প্রতিবেদন

সশস্ত্র বাহিনী নির্বাচনী পর্ষদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : সামরিক অভিধান থেকে ‘মার্শাল ল’ শব্দটি বাদ দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘সামরিক অভিধান’ থেকে ‘মার্শাল ল’ শব্দটি বাদ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এটা দেশ ও সশস্ত্র বাহিনীর কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।
এছাড়া পদোন্নতির ক্ষেত্রে যেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীরা দায়িত্ব পায় সেদিকেও খেয়াল রাখতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। গত ৭ সেপ্টেম্বর আর্মড ফোর্সেস সিলেকশন বোর্ড মিটিং ২০২০-এ তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভার্চুয়াল বৈঠকে অংশ নেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘মার্শাল ল’ রক্তপাত ছাড়া দেশ ও সশস্ত্র বাহিনীর কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। তাই ‘সামরিক অভিধান’ থেকে আমাদের ‘মার্শাল ল’ শব্দটি বাদ দেয়া উচিত।
জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসন আমলের ১৯টি ক্যু-এর কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ওই সময়ে বহু সামরিক কর্মকর্তা ও সৈনিককে হত্যা করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘সামরিক স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের আমলে সশস্ত্র বাহিনীর এতো বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা ও সৈন্যকে হত্যা করা হয়েছে যে যুদ্ধেও এতো বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিহত হয়নি। আমরা (সশস্ত্র বাহিনীতে) আর কোনো ছেলে হারা পিতা বা পিতা হারা ছেলের কান্না শুনতে চাই না।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাকা-ের পর একের পর এক ক্যুয়ের কারণে সশস্ত্র বাহিনী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’
তিনি বলেন, ‘এই সব ক্যু-এর নামে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী সশস্ত্র বাহিনীর অনেক সদস্যকে বর্বরোচিতভাবে হত্যা করা হয়।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেনা ও বিমান বাহিনীতে সবচেয়ে বেশি রক্তপাত হয় এবং আমাদেরকে বহু স্বামী হারা বিধবা ও পুত্র হারা বাবা-মায়ের কান্না শুনতে হয়েছে।’
সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন ও একে সময়োপযোগী করে গড়ে তোলা তাঁর সরকারের লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা আমাদের পরিবারের সম্মানিত সদস্য। তারা আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। এই বাহিনীকে আরো আধুনিক ও সময়োপযোগী হিসেবে গড়ে তোলা আমাদের লক্ষ্য এবং এই লক্ষ্যকে সামরে রেখে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। তাঁর সরকার দেশের সুরক্ষা ও কষ্টার্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সশস্ত্র বহিনীকে আরো সুসজ্জিত করার লক্ষে কাজ করে যাচ্ছে।
এ সময় গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জে. মাহফুজুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম উপস্থিত ছিলেন।
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ সেনা সদর দফতর থেকে, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শাহীন ইকবাল নৌবাহিনীর সদরদপ্তর থেকে এবং বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত বিমান বাহিনীর সদরদপ্তর থেকে অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পরপরই বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনের পাশাপাশি আধুনিক ও সময়োপযোগী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
তিনি বলেন, ‘ওই সময়ে জাতির পিতা সময়োপযোগী প্রতিরক্ষা নীতি গ্রহণ করেন এবং তিনি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানী সামরিক জান্তার দোসররা এবং যারা মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত দেশের বিজয় মেনে নিতে পারেনি, তারা বঙ্গবন্ধুর উদার নীতির মূল্যায়ণ করেনি।’
শেখ হাসিনা আরো বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট হত্যাযজ্ঞের পর স্বাধীনতা-বিরোধী অপশক্তির ষড়যন্ত্রে ও কতিপয় উচ্চাকাক্সক্ষী ব্যক্তির কারণে দেশ ঘোর অন্ধকারে ঢেকে যায়।
তিনি বলেন, ‘তারা ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট শুধু রাষ্ট্রপতিকেই নয়, তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য এবং এই বছরই ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে, যারা মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতির পিতার নির্দেশনায় যুদ্ধকালীন সরকার গঠন করে এ দেশের বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন।’
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমি জানি না এই কলঙ্ক মুছে যাবে কিনা। এই সব হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করা হয়।’
তিনি বলেন, এটা দুর্ভাগ্যজনক যে ১৯৭৫ সালের হত্যাকারীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়া বিজয়ের গৌরব হারিয়ে গেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার বঙ্গবন্ধুর প্রতিরক্ষা নীতির আলোকে ফোর্সেস গোল-২০৩০ গ্রহণ করেছে। বঙ্গবন্ধু সশস্ত্র বাহিনীর জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অত্যাধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ ক্রয় করে এই বাহিনীকে একটি আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর তাঁর সরকার বঙ্গবন্ধুর পদাঙ্ক অনুসরণের মাধ্যমে এনডিসি ওয়ার কলেজসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন এবং তিন বাহিনীর জন্য আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ ক্রয় করেন।
তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর, সশস্ত্র বাহিনীগুলো যেন সব দিক দিয়ে স্বক্ষম হয়, সে লক্ষে আমরা নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। সেনা অভিযানের স্বক্ষমতা বাড়াতে আমরা আধুনিক হেলিকপ্টার ক্রয় করেছি।’
শেখ হাসিনা আরো বলেন, তাঁর সরকার প্রথমবারের মতো নৌবাহিনীর জন্য আধুনিক ফ্রিগেট (রণপোত) ক্রয় করে। এছাড়াও ডুবোজাহাজ ও সামরিক হেলিকপ্টার ক্রয় করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা নৌবাহিনীকে একটি ত্রিমাত্রিক বাহিনীকে পরিণত করেছি।’
বিরাট সমুদ্রসীমা অর্জন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সমুদ্র সম্পদকে আহোরণ করার জন্য নৌবাহিনীকে সময়োপযোগী করতে গড়ে তুলতেই হবে।’
বিমান বাহিনীর উন্নয়নের ব্যাপারে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকারই প্রথমবারের মতো দেশের বিমান বাহিনীতে মিগ-২৯ জঙ্গি বিমান সংযুক্ত করেন। পাশাপাশি আমরা সর্বাধুনিক পরিবহণ বিমান, আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার ও ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন অস্ত্র ও সরঞ্জামাদি ক্রয় করেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার সবসময়ই প্রশিক্ষণের উপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। সশস্ত্র বাহিনীর জন্য উচ্চতর প্রশিক্ষণ অতিজরুরি।
তিনি আরো বলেন, ‘বিমান বাহিনীর সদস্যদের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য আমরা বৈমানিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি তাদের যুদ্ধ সরঞ্জামাদি রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করেছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘সরকার আর্মি আইটি সাপোর্ট অর্গানাইজেশন এবং কম্পিউটার ওয়ার গেমস সেন্টার স্থাপন করেছে। আমরা সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সব ধরনের আধুনিক উপকরণের ব্যবস্থা করেছি।’
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সব ধরনের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা চাই না যে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর কোনো বিভাগ পিছিয়ে থাকুক। আমরা চাই আমাদের এই বাহিনীর প্রতিটি বিভাগ সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও জ্ঞানে সমৃদ্ধ হোক। আর এ লক্ষে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
দেশের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সকলকে কম প্রয়োজনীয় খরচ বাদ দিয়ে শুধুমাত্র অতি জরুরি ব্যয় করতে অনুরোধ জানান। সরকার বিপুল পরিমাণ প্রণোদনা দেয়া সত্ত্বেও করোনাকালে কত টাকা সংগ্রহ হয়েছে তিনি সে ব্যাপারে ভেবে দেখতে বলেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা করোনাকালে শুধুমাত্র অতি প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করব এবং কম গুরুত্বপূর্ণ খাতে কোনো খরচ করব না। আর এভাবেই আমরা আবার সুদিন ফিরিয়ে আনব।’
প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতা, দক্ষতা, দেশপ্রেম, সততা, আনুগত্য, অভিজ্ঞতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এবং নেতৃত্বের গুণগত মান বিবেচনা করতে বলেন।
তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সিনিয়র কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সবার মধ্যে যাতে আস্থা বৃদ্ধি পায়, সেজন্য ন্যায্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি দিন। আমি জানি, পোস্ট সীমিত বলে বহু লোক এর জন্য যোগ্য হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। তবু সকলকে পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব হবে না। তা সত্ত্বেও যারা পদোন্নতির জন্য সত্যিকারের যোগ্য তাদেরই পদোন্নতি নিশ্চিত করা উচিত।’
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে পদোন্নতি দেওয়ার সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস, পেশাগত দক্ষতা, নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা, সততা, সত্যবাদিতা, মাঠের অভিজ্ঞতা, আনুগত্য এবং কার্যকারিতা বিবেচনা করা উচিত।
তিনি আরো বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস ও দেশপ্রেমের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নে বিশ্বাসীদের দায়িত্ব প্রাপ্তি নিশ্চিত করুন, যাতে তারা আগামী দিনে দেশকে সঠিক দিকে নিয়ে যেতে পারে।’
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা শেখ হাসিনা বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বুদ্ধিমত্তা, বিচার-বিবেচনা ও নিরপেক্ষতার বিষয়ে তার আস্থা রয়েছে এবং তারা পদোন্নতির জন্য যথাযোগ্য ব্যক্তিদের বেছে নেবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সেনাবাহিনীতে নারী অফিসার নিয়োগে তার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নারীরা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে খুবই ভালো করছেন এবং এভাবে সবার প্রশংসা অর্জন করছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য সত্যিই গর্বের বিষয় যে ২৭ জন নারী কর্মকর্তা
প্যারাট্রোপিংয়ে সাফল্য অর্জন করেছেন।’ নারীরা সকল সেক্টরে তাদের দক্ষতা দেখাচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের দুইজন মহিলা পাইলটের ছবি দেখে আমার মন আনন্দে ভরে উঠেছে।’