প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

করোনায় প্রমাণ হলো কৃষিই বাংলাদেশের প্রাণ

বিশেষ প্রতিবেদক
বিশ্বজুড়ে চলছে করোনা মহামারী। সর্বত্রই জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে। উন্নত বিশ্বের শিল্পায়নের হাওয়া ইতোমধ্যে বাংলাদেশেও লেগেছে। তবে বাংলাদেশ মূলত কৃষিপ্রধান দেশ। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও কৃষির ওপর নির্ভর করেই তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। এক্ষেত্রে অবশ্যই বর্তমান সরকারের ব্যাপক সফলতা রয়েছে। কৃষিখাতে সরকারের নানামুখী প্রণোদনা ও ভর্তুকি প্রদানের পাশাপাশি কৃষি উপকরণের মূল্য সহনীয় রাখার ক্ষেত্রে সরকারের ইতিবাচক মনোভাব আশার আলো দেখাচ্ছে কৃষিজীবী মানুষকে। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা-মহামারি সত্ত্বেও সরকারের প্রণোদনার কারণে বরাবরই ঘুরে দাঁড়াচ্ছে কৃষিখাত।
করোনায় প্রমাণ হলো কৃষিই বাংলাদেশের প্রাণ সারাবিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, ছাত্র-শিক্ষকসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ যখন করোনার আক্রমণ থেকে বাঁচতে ঘরবন্দি, ঠিক সেই সময়ও মাঠে ছিলেন বাংলার কৃষকরা। তারা নিজের হাতে ফলিয়েছেন ফসল। আর সেই ফসলই বাঁচিয়ে রেখেছে দেশের ১৬ কোটি মানুষের জীবন। আর এভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে অর্থনীতি। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে ঘরবন্দি মানুষকে দেয়া সহায়তার অধিকাংশই ছিল কৃষিপণ্য। যদিও করোনার কারণে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণে বহু সমস্যা পোহাতে হয়েছে। সারা দেশ লকডাউনের আওতায় থাকায় পরিবহন, বাজার সবকিছুই ছিল বন্ধ। আর ক্রেতারা ছিলেন বাড়িতে। অনেকেই তখন উৎপাদিত পণ্যের দাম কমিয়ে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। আবার অনেকের ফসল নষ্ট হয়েছে। পচে যাওয়ার ফলে ফেলে দিতেও বাধ্য হয়েছেন অনেকে। শিল্প নয় কৃষিই বাংলাদেশের প্রাণ। করোনা এবার সেই বার্তাই দিলো এ দেশের মানুষকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষি খাতে সরকারের নানামুখী উদ্যোগের ফলে ভালো ফলনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, মহামারিসহ চলমান করোনার ভয়াবহ থাবায় দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা থেকে কৃষিই বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
কৃষি গবেষকরা বিশ্বাস করেন, কৃষকের এই অবদানকে বাঁচিয়ে রাখতে তার উৎপাদিত পণ্যের সুষ্ঠু বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা খুবই প্রয়োজন। কৃষকের হাতে সর্বোচ্চ উৎপাদন ও সুষ্ঠু বাজারজাতকরণ কেবল করোনা সংকটে নয়, দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের নগদ সহায়তা প্রদান করা গেলে তা সংকট সত্ত্বেও কৃষি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও)-এর তথ্যমতে, বিশ্বে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বাংলাদেশের ১ কোটি ৬০ লাখ কৃষক পরিবার সবজি চাষে জড়িত। ফলে বছরে গড়ে ১ কোটি ৬২ লাখ টন সবজি উৎপাদন হয় দেশে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১৮-১৯ সালে ২ দশমিক ৪ কোটি টন বোরো ধান, ১ দশমিক ৫৩ কোটি টন আমন ধান এবং ২৯ দশমিক ২ লাখ টন আউশ ধান উৎপাদিত হয়েছে। ধান ছাড়াও সবজি উৎপাদনেও কৃষকের সফলতা প্রশংসাযোগ্য। ২০০৯-১০ সালে ১ কোটি ২৫ লাখ টন সবজি উৎপাদিত হয়েছিল। ২০১৮-১৯ সালে এর পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৭২ লাখ টন। করোনা মহামারী অর্থবছর ২০১৯-২০ সালে দেশে ধান ও সবজি উৎপাদন ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় বেশি হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে কৃষি বিভাগ। ধান এবং সবজি দুটোই দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি উৎপাদিত হয়েছে।

ধান চাষে কর্মসংস্থান বেশি
সামগ্রিকভাবে খাদ্যশস্য উৎপাদনের হিসাবে দেখা যায়, এখনও ধান চাষে গ্রাম বাংলার ৪৮ ভাগ মানুষের কর্মসংস্থান হয়। বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের যে অংশগ্রহণ তার অর্ধেক এবং জাতীয় আয়ের ছয় ভাগের এক ভাগ আসে ধান থেকে। দেশের ১ কোটি ৩০ লাখ পরিবার প্রতিবছর ১ কোটি ৫ লাখ হেক্টর একর জমিতে ধান চাষ করছে। ধান উৎপাদিত জমির এ পরিমাণ গত ৫০ বছরের তুলনায় কমলেও দেশে সামগ্রিকভাবে ধান উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছে। ১৯৭১-৭২ সালে ধান উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ টন। ২০০৯-১০ সালে দেশে ধান উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৩৮ লাখ টন, ২০১৪-১৫ সালে ৩ কোটি ৪৭ লাখ টন এবং ২০১৮-১৯ সালে হয়েছে ৩ কোটি ৮৬ লাখ টন।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে ধানের উৎপাদন ৪ কোটি টন ছাড়িয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। ২০০৬ সালে ২ কোটি ৬১ লাখ টন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়েছিল, যা ২০১৮-১৯ সালে বেড়ে হয়েছে ৪ কোটি ৩২ লাখ টন। ১২ বছরে প্রায় দ্বিগুণ। এ অবদান কৃষকের, এ সফলতা কৃষি খাতের।
ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইসমত আরা বেগম বলেছেন, করোনাভাইরাস
সংক্রমণ এড়াতে সারা দেশে লকডাউন শিথিল করা হলেও কৃষিপণ্য পরিবহন ও বাজারজাতকরণে সমস্যা ছিল। সরকার স্বল্প সময়ে কৃষিপণ্যের পার্সেল এক্সপ্রেস ট্রেন, কৃষকবন্ধু ডাক সেবা, ভ্রাম্যমাণ বাজার, ট্রাক চলাচলের নিশ্চয়তা, ত্রাণে আলু ও সবজি
অন্তর্ভুক্তি, কৃষিপণ্য ও আম্পানের পর আম পরিবহনে প্রণোদনা, উন্মুক্ত কৃষিপণ্য মার্কেটপ্লেস ‘ফুড ফর নেশন’ উদ্বোধনের মতো ব্যবস্থা নিয়েছে।
খাদ্য উৎপাদনে কৃষকদের সহায়তা দিতে ৬৪ জেলায় একজন করে কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। তাদের এসব বাস্তব ব্যবস্থার ফলে কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ তাৎক্ষণিকভাবে সহজতর হয়েছে নিঃসন্দেহে, কিন্তু প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ কৃষিক্ষেত্রে গতি বৃদ্ধি করবে।

করোনাকালীন অভিজ্ঞতা জানাতে কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, করোনাকালের পুরো সময়টাই মাঠে কাজ করেছি। ফসল ফলিয়েছি। উৎপাদিত পণ্য ন্যায্য দামে বিক্রি করতে না পেরে বাড়ি ফিরে এসেছি। অনেক সময় বাকিতে বিক্রি করে দিয়েছি। আবার বাধ্য হয়ে কম দামেও বিক্রি করেছি। করোনার এ সময়ে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। তারপরও ভালো লাগে যখন ভাবি, আমাদের পরিশ্রমের ফলে দেশের মানুষ না খেয়ে থাকেনি। মহামারী আমাদের ক্ষতি করতে পারেনি। দেশের অর্থনীতি টিকে আছে, ভবিষ্যতে আমাদের লাভ হবে।
একটি এনজিও’র গবেষণায় দেখা যায়, কৃষকরা তাদের কৃষি-জমিতে ধানসহ অন্যান্য ফসলও ফলিয়ে থাকেন। জমিতে কোনও না কোনও সবজির চাষ করেন ৭৮ শতাংশ কৃষক। ২৬ শতাংশ কৃষক জমিতে পাট চাষ করেন। ১২ শতাংশ কৃষক জমিতে মাছের চাষ করেন, প্রায় সমপরিমাণ কৃষক সরিষা, ডাল এবং রসুন উৎপাদন করেন। বাদাম এবং সয়াবিন উৎপাদন করেন ১০ শতাংশ কৃষক। ভুট্টা চাষ করেন ৫ শতাংশ কৃষক। আম চাষ করেন ৪ শতাংশ কৃষক। পেঁয়াজ চাষ করেন ৪ শতাংশ কৃষক। তিল চাষ করেন ৩ শতাংশ কৃষক। পান উৎপাদন করেন ৩ শতাংশ কৃষক এবং এছাড়াও কিছু কৃষক তাদের জমিতে অন্যান্য ফল ও ফুলেরও চাষ করেন। তবে ১২ শতাংশ কৃষক ধান ছাড়া অন্য কোনও কৃষিজ কাজে তাদের জমি ব্যবহার করেন না।
ওই প্রতিষ্ঠানের একজন গবেষক বলেন, করোনায় কৃষকের ক্ষতির বিষয়টি জানতে একটি গবেষণা করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, লকডাউনের ফলে কৃষিপণ্যের উৎপাদন, ফসল সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে ধান চাষি কৃষকদের একটি বড় অংশের ধান কাটার মুহূর্তে কৃষি শ্রমিকের অভাবে ধান কাটতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছে। ৯০ শতাংশ কৃষকই বলেছেন করোনার কারণে তাদের কৃষি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
এছাড়াও ৭৮ শতাংশ কৃষক তাদের উৎপাদিত সবজি, মাছ, দুধ, ডিম, এমনকি পোল্ট্রি বাজারজাত করতে সমস্যায় পড়েছেন। পরিবহন ও হাট-বাজার সীমিত হওয়ায়, খুব কমই বাজারে নিতে পারছেন। ৩৮ শতাংশ কৃষক বলেছেন, বেগুন, শসা, শিম ও আলুর মতো সবজি বিক্রিতে গিয়ে তারা সবচেয়ে বেশি লোকসান গুনেছেন। অনেক সময় এসব পণ্য বিক্রি করতে না পেরে ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। এমনকি অনেকে অবিক্রীত সবজি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করছেন। অনেকে আবার তা ক্ষেতেই ফেলে এসেছেন।
এ গবেষণায় দেখা গেছে, করোনার কারণে সৃষ্ট আর্থিক অচলাবস্থায় কৃষকের এখন পর্যন্ত পরিবার প্রতি কৃষিতে ক্ষতির পরিমাণ ১৯ হাজার ৮ শত ৫৩ টাকা, যা তাদের পরিবারের বার্ষিক আয়ের ১০ দশমিক ৫ শতাংশ।
বাংলাদেশে বর্তমানে সরাসরি কৃষিকাজের সাথে জড়িত এমন লোকের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৩ শতাংশ। তাছাড়া দেশের অর্থনীতির মোট যে কয়টি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি রয়েছে তার মধ্যে কৃষি, শিল্প ও বিদেশি রেমিট্যান্সই প্রধান। শিল্পের মধ্যে যেমন ক্ষুদ্র, মাঝারি, ভারি প্রভৃতি বিভিন্ন ভাগ রয়েছেÑ তার মধ্যে তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে কৃষিখাতের পুরোটাই কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতি ভিত্তিক। সেখানে কৃষকদের মধ্যে ভূমিহীন, মাঝারি, ক্ষুদ্র, বড়Ñ এমন অনেক ধরনের কৃষক রয়েছে। আবার কৃষির রয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপখাত। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ এবং এসব খাতের ছোট-বড় অনেক খামারি। কিছু কিছু বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাদ বাকী পুরোটাজুড়েই জড়িয়ে রয়েছে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষজন।
অর্থনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে কৃষি, তৈরি পোশাকশিল্প এবং রেমিট্যান্সের ওপর। তৈরি পোশাক ও রেমিট্যান্স চিরস্থায়ী ব্যবস্থা নয়। কৃষি চিরস্থায়ী। নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং আবহাওয়ার প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে
কৃষিকে টিকে থাকতে হয়।
তারা বলেন, বাংলাদেশ খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠার পেছনে ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান বিরাট। সেখানকার শিক্ষার্থীরা ধান, গম, ডাল, তৈলবীজ, ইক্ষু, তরিতরকারি শুধু নয়, ফলমূলের উৎপাদন, পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্য পালন প্রভৃতি ক্ষেত্রে কৃষকদের সহযোগিতা করেছেন।

ধানের পাশাপাশি অন্য ফসল চাষ করছে কৃষকেরা
সরকারের পক্ষ থেকে দেশের ৩৭ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে শাকসবজির বীজ বিতরণের জন্য ১০ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ৬৮৫ টাকার প্রণোদনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আওতায় ১ লাখ ৫১ হাজার ৬০০ কৃষক পাবেন প্রণোদনার এই অর্থ।
জানা গেছে, এ কর্মসূচির আওতায় অগ্রাধিকার তালিকাভুক্ত একটি কৃষক পরিবারকে ৫০ গ্রাম
লালশাক, ৫০ গ্রাম ডাঁটাশাক, ৫০ গ্রাম কলমিশাক, ১০০ গ্রাম মুলাশাক, ৫০ গ্রাম পুঁইশাক, ১০০ গ্রাম পালংশাক, ৫০ গ্রাম পাটশাক, ৩ গ্রাম শসা (হাইব্রিড), ৫ গ্রাম হাইব্রিড লাউ, ৫ গ্রাম হাইব্রিড মিষ্টি কুমড়া, ১০ গ্রাম হাইব্রিড করলা, ২ গ্রাম হাইব্রিড মরিচ, ১০ গ্রাম হাইব্রিড বরবটি এবং ৫০ গ্রাম শিমের বীজ দেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান জানিয়েছেন, করোনাকালে কৃষি আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, এ বিষয়টি এখন প্রমাণিত। করোনা পরবর্তী বন্যায় কৃষির ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে মাঠপর্যায়ে জেলা প্রশাসন কাজ করছে। এরইমধ্যে কৃষকের ক্ষতি কাটাতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে দেশের ৩৭ জেলায় ১০ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার টাকার প্রণোদনা
প্যাকেজ গ্রহণ করা হয়েছে।

করোনার ক্ষতি কাটাতে কৃষিই ভরসা
গ্রামে জনসমাগম কম, সেজন্য শহরের তুলনায় তাদের করোনা আক্রমণের স্বাস্থ্য ঝুঁকি অনেকটাই কম। খোলা আকাশ-বাতাস ও রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের কারণে কৃষকরা ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই ঝুঁকি কমে যায়। শুধু সাময়িক পরিবহন অসুবিধার জন্য তাদের উৎপাদিত পণ্য পরিবহনে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। কিন্তু ফসল উৎপাদনে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। তাছাড়া সরকার সার, বীজ, সেচ জ্বালানি, কীটনাশক, উৎপাদিত শাক-সবজি, ধান-চাল, তেল, পিঁয়াজ-রসুন, গম-ভুট্টা, আলু-পটোল ইত্যাদি বিশেষ ব্যবস্থায় অর্থাৎ জরুরি পণ্য হিসেবে মর্যাদা দিয়ে পরিবহন করার ব্যবস্থা করে। লকডাউনের শুরুতেও ধান সংগ্রহ করার জন্য ধানকাটা শ্রমিকদের যাতায়াত নির্বিঘœ করতে সরকার বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছিল।

শক্ষ ভিতের ওপর দেশের কৃষি অর্থনীতি
আমাদের অর্থনীতির এই শক্ত ভিত্তি এক দিনে তৈরি হয়নি। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রী কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে বিশেষ জোর দিয়েছেন। ২০০৯ সালে সরকার গঠন করার সঙ্গে সঙ্গে কৃষির দিকে তিনি মনোযোগ দেন। শপথ গ্রহণের পরপরই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী সারের দাম ব্যাপক হারে কমিয়ে দেন। এই দুর্যোগের বছরেও
বাজেটের ৫.৩ শতাংশ বরাদ্দ কৃষিতে দেওয়া হয়েছে।
কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ দ্রুত সফলতা অর্জন করছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ৬৭৮ মিলিয়ন ডলার কৃষিপণ্য রপ্তানি করেছে। বেশ কিছু বাংলাদেশি করপোরেট এখন ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল ছাড়াও সারা বিশ্বে প্রসেসড কৃষিপণ্য রপ্তানি করে বিপুল সুনাম অর্জন করেছে। এ সবই সরকারের ইতিবাচক প্রণোদনামূলক নীতির কারণেই সম্ভব হচ্ছে।
আর সে জন্যই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেকটাই বেশি। তবে করোনা আক্রমনের ফলে আমাদের অর্জন অনেকটাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কিন্তু ভেঙে পড়েনি। এতে বোঝা যায় দেশের কৃষি অর্থনীতি শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আছে। করোনায় প্রমাণ হলো
কৃষিই বাংলাদেশের প্রাণ। করোনা সংকট কেটে গেলে কৃষির মাধ্যমে দ্রুতই অর্থনীতির পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে পারবে বাংলাদেশ। আমাদের কৃষি খাত এখনো চাঙ্গা থাকায় অনেক দেশের চেয়ে এই সংকট মোকাবেলায় ভালো করব বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় কৃষি
আমাদের জাতীয় খাদ্য চাহিদা তিন কোটি ৩৩ লাখ মেট্রিক টনের মতো। অনুমান করা হচ্ছে, এ বছর মোট খাদ্য উৎপাদিত হবে চার কোটি মেট্রিক টনের মতো। এই অঙ্ক ২০০৯ সালের খাদ্য উৎপাদন থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।
খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ধারণা করছে বিশ্বজুড়ে করোনার কারণে যে সঙ্কট সৃষ্টি হবে তার প্রাথমিক ধাক্কাটা আসবে খাদ্য নিরাপত্তার উপর। আর সেটির কারণে বিশ্বে বিরাট খাদ্য ঘাটতিই শুধু নয়, দেখা দিতে পারে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। বিশ্ব ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এমন দুর্যোগের পরে খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষ নিত্য নৈমিত্তিক হিসেবে দেখা দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়েছিল যা আমরা সবাই জানি। বস্তুত এ করোনার প্রাদুর্ভাবকে একটি যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করে এটিতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বলে মনে করছেন অনেকে। আর এ যুদ্ধের ফলে খাদ্য সঙ্কট সৃষ্টি এবং দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় কৃষিই একমাত্র ভরসা। বাংলাদেশে বর্তমানে কৃষির যে অবস্থা সেটিকে
সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে পারলে তা দিয়ে আমাদের দেশের দুর্ভিক্ষ তো বটেই, উপরন্তু আরো পার্শ্ববর্তী অনেক দেশকে সহযোগিতা করা যাবে।
আমাদের দেশটি সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা। কৃষির জন্য এর মাটি, জল, আবহাওয়া খুবই উপযোগী। বাংলাদেশের এমন উর্বর মাটিই হতে পারে এসময়ে আমাদের জন্য আশীর্বাদ। এটি উপলব্ধি করেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে বিভিন্ন কৃষিবান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। আর এসব কারণেই আমাদের দেশ এক সময়ের তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ থেকে এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে।
আমাদের জাতির পিতা ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, নানা দুর্ভোগেও তাঁর দেশবাসী কাবু হবে না। বরং বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নিজেদের ইচ্ছাশক্তির জোরেই জয়ী হবে শেষ পর্যন্ত। সেই একই রকম আস্থার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকন্যা চলমান বিশ্ব সংকট মোকাবেলায় জনগণের অজেয় প্রাণশক্তির ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাচ্ছেন। আর এই ভরসার কেন্দ্রে রয়েছে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি, বিশেষ করে কৃষির অভূতপূর্ব শক্তিমত্তা। সারা বিশ্ব যখন করোনাকালে মহামন্দায় ভীতসন্ত্রস্ত, তখন আমাদের চাঙ্গা কৃষি তাঁর আশার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করে চলেছে। প্রমাণ করেছে কৃষিই বাংলাদেশে প্রাণ।