প্রতিবেদন

বৃহত্তম জলবায়ু উদ্বাস্তু পুনর্বাসন প্রকল্পের উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক
কক্সবাজারে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য বিশে^র সর্ববৃহৎ পুনর্বাসন প্রকল্প উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ২৩ জুলাই গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কক্সবাজারে ‘খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্প’ নামে এ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন তিনি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বন্যা ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তসহ দেশের সব জনগণের জন্য মুজিববর্ষে আবাসন নিশ্চিত করতে তার সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে মুজিববর্ষ উদযাপন করছি। তার জন্মশতবর্ষে আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশে একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না। প্রত্যেকটি মানুষকে যেভাবে পারি, গরিবানাহালে একটি চালা হলেও আমরা করে দেব।’
সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ গণভবন থেকে এবং দশম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও এরিয়া কমান্ডার মো. মাঈন উল্লাহ চৌধুরী কক্সবাজার প্রান্ত থেকে বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন। পিএমও সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া ও প্রেস সচিব ইহসানুল করিম গণভবন প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর হাতে প্রকল্পের একটি রেপ্লিকা তুলে দেন। অনুষ্ঠানে প্রকল্পের ওপর একটি ভিডিওচিত্র প্রদর্শিত হয় ও প্রকল্প স্থানে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তিনজন উপকারভোগী তিনটি গাছের চারা রোপণ করেন।
এ সময় কক্সবাজার প্রান্তে আরও উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার-রামু আসনের সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল, চকরিয়া-পেকুয়া আসনের সাংসদ জাফর আলম, মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনের সাংসদ আশেক উল্লাহ রফিক, সাংসদ কানিজ ফাতেমা আহমদ, প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মাহবুব হোসেন, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার এ বি এম আযাদ, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমদ, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন প্রমুখ।
প্রধানমন্ত্রী বন্যা মোকাবিলায় তার সরকারের সব ধরনের প্রস্তুতি থাকার উল্লেখ করে বলেন, ‘এবারে বন্যার প্রকোপটা একটু বেশি দেখা যাচ্ছে। এটা হচ্ছে শ্রাবণ মাস, হয়তো ভাদ্র মাসের দিকে আরও পানি আসবে অর্থাৎ আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও বন্যার আশঙ্কা থাকতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতি আছে সেটা মোকাবিলা করার। সেই সঙ্গে বন্যা ও নদীভাঙনে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তাদেরও আমরা ঘরবাড়ি তৈরির জন্য জমির ব্যবস্থা করে দেব। সেটাও আমাদের লক্ষ্য রয়েছে এবং সে জন্য এবারের বাজেটে আমরা আলাদা করে টাকা বরাদ্দ রেখেছি।’
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে রক্ষা পেতে উপকূলবাসীকে বেশি করে গাছ লাগানোর পাশাপাশি দেশবাসীর প্রতি প্রাণঘাতী ভাইরাস করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বানও পুণর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজের গতি খুব ভালো ছিল। কিন্তু এই করোনাভাইরাস এসে সব জায়গাতেই একটা বাধার সৃষ্টি করেছে।’
সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমি সবাইকে অনুরোধ করব আপনারা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত যে নির্দেশনাগুলো রয়েছে, সেগুলো মেনে চলবেন। মাস্কটা পরে থাকবেন, যখন বাইরে যাবেন বা কারও সঙ্গে কথা বলবেন, নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন।’
প্রধানমন্ত্রী পরে ভিডিও কনফারেন্সে উপকারভোগী ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। খুরুশকুলে আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানস্থলে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের পরেই তার পক্ষ থেকে ফ্ল্যাটপ্রাপ্ত পরিবারগুলোর হাতে চাবি তুলে দেওয়া হয়।
কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল ইউনিয়নের বাঁকখালী নদীর তীরঘেঁষা এ প্রকল্পে নির্মিত ২০টি পাঁচতলা ভবনে ৬০০টি পরিবার নতুন ফ্ল্যাট পেল। প্রতিটি পাঁচতলা ভবনে থাকছে ৪৫৬ বর্গফুট আয়তনের ৩২টি করে ফ্ল্যাট। পর্যায়ক্রমে ৪ হাজার ৪০৯টি পরিবার এখানে ফ্ল্যাট পাবে।
প্রকল্প পরিচালক মো. মাহবুব হোসেন গত ২২ জুলাই এই প্রকল্প সম্পর্কে ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘প্রতিটি পরিবার এখানে ১০০১ টাকার বিনিময়ে একটি প্রায় ৪৫৬ স্কয়ারফিটের আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত ফ্ল্যাট পাবে। যেখানে প্রতিবন্ধীদের জন্য পৃথক র‌্যাম্প, সোলার প্যানেল, বিশুদ্ধ পানির সুবিধা, বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজব্যবস্থা ও গ্যাস সিলিন্ডারসংবলিত চুলার ব্যবস্থা থাকবে।’ প্রকল্পে আবাসন, পর্যটনব্যবস্থা, শুঁটকি পল্লী বা শুঁটকি মহল এবং সবুজ বনায়নসহ চার ধরনের সুবিধা থাকবে বলেও জানান তিনি।
প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘এটাই দেশের সবচেয়ে বড় আশ্রয়ণ প্রকল্প এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য দেশের প্রথম আশ্রয়ণ প্রকল্প। জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর জন্য এখানে যে পুনর্বাসন, এটাকে আমরা বিশ্বের বৃহত্তম জলবায়ু পুনর্বাসন প্রকল্প বলতে পারি, এ ধরনের প্রকল্প পৃথিবীতে বিরল।’
তিনি আরও বলেন, ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত এবং পরবর্তীকালে কুতুবদিয়াপাড়া, নাজিরাটেক এবং সমিতিপাড়া এলাকায় বসতি স্থাপনকারী জনগণ যারা কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের জন্য ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তাদের পুনর্বাসনের জন্যই মূলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ উদ্যোগ।
কক্সবাজারকে ঘিরে থাকা ঝাউবনগুলো উপকূলীয় এই পর্যটন নগরীকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল থেকে রক্ষায় জাতির পিতার নির্দেশে লাগানো হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারকে একটি আধুনিক পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলায় তার সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারের উন্নয়নে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। সেখানকার মানুষের আগে চিংড়ি ও লবণ চাষ ছাড়া কোনো জীবন-জীবিকাই ছিল না। কিন্তু এখন আমরা বহুমুখী কর্মপরিকল্পনা নিয়েছি। একদিকে যেমন পর্যটনকেন্দ্র হবে, অন্যদিকে মানুষের সব রকম জীবন-জীবিকার ব্যবস্থার পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চলও সেখানে করে দেব।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণ করতে গিয়ে দেখলাম জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৪ হাজার পরিবার সেখানে উদ্বাস্তু হয়ে আছে। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম এদের পুনর্বাসন করব এবং এই খুরুশকুল জায়গাটাও আমিই খুঁজে বের করেছিলাম।’
প্রধানমন্ত্রী কাজের দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘এখন ২০টি ভবন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বাকি ভবনগুলো নির্মাণ হবে। যেখানে সবকিছুই থাকবে, একটি আধুনিক শহর হিসেবেই খুরুশকুলকে গড়ে তোলা হবে।’
তিনি বলেন, ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে যেমন ঘর করে দিচ্ছি। পাশাপাশি যাদের জমি আছে, তাদের ঘর করে দেওয়ার জন্য গৃহায়ণ তহবিল নামে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটা তহবিল করা হয়েছে। পাশাপাশি যাদের ভিটা আছে কিন্তু ঘর নেই তাদেরও ঘর করে দিচ্ছি।’
আজকে যে ঘর-বাড়ি করে দেওয়া হল সেটাকে ‘রিজেক’ আখ্যায়িত করে তিনি এ সবের যতœ নেওয়ার পাশাপাশি আবাসস্থলের পরিবেশ উন্নত রাখার জন্যও সেখানে ফ্ল্যাট প্রাপ্ত সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসেই গৃহহীন ও ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসনের জন্য ১৯৯৭ সালে ‘আশ্রয়ণ’ নামে প্রথম প্রকল্প গ্রহণ করেন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আবার ক্ষমতায় আসলে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প শুরু হয়। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল ৩ লাখ ১৯ হাজার ১৪০টি পরিবার ঘর পেয়েছে।
ঘুর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছাস, মঙ্গাসহ বিভিন্ন দুর্যোগে তাঁর দল এবং তিনি মানুষের সাহায্যে সর্বত্র ছুটে বেড়িয়েছেন এবং সাধ্যমত ত্রাণ সহায়তা দিয়েছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৭ সালের ঘুর্ণিঝড়ের পর সেন্ট মার্টিন দ্বীপে গিয়ে ৭০টি ঘর-বাড়ি হারা পরিবারকে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়ার মধ্য দিয়েই তাঁর সরকার আশ্রয়ণ প্রকল্পের শুরু।
তিনি বলেন, ‘সেই থেকে আমাদের যাত্রা শুরু এবং এর পরে আশ্রয়ণটাকে আমরা একটি প্রকল্প হিসেবে নেই এবং সশস্ত্রবাহিনী তথা সেনাবাহিনীর বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরতদের এই ঘরগুলো করে দেওয়ার দায়িত্ব দেই। এগুলো ব্যারাক হিসেবে করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয় যাতে এসব কেউ চাইলেই বিক্রী করতে না পারে।’
সে সময়কার অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের তখন সামর্থ তেমন না থাকলেও আমরা উদ্যোগ নেই প্রত্যেক গৃহহীনকে গরিবানা হালে হলেও একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই বা ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার।’
পরবর্তীতে আশ্রয় লাভকারীদের প্রশিক্ষণ, কাজের সুযোগ এবং ঋণ সুবিধা প্রদানের সুবিধা এসব প্রকল্পে অন্তর্ভূক্ত হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।