প্রতিবেদন

করোনায় ফের ফিরছে সেশনজট

নিজস্ব প্রতিবেদক
করোনা পরিস্থিতিতে গত প্রায় সাড়ে চার মাস ধরে দেশের শিক্ষাকার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে। এতে করে গোটা শিক্ষাব্যবস্থা বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে। করোনা সংকটে বন্ধ দীর্ঘায়িত হলে ফের সেশনজট ফিরে আসতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষক-অভিভাবকরা।
মহাসংকটের কারণে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে অনলাইনে ক্লাস কার্যক্রম চালু থাকলেও সে সুবিধা থেকেও বঞ্চিত রয়েছে মফস্বলের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাকালীন সময়ে দেশের সবচেয়ে বড় পাবলিক পরীক্ষা এইচএসসিসহ স্কুলপর্যায়ের কোনো পরীক্ষা এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েরও অধিকাংশ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি।
একাদশের ভর্তি কার্যক্রমও পিছিয়েছে। আর এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও প্রথম বর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে পারছে না। চাকরিপ্রার্থীরাও কোনো নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। সব মিলিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে পুরো শিক্ষা ক্যালেন্ডার। কবে সবকিছু স্বাভাবিক হবে তাও জানা নেই কারও।
বাংলাদেশে প্রথম দফায় গত ১৭-৩১ মার্চ পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর এখন পর্যন্ত দফায় দফায় বন্ধের মেয়াদ বাড়ছে। এর মধ্যে ১ এপ্রিল থেকে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা হওয়ার কথা থাকলেও পরীক্ষাসূচি স্থগিত করতে বাধ্য হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কোনোমতে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা গেলেও উত্তীর্ণদের কবে কলেজে ভর্তি ও ক্লাস নেওয়া হবে তা বলা যাচ্ছে না।
এমন মহাসংকটের কারণে অধিকাংশ উদ্যোক্তা, শিক্ষক ও কর্মচারী সমিতি ইতিমধ্যেই সরকারের কাছে প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধার জন্য আবেদন করেছে। কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা ও শিক্ষক প্রতিনিধিরা সবাই সরকারের সহায়তা চেয়েছেন। সহায়তা চেয়েছেন ইংলিশ মিডিয়াম ও কোচিং সেন্টারের শিক্ষকরাও। স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের এমন দুরবস্থার কারণে শিক্ষার্থীসহ স্কুল বিক্রির মতো ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে।
এদিকে দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর আগামী ৯ আগস্ট থেকে অনলাইনে একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রম শুরু করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এসএম আমিরুল ইসলাম
বলেন, ‘একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি অনলাইনে শুরু করা হচ্ছে। কিন্তু এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা মন্ত্রণালয়ের দিকনির্দেশনার অপেক্ষায় আছি। তবে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়। কারণ লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে ঝুঁকির মুখে ফেলা যাবে না।’
এর আগে এক অনলাইন সভায় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি আমরা। তাই সবকিছু স্বাভাবিক হওয়ার পরই স্কুল-কলেজে যাবে ছাত্রছাত্রীরা। যে সংকট শুরু হয়েছে তাতে আমরা বলতে পারছি না যে কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। তা জানলে সে হিসেবে ব্যবস্থা নিতাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনিশ্চয়তা থাকায় শিক্ষার্থীদের স্কুলে পাঠানো যাচ্ছে না। যদি করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয় তবে টানা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যেভাবে সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশন ও অনলাইনে ক্লাস কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে এটি চলমান থাকবে।’
গত এক দশকের নানারকম কার্যক্রম ও পরিকল্পনার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা স্তরে সেশনজট কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও আবারও নতুন করে সেশনজটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর আগে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের কথা মাথায় রেখেই ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে ক্লাস পরিচালনার তাগিদা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। তবে ইউজিসির আহ্বানের পরও অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় তার অনলাইন শিক্ষা
কার্যক্রম চালাতে পারছে না সফলভাবে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালাচ্ছে। আবার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে এক বা দুটি বিভাগে সপ্তাহে দুয়েকটি ক্লাস নিচ্ছে। হাতেগোনা কিছু পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে কমবেশি ক্লাস নিলেও তাতে সংকটের সমাধান হচ্ছে না। অনলাইনে ক্লাসের বাইরেই থেকে যাচ্ছে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়। সংকট সমাধানের কার্যকরী পথও খুঁজে পাচ্ছে না তারা। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা গ্রহণের সুপারিশ করেছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ দেশের শিক্ষাবিদরা। করোনার ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনার জন্য একটি জাতীয় শিক্ষা কমিটি গঠনেরও সুপারিশ করেছেন তারা।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনা সংকটে বন্ধ দীর্ঘায়িত হলে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বেশি সংকটে পড়বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সাত কলেজের দুই লক্ষাধিক শিক্ষার্থী। এখনই বড় ধরনের সেশনজটে থাকা এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ তাই সবচেয়ে বেশি। শিক্ষকরাও বলছেন, যদি এ অচলাবস্থা চলতে থাকে তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। কারণ তারা এমনিতেই দীর্ঘ সেশনজটে আছে। এভাবে চলতে থাকলে সেশনজট দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, ‘বন্ধের সময়সীমা যদি অন্তত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ে তারপরও প্রতিষ্ঠান খোলার পর শিক্ষা ক্যালেন্ডার সমন্বয় করে বেশি বেশি ক্লাস ও ক্লাসের সময়সীমা বাড়িয়ে সমস্যা কাটানো সম্ভব হবে। আবার শুক্র ও শনিবারও তখন ক্লাস নেওয়া যাবে। প্রয়োজনে পরীক্ষা একটু এগিয়ে এনে হলেও সংকটের অনেকটাই সমাধান করা যাবে। বন্ধের সময়সীমা যদি ক্রমেই বাড়তে থাকে তাহলে সেশনজট বাড়তে পারে।’
দীর্ঘমেয়াদি সংকটের আশঙ্কা করে এখনই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণের সুপারিশ করেছেন জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. শেখ একরামুল কবীর। তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি বছর যে পিছিয়ে যাচ্ছে সেটি আগামী দুই বছরের মধ্যে যাতে সমন্বয় করা যায় সে ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যদি এখনই পরিকল্পনা গ্রহণ করা না যায় তাহলে সে ক্ষেত্রে নানা সমস্যা তৈরি হবে। এছাড়া শিক্ষকদের জন্য একটা নির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি করতে হবে।’