প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

করোনায় দিশেহারা মানুষ : পাড়ি দিচ্ছেন গ্রামে

বিশেষ প্রতিবেদক
দেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। ২৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সাধারণ ছুটিতে কর্মহীন হয়ে পড়েছে অনেক মানুষ। করোনার এই ক্রান্তিকালে মৌলিক চাহিদা পূরণে তারা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। তাই আয়হীন ব্যয়ের ভারে টিকতে না পেরে শহর ছাড়ছেন সাধারণ মানুষ। নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত সব শ্রেণির মানুষই রয়েছে এই তালিকায়। এর মধ্যে অনেকে স্ত্রী-সন্তানদের গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে নিজে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। এতে কমতে শুরু করেছে শহরতলীতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা। বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন আর বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে নেই আগের মতো হৈ-হুল্লোড়। গণপরিবহন চলছে স্বল্প সংখ্যক। এরপরও নেই পর্যাপ্ত যাত্রী। করোনাকালে অর্থনৈতিক সংকটে বেশিরভাগই চলে যাচ্ছেন গ্রামের বাড়ি। কেউ আবার বড় বাসা ছেড়ে উঠছেন সেমিপাকা ঘরে। আর যারা জীবন ও জীবিকার সমন্বয় ঘটিয়ে টিকে থাকার চেষ্টায় নগরীতে রয়ে গেছেন, সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সেই ভাড়াটিয়ারা। বাড়িওয়ালাদের চাপে তারা দিশেহারা। একের পর এক অভিযোগ জমা পড়ছে প্রশাসনের কাছে। বিভিন্ন সংগঠন বাড়ি ভাড়া কমানোর দাবিতে সোচ্চার রয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, মানুষ যে ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে, তা আমরা জানি। কাজ না থাকলে ঢাকায় মানুষ কীভাবে থাকবে? যাঁরা কাজ হারিয়েছেন, ঘরভাড়া দিতে পারছেন না, তাঁদের অনেককেই ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে চলে যেতে হচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা বলেন, শুধু বস্তিবাসীই যে ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছেন তা নয়, চাকরিজীবীদের অনেকেও গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। বিশেষ করে যাঁরা মেসে থাকতেন, তাঁদের অনেকে চলে যাচ্ছেন।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, করোনা শুধু আর্থিক বিপর্যয় ডেকে আনেনি, মানসিক বিপর্যয়ও ডেকে নিয়ে এসেছে। করোনায় কাজ হারানো, চাকরি হারানো মানুষগুলোর যদি আবার কর্মসংস্থানের সুযোগ না হয়, তাহলে আরও বিপদ। যে লোকটা বাড়িভাড়া দিতে না পেরে গ্রামে ফিরে গেলেন, তাঁর জীবনমান নেমে যাবে।

টুু-লেট আর টু-লেট
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর দনিয়ার আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে পাশাপাশি তিনটি বড় ভবন। প্রতিটি ভবনের সামনে ঝুলছে টু-লেট। প্রতিটি ভবনে চার থেকে পাঁচটি ফ্ল্যাট খালি। শুধু এই তিনটি ভবন নয়, দনিয়া এলাকাসহ রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় বাসার সামনে টু-লেট দেখা যাচ্ছে।
রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অন্তত ১৫ জন কাউন্সিলরের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনার কারণে সাধারণ ছুটির সময় কাজ না থাকায় দুই থেকে তিন মাসের বাসাভাড়া দিতে পারেননি অনেকে। কাজের সুযোগ কম থাকায় অনেকে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন।
ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬২ নম্বর ওয়ার্ডের মোশতাক আহমদ বললেন, ‘কাজ না থাকায়, বাসাভাড়া না দিতে পারায় অনেক লোক যে ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, তা ভালোভাবে দেখতে পাচ্ছি। আমার পাঁচতলা একটা বাসা আছে। ওই বাসায় ১৮টি পরিবার বসবাস করত। করোনার কারণে পাঁচটি পরিবার চলে গেছে। আমরা যাঁরা ভাড়ার টাকায় চলি, তাঁরা খুবই কষ্টে আছি। যাঁরা ছোটখাটো কাজ করে ঢাকায় পরিবার নিয়ে চলেন, তাঁরা আর টিকতে পারছেন না। পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, পুরান ঢাকায় এর আগে কখনো একসঙ্গে এত বাসা খালি হয়নি। এত টু-লেট দেখা যায়নি।
লালবাগ এলাকার কাউন্সিলর মকবুল হোসেন বলেন, লকডাউনে কাজ বন্ধ। সবাই তো পঙ্গু হইয়া গেছে গা। এই কারণে অনেকে দ্যাশে চলে যাচ্ছেন। আমার পাশের বাড়ির এক ভাড়াটে বাদে সবাই চলে গেছেন। বাসাগুলো এখন খালি পড়ে আছে। প্রতিটি বাড়ির একই অবস্থা।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেটের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে অসংখ্য টু-লেট দেখা গেছে, যা সচরাচর এই সময়ে দেখা যায় না। শুধু তাই নয়, ট্রাকে বাসা-বাড়ির মালপত্রসহ অনেকেই শহর ছাড়ছেন এমন দৃশ্য দেখা গেছে। বিশেষ করে চাকরি ও কর্মহারা মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে শহর ছাড়ছেন। মেসে চাকরির আশায় এতদিন বসবাস করা অনেক তরুণও বাসা ছেড়েছেন।
করোনার অভিঘাতে সংকটে মানুষ। তাদের বেশিরভাগ চাকরিজীবী। লকডাউনের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ। এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। ঠিকমতো বেতন-ভাতা পাবেন কিনা তা নিয়ে চিন্তিত তারা। এই কঠিন সময়ে তারা মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছেন। আয় নেই, অথচ ব্যয় আছে। ব্যয়ের ভারে টিকতে না পেরে তাই অনেকে নগরী ছাড়ছেন। কেউ কেউ আবার স্ত্রী-সন্তানদের গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে নিজে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। তবু তাদের মনে শঙ্কা, করোনার পর অবস্থা ঠিক হবে?
এদিকে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা আওতার বাইরে যেসব নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ আছে, তাদের ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গত ৭ এপ্রিল ভিডিও কনফারেন্সে তিনি বলেছিলেন, যাদের আমরা সামাজিক নিরাপত্তায় সাহায্য দিচ্ছি তার বাইরে যারা আছে, যারা হাত পাততে পারবে না, তাদের তালিকা করে ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়া হবে। এ বিষয়ক তালিকা করে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং মাঠ প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।
জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলেও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের তালিকা তৈরির বিষয়ে অগ্রগতি নেই। সামাজিক সুরক্ষার আওতায় অন্যান্য খাতে সরকারি সহায়তা বিতরণ চলছে। কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা এখনো হয়নি। তবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে এক দল মানুষ। মুঠোফোনে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর পেয়ে কষ্টে থাকা মধ্যবিত্ত মানুষের কারো কারো ঘরে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন তারা। অন্তত এক সপ্তাহ চলা যায় সেই পরিমাণ চাল, ডাল, তেল, সবজি পৌঁছে দিচ্ছেন।
জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ৬ কোটি ৪০ লাখের মতো শ্রমিক কাজ করেন। এর মধ্যে ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন কৃষি খাতে। বাকি প্রায় ৪ কোটি শ্রমিক কাজ করছেন শিল্প ও সেবা খাতে।

ঢাকা ছেড়েছে ৫০ হাজার ভাড়াটিয়া
করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাঁটাই ও বেতন কমানো, সড়কে ভাসমান দোকানে বিক্রি সংকুচিত হয়ে আসায় ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। মধ্যবিত্ত অনেকেই বাসাভাড়ার চাপে তাদের পরিবার পাঠিয়ে দিচ্ছে গ্রামে। পরিবারপ্রধান থাকছেন মেস ভাড়া নিয়ে। জুন মাসের প্রথম থেকেই ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় বাড়িভাড়ার সাইনবোর্ডের সংখ্যা বেড়েছে।
ভাড়াটিয়া পরিষদ নামের বেসরকারি সংগঠনের সভাপতি বাহরানে সুলতান বাহার বলেছেন, প্রায় ৫০ হাজার লোক বাসা ছেড়ে দিয়েছে। তবে কী পরিমাণ মানুষ ঢাকা ছেড়েছে এর কোনো পরিসংখ্যান নেই সরকারি কোনো দপ্তর বা সিটি করপোরেশনের কাছে।
২০১১ সালের সর্বশেষ আদমশুমারি অনুসারে, রাজধানীর জনসংখ্যা এক কোটি ৭০ লাখ। ভাড়াটিয়া পরিষদের হিসাব মতে, এর মধ্যে ৮০ শতাংশ লোক ভাড়ায় বসবাস করে। সে হিসাবে ঢাকা শহরে ভাড়ায় থাকে এক কোটি ৩৬ লাখ মানুষ।

ভালো নেই ফ্ল্যাটমালিকও
বাসাভাড়ার টাকায় সংসার চালান রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার একটি পাঁচতলা বাসার মালিক মাহবুবুর রশীদ। বাসাটিতে ১৮টি পরিবার বসবাস করে। চার থেকে পাঁচজন ভাড়া দিলেও বাকিরা দিতে পারেননি। মাহবুবুর রশীদ বলেন, আমার ভাড়াটেদের মধ্যে যাঁরা ছোটখাটো ব্যবসা করতেন, তাঁরা কেউই বাসাভাড়া দিতে পারেননি। কারণ, লকডাউনে তাঁদের ব্যবসা বন্ধ ছিল। কোনো আয় হয়নি। ছুটির সময় দুই ভাড়াটে গ্রামে চলে যান। এখন ফোন করে জানিয়ে দিয়েছেন তাঁরা আর ঢাকায় ফিরবেন না।
করোনায় সামগ্রিক অর্থনীতি নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য।
তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে আমাদের অর্থনীতি নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। অর্থাৎ, যাঁর বাড়িভাড়া দেওয়ার ক্ষমতা ছিল, তাঁর এখন আর সেই ক্ষমতা থাকছে না। আর যিনি বাড়িভাড়া দিয়ে রেখেছিলেন, তিনি বাড়িভাড়া পাবেন না। সামগ্রিকভাবে এই লোকগুলোর সবাই ক্রমান্বয়ে জীবনমানের দিক দিয়ে অনেক নিচে নেমে যাচ্ছেন। কেউ কেউ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবেন। এই জায়গাতে তাঁরাই যাবেন, যাঁরা তুলনামূলকভাবে অস্থায়ী চাকরি করতেন। খণ্ডকালীন কাজ করতেন। এটাই হলো করোনার এই মহামারিতে অর্থনীতির অভিঘাতের বড় জায়গা।
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে আয়ের পথ বন্ধ হওয়া এমন অনেক পরিবার গ্রামে চলে গেছেন। আবার অনেকে যাওয়ার চিন্তা করছেন। আর সে কারণে ঢাকার বাড়িওয়ালারাও পড়েছেন লোকসানে। অনেকে দিনের পর দিন টু-লেট লাগিয়েও ভাড়াটিয়া পাচ্ছেন না।
বর্তমানে যারা ঢাকায় রয়ে গেছেন তারাও অভিজাত এলাকা ছেড়ে অপেক্ষাকৃত কম ভাড়ায় যেখানে বাড়ি পাওয়া যায় সেখানে চলে যাচ্ছেন। ফলে ভাড়াটিয়ার অভাবে ফ্ল্যাটবাড়ি খালি পড়ে থাকছে।
রাজধানীর প্রায় প্রতিটি এলাকা থেকেই কম-বেশি এমন পরিস্থিতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে টানা ৬৬ দিন সবধরনের প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে এমন কঠোর নির্দেশনায় এই দীর্ঘ সময়ে অচল হয়ে পড়ে দেশের অর্থনীতির চাকা, যা এখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। দিনমজুর থেকে শুরু করে স্বচ্ছল চাকরিজীবীদের মাঝেও এর প্রভাব পড়েছে।
এমনিতেই নানা কারণে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের প্রায় সবসময়ই ঝামেলা থাকতে দেখা গেছে। এবার করোনাভাইরাস দু-পক্ষকেই বিপদে ফেলেছে। করোনায় ঢাকার বেশিরভাগ বাড়িওয়ালাই লোকসানে পড়েছেন।
মোহাম্মদপুরে মোহাম্মাদীয়া হাউজিং লিমিটেডের সাত নম্বর রোডের বাড়িওয়ালা আশিকুর রহমান জানান, তার চারতলা বাড়ির দুই পরিবার মে মাসে বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। দুমাস হতে চললো ভাড়াটিয়ার দেখা নেই। স্বাভাবিক সময়ে কখনও বাড়ি এভাবে খালি থাকে না বলে জানান তিনি।
এদিকে গত ৯ জুন ভাড়াটিয়া পরিষদ নামের একটি সংগঠন এপ্রিল, মে ও জুন মাসের ভাড়া
মওকুফের দাবিতে প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে। সংগঠনের সভাপতি মো. বাহারানে সুলতান বাহার এ প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই কর্মজীবীরা অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন। এখন তো অনেকেই বেকার। এদের অধিকাংশ গ্রামে চলে গেছে। আর যারা আছে তাদের ঘরভাড়া দিয়ে টিকে থাকা কঠিন। তাই আমরা বলছি, লকডাউন ও বিধি-নিষেধ চলাকালীন তিন মাসের ঘর ভাড়া যদি মাফ করে দেয়।
দেশের চাকরির বাজারে করোনা কতটা ক্ষতি করেছে তার হিসাব যদিও সরকারের কাছে নেই। কিন্তু বেসরকারিভাবে জরিপ করা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বলছে, ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটি আর লকডাউনে প্রায় ৫ কোটি মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। আর বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক বলছে, এই সময়ে ৯৩ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে। এখন এই কমে যাওয়া আয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে টিকে থাকা নিঃসন্দেহে কঠিন হয়ে পড়বে।

ভাড়া কমানোর পরও ভাড়াটিয়া খুঁজে পাচ্ছেন না বাড়িওয়ালারা
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৪ তলা বাড়ির মালিক আসলাম হোসেন। পরিবারের জন্য এক তলা ও বাকি তিন তলায় ৩টি করে মোট ৯টি ফ্ল্যাট রয়েছে। নিজের জমানো টাকা আর ব্যাংক লোন নিয়ে বাড়িটি বানিয়েছেন তিনি। ভাড়া বাবদ যে টাকা পেতেন তা দিয়ে নিজের সংসার ও ব্যাংক লোন ভালোভাবে চালাতে পারতেন। তবে এখন বিপাকে পড়েছেন। ৯টি ভাড়া দেওয়া ফ্ল্যাটের মধ্যে ইতিমধ্যে দুই মাস
যাবত ১টি ফ্ল্যাট ফাঁকা পড়ে আছে? চলতি মাসে আরও একটি ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া চলে যাবে। আগামী মাসে আরও দুইটি ফ্ল্যাট খালি হবে বলে জানান তিনি। চেষ্টা করেও নতুন ভাড়াটিয়া খুঁজে পাচ্ছেন না।
এদিকে বাকি ভাড়াটিয়াদের জন্য ভাড়ার পরিমাণও কমাতে হয়েছে। এখন বাসা ভাড়া বাবদ যে টাকা পান তা দিয়ে ব্যাংক লোন, পানি-গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল নিজের সংসার, বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীর বেতন গৃহপরিচারিকার বেতন পরিশোধ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমন চলতে থাকলে আগামীতে আরও বিপাকে পড়বেন বলে আশঙ্কা করছেন আসলাম হোসেন। শুধু আসলাম হোসেন নয় এ চিত্র প্রায় ঢাকার অধিকাংশ বাড়িওয়ালাদের।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাড়িওয়ালা বলেন, করোনার সময় ভাড়াটিয়া গ্রামের বাড়িতে চলে যান। এখন কেউ কেউ এসেছেন। এ সময়ে তাদেরও কাজ নেই, তারাও নানা সমস্যায় আছে। যার কারণে ঠিকমতো ভাড়া দিতে পারছেন না। মানবিকতার জায়গা থেকে তাদেরকে কিছু বলতে পারছি না। একটা ফ্ল্যাটে শিক্ষার্থীরা থাকতো। ভাড়া দিতে না পেরে বাসা ছেড়ে দিয়েছে তারা। চলতি মাসের শুরুতে তাদের মালামাল নিয়ে গেছে।
মিরপুরের পূর্ব শেওড়াপাড়ার বাড়িওয়ালা সাদি হোসাইন। করোনাভাইরাসের মহামারি শুরুর আগে থেকেই নিচতলার ফ্ল্যাট খালি ছিল তার। গত চার মাসে নতুন ভাড়াটিয়া না পাওয়ায় বাসা ভাড়া দিতে পারেননি তিনি। চলতি দুর্যোগে দ্বিতীয় তলার বাসা ছেড়ে দিয়েছে ভাড়াটিয়া। ফলে নতুন করে বাসা খালি হয়েছে। এদিকে যে ভাড়াটিয়া আছে তারাও ঠিকমতো ভাড়া দিচ্ছেন না। করোনার কারণে বাসা ভাড়া কমিয়েছেন তিনি। তারপরও আরও কমানোর দাবি ভাড়াটিয়াদের।

আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত ছোট প্রতিষ্ঠান
করোনার করাল গ্রাসে অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত। কোনোটি এখনও বন্ধ, কোনোটি চালু হলেও হয়েছে অনেক ছোট পরিসরে। ফলে অনেক কর্মীকেই চাকরি হারাতে হয়েছে বা হচ্ছে। ছোটখাটো ব্যবসা করতেন এমন অনেকে গত তিন মাসের লোকসান সামলে উঠতে পারছেন না। তাদের কেউ সপরিবারে ফিরে গেছেন গ্রামের বাড়ি, কেউ স্ত্রী-সন্তানকে পাঠিয়ে শুধু নিজে রয়ে গেছেন। প্রায় সবাই ছেড়ে দিয়েছেন ঢাকা বা নগরীর উপকণ্ঠের বিভিন্ন এলাকার ভাড়া বাসা।
এদের কেউই জানেন না পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে বা একটু স্বাভাবিক হলেও স্বজনদের আবারও ঢাকায় নিয়ে আসতে পারবেন কিনা?
তরুণ এক অর্থনীতি বিশ্লেষক বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তেমনি জীবিকা নিয়েও বিপদে পড়েছেন বিশেষত মধ্য ও নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ। সবকিছু সীমিত পরিসরে খুলে দেওয়া হলেও একটি প্রতিষ্ঠানের সব কর্মী চাকরি ফিরে পাচ্ছেন না। অনেককে স্পষ্টভাবেই না করে দেওয়া হয়েছে। আবার অনেককে বলা হয়েছে কিছুদিন পর ডেকে নেওয়া হবে। এমন অবস্থায় আর্থিক সামর্থ্যরে অভাবে লোকজন গ্রামে ফিরে যাচ্ছে।
করোনা পরিস্থিতিতে মার্চের শেষে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর প্রথমে অস্থায়ীভাবে ঢাকা ছাড়তে শুরু করেন অনেকে। ছুটি শেষে ফিরবেন ভেবে গেলেও পরে পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকায় পরিকল্পনা বদলে যেতে থাকে। কর্মহীন হতে থাকেন অনেকেই। তেমনই এক ব্যক্তি পরিবার নিয়ে থাকতেন উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর সংলগ্ন প্রিয়াঙ্কা সিটিতে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি বিমান সংস্থার ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম এজেন্ট ছিলেন তিনি। বিমান চলাচল বন্ধের দুই সপ্তাহ পর প্রতিষ্ঠানটি বেশকিছু কর্মীকে ছাঁটাই করে। দুর্ভাগ্যবশত তিনিও তাদের একজন। এ পরিস্থিতিতে নতুন করে চাকরি পাওয়ারও সুযোগ ছিল না। বাড়ি ভাড়া নিয়েও বাড়িওয়ালার সঙ্গে বিতর্ক হয় তার। শেষে পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। নাম না প্রকাশের শর্তে তিনি জানান, মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ১৯ মে ঢাকা ছেড়েছেন। সঙ্গে ট্রাকে করে নিয়ে গেছেন আসবাবসহ অন্যান্য জিনিসপত্র। চাকরির ব্যবস্থা না হলে তার ঢাকায় ফেরা অনিশ্চিত।
একটি পোশাক কারখানায় সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেন রবিউল ইসলাম। পরিবারের চার সদস্যকে নিয়ে থাকতেন সাভারের ফুলবাড়িয়া এলাকায়। তিনি জানান, প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় মাত্র ৬৫ ভাগ বেতন পেয়েছেন। অনিশ্চয়তার কারণে ঈদের এক সপ্তাহ আগে মা, ভাই, স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি রাজশাহীতে চলে যান। সম্প্রতি কারখানা খুলে দেওয়ায় তিনি এসে কাজে যোগ দিয়েছেন। চোখের সামনেই দেখছেন, কর্মীদের কেউ কেউ অসুস্থ থাকলেও চাকরি হারানোর ভয়ে তা চেপে যাচ্ছেন। কেউ প্যারাসিটামল খেয়ে, কেউ সাপোজিটর নিয়ে তাপমাত্রা কম দেখিয়ে কাজে যোগ দিয়েছেন। তবে এখন চাকরিতে বহাল থাকবেন কিনা, কী হারে বেতন পাবেনÑ এসব নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন সবাই।

দুরবস্থায় নিম্ন-মধ্যবিত্তরা
করোনার মহামারিতে বিপর্যস্ত বিশ্ব। এর প্রভাবে দেশ এক কঠিন সময় পার করছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো পৃথিবী এক অজানা শঙ্কা ভর করে চলেছে। এই মহামারি কবে নাগাদ পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে সেটিও একরকম অনিশ্চিত। সব মিলিয়ে চরমভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে মানুষের জীবনমান, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাপন।
