প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

বিদেশি শ্রম বাজারে করোনার ধাক্কা : সরকারকে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে

বিশেষ প্রতিবেদক : বাংলাদেশে করোনার প্রথম ধাক্কায় প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রভাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছে। তবে শ্রম বাজারে করোনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন এখাত সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, করোনার বৈশ্বিক প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি অনেক শ্রমিক ইতোমধ্যে চাকরি হারিয়েছেন, আবার বিদেশে কর্মরত অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক ছুটিতে দেশে এসে করোনা বিধিনিষেধের কারণে সময়মতো কর্মস্থলে ফেরত যেতে না পারার কারণে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতেও রয়েছেন। এ সকল সমস্যা সমাধানে সরকারের জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নতুন নতুন শ্রম বাজার সৃষ্টিতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। করোনার প্রভাবে সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমে বৈধ-অবৈধ উপায়ে বিদেশে শ্রমিক যাওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ থাকার কারণেও প্রবাসী রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর ভবিষ্যতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেকর্ড রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক
মুদ্রার রেকর্ড রিজার্ভ
চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রবাসী কর্মীরা ৪.৫৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। গত অর্থ বছরের তুলনায় এটা শতকরা ১.৫ ভাগ বেশী। বিপুল পরিমাণের প্রবাসী আয়ের কারণে ব্যাংকগুলোতে ডলারের উদ্বৃত্ত দেখা দিয়েছে। করোনা ভাইরাস মহামারির মধ্যেও বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রেকর্ড ৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে।
সম্প্রতি রেমিট্যান্সে সরকারঘোষিত ২ শতাংশ প্রণোদনা প্রবাসীরা যেন সহজে পান সেজন্য বেশকিছু শর্ত শিথিল করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতদিন দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত রেমিট্যান্সের প্রণোদনায় কোনো ধরনের কাগজপত্র লাগত না। এখন এর আওতা বাড়ানো হয়েছে। গত ১ জুলাই থেকে প্রবাসীদের পাঠানো ৫ হাজার ডলার বা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত রেমিট্যান্সে বিনা শর্তে কোনো ধরনের কাগজপত্র ছাড়াই প্রণোদনার অর্থ দেওয়া হবে। দেশে প্রবাসী আয়ের ৯০ শতাংশ আসে বিশে^র ১০টি দেশ থেকে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের জিসিসিভুক্ত ছয় দেশ থেকে ৫৮ শতাংশ রেমিট্যান্স আসে। সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় আসে সৌদি আরব থেকে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ দেশ থেকে ৪০১ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছিল, যা আগের বছরের চেয়ে ২৯ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরে দেশে যে পরিমাণের রেমিট্যান্স এসেছে তার ২২ শতাংশই আসে সৌদি আরব থেকে। এ সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ২৪৭ কোটি ২৫ লাখ ডলার, কুয়েত থেকে ১৩৭ কোটি ২২ লাখ ডলার, ওমান থেকে ১২৪ কোটি ডলার, কাতার থেকে ১০১ কোটি ৯৬ লাখ ডলার ও বাহরাইন থেকে ৪৩ কোটি ৭১ লাখ ডলার প্রবাসী আয় আসে। দেশে প্রবাসী আয়ের তৃতীয় ও পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এ দুই দেশ থেকে গত অর্থবছরে যথাক্রমে ২৪০ কোটি ৩৪ লাখ ডলার ও ১৩৬ কোটি ৪৮ লাখ ডলার রেমিট্যান্স আসে। এছাড়া গত অর্থবছরে দশম অবস্থানে থাকা সিঙ্গাপুর থেকে ৪৫ কোটি ৭৪ লাখ ডলার এসেছিল।

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে
দেশও বদলে যায়
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক সেমিনারের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ভার্চুয়াল জুমে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ বলেছেন, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে দেশও বদলে যায়।
তিনি বলেন, ‘মানুষ বিদেশে যায় নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। তবে বিদেশে গিয়ে শুধু তাদেরই ভাগ্য পরিবর্তন হয় না, তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে দেশও বদলে যায়। যদি আমরা দক্ষ জনবল তৈরী করতে পারি, তাহলে দেশ আরও উন্নত হবে। এজন্য দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে আমরা বদ্ধ পরিকর।’

করোনাকালে ১ লাখ ১১ হাজার
১১১ জন কর্মী দেশে ফিরেছে
বৈশ্বিক মহামারী করোনাকালে এ পর্যন্ত ১ লাখ ১১ হাজার ১১১ জন প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশী কর্মী দেশে ফিরে এসেছেন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমেদ সম্প্রতি সংসদে ৩০০ বিধিতে দেয়া বিবৃতিতে এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ফেরত কর্মীদের মধ্যে প্রায় সবাই কর্মকালের মেয়াদ শেষে অথবা সেখানে কাজ না থাকায় দেশে এসেছেন। ফলে করোনাকালে এ ফেরত আসার হার এখন পর্যন্ত আশঙ্কাজনক নয়। আর ফেরত আসা কর্মীদের সামাজিক ও আর্থিকভাবে পুর্নবাসনে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো ৫শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। এছাড়া বিশ্ব ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ৪শ’ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নেরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এর বাইরে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক বিদেশ ফেরত কর্মী ও তার পরিবারকে শতকরা ৪ ভাগ সুদে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদান করছে। আর করোনাকালে বিদেশে বাংলাদেশী কর্মীদের বিভিন্ন সহযোগিতায় এ পর্যন্ত ১৩ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, চলতি বছরের জুন থেকে এ আগস্ট পর্যন্ত প্রবাসী কর্মীর ৪.৫৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। গত অর্থ বছরের তুলনায় এটা শতকরা ১.৫ ভাগ বেশী। প্রধানমন্ত্রীর শতকরা ২ ভাগ ইনসেনটিভ ঘোষণার কারণে এটা সম্ভব হয়েছে।
তিনি জানান, ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে রেমিট্যান্স পাঠানো হয় ১৬.৪ বিলিয়ন ডলার। আর ২০১৯-২০ অর্থ বছরে ১৮.২ বিলিয়ন ডলার, যা পূর্ববর্তী অর্থ বছরের তুলনায় শতকরা ১১ ভাগ বেশী।
মন্ত্রী বলেন, করোনাকাল এবং পরবর্তীতে বিদেশে বিদ্যমান শ্রম বাজার ধরে রাখা এবং নতুন বাজার খোজার উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সাথে কাজ করছে।
তবে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ফেরত আসা প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা আশঙ্কাজনক নয় বলেও মনে করছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ।
ইমরান আহমদ বলেন, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী গত ১ এপ্রিল থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ১১ হাজার ১১১ জন কর্মী দেশে ফেরত এসেছেন। তাদের অনেকেই কাজের মেয়াদ শেষে বা কাজ না থাকায় দেশে ফেরত এসেছেন। যদিও আশঙ্কা করা হয়েছিল অর্থনৈতিক মন্দা এবং করোনার কারণে প্রধান কর্মী নিয়োগকারী দেশগুলোর শ্রমবাজার বিপর্যস্ত হওয়ার কারণে অনেক কর্মী বেকার হয়ে পড়বেন। কিন্তু আশার কথা এই যে, এখন পর্যন্ত ফেরত আসা কর্মীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠেনি। এ ক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একযোগে ভূমিকা পালন করেছে।
তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস মহামারী এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বিশ্বব্যাপী শ্রমবাজার হুমকির মুখোমুখি হয়েছে। অন্যতম কর্মী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
ইমরান আহমদ বলেন, বিগত বছরগুলোর হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে প্রায় প্রতি মাসে ৬০ হাজার কর্মী বিদেশে গিয়েছেন। ২০১৯ সালের জানুয়ারি-আগস্ট মাসে ৪ লাখ ৬০ হাজার কর্মী বিদেশে গিয়েছেন। কিন্তু আগস্ট ২০২০ পর্যন্ত মাত্র ১ লাখ ৭৬ হাজার কর্মী বিদেশে গিয়েছেন। এর কারণ হলো এ বছরের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত কোনো কর্মী বিদেশে যেতে পারেননি বলা চলে।
দেশে ফেরত আসা কর্মীদের পুনর্বাসনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, যেসব কর্মী ফিরে এসেছেন বা আসবেন তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। করোনা সংকট মোকাবিলায় বিদেশে থাকা কর্মীদের জন্য ১৩ কোটি টাকার জরুরি ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কর্মীদের দেশে আনা এবং ফেরত আসাদের রিইন্টিগ্রেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক মন্দার মধ্যে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেশি হওয়ায় প্রবাসী কর্মীদের ধন্যবাদ জানান মন্ত্রী।
একই সঙ্গে রেমিট্যান্সে ২ শতাংশ ইনসেনটিভ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকেও ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী উদ্যোগের জন্যই রেমিট্যান্সের ঊর্ধ্বগতি। সম্প্রতি আমাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কিছু দেশে আমাদের কর্মীরা অনাকাক্সিক্ষত বিষয়ের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকেই বৈধভাবে বিদেশে যাননি। এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রবাসী কর্মীদের করোনা ভাইরাস টেস্ট ফি ১০০ টাকা করতে প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, তারা আমাদের দেশের নাগরিক। বিদেশে গিয়ে আমাদের দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যে ফি নেওয়া হচ্ছে, তাদের কাছ থেকেও যেন একই ফি নেওয়া হয়।

ইতালিতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার
মেয়াদ বাড়ল
ইতালিতে বাংলাদেশিদের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরেক দফা বাড়ানো হয়েছে। ইতালির স্থানীয় গণমাধ্যম দ্য লোকাল-এর খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জুসেপ্পে কন্তের জারি করা এক আদেশে এ নিষেধাজ্ঞার উল্লেখ রয়েছে। যেখানে করোনাসংক্রান্ত নির্দেশনায় অল্প কিছু ক্ষেত্রে শিথিলতা আনা হলেও বেশিরভাগ নিষেধাজ্ঞা ৭ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
এর আগে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছিল। কিন্তু এদিন জারি করা নতুন নোটিসে এক মাস সময় বাড়ানো হয়েছে। এ তালিকায় বাংলাদেশের সঙ্গে আগের মতোই রয়েছে ১৬টি দেশের নাগরিক। অন্য দেশগুলো হলো: ওমান, উত্তর মেসিডোনিয়া, আর্মেনিয়া, বাহরাইন, ব্রাজিল, বসনিয়া, চিলি, কুয়েত, মালদোভা, পানামা, পেরু, রিপাবলিক ডোমেনিকান, কসোভো, মন্টেনেগ্রো ও সার্বিয়া।

মালয়েশিয়া ফিরতে সরকারের সহায়তা চান প্রবাসীরা
দ্রুত কর্মস্থলে ফিরে যেতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন মালয়েশিয়া থেকে ছুটিতে দেশে এসে আটকেপড়া প্রবাসীরা। এ ব্যাপারে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ৪ দফা দাবিতে এক মানববন্ধনে তারা এ দাবি জানান।
তারা বলেন, অনেকেই মালয়েশিয়া থেকে গত আট-নয় মাস আগে ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। কিন্তু বিশ্বজুড়ে চলমান করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির কারণে মালয়েশিয়া যেতে পারছেন না। অধিকাংশ প্রবাসীর ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে।
তারা আরও বলেন, অত্যন্ত দুঃখের বিষয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত আর্থিক সহায়তা বা ঋণের ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের কাছ থেকে আমরা পর্যাপ্ত সহায়তা পাচ্ছি না। যদিও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার কথা, কিন্তু প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক কর্মকর্তারা, দেশের ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আমাদের ওপর কঠিন শর্ত আরোপ করেছেন। এর মাঝে নিজের নামের থাকার জায়গার মূল দলিল, সরকারি চাকরিজীবীর ব্যাংকের চেকের পাতাসহ বিভিন্ন ডকুমেন্টসহ খুব কঠিন শর্ত আরোপ করেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন বেকার অবস্থায় দেশে অবস্থান করার কারণে আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে দিশেহারা হয়ে, খেয়ে না খেয়ে অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছি। তাই আমরা সরকারের কাছে কিছু দাবি উপস্থাপন করছি। মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা করে দ্রুত আমাদের ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। যতদিন না যেতে পারি মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে আমাদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হোক।

প্রতারণার শিকার ভিয়েতনাম ফেরত প্রবাসী কর্মীরা আটক
দেশে ফিরেই দায়ী রিক্রুটিং এজেন্সি, দালালদের বিচারের দাবি করে আসছিলেন ভিয়েতনাম গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে ফেরা ১০৬ জন প্রবাসী কর্মী। কিন্তু দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানানো এই প্রবাসী কর্মীদেরই আটক করেছে পুলিশ। গত ১৮ আগস্ট দেশে ফেরার পর তারা দিয়াবাড়িতে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে ছিলেন। গত ১ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টার দিকে তাদের নিয়ে যেতে পুলিশভ্যান আনা হয় কোয়ারেন্টিন ক্যাম্পে। ১০৬ জনের সবাইকে আটক করা হচ্ছে কিনা, কী কারণে আটক করা হচ্ছে এসব বিষয়ে নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
ভাগ্য বদলানোর আশা নিয়ে গেলেও তাদের ফিরতে হয়েছে শূন্য হাতে। কেউ কেউ শিকার হয়েছেন নির্যাতনের। এখন ভিয়েতনামে যারা আছেন তারাও মানবেতর জীবন যাপন করছেন। ভিয়েতনামে মানব ও অর্থপাচারে জড়িত ২১ প্রতিষ্ঠান। প্রতি মাসে ৫০০ ডলারের বেশি আয়ের প্রতিশ্র“তি দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ভিয়েতনামে। কর্মসংস্থানের আশায় গিয়ে প্রতারণার ফাঁদে পড়ে ছয়-সাত মাস পরেই ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন ভুক্তভোগী প্রবাসীরা। কেউ কেউ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। মানবপাচারকারী চক্র অর্থপাচারের কাজেও জোরপূর্বক ব্যবহার করছেন প্রবাসীদের।

নতুন শ্রমবাজার খুঁজতে হবে
করোনা পরিস্থিতি-উত্তর বড় ধরনের সংকট ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশের শ্রমবাজার। মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কুয়েতসহ কয়েকটি দেশ থেকে প্রবাসী শ্রমিকরা দেশে ফেরত আসছে। এমতাবস্থায় বিদেশে শ্রমবাজার সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার বিষয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। প্রবাসী শ্রমিকদের বিষয়ে সরকারের যথাযথ কর্মসূচি থাকা আবশ্যক; বিশেষ করে নতুন শ্রমবাজার তৈরিতে সরকারকে দৃষ্টি দিতে হবে। জানা গেছে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ১ কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশি কর্মী কর্মরত রয়েছেন। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরও দেশ থেকে সবচেয়ে বেশি কর্মী গিয়েছিলেন সৌদি আরবে, প্রায় ৫৭ শতাংশ। তালিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানের দেশগুলোও মধ্যপ্রাচ্যের। দেশ দুটি হলো যথাক্রমে ওমান (১০.৩৮ শতাংশ) ও কাতার (৭.১৮ শতাংশ)।
অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সৌদি আরব থেকে করোনার কারণে সামনের বছরগুলোতেও লাখ লাখ প্রবাসী কর্মী কাজ হারিয়ে দেশে ফেরা অব্যাহত থাকবে। এ অবস্থায় রেমিট্যান্সের ভবিষ্যৎ নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়। করোনা পরিস্থিতির কারণে শ্রমিকরা দেশে ফেরত আসায় সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রবাসী বেকারদের জন্য আড়াই হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের কথা জানিয়ে বলেছেন, তারা কিন্তু রেমিট্যান্স পাঠায়। বিদেশে অনেক বাংলাদেশি বেকার হয়েছেন। দেশে ফিরে তাদের যাতে কষ্ট না হয় সেজন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে এভাবে প্রণোদনা দিয়ে স্থায়ী সমাধান হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে এখন থেকেই। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম ক্ষেত্র হলো রেমিট্যান্স। জনশক্তি রপ্তানি এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করছে। আশার কথা হলো, জাপানে নতুন বাজার সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। জাপানের পাশাপাশি অন্যান্য দেশও খুঁজে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। ২০১৮ সাল থেকে আফ্রিকার দেশ সোমালিয়া, সুদান, উগান্ডা এবং জাম্বিয়া বাংলাদেশকে ‘বিনিয়োগ ও কর্মংস্থান’ সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়ে আসছে। সেসব প্রস্তাব অনুযায়ী বাংলাদেশের শিল্পোদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা দেশগুলোতে সহজশর্তে কৃষি, কৃষিভিত্তিক শিল্পপণ্য, কৃষিজ খাদ্যশিল্প এবং তৈরি পোশাক খাতে বিনিয়োগে মনোযোগ দিতে পারে। এসব দেশে আমাদের বড় কর্মসংস্থানের বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে।
ফলে সরকারকে এক্ষেত্রে এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের সকল দূতাবাসকে সক্রিয় করতে হবে, যাতে করে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের দ্রুততার সাথে সমস্যার কার্যকর সমাধান করে দেয়া যেন করোনাকালে তাদের দেশে ফেরত আসতে না হয়। তাছাড়া সরকারকে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে, যাতে করে অন্যান্য দেশের সাথে সরকারের বিদ্যমান চমৎকার কূটনৈতিক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবস্থান সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি বিশ্বের নতুন-পুরাতন সকল দেশে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করা যায়। এমনকি করোনাকালে ফেরত আসা প্রবাসী শ্রমিকদের স্ব স্ব কর্মস্থল বা নতুন কর্মস্থলে পাঠানোর কার্যকর উদ্যোগ নেয়া এবং অন্যান্যদের দেশে পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষি, গার্মেন্টস ও প্রবাসী আয়ের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। বৈশ্বিক করোনাকালে এ তিনটি খাতের অনন্য অবদানের কারণে বৈশ্বিক করোনা মহামারি মোকাবিলায় বাংলাদেশ অনেকটাই সফলভাবেই এগিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে। তবে বলা প্রয়োজন যে, শুরু থেকেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার এসব খাতের সুরক্ষায় নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এতে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন প্রণোদনার কারণে এর দীর্ঘমেয়াদি সুফলও পাচ্ছে এখাত সংশ্লিষ্টরা, এমনকি দেশের সাধারণ মানুষের মাঝেও পড়েছে এর ইতিবাচক প্রভাব। তারপরও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার প্রাথমিক ধাক্কা বাংলাদেশ ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারলেও বিশ্বব্যাপী সঙ্কটের কারণে বাংলাদেশকে বিদেশি শ্রম বাজার ও পোশাক শিল্পের বাজার তদারকি করাসহ এসব খাতে দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে।