রাজনীতি

স্থানীয় নির্বাচনে ‘বঞ্চিতদের’ মনোনয়ন দেবে আওয়ামী লীগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
ক্ষমতার কাছাকাছি এসে রাজনৈতিক ফায়দা লুটে নিতে অনেকেই রাতারাতি সরকারি দলের নেতা বনে যান। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বেলাতেও এমনটা দেখা গেছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া তৃণমূলের নেতারা তখন পেছনে পড়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে দলে ‘বঞ্চনার শিকার’ তৃণমূলের ত্যাগী নেতাদের এবার মূল্যায়ন করবে আওয়ামী লীগ। আগামীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়ে তাদের মনোকষ্ট দূর করবেন দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্ষমতাসীন দলটির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, আসন্ন পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে বড় পরিবর্তন আসবে। বর্তমান জনপ্রতিনিধিদের বড় অংশ বাদ পড়বেন এবার। চলতি বছর ডিসেম্বরে পৌরসভা ও আগামী বছর মার্চে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। সে নির্বাচনগুলোতে মনোনয়ন দিয়ে দলটির প্রাণশক্তি তৃণমূলে প্রাণের সঞ্চার ঘটাবেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। শূন্য হওয়া পাঁচটি আসনের উপনির্বাচনে দীর্ঘদিন বঞ্চিত নেতাদের মনোনয়ন দিয়ে তিনি তেমন ইঙ্গিতই দিয়েছেন। আর আগামীতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।
তৃণমূল নেতাদের অভিযোগ, দল ক্ষমতায় আসার পর থেকে ত্যাগের মূল্যায়ন পাচ্ছেন না দুর্দিনের নেতারা। অন্যদিকে দলে সুবিধাবাদীদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। কেন্দ্রীয় নেতারা বলেন, সারা দেশেই খোঁজ নেওয়া হচ্ছে সত্যিকার ত্যাগী কারা কারা, বঞ্চিত এবং সুবিধাবাদী কারা। সেই তালিকা করে বঞ্চিতদের মূল্যায়ন ও সুবিধাবাদীদের বাদ দেওয়া হবে এমন একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা।
তারা আরও বলেন, প্রায় আড়াইশ পৌরসভা ও সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে নেতাকর্মীবেষ্টিত নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সুবিধাবাদী ও কর্মীবিচ্ছিন্ন জনপ্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়া হবে। এর মধ্য দিয়ে তৃণমূলের ক্ষোভ-বিক্ষোভ দূর হবে এবং দলে ভারসাম্য ফিরে আসবে বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় নেতারা।
আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা বলেন, সারা দেশে দলের একটি অংশ বঞ্চিত। দলের অনেক মন্ত্রী-এমপির ব্যক্তিগত বলয়ের কারণে তারা বঞ্চনার শিকার এই তথ্য
দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে অবগত হয়েছেন। বিষয়টি আমলে নিয়ে সারা দেশে জনবিচ্ছিন্ন নেতা ও বলয় তৈরি করে রাজনীতি করা এমপি-মন্ত্রীদের খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছেন তিনি। একইসঙ্গে কেন ত্যাগের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না, তৃণমূল নেতাদের অপরাধ কী সে খবরও নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান জনপ্রতিনিধিদের বড় অংশ মনোনয়নবঞ্চিত হবেন।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান বলেন, আওয়ামী লীগই একমাত্র দল যেখানে ত্যাগের মূল্যায়ন করা হয়। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে এবারও ত্যাগীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। নেতাকর্মীবিচ্ছিন্ন জনপ্রতিনিধিদের মনোনয়ন দেওয়া হবে না এবার। তাছাড়া দুর্নীতি ও কর্মীবিচ্ছিন্ন জনপ্রতিনিধিরাও বাদের তালিকায়
থাকবেন।
শীর্ষস্থানীয় নেতাদের একজন বলেন, এবার শূন্য আসনগুলোর উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে ত্যাগী নেতাদের প্রতি দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার বিশেষ নজর ছিল। এরই অংশ হিসেবে দেখা গেছে, প্রায় সব আসনেই প্রয়াত ওইসব নেতার পরিবারের সদস্যদের চেয়ে দলে অবদান রাখা নেতাদের প্রতি আস্থা রেখেছেন দলীয় প্রধান। তিনি আরও বলেন, এই ধারা আগামীতে সব নির্বাচনেই থাকবে। নেতাকর্মীবিচ্ছিন্ন কোনো নেতাকেই তিনি আর আমলে নেবেন না।
তিনি বলেন, অনেক জায়গায় ক্ষমতাবান নেতারা ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে বলয়ের রাজনীতি শুরু করে ত্যাগী ও দুর্দিনের নেতাদের অবমূল্যায়ন করেছেন এ তথ্য দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার কাছে রয়েছে। তাই তিনি মনে করেন, বিভিন্ন অঞ্চলে বলয়ের রাজনীতি ভেঙে দিয়ে ঐক্যের রাজনীতি শুরু করতে এবং ত্যাগী নেতাদের ক্ষোভ-মান ভাঙাতে কেন্দ্রের এ ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। এই
উদ্যোগের অংশ হিসেবে তাই শুধু জেলায়ই নয়, উপজেলায়ও নেতা বানানো বা জনপ্রতিনিধি বানানোর ক্ষেত্রে ওই এলাকার প্রভাবশালীদের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন প্রধানমন্ত্রী।
আওয়ামী লীগের ওই নেতা আরও বলেন, প্রভাবশালীদের হাতে নেতা নির্বাচন ও জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করার সুযোগ দিয়ে সারা দেশে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। তবে অনেক অঞ্চলে ব্যতিক্রমও আছে। ব্যতিক্রম অঞ্চলে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিভিন্ন সময়ে জেলা-উপজেলায় যেসব সম্মেলন হয়েছে সেখানে কাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে সেই নির্দেশনা দিয়ে দিতেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এগুলো স্থানীয় নেতাদের প্রভাব কমানোর কারণ বলে জানান ওই নেতা।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর আরেক সদস্য বলেন, কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনের অভ্যন্তরে সুবিধাবাদী নেতাদের আধিপত্য বেড়ে গেছে। আর এই সুযোগ তৈরি হয়েছে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমতাবান হওয়ার মনোবাসনা থেকে। ফলে সংগঠন দুর্বল হচ্ছে। এ কারণেই সংগঠনের দিকে নজর দিতে সম্প্রতি সম্পাদকমণ্ডলীর সভায় দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা নেতাদের তাগিদ দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, সারা দেশে সাহেদদের জন্মই হয়েছে নেতাদের বলয়ের রাজনীতি শুরু করার কারণে। দলের চেয়ে ব্যক্তির ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা যাদের উদ্দেশ্য তারাই বলয়কেন্দ্রিক রাজনীতি শুরু করেন।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফ বলেন, আসন্ন পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ত্যাগী নেতাদের এবার মূল্যায়ন করা হবে। আওয়ামী লীগ ত্যাগীদের দল। কর্মীদের ত্যাগের মূল্যায়ন করেই আওয়ামী লীগের পথচলা।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম বলেন, ‘আগামীতে দলের সব পর্যায়ে ত্যাগী, সৎ, কর্মীবান্ধব নেতাকর্মীদের গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি হাইব্রিড, সুযোগসন্ধানী ও দুর্নীতিবাজদের বাদ দেওয়া হবে। উড়ে এসে জুড়ে বসাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান থাকবে এটা দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশ। শুধু পৌর বা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনই নয়, দলের সবস্তরে ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হবে।’