করোনায় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষদের দৈনন্দিন জীবনযাপন নির্বিঘœ করতে সরকার, প্রশাসন, বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তি উদ্যোগে সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যদিও এখন কিছুটা স্তিমিত এই সহায়তা কার্যক্রম। তারপরও এসব মানুষ কোথাও না কোথাও থেকে সাহায্য পাচ্ছে বা কাজ পাচ্ছে। তবে দেশে করোনার থাবায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তরা। এদের দিনযাপন অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়েছে। কারো সঞ্চয় ফুরিয়ে যাচ্ছে, কেউ চাকরি হারিয়েছেন,
কারো ব্যবসা নেই আবার কারো বেতন কমেছে। লোকলজ্জার ভয়ে সরকারি-বেসরকারি সহায়তা নেয়নি। ব্যাপক সংখ্যক মানুষের জীবনে চরম এক অনিশ্চয়তা ভর করেছে। তবে কমেনি যাতায়াত ভাড়া, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা সেবার খরচসহ দৈনন্দিন জীবন নির্বাহের খরচ। তারপর আবার নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। তাই পুঁজিসংকটে নিম্ন, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যম আয়ের প্রতিটি পরিবার এখন দুরাবস্থায় পড়েছেন। জীবনধারণে প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান সৃষ্টি করতে না পারার গ্লানি নিয়ে অনেকেই এখন রাজধানী ছেড়ে বাধ্য হচ্ছেন গ্রামে ফিরতে। রাজধানীর রাজপথে ট্রাকে মালামাল ভরে গ্রামে ফিরে যাওয়ার দৃশ্য হরদম দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এদের সহায়তায় এখনও সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। এখনই সরকার সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠী সংকটে পড়তে যাচ্ছে এটি নিশ্চিত করেই বলা যায়। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এই অবস্থা আরও কিছুদিন চললে অনেক মধ্যবিত্ত যোগ হবে নিম্নবিত্তের তালিকায়। এই পরিস্থিতিতে রাজধানীতে বসবাসকারী অনেকেই ইতিমধ্যে ঢাকা ছেড়ে ফিরে যাচ্ছে গ্রামে। সংকটকালে নিম্নবিত্তের সমস্যা হয় না। তারা যে কোনো কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারে। উচ্চবিত্ত তাদের সম্পদের কারণে যে কোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে। যত সমস্যা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, করোনা পরিস্থিতির যে সময়টা আমরা পার হচ্ছি, তা কবে কাটবে আমরা বলতে পারছি না। এই সংক্রমণের পর্যায় আমরা যদি দ্রুত কাটিয়ে উঠতে না পারি, তাহলে অর্থনৈতিক সব সমস্যাই আরো ঘনীভূত হবে। সরকার দরিদ্র শ্রেণির মধ্যে সহায়তা দিচ্ছে। আমাদের সম্পদ এতটা নেই যে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকেও সহায়তা দেবে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের দিক থেকে একজন চাকরিজীবীর শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিতে জোর দিতে হবে। এ সময় যেন কাউকে চাকরিচ্যুত করা না হয়, সেই দিকে নজর দিতে হবে। এর পাশাপাশি যারা মধ্যম পর্যায়ের ব্যবসায়ী, তাদের ঋণসহায়তা দেওয়া যেতে পারে। আর মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ক্ষতি মেনে নিয়ে নিজেদের সঞ্চয় দিয়ে সংসার চালাতে হবে। তবে এসব পরামর্শই সাময়িক।
যদি আমরা দ্রুত করোনা সংক্রমণ রোধ করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে না পারি, তখন সব হিসাবই পালটে যাবে।
সূত্র মতে, বেসরকারি অফিসের চাকরিজীবী, ব্যাংক-বিমার কর্মকর্তা, মাঝারি মানের ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তারা সবাই এখন অর্থনৈতিক মন্দার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। যিনি পোশাকের ব্যবসা করেন তার দোকান বন্ধ। যিনি বেসরকারি অফিসে চাকরি করেন, অনেকে বাসা থেকে অফিস করলেও সিংহভাগেরই কাজ প্রায় বন্ধ। যারা বিদেশ থেকে পণ্য এনে দেশে বিপণন করেন, তাদের ব্যবসাও বন্ধ। মাসের কোনো আয় নেই। সঞ্চয় ভেঙে খেতে খেতে তা-ও এখন তলানিতে। তাই করোনার
থাবায় দেশে সবচেয়ে বেশি বিপাকে মধ্যবিত্তরা।
করোনা দুর্যোগে রাজধানী ঢাকার চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় পার করছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। চাকরি বা ব্যবসা থাকে কি থাকে না, কারো চাকরি চলে গেছে, করোবা বেতন কমেছে-এই অনিশ্চয়তার মধ্যে পুরো জীবনটাই যেন আতঙ্কের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে তাদের। পাশাপাশি রয়েছে বাড়িভাড়া পরিশোধের চাপ, সন্তানদের স্কুলের বেতনের চাপ, অন্যদিকে ব্যবসার জন্য ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ তাদের রাতের ঘুম হারাম করে দিচ্ছে। সব মিলিয়ে চরমভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে মানুষের জীবনমান, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাপন। সামাজিক ও আর্থিক চাপে ভেঙে পড়ার উপক্রম তাদের জীবনব্যবস্থা।
তাই বিশাল জনগোষ্ঠী ইতোমধ্যে ঢাকা ত্যাগ করে গ্রামে চলে গেছে। মধ্যবিত্তরা ঢাকা ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন। অনেকেই ইতোমধ্যে অর্থসংকটে ভাড়া বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের জন্য বাসা ভাড়া দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এদিকে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে সারা দেশে ৯৫ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে বলে সম্প্রতি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের এক জরিপে উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়াদের মধ্যে ৫১ শতাংশের কোনো আয় নেই এবং কাজ হারিয়েছেন ৬২ শতাংশ নিম্ন আয়ের মানুষ। এছাড়াও, ২৮ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, মহামারির কারণে তারা অর্থনৈতিকভাবে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। সাধারণ ছুটির আগে জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মাসিক গড় আয় ছিল ২৪ হাজার ৫৬৫ টাকা। গত মে মাসে তা কমে ৭ হাজার ৯৬ টাকায় দাঁড়ায়। অর্থাৎ আয় কমে ৭৬ শতাংশ। জরিপ মতে, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলের মানুষদের আয় কমেছে বেশি। গ্রামাঞ্চলের মানুষদের আয় কমেছে ৭৫ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলের মানুষদের আয় করেছে ৭৯ শতাংশ।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, করোনা নতুন একটি দরিদ্র শ্রেণী সৃষ্টি করেছে। যারা ব্যবসা-চাকরি-পুঁজি হারিয়েছে। কারো কারো বেতন কমেছে। এরা বেশিরভাগই শহরাঞ্চলের। এদের জন্য প্রচলিত কার্যক্রমের বাইরে গিয়ে সরকারের ভিন্নভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন। যদিও এদের চিহ্নিত করা খুবই কঠিন। তারপরও সরকারের উচিত এলাকাভিত্তিক বা পেশাভিত্তিক এদের চিহ্নিত করে বর্তমান কঠিন পরিস্থিতিতে সহায়তা করা। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এসব মানুষ হয়তো নতুনভাবে পেশা শুরু করতে পারবে। বেশিদিন না হলেও একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এসব নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারকে সহায়তার আওতায় আনা দরকার বলে মনে করেন ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া সম্পর্কের অবনতি : সমাধানের উপায়
‘একজন শিক্ষার্থীর সারাজীবনের অর্জন তার সার্টিফিকেট, সেই সার্টিফিকেট, মূল্যবান জিনিসপত্রসহ সবকিছু সিটি করপোরেশনের গাড়িতে তুলে দিয়েছে বাড়িওয়ালা। যখন জানতে পারলাম সঙ্গে সঙ্গেই ঢাকা চলে আসি। এসে দেখি জিনিসপত্র কিছুই নেই বাড়িওয়ালা সব ফেলে দিয়েছেÑ কাঁদতে কাঁদতে এভাবে ঘটনার বিবরণ দিচ্ছিলেন ঢাকা কলেজের স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মাদ সজীব? দীর্ঘ চার বছর ধরে তিনি থাকতেন রাজধানীর কলাবাগান এলাকার ৪/এ, ওয়েস্ট অ্যান্ড স্ট্রিটের রুবী ভবনের নিচতলায়। শুধু সজীব নন ওই মেসে থাকা ল্যাপটপসহ শিক্ষাজীবনে অর্জিত মূল্যবান সব সনদ হারিয়েছেন আরো আট শিক্ষার্থী।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কোনো ধরনের নোটিস না দিয়েই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আর জিনিসপত্রসহ সবকিছু বাসা থেকে বের করে তুলে দেওয়া হয়েছে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িতে। আর কাজটি করেছেন বাড়িওয়ালা মুজিবুল হক ওরফে কাঞ্চন। খবর পেয়ে নিজ নিজ এলাকা থেকে ফ্ল্যাটে আসলেও ঢুকতে পারিনি।
সজীব বলেন, মার্চের ৫ তারিখ পর্যন্ত ভাড়া পরিশোধ করে আমরা বাড়ি চলে যাই? এরপর বাড়িওয়ালা বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি বিল বাবদ আরও ১৫ হাজার টাকা মোবাইলে পাঠাই। বাকি টাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললে ঢাকায় এসে পরিশোধ করার কথা ছিল। টাকা পাঠানোর পরই বাড়িওয়ালা আর ফোন রিসিভ করছিলেন না। পরে জানতে পারি আমাদের মালামাল সব ফেলে দেওয়া হয়েছে। ঢাকায় ফিরে কিছুই আর অবশিষ্ট পাইনি।
বাড়িওয়ালার এমন অমানবিক আচরনে ভুক্তভোগীর তালিকায় রয়েছে চার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীও। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সঙ্গে এই শিক্ষার্থীদের খোয়া গেছে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মূল রেজিস্ট্রেশন কার্ড। এখন পরীক্ষায় অংশ নেয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছেন তারা। বাড়ির মালিক মুজিবুল হক ওরফে কাঞ্চন গাঢাকা দিয়েছে। ঘটনার বিষয়ে মামলা হওয়ায় অভিযুক্ত বাড়ির মালিককে ধরতে তার বাসায় অভিযান চালিয়েছি পুলিশ, আসামিকে পাওয়া যায় নাই? চেষ্টা চলছে, শিগগিরই আসামি গ্রেপ্তার হবে।
করোনা পরিস্থিতিতে ভাড়াটিয়াদের পাশাপাশি ঢাকা শহরের অনেক বাড়ির মালিকও সংকটে পড়েছেন বলে মনে করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) সিনিয়র ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ? তিনি বলেন, কোভিড পরিস্থিতিতে ভাড়াটিয়া-মালিক সবাই সংকটে আছেন? হয়তো কেউ সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে একটি বাড়ি করেছেন? ওই বাড়ির ভাড়াই তার জীবন চলার একমাত্র উপার্জন? এখন সেই মালিক কী করবেন? তাই বলে তো সার্টিফিকেট ডাস্টবিনে ফেলতে পারেন না?
তিনি সর্বোচ্চ ভাড়াটিয়ার সঙ্গে বসতে পারেন, আলোচনা করতে পারেন? ভাড়া কমাতে পারেন? কোন ভাড়াটিয়াকে বের করে দিতে হলেও একটা প্রক্রিয়া আছে? সেটা অনুসরণ করতে পারেন? ভাড়াটিয়াদেরও বুঝতে হবে, মালিকও সংকটে আছেন? তাই উভয় পক্ষ আলোচনা করেই সমাধানে আসতে হবে?
এদিকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বাড়ির মালিকদের সহনশীল হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, এ কথা সত্য যে, কোনো কোনো বাড়িওয়ালা আছেন ভাড়া থেকে প্রাপ্ত আয়ই তাদের একমাত্র উৎস? আবার তার উপর ব্যাংক লোনও থাকতে পারে? তাই আমি পরিস্থিতি বিবেচনায় দু’পক্ষকে ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে মানবিক হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি?