাধ্য। কারণ এরই মধ্যে নতুন করে চাকরিরর বাজারে প্রবেশে অপেক্ষায় থাকবে অনেকে।

চাকরি হারাচ্ছেন অনেকেই
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত পোশাক খাতে প্রায় ২২ লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। সব মিলিয়ে করোনা কারণে ৭ কোটি মানুষ কর্মহীন এবং দারিদ্র্যসীমায় রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরকারি হিসেবে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। করোনার কারণে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আরো ২২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে হবে ৪৩ শতাংশ। করোনার কারনে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ বেড়েছে। অবস্থা এমন যে দারিদ্রতা আরও দারিদ্র্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অর্থাৎ নিম্নআয়ের মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। যা দারিদ্র্যতা সমস্যাকে আরও প্রকট করবে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর পূর্বাভাস মতে, চলতি অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, করোনার কারণে সাধারণ মানুষের আয় কমে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়েছে ৩৫ শতাংশ। এর পাশাপাশি বেড়েছে আয় ও ভোগ বৈষম্য। মন্দার যে পূর্বাভাস বইতে শুরু করেছিল তা শুরু হয়ে গেছে। এবারের বিশ^ মন্দা ছাড়িয়ে যাবে ২০০৯ সালের মন্দাকেও। জীবনধারা পরিবর্তনের এই ধারা রোধ করা বা এর লাগাম টেনে ধরা সহজ হবে না। কারণ সবার জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা বরাবরই একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। সেক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় যেমন যারা করোনার পূর্বেই বেকার ছিল, করোনার সময়ে যারা চাকরি হারিয়ে বেকার হলো এবং যারা আগামীতে চাকরির বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আসছেÑ এই তিন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে হবে। অর্থাৎ একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। করোনাকালের মহামারী আর কতদিন পৃথিবীতে বিরাজ করবে তা বলা সম্ভব না। কয়েকটি দেশের ভ্যাকসিন ট্রায়ালে রয়েছে। হয়তো খুব দ্রুতই চূড়ান্ত সফলতা আসবে। ততদিনে নতুন করে দারিদ্রতার শিকার হবে আরও বহু মানুষ। জীবন যাপন পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে। চেনা শহর ছেড়ে নতুন ঠিকানায় পাড়ি জমাবে। সবকিছুই চলবে পরিবর্তনের নতুন ধারায়।

করোনার জেরে পেশার পরিবর্তন
সংসারে দুবেলা দুমুঠো ভাত জোগাড়ে সবজির ব্যবসা শুরু করেছেন ইসলামপুরের এক কাপড় ব্যবসায়ী। প্রতিবেশীরাও তাঁর কাছ থেকে সবজি নিচ্ছেন অনেকটা সহযোগিতার দৃষ্টিকোন থেকে। দীর্ঘদিন কাপড়ের ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন তিনি। কোনোদিন ভাবেননি তাঁকে সবজির দোকান দিতে হবে।
হোটেলের মালামাল বিক্রি হবে- টেবিল, চেয়ার, ফ্যান, চুলা, হাঁড়ি-পাতিল, ক্যাশ টেবিল ইত্যাদি শিরোনামের একটি বিজ্ঞাপন দেয় এক যুবক। জানা যায়, করোনায় ক্রেতা কমে যাওয়ায় হোটেলে বিক্রি কমেছে, অন্যদিকে মাসিক ভাড়া ১২ হাজার টাকাসহ কর্মচারীদের বেতন ৩০ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। ৩ মাস বসে ৯০ হাজার টাকা নগদ পকেট থেকে বেরিয়ে গেছে। লোকসানের মুখে পড়ে হোটেলটি বন্ধ করতে হয়েছে। বর্তমানে হোটেল ব্যবসা গুটিয়ে এখন মৌসুমি ফল বিক্রি করছেন তিনি।
রাজধানীর একটি বেসরকারি বিনোদন পার্কে হিসাবরক্ষক কর্মকর্তার কাছ থেকে জানা যায়, করোনার কারণে পার্কটি বন্ধ হয়ে গেলে তার নিয়মিত বেতন আটকে যায়। ৪ মাস ঘরে বসে থেকে এখন অনলাইনে একটি ব্যবসা করার চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, সংসারে স্ত্রী গর্ভবতী। এ সময়ে চাকরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সংসার পরিচালনা, স্ত্রীর চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে বড় ধরনের দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। এখন নতুন পেশা হিসেবে অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেছেন।
ফেনীর দাগনভুঞা হাসাননগর গনিপুর গ্রামে কৃষি কাজ করেন একজন সেলসম্যান। ৫ মাস আগেও তিনি ঢাকার মহাখালীর একটি মোটরপার্টসের দোকানে ১২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতেন। করোনায় বেতন বন্ধ হয়ে গেলে সেলসম্যান পেশা পরিবর্তন করে তিনি কৃষিতে প্রবেশ করেছেন।
তিনি বলেন, মা-বোন নিয়ে মোহাম্মদপুর কাটাসুরে ভাড়া থাকতেন। বেতনের ওপর নির্ভর করে তার সংসার চলত। কিন্তু করোনার কারণে তার কর্মক্ষেত্র অটোপার্টস দোকান ৩ মাস ধরে বন্ধ। বেতন-ভাতাও দেয়া হয়নি। ফলে পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে এসেছেন। ফলে তিনি এখন পেশা পরিবর্তন করে কৃষি কাজ করছেন।
রাজধানীর শনিরআখড়া রায়েরবাগে ছোট কবিরাজি ওষুধের দোকান দিয়ে মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় করতেন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল। করোনায় তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার মির্জাগঞ্জ গ্রামে চলে আসেন। এখানে তিনি মৌসুমি পণ্য বিক্রেতা হিসেবে কাজ শুরু করেছেন।
তিনি বলেন, টিকে থাকাই এখন বড় লড়াই। আর এ লড়াইয়ের অংশ হিসেবে নতুন পেশা শুরু করছি। ভালো আয় নেই। কোনোমতো বেঁচে দিন কাটাচ্ছি।
পেশা পরিবর্তনের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, পুরান ঢাকার লালবাগ, আজিমপুর, কামরাঙ্গীরচর, মোহাম্মদপুর, কাটাসুরসহ অনেক এলাকার ছোটখাটো দোকানের শাটার বন্ধ এবং পাশেই টাঙানো আছে দোকান ভাড়া হবে লেখা বিজ্ঞাপন। লোকসানে পড়ে এসব দোকানি তার ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। শুধু তাই নয়Ñ নিউমার্কেট, গাউছিয়াসহ অনেক মার্কেটে দোকান ভাড়ার সাইনবোর্ড দেখা যাচ্ছে চোখে পড়ার মতো।
করোনার এ সংকট পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার জন্য বিপুলসংখ্যক বেসরকারি কর্মজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এখন পেশা পরিবর্তন শুরু করছেন। এরা বেশিরভাগ হচ্ছে চাকরি হারানো ও ব্যবসা বন্ধ হওয়া কর্মহীন মানুষ। মূলত টিকে থাকার লড়াইয়ে তারা বদল করছেন পেশা।
সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, জীবিকার তাগিদে অনেকে পেশা বদল করছেন। তবে এটি সাময়িক, স্থায়ী হবে না। করোনাভাইরাস সংক্রমণ কমে এলে যারা পেশা পরিবর্তন করেছেন তারা আগের জায়গায় ফিরে আসবেন। তিনি বলেন, অনেক শিক্ষিত মানুষ চাকরি হারিয়ে নতুন নতুন পেশা নিয়ে বসছেন। এটি হয়তো বেঁচে থাকার জন্য। তবে এটি দীর্ঘ মেয়াদে থাকবে না।
অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকাতে এখনই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার তাগিদ অর্থনীতিবিদদের। অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘বিপুল সংখ্যক মানুষ যে কাজ হারিয়েছে, সে ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ণ প্রকল্প; আর উন্নয়ণ প্রকল্প ছাড়াও বিভিন্ন এলাকার সংসদ সদস্যরা তাদের এলাকায় খরচের জন্য যে অর্থটা পেয়েছেন সেখান থেকে কিন্তু কাজের ব্যবস্থা করতে পারেন।’
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, সেবাজনিত পেশাতে বেশি মন্দা চলছে। ছোটখাটো দোকানে বেচা-কেনা হচ্ছে না। ঢাকামুখী অনেক মানুষ আগেই সহায়-সম্বল বিক্রি করে এসেছিলেন।
পেশা হারিয়ে সেই গ্রামে ফিরে যাওয়ার অবস্থাটুকু নেই। অনেকে পরিবার-পরিজন গ্রামে রেখেই ঢাকায় এসেছিলেন। তারা হয়তো ফিরে গিয়ে অন্য পেশায় ঝুঁকবেন। এতে গ্রামীণ শ্রম বাজারে ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শ্রমের মূল্যও কমে যেতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার হিসেবে দেশে কর্মে নিয়োজিত ছিলেন ৬ কোটি ৮২ লাখ মানুষ। করোনার কারণে ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির কারণে এসব মানুষ কাজ হারান। তবে সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত কর্মহীন লোকের সংখ্যা ১৪ লাখ।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও তার রিপোর্টে বলেছে, করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় প্রবাহের জেরে বিশ্বজুড়ে ৩৪ কোটি মানুষ কাজ হারাতে পারেন। এ ক্ষতির তালিকায় নাম রয়েছে বাংলাদেশেরও।

চাকরির বাজার ও নতুন পেশা
বৈশ্বিক মহামারি শুরুর পর থেকে বহু মানুষ কাজ হারিয়েছেন, গুটিয়ে গেছে বহু ব্যবসা। এর মধ্যেও কোন পেশায় টিকে আছেন এমন সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদেরও কাজের ধরন পুরোপুরি বদলে গেছে। তরুণ প্রজন্মের যারা পড়াশুনা করছেন, চাকরির বাজারে প্রবেশ করার আশা নিয়ে যারা এগোচ্ছিলেন, যারা কোনো কিছু শুরু করতে চেয়েছিলেন তাদের সামনে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। তারা যেভাবে ভাবছিলেন তা এখন পুরোটাই বদলে দিতে হবে।
বাংলাদেশে চাকরিতে নিয়োগ বিজ্ঞাপনের সবচেয়ে বড় অনলাইন পোর্টাল বিডিজবস। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর বলছেন, বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তি সনাক্ত হওয়ার পর থেকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে ব্যাঘাত ঘটেছে তাতে তাদের প্ল্যাটফর্মে চাকরিতে নিয়োগের বিজ্ঞাপন এপ্রিল মাসে ৮০ শতাংশের মতো কমে গিয়েছিলো।
মে মাসেও পরিস্থিতি প্রায় একই রকম ছিল। তিনি বলছেন, এখন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি আবার বাড়লেও পরিস্থিতি আগের পর্যায়ে ফেরেনি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নতুন নিয়োগ বন্ধ রেখেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান অবস্থায় অনেক প্রতিষ্ঠান তা স্থগিত রেখেছে।
সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ই-কমার্স খাতে। এর মধ্যেও কিছু কাজে সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, বলছিলেন ফাহিম মাশরুর। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ই-কমার্স খাতে।
বিশ্বব্যাপী মানুষজন করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ভয়ে সরাসরি দোকানে না গিয়ে অনলাইনে কেনাকাটা করছেন। বাংলাদেশেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাই প্রায় সব ধরনের পণ্যের প্রতিষ্ঠানকে ধীরে ধীরে অনলাইন বিপণনে যেতে হচ্ছে।
মি. মাশরুর বলছেন, অনলাইনে বিপণনের ব্যবসা ও এর সাইটগুলো চালাতে গেলে তার সাথে নানান বিষয় যুক্ত রয়েছে। তাই এই খাতে নিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে, ভবিষ্যৎ কাজের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রযুক্তিখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘ই-কমার্স খাতে বাংলাদেশে বেশ কিছু খ-কালীন কাজের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। যেমন ই-কমার্সের জন্য ওয়েবসাইট তৈরি করা, ভিডিওর মাধ্যমে ইউটিউব ও ফেসবুকে পণ্যের মার্কেটিং, এসব প্ল্যাটফর্মে প্রচারের ভিডিও ধারণ করার জন্য ভিডিওগ্রাফি, অনলাইন শপিং-এর পণ্য ভোক্তার বাড়িতে পৌঁছে দিতে পরিবহনের কাজ। যার একটি স্মার্টফোন ও মোটরসাইকেল রয়েছে সে কিন্তু সহজেই এই কাজটি করতে পারে। শুধু লাগবে মানসিকতার পরিবর্তন।’
অন্যদিকে সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনও তরুণদের জন্য নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করছে। এখন যেহেতু ফিজিকাল মুভমেন্ট কম হচ্ছে তাই মার্কেটিং-এর কাজও অনলাইনে চলে যাবে। যারা আগে কোনো প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পণ্যের মার্কেটিং করতেন তাদের এখন ভোক্তাদের সাথে অনলাইনে যোগাযোগ বিষয়ক দক্ষতা অর্জন করতে হবে। এসব কাজ বাড়ি বসেই করা যায়।
সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন অর্থাৎ গুগুলোর মতো সার্চ ইঞ্জিনে কোনো কিছু খুঁজলে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের পণ্য সবচেয়ে উপরের দিকে থাকবে। অনলাইন শপিং পোর্টালগুলো সেজন্য লোক নিয়োগ দিয়ে থাকে। ই-কমার্স যেহেতু বাড়ছে তাই এই ব্যাপারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতাও বাড়বে। যা তরুণদের জন্য নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করবে।
তারা বলছেন, ‘ভোক্তার ক্রয় প্রবণতা সম্পর্কে গবেষণা, তার ক্রয়ের ডাটাবেইজ সংরক্ষণ সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনে কাজে লাগে। তরুণরা সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের এই স্কিলটা যদি অর্জন করেন তা বেশ কাজে আসবে। কারণ করোনাভাইরাস থেকে আমরা বোধহয় সহসাই মুক্তি পাচ্ছি না। তার মানে ই-কমার্স সামনে আরও দীর্ঘদিন ব্যবসা ধরে রাখবে।’
এশিয়া প্যাসিফিক নেটওয়ার্ক ইনফরমেশন সেন্টারের নির্বাহী সদস্য সুমন আহমেদ সাবির বলছেন, একটি ই-কমার্স সাইট তৈরি করতে ও চালাতে গেলে প্রচুর ছবি লাগে এবং সেসব ছবি সাইটে দেবার জন্য ইমেজ প্রসেসিং দরকার হয়।
‘যেকোনো অনলাইন শপিং পোর্টালে গেলে দেখতে পাবেন পণ্যটির কয়েকটি ছবি ও পণ্যটি সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। বিভিন্ন দিক থেকে আকর্ষণীয় করে ছবি তুলে পণ্যটি সম্পর্কে আবেদন তৈরি করার চেষ্টা। বাংলাদেশে বসে বিদেশের প্রতিষ্ঠানের ইমেজ প্রসেসিং-এর কাজও হচ্ছে। ছবিগুলো তোলা ও সেগুলো প্রসেসিং-এ ভালো কাজের সুযোগ রয়েছে।